গুরুদয়াল কলেজের সামনে যে পার্কসদৃশ মুক্তমঞ্চ আছে নরসুন্দার পাড়ে, হিমশীতল বিষাদ তাড়াতে ওখানে প্রায়ই হাঁটতে যাই। হাঁটাহাঁটি, খাওয়া-দাওয়া... ভালোই লাগে।
আজ এক বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম... না, ওখানে নয়। হঠাৎ মনে হলো, সুমন টি স্টল-এ চা খেতে যাই। মাঝে মাঝে আমার মধ্যে নানান ধরনের ক্রেইভিং চাপে। আজও তা-ই।
অটোতে চেপে মুক্তমঞ্চে চলে গেলাম। দুই বন্ধু মিলে বুলেট-চা আর দুধ-চা খেলাম। ঘড়িতে তখন রাত সোয়া দশটা। ক্রেইভিং মিটল, দাম মিটিয়ে মাঠ পেরিয়ে কলেজের সামনে থেকে মিশুক অটো'তে ওঠার জন্য রাস্তার ওপারে থাকা এক চাচাকে ডাকলাম। বন্ধুকে বললাম, চলো, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে এই অটোতেই আমি বাসায় ফিরব। বন্ধু বলল, না না, আমার বাসা তো কাছেই, হেঁটে চলো। ওখান থেকে অটোতে উঠতে পারবে।
দ্রুত চাচাকে চেঁচিয়ে বললাম, চাচা, যাব না, আপনি চলে যান। হাত নেড়ে রাস্তার এপারে না আসতে অনুরোধও করলাম।
বয়স্ক চাচা আমার কথা বা বারণ কোনোটাই খেয়াল করতে পারলেন না, গাড়ি ঘুরিয়ে এপারে এসে আমাদের পাশে থামলেন। তখন আমি তাঁকে বললাম, চাচা, কিছু মনে করবেন না, আপনাকে আসতে নিষেধ করেছিলাম তো!
তিনি "ও আচ্ছা!" বলে চলে গেলেন। আমি সাধারণত এমন ভুল বোঝাবুঝির ক্ষেত্রে কিছু কমপেনসেশন দিয়ে দিই। আজ কেন জানি দিলাম না। তিনি চলে যাবার পর প্রচণ্ড আফসোসে মনের মধ্যে সারাক্ষণই খচখচ করতে লাগল। আমার বন্ধু আমাকে বার বার ওভারথিংক না করার পরামর্শ দিচ্ছিল। কিন্তু মন কি আর শোনে ধর্মকথা!
বন্ধুর বাসার কাছাকাছি যখন, তখন আবছাভাবে মনে হলো, ওই বৃদ্ধ চাচা দু-জন যাত্রী-সহ আমাদের পাশ দিয়ে গেলেন। বন্ধুকে এটা বলাতে সে বলল, ভাই, তোমার মাথায় উনি এখনও রয়ে গেছেন, তাই ভুল দেখেছ। অন্য কেউ গেছেন।
বন্ধুকে বিদায় দিয়ে ওর বাসার গলির মুখে এসে দাঁড়িয়ে এক মিশুককে হাত দেখিয়ে থামতে বললাম। বিস্ময়ে দেখি, সত্যি সত্যি ওই চাচাই সামনে এসে থামলেন। জিজ্ঞেস করলাম, চাচা, কিছুক্ষণ আগে গুরুদয়ালের সামনে আপনার সাথেই দেখা হলো না?
চাচার সাথে জন্ম-মৃত্যু বিষয়ক বিভিন্ন গল্প করতে করতে বাসায় ফিরলাম। আমার অদৃষ্টে লেখা ছিল, আজ আমি চাচার গাড়িতেই বাসায় ফিরব। চাচাকে ফিরিয়ে দেবার পরও তা-ই হলো আমার সাথে। অদৃষ্টই চাচাকে আমার বন্ধুর বাসার কাছাকাছি নিয়ে এল; শুধু তা-ই নয়, উনি যে যাত্রী নিয়ে সে-পথে গেলেন, তাঁরা এমন একটা দূরত্বে নেমেছেন, যেখান থেকে উলটো পথে ঠিক ওই পয়েন্টে ফেরার প্রয়োজনীয় সময় ঠিক ততটাই ছিল, আমার চোখে প্রথমেই পড়ার জন্য যতটা লাগে।
তাঁরা তো অন্যপথেও যেতে পারতেন, যাননি। তাঁরা তো আরও দূরেও যেতে পারতেন, যাননি। চাচার মিশুকটি আমার দৃষ্টিসীমার মধ্যে কয়েক সেকেন্ড পরেও তো আসতে পারত, আসেনি। সময়ের এমন অদ্ভুত সমাপতন আমি বেশি দেখিনি। আমার আফসোস কমানোর দায় কি স্বয়ং ঈশ্বরই অনুভব করেছেন আজ? না কি আজ চাচার রিজিকে যাত্রী হিসেবে আমার বন্ধুটি ছিলই না, বরং ওই দু-জন এবং আমি ছিলাম? নসিবে যা লেখা থাকে, তা ফলানোর জন্য কি তবে সময় নিজেই কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়ে?
চাচার গাড়িতে বাসায় নেমে বুক থেকে যেন আফসোসের ভারী একটা পাথর নেমে গেল। প্রযোজ্য ভাড়ার কয়েক গুণ মেটানোর পর চাচার মুখে ফুটে ওঠা তৃপ্তি দেখে মনে হলো, ঈশ্বর যেন পরিকল্পনা করেই আজ আমাদের মুক্তমঞ্চে টেনে নিলেন, আর এমন নৈশ-মঞ্চনাটকের মধ্য দিয়ে আমার কিছু ভুল ক্ষমা করে দিলেন। চাচার মন আজ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ভালো হবার জন্যই এই পুরো টাইমফ্রেমের শুরুতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খারাপ হওয়া দরকার ছিল। আমরা কে-ইবা যেতে পারি তাঁর মহান মাস্টারপ্ল্যানের বাইরে! আবারও প্রমাণ পেলাম, নিয়তের জোরে নিয়তি ঘোরে।
নৈশ-মঞ্চনাটক
লেখাটি শেয়ার করুন