আমার মেয়েটা দেখতে কেমন হয়, তা দেখার খুব ইচ্ছে আমার ছিল। সে মেধায় কেমন হতো, কেমন করে কথা বলত, ওর চোখ-নাক-মুখ-চুল দেখতে কেমন হতো, দেখার ভয়ংকর তৃষ্ণা আমার ছিল।
আমি আমার মেয়ের নাম রেখেছি স্বর্ণলতা। অথচ স্বর্ণলতা বলে সত্যি সত্যি কেউ নেই। আজব না?
আপনার লাগবে না আজব, জানি। আমার খুব আজব আজব লাগে।
ওকে খুব করে চাইতাম। ওর কথা ভাবলেই মাথায় অর্গাজমের মতন সুখ হতো।
ওকে দেখার তৃষ্ণাটা ঠিক ততটুকুই প্রকট ছিল, যতটুকু প্রকট ছিল আমার জন্মের আগেই চলে-যাওয়া বাবাকে দেখতে চাওয়ার তৃষ্ণা।
এই দুই ভয়ংকর তৃষ্ণা গলায় কাঁটার মতন বিঁধে নিয়েই আমি একদিন টুক করে মরে যাব। সবাই জানবে, স্ট্রোক করেছি, সুইসাইড করেছি, কিংবা বড়ো কোনও রোগে মরে গেছি। অথচ আমি যে গলায় কাঁটা বিঁধে মরে গেছি, সেটা কেউ কখনও জানতেই পারবে না।
মানুষের কত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চাওয়া কত বিশাল বিশাল কাঁটা হয়ে গলার দম আটকে দেয়, তাই না?
তুই রাখিসনি আমাকে। স্বর্ণলতাকে এত করে চাইতাম, তুই সবসময় না না করতিস। তুই থাকিস তোর জগত নিয়ে, ঘরসংসার বউ-বাচ্চা সবই আছে, ভালোই কেটে যায় তোর সময়। কিন্তু আমার কাছে তুইও নেই, স্বর্ণলতাও নেই। তাহলে একটা মানুষ বাঁচবে কী নিয়ে যদি কিছুই না দিস তাকে?
আমার স্বর্ণলতা থাকলে দিব্যি চলে যেত। আমি শুধু তোর ডানহাত আর স্বর্ণলতার মা হতে চেয়েছি। আমি শুধুই একজন লেখক হতে চেয়েছি রে! ওই লেখকসত্তাটা এক তুই ছাড়া আর কেউই জাগাতে পারে না। এত দামি একটা সত্তা কত অনায়াসে মরে গেল, তুই ধরতেও পারিসনি!
গোটা দুনিয়ায় আমার আর কারও সাথেই তোর মতন সৌল-কানেকশন হয়নি। আমি দেখতাম, আমি যা বলতে চাই, তা তুই বলার আগেই বুঝে যাস। আমি ঠিক যেভাবেই ভাবি, তুই ঠিক সেভাবেই ভাবিস। এই কানেকশনটা স্বর্গীয়।
কেন এখন আমাকে আটকে রাখতে চাইছিস?
না, তা আর হয় না রে, কুবের মাঝি! ঘাটে নাও এসে গেছে আমায় নিতে, আমায় যে ফিরতে হবে তীরে... ঘরে, সংসারে।
সংসারে সাহিত্য হয় না, রান্নাবাড়া আর নিয়ম মেপে রাতগভীরে সঙ্গম হয় কেবল। ওখানে সাহিত্য জন্মে না। যা হারিয়েছ, তা আগাগোড়াই হারিয়ে ফেলেছ।
আমাদের গেছে যে দিন, তা যে একেবারে গেছে!
এটাই আমাকে ভাবিয়েছে প্রচুর। টেকেন-ফর-গ্রান্টেডের মতন একটা ব্যাপার। থাকলে থাকো, না থাকলে যাও গিয়ে! একটা গা-ছাড়া সম্পর্ক ছিল আমাদের।
তুমি জানো, আমি স্রেফ তোমার সাথে থাকব বলে কত যুদ্ধ করেছি সমাজের বিরুদ্ধে, পরিবারের বিরুদ্ধে, কাছের মানুষগুলোর বিরুদ্ধে? তুমি জানো, আমি কত কত মানুষকে জীবন থেকে অনায়াসেই সরিয়ে দিয়েছি, চলে যেতে বলেছি স্রেফ তোমার সাথে থাকব বলে? এসব কখনও তোমাকে বলা হয়নি। কারণ তোমার জন্য যুদ্ধ করতেও আমি সুখী ছিলাম। কিন্তু কিছু বিষয় ভাবিয়েছে আমাকে খুউব।
আমার ডায়েরিটা তোমাকে আমাদের পঞ্চম অ্যানিভার্সারির সারপ্রাইজ গিফট হিসেবে লিখতে শুরু করেছিলাম। আমি জানতাম যে তুমি দুনিয়ায় লেখার চেয়ে বেশি ভালো আর কিছুকেই বাসো না।
কিন্তু যেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, তোমাকে নিয়ে আমার আগামী পাঁচ বছরের প্ল্যান থাকলেও, আমাকে নিয়ে তোমার আগামী পাঁচ দিনেরও প্ল্যান নেই, সেদিন অনেক কিছুই পালটে গিয়েছিল।
যেদিন এই ডায়েরিটা পোড়াতে পেরেছিলাম, সেদিন বুঝে গিয়েছিলাম, তোমাকে ছাড়তেও আমি পারব, মানুষও খুন করতে পারব।
এসব কথা বলতে চাইনি, রাতের বাসে ঢাকা যাচ্ছি, বাস-কাউন্টারে বসে আছি, বারোটায় বাস ছাড়বে। ভূতে হঠাৎ মাথা টিপছে আমার। 'অ্যা মোমেন্ট টু রিমেমবার' মুভিটা দেখে ভূতে পেয়েছে আমাকে, আবেগে কুরে কুরে খাচ্ছে আমাকে।
আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি বাস-কাউন্টারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করব শূন্য কারও জন্য। কেউ আসবে না, তবুও অপেক্ষা করব। এই শীতে আমি সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা থেকে কাউন্টারে বসে আছি। এখান থেকে বোনের বাসা মাত্র দশ মিনিটের পথ। তবু আমি এখানেই বসে আছি।
তুমি জানো, পান আমার ভয়ংকর রকমের পছন্দের খাবার? জানো না। আজ জানিয়ে দিলাম।
আরও অনেক কিছুই জানো না তুমি আমার সম্পর্কে।
আমি প্রায়ই সন্ধ্যায় রাস্তায় বের হয়ে একা একা হাঁটি, পান খাই, চা খাই, টংয়ের দোকানে বসে থাকি রিকশাওয়ালার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
তুমি জানো, আমার একদমই কথা বলতে ইচ্ছে করে না? আমার সুযোগ থাকলে একটা শব্দও মুখে উচ্চারণ না করেই সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পারব। বেশি কথা বলতে হবে দেখে আমি তেমন কারুর ফোন ধরিও না, কাউকে ফোন করিও না। মায়ের সাথে কথা বলেছি দুই মাস হয়ে গেছে। মা বেশি কথা বলে, তাই। আমি মাকেও ফোন করি না।
তুমি তো জানো না, প্রাণহত্যা করতে হয় বলে আমি মাছ-মাংস খাই না খুব ছোটোবেলা থেকে। আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না ক্লাস থ্রি থেকে। আমি মোটেও সংসারী মানুষ নই।
তুমি তো জানো না, প্রযুক্তিতে আমার ভয়ংকর বিতৃষ্ণা আছে। ফেইসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ছাড়া আমার আর কোনও কিছুই নেই। একটাই কারণ, এসবে প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি লাগে। আমি খুব করে চেয়েছি ল্যাপটপে বাংলা লেখা শিখতে, খুব কঠিন লেগেছে শিখতে গিয়ে।
মিরপুরে আড়াই হাজার টাকা দিয়ে ভর্তিও হয়েছি কম্পিউটারের কাজ শিখতে, এক সপ্তাহের বেশি যাইনি। ওসব ওয়ার্ড, এক্সেল... ফালতু জিনিসপত্র টানে না আমাকে।
অদ্ভুত না? মানুষ ভাবে, আমি অনেক স্মার্ট। তুমি তো জানো না, আমি আমার ফেইসবুকের পাসওয়ার্ডও জানি না।
নতুন ফোনে নতুন কাজ শিখতে হবে বলে আমি ফোন কিনছি না, এই মরা ফোন নিয়েই পড়ে আছি।
দুনিয়ায় একমাত্র কয়েকটা জিনিস আমাকে টানে খুব করে। সেগুলি হলো সাহিত্য, লেখালেখি, কবিতা, ফিলসফি, সাইকোলজি।
আমি চলে যাচ্ছি... আমার সব হারিয়ে যাচ্ছে... তোমার সব হারিয়ে যাচ্ছে... আমার আর তোমার দিকে তাকিয়ে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে!
আমাদের গেছে যে-দিন
লেখাটি শেয়ার করুন