গল্প ও গদ্য

টুয়েন্টি পার্সেন্টের বিচার

: বাহ্! স্পিকারটা তো চমৎকার! নাম কী এটার? ... (হাতে নিয়ে) কোরাস ... কোন দেশের?
: বাংলাদেশের, ভাই। ওয়ালটন কোম্পানির।
: অসাধারণ কোয়ালিটি! অবশ্য ওদের সব প্রোডাক্ট‌ই ভালো।
: তুমি ইউজ করেছ ওদের সব প্রোডাক্ট?
: না, তা করিনি। তবে এসি'ও তো ভালো, বাসায় ইউজ করি। বাকিগুলোও হয়তো ভালো।
: এই হয়তো'র উপর ভর করে তুমি ওদের সব প্রোডাক্ট নিয়ে সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেললে? অনুমানের উপর নির্ভর করে জাজ করা কি ঠিক?
: আসলে অত ভেবে কথাটা বলিনি। মাথায় এল, বলে ফেললাম।
: বলতে চাইলে ভেবেই বলতে হবে, ভাই। কার‌ও যতটুকু নিয়ে তুমি নিশ্চিতভাবে জানো, ততটুকু নিয়েই কথা বলো। যা জানো না, তা নিয়ে মতামত দাও কীভাবে? আমরা যখন নিজে নিজেই কার‌ও টুয়েন্টি পার্সেন্ট জেনে বাকি এইটি পার্সেন্ট নিয়েও মন্তব্য করে বসি, তখন কী হয়, জানো? তার সম্পর্কে আমাদের মধ্যে একধরনের পজিটিভ বা নেগেটিভ জাজমেন্ট তৈরি হয়। যদি কখনও ওই বাকি এইটি পার্সেন্ট নিয়ে আমাদের ধারণার বাইরে কিছু দেখি, তখন আমাদের মেজাজ খারাপ হয়। এর জন্য কে দায়ী? সে? না কি আমাদের জাজমেন্টাল অ্যাটিটিউড? যা ভালো করে জানিই না, তা নিয়েও মতামত দিই কোন যুক্তিতে?

এই স্পিকার নিয়েই বলি। তোমার এটা ভালো লেগেছে। তুমি কেবল এটা নিয়েই বলো। তোমার যদি ওদের এসি'ও ভালো লাগে, তাহলে ওটা নিয়েও বলো। ওদের যা নিয়ে তুমি জানো না, তা নিয়ে ভালো কি খারাপ কিছুই বলতে যেয়ো না। ওদের কোনোটা খারাপ লাগলে কেবল ওটাকেই খারাপ বলো, বাকিগুলোকে খারাপ বোলো না। আরও ভালো হয় যদি ওদের যা যা তোমার বিচারে ভালো, তা তা নিয়েই কথা বলো, বাকিগুলো নিয়ে চুপ থাকো। কিংবা নিতান্তই বলতে হলে বলো যে ব্যক্তিগতভাবে তোমার ভালো লাগেনি, কেননা যা তোমার ভালো লাগেনি, তা অন্য কারও ভালো লাগতেও পারে। কোম্পানি তো আরও আছে; ওদের যে প্রোডাক্ট তোমার পছন্দ হয়নি, তা তুমি অন্য কোনও কোম্পানিরটা ইউজ করো, ওদেরটা সিম্পলি ইগনোর করো। মন্দ কথা ছড়ানোর কী দরকার? যতটুকু ভালো লাগে, গ্রহণ করো, বাকিটুকু এড়িয়ে চলো।

এই যে সামনের স্পিকারটা, এটা তোমাকে যে আনন্দ দিচ্ছে, তার কি কোনও দাম নেই? এই আনন্দের জন্য কি তোমার মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা উচিত নয়? ভাবো তো, কাছাকাছি কোয়ালিটির জেবিএল স্পিকার কিনতে গেলে তোমার কত গুণ বেশি খরচ পড়ত? কী দরকার ওয়ালটনকে জাজ করার? ওদের এটা ভালো লেগেছে তো এটাই উপভোগ করো, বাকিগুলো নিয়ে আলাপ করার কী আছে? তোমার অপছন্দের প্রোডাক্ট তো অন্য কারও ভালো লাগতেও পারে, তাই না?

মানুষের বেলাতেও এই কথাগুলি খাটে। খুব নিশ্চিত হয়ে না জেনে নিছকই অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে নিয়ে কখনোই কিছু বলা যায় না। কাউকে নিয়ে কিছু বলতে চাইলে তার ভালো দিকগুলো নিয়ে বলো, নতুবা চুপ করে থাকো। যার যতটা তোমার ভালো লাগে, শুধু ততটা নিয়েই থাকো, ব্যস্! ধরো, হুমায়ূন আহমেদের কেবল একটা ব‌ই-ই তোমার ভালো লেগেছে। তাহলে বলতে চাইলে ওই একটা ব‌ই নিয়েই বলো। তিনি ওটা না লিখলে ওটা পড়ার আনন্দ তুমি কোথায় পেতে? তোমার সব আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে মেটাতে হবে কেন? আরও তো লেখক আছেন, তাই না? আরেক ধরনের পাঠকরূপী ছাগল দেখেছি যারা আরও এককাঠি সরেস। লেখকের পার্সোনাল লাইফ নিয়েও গবেষণা করতে শুরু করে দেয়।

আমার মাথায় আসে না, আমি কীভাবে চলব বা চলব না, তা নিয়ে আপনি কেন বলবেন যদি আমার চলার কোনও দায় বা দায়িত্ব আপনি না নেন বা আপনাকে নিতে না হয়? সেই শিক্ষা বা জ্ঞান দিয়ে কী হবে, যা কমনসেন্স‌ই শেখায় না? অনুমানের উপর ভর করে বা শোনাকথার উপর ভরসা রেখে কাউকে জাজ করতে যেয়ো না। যার দিকে তাকাতে ভালো লাগে না, তার দিকে না তাকিয়ে অন্যদিকে তাকালেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *