গল্প ও গদ্য

পয়সায় কেনা শত্রুতা

কার‌ও কাছ থেকে টাকা ধার নিলে সে তা ফেরত চাইবার আগেই দিয়ে দিতে হয়। পুরোটা এক বারে শোধ করতে না পারলেও হাতে যখন‌ই কিছু বাড়তি টাকা জমে, অল্প অল্প করে মিটিয়ে দিতে হয়। নির্দিষ্ট দিনক্ষণ উল্লেখ করতে নেই, বরং অমুক দিনের মধ্যে কিছু টাকা পরিশোধ করে দেবে, এমনটা বললেই ভালো। ওই দিনের আগেই তাকে তাগাদা দেবার সুযোগ না দিয়ে প্রতিশ্রুত অংশটুকু তার হাতে তুলে দিলে তোমাদের সম্পর্কটা সুন্দর থাকবে।

পাওনাদারকে এড়িয়ে চললে অনেক ধরনের দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এর চাইতে বরং তার সাথে দেখা করে নতমস্তকে ক্ষমা চাওয়া ভালো। সে নাহয় কিছু কথা শোনাল‌ই-বা... ওটা মেনে নাও। ভুল তো তুমিই করেছ, কথা তো তোমাকে শুনতেই হবে।

অনেকসময় এমন হয়, তুমি তাকে টাকাটা ফেরত দেবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে, এই বিষয়টি মাথায় রেখে সে কোনও একটা কাজের পরিকল্পনা করে ফেলল কিংবা তোমার কথার উপর নির্ভর করে সে কাউকে আর্থিক বিষয়ে কথা দিয়ে ফেলল। এখন তুমি যদি শেষ মুহূর্তে এসে টাকা ফেরত দিতে অপারগতা প্রকাশ করো, তখন সে বিব্রত ও বিরক্ত হবে, এমনকী চরম বিপদেও পড়ে যেতে পারে। তাই তোমার উচিত হবে, সময় শেষ হবার অনেক আগেই তার সাথে দেখা করে তোমার সমস্যার কথাটি তাকে জানানো। এতে যদি তোমাকে তার খারাপ আচরণও সহ্য করতে হয়, তবু তোমাদের সম্পর্কটা নষ্ট হবে না।

জীবন থেকে একজন মানুষ হারিয়ে ফেলা খুব বোকামির কাজ। বিশেষ করে, যে মানুষটা তোমাকে অমন বিশ্বাস করে তোমার প্রয়োজনের সময় টাকা ধার দিয়েছে, তাকে হারানো মানে নিজের আত্মার সাথে প্রতারণা করা। মানুষ এমনি করেই বিশ্বস্ত মানুষ হারিয়ে পুরো পৃথিবীকেই হারিয়ে ফেলে।

আমরা যখন কাউকে কখনো ঋণ দিই, তখন ভালো হয়, এমন পরিমাণে টাকা ধার দেওয়া, যেটা সে পরিশোধ না করলে বা করতে না পারলে আমরা আর্থিক ও মানসিকভাবে কষ্টে পড়ে যাব না। কেউ এক লক্ষ টাকা ধার চাইলে যদি দিতেই হয়, তাকে দশ হাজার টাকা দিয়ে তা ফেরত পাবার আশা ছেড়ে দিলেই ভালো। এতে মানসিক শান্তি নষ্ট হয় না। একসময় পাওনা টাকার মায়া ছাড়তে পারলেও দেনাদারকে কখনও কেউ মন থেকে ক্ষমা করতে পারে না। মানুষ নিরুপায় হয়ে ঠকে যাওয়াটা মেনে নিতে বাধ্য হয়, তবে যে তাকে ঠকাল, তার সাথে বাকি জীবনে সম্পর্কটা আর স্বাভাবিক হয় না।

ওই লোকের সাথে কথা বলার সময় আমাদের আচরণে ঠিক‌ই তার প্রতি বিরক্তি ও ঘৃণা ফুটে উঠবে। স্বাভাবিকভাবেই সে আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। টাকা ধার দিয়ে এভাবেই আমরা টাকাও হারাই, মানুষ‌ও হারাই। নিজের পয়সা খরচ করে এভাবে শত্রুতা কিনে কী হয়? তার চাইতে অনেক ভালো, ফেরত পাবার আশা ছেড়ে দিয়ে এমনিই কিছু টাকা দিয়ে দেওয়া।

কার‌ও কাছ থেকে ধার না নিয়ে বরং কিছু টাকা চেয়ে নিলে ভালো। এতে সম্পর্ক ঠিক থাকে। মানুষ আরেক জায়গায় ধরা খায়, আর তা হলো, অন্যের ব্যাবসার জন্য মুনাফার শর্তে টাকা লগ্নি করা। এ ধরনের চুক্তিতে মুনাফা দূরে থাক, মূল টাকাটা তুলতেই ঘাম ছুটে যায়। প্রায় সময়ই মূল টাকাটাই জলে যায়। যে ব্যাবসা তুমি নিজে থেকে করতে পারবে না কিংবা তুমি নিজেই বোঝো না, সেই ব্যাবসার কাজে কাউকে বিশ্বাস করে মুনাফার প্রতিশ্রুতিতে টাকা বিনিয়োগ করার মানেই নিজেই হাতে ধরে সন্দেহ ও অবিশ্বাসকে জীবনে জায়গা দেওয়া।

যখন সে মূল টাকাটাই আর ফেরত দেয় না, নানান তালবাহানা করে, মাসের পর মাস আর বছরের পর বছর ঘোরায়, তখন নিজেকে খুব প্রতারিত ও প্রত্যাখ্যাত লাগে। মনটা একেবারেই কীরকম ছোটো হয়ে থাকে। বন্ধুত্ব, সম্পর্ক, মনের শান্তি ও স্বস্তি... এক এক করে সব‌ই হারিয়ে যায়। তার প্রতি সমস্ত বিশ্বাস ও সম্মান চলে যায়, সে জায়গাটা দখল করে নেয় চরম বিরক্তি ও ক্রোধ। অশান্তি কখনও এমনি এমনি আসে না, বরং মানুষ নিজেই নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে যত্নের সাথে অশান্তিকে নিজের মনের ঘরে নিমন্ত্রণ দেয়।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *