৫।
মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়ো। যাবার মতো কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই, কোথাও নেই। শুধু পা-দুটি চলতে থাকে, আর তুমি তাদের পেছনে পেছনে অনুসরণ করো। পা জানে, কোথায় রাস্তা উঁচু হয়েছে, কোথায় পাথর, কোথায় নরম মাটি। পায়ের নিজস্ব এক স্মৃতি আছে, মাথার স্মৃতিরও আগে থেকে, আরও প্রাচীন, আরও নিঃশব্দ। কে হাঁটছে, কে বসে আছে, কে না-হওয়ার দিকে যাচ্ছে, কে হওয়ার ভান করে এগোচ্ছে, এসব আলাদা করার প্রয়োজন নেই; সবই শেষপর্যন্ত নড়া, শুধুই নড়াচড়া।
দরজার কাছে, জুতোর পাশে, একটি ছাতা পড়ে আছে। কবে এসে সেখানে থেমেছে, মনে নেই। হয়তো নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে, চোরের মতো। জিনিসপত্র এভাবেই আসে। যথেষ্ট দীর্ঘদিন স্থির হয়ে বসে থাকলে চারপাশে তারা জমে ওঠে, যেমন নদীর বাঁকে পলি জমে। আর তুমি যেন সেই পাথর, যার চারদিকে সব এসে থিতু হয়।
ছাতাটি ভাঙা। ভেজা কাপড়ের পুরোনো গন্ধ এখনও লেগে আছে তার গায়ে। একটি শিক বেঁকে গেছে, একদিকে কাপড় ছিঁড়ে গেছে। এখন আর বৃষ্টি ঠেকানোর ক্ষমতা তার নেই। বৃষ্টি হলেও কী, না হলেও কী, সে নিয়ে তোমার খুব-একটা ভাবনা নেই।
তবু এই ছাতাটিই যেন যত্নের শেষ অবশেষ। কারও যত্নের, তোমার নিজের নয়, বরং সেই দূরের, প্রায়-ভুলে-যাওয়া সময়ের, যখন মানুষ এখনও আবহাওয়ার বিরুদ্ধে, দুনিয়ার বিরুদ্ধে, নিজের ক্ষয়িষ্ণু শরীরটিকে একটু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করত। চলার দিনে ছাতা নিয়ে বেরোতে। রোদ, বৃষ্টি, আকাশ যা-ই পাঠাক, তার বিরুদ্ধে এক ক্ষুদ্র ঢাল সঙ্গে রাখা। সে তোমার আর আকাশের মাঝখানে দাঁড়াত, কিছুটা সময়ের জন্য আবহাওয়াকে আটকাত, তারপর ভেজা কাপড় ভাঁজ করে বগলে চেপে তুমি ফিরে আসতে।
ছাতা আর টুপি, উপরের বিরুদ্ধে এই দুই প্রাচীন প্রতিরোধ। দুটোই ছিল আকাশ থেকে নিজেকে সামান্য বাঁচিয়ে রাখার উপায়। এখন তারা ছুটিতে। টুপি টেবিলে, ছাতা দরজার ধারে। দুই ক্লান্ত সৈনিক, দীর্ঘ পাহারাশেষে বিশ্রামে।
আর তুমি এখন খোলা। ওপরের বিরুদ্ধে আর কোনো ঢাল নেই। আকাশ যা পাঠায়, তা-ই নেমে আসুক শরীরে। তুমি বেরিয়ে পড়ো টুপি ছাড়া, ছাতা ছাড়া, অনাবৃত, ধূসরের নিচে; যেমন পাথর থাকে অনাবৃত, যেমন সব কিছু থাকে, যখন তারা আর নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে না।
সিঁড়ি। অন্ধকার সিঁড়ি। দেয়ালে হাত রেখে নামতে হয়। তেরো ধাপ। তুমি গুনতে চাওনি, পা গুনেছে। পায়ের নিজের এক অভ্যেস আছে; তুমি তাকে শিখিয়েছিলে, না সে নিজেই শিখে নিয়েছে, তা আর জানা যায় না। সে তোমাকে জানানোরও প্রয়োজন বোধ করে না। তবু সংখ্যাটা থেকে গেছে, কারণ একদিন তুমি তাকে হাতেনাতে ধরেছিলে: পা নিঃশব্দে গুনছিল, আর তেরো সংখ্যাটি মাথায় আটকে গেল। তেরো।
লোকেরা বলে, অশুভ। কার জন্য অশুভ? তোমার জন্য তো নয়। কোনো সংখ্যাই আর তোমার কাছে শুভ বা অশুভ নয়; সবই সমান নিরর্থক, সমান নির্বিকার। সেটাও অনেকদিন আগে স্থির হয়ে গেছে।
নিচে নেমে আসে দরজা। তার বাইরে রাস্তা। সরু, পাথর-বাঁধানো, ভেজা, বৃষ্টির পরে শ্যাওলায় পিছল। রাস্তা ঢালু হয়ে বন্দরের দিকে নেমে গেছে। ধরো, বন্দর: একটি দেয়াল, কিছু নৌকা, কিছু জল, যা পুরোপুরি সমুদ্র নয়, অথচ শেষপর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে মেশে, এক ফাঁক দিয়ে জোয়ার-ভাটা আসে যায়।
জোয়ার-ভাটার ওপর ভরসা করা যায়। তারা চুপচাপ আসে, চুপচাপ সরে যায়, আবার ফিরে আসে। মানুষের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বস্ত। ঘড়ি থাকলে তাদের সঙ্গে সময় মেলানো যেত, যদি তোমার মেলাতে ইচ্ছে করত। কিন্তু ইচ্ছে করে না। ঘড়িও আর নেই। যে-ঘড়িটি ছিল, তা তোমার মতোই কোনো এক অদৃশ্য ঘণ্টায় থেমে গেছে, একটি সময়ে, যা আর পড়া যায় না। এখন সেটি টেবিলের ওপর পড়ে আছে, চায়ের দাগের পাশে। ঘড়ি আর দাগ, দু-জনেই থেমে গেছে।
শহরটিও ছোটো হয়ে এসেছে। আগের চেয়ে অনেক ছোটো, যেন ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে, মাংস সরে গিয়ে হাড় বেরিয়ে আসছে। দোকানপাট আছে। কিছু খোলা, কিছু এমনভাবে বন্ধ যে, আর কখনও খুলবে না। তক্তা-মারা জানালার কাঠ কোথাও কোথাও পচে গেছে, পেরেকের মাথায় মরচে, ফাঁক দিয়ে অন্ধকার দেখা যায়। ধুলো জমেছে স্তরের পর স্তর।
দেয়ালে এখনও খসে-পড়া বিজ্ঞাপন লেগে আছে। সেল, কনসার্ট, নির্বাচন, প্রার্থীদের নাম, এমন সব মুদ্রায় দাম লেখা, যা আর চলে না। মুখগুলো বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে; শব্দগুলো অর্থ হারিয়েছে। শহরের মৃত জীবন দোকানের সামনে পড়ে আছে, যেন আঠায় আটকে যাওয়া মাছি; স্থির, আর কখনও উড়বে না।
তুমি হাঁটতে থাকো এদের পাশ দিয়ে: কসাইয়ের দোকান, কাগজের দোকান, সুতো-জিপ-বোতামের দোকান, আর সেই জায়গা, যেখানে একসময় রেডিয়ো বিক্রি হতো, এখন যেখানে কিছুই হয় না। যে-বাড়িটি একদিন ব্যাংক ছিল, সেখানে এখন চিঠির স্তূপ। সব কিছু এখনও চলছে, তবে একধরনের নিভে-আসা ভঙ্গিতে। কারণ হারিয়ে যাবার পরেও জিনিসপত্র যেভাবে নিজের পুরোনো অভ্যেসে কিছুদূর এগিয়ে যায়, এই শহরও সেভাবেই চলছে। ধীরে, নির্বাপণের দিকে।
বন্দরের কোণায় একটি গাছ আছে। পুরোনো, বাকল-ফাটা, বুড়ো হাতের শিরা-ওঠা চামড়ার মতো। প্রতিবছর একই নকশা ফিরে আসে। শীতকালে তার ডালপালা কঙ্কালের মতো খালি হয়ে যায়, আর এখানে বেশিরভাগ সময় যেন শীতকাল। গ্রীষ্ম এলে সামান্য কিছু পাতা জন্মায় বটে, কিন্তু তাকে পুরোপুরি সবুজ বলা যায় না; একধরনের হলদেটে, রুগ্ণ সবুজ, যেন ঋতু নিজেও অসুস্থ শরীরে টিকে আছে।
তুমি আসার আগেও গাছটি ছিল। তুমি চলে গেলেও থাকবে। এখনও আছে, আর তুমি তার পাশ দিয়ে বন্দরের দেয়ালের দিকে এগিয়ে যাচ্ছ।
আজ গাছে পাতা নেই, শুধু ডাল, ধূসরের গায়ে আঁকা। শিরার মতো, ফাটলের মতো, ছাদের চিড়ের মতো, ওপর থেকে দেখা নদীর বদ্বীপের মতো। দূর থেকে দেখলে সব শাখায়-ভাঙা জিনিসের নকশাই একরকম লাগে; গাছ, ফাটল, শিরা, বদ্বীপ। ভাঙনেরও যেন একটি অভিন্ন ব্যাকরণ আছে।
গাছের কোনো মানে নেই।
তবু কখনো তুমি তার নিচে দাঁড়াও। ছায়ার জন্য নয়, কারণ ছায়া নেই। আশ্রয়ের জন্যও নয়। পা থেমে যায় বলেই থামো। তারপর ওপরে তাকাও, খালি ডালের দিকে, ধূসর আকাশের গায়ে। আর একমুহূর্তের জন্য, শুধু একমুহূর্ত তুমি আর গাছ একই নীরবতায় এসে মিশে যাও, একই না-যাওয়ায়, একই স্থির শ্বাসে।
গাছ কোথাও যায় না। তুমিও আর যাও না। গাছ কোনোদিন যায়নি; তুমি কেবল যাওয়া বন্ধ করেছ। গাছ তো সেই জায়গাতেই বহু আগে পৌঁছে গেছে, যেখানে তুমি এখন এসে দাঁড়িয়েছ। না-যাওয়ার মধ্যে, এক স্থানে শিকড় গেড়ে, সারাটা জীবন নড়েনি একচুলও, কোনো অভিযোগ ছাড়া, অন্য কোথাও থাকার বাসনা ছাড়া।
যথেষ্ট। এই শব্দেরও আর তোমার দরকার নেই। তুমি যথেষ্টেরও পরে, অযথেষ্টেরও পরে, সব মাপকাঠির বাইরে এসে পড়েছ। গাছ যেখানে আছে, তুমিও যেন সেখানেই এসে পৌঁছো। এখানে, শুধু এখানে, চিরকাল এখানে।
তারপর বন্দরের দেয়ালে এসে থামো। পৌঁছেছ বলে নয়, পৌঁছোনোর আলাদা কোনো জায়গা তো নেই। পা থেমেছে বলেই থামো। সিদ্ধান্ত নেয় পা, তুমি নও। পা-ই যেন সব বোঝে। কখন চলবে, কখন থামবে, কখন ঘুরবে। মাথা ভাবে; পা জানে। তুমি যাত্রী মাত্র, চালক পা।
দেয়ালে হেলান দাও। হাতের নিচে পাথর। ঠান্ডা, খসখসে, কোথাও কোথাও শ্যাওলার ভেজা ছোঁয়া। এই পাথর ঘরের চেয়ে অন্যরকম সত্যি। ঘরকে চেনা যায় ভেতর থেকে; এই দেয়ালকে চেনা যায় স্পর্শের তল থেকে, চামড়ার কিনারা থেকে। যেখানে তুমি শেষ, পাথর শুরু।
ঘরে তুমি আর ঘর এতটাই মিশে গেছ যে, দুটিকে আলাদা করা যায় না। কিন্তু এখানে, এই দেয়ালে হেলান দিলে, হঠাৎ সীমানা স্পষ্ট হয়। একেবারে ঠিক সেই রেখা, যেখানে তোমার উষ্ণতা শেষ, পাথরের শীতলতা শুরু; যেখানে তোমার নরম শেষ, পাথরের শক্ত শুরু। জীবনের সবচেয়ে স্পষ্ট সীমারেখা বোধ হয় এটাই।
তুমি এখানে। পাথর এখানে। দু-জনেই এখানে, এবং দু-জনেই আলাদা। এমন এক জীবনে, যেখানে সব কিছু ক্রমে মিশে গিয়ে একাকার হয়ে যায়, সেখানে অন্তত এইটুকু আলাদা করে টের পাওয়া যায়। এ-ও তো কম কিছু নয়।
নিচের দিকে তাকাও। জল। পুরো সমুদ্র নয়, বন্দরের জল। গাঢ়, ঘন, ভারী। তার ওপর নানা জিনিস ভাসছে। দড়ির ছেঁড়া মাথা, প্লাস্টিক, বোতল, একটি দস্তানা। একটাই। ভেজা। তার জোড়া নেই। অন্যটি কোথায়? হয়তো অন্য কোনো বন্দরে, অন্য উপকূলে, অন্য জীবনে, যে-জীবনে তুমি কোনোদিন পৌঁছোবে না।
দস্তানাটি এখানে, অন্যটি নেই। সব দস্তানার পরিণতি যেন এমনই। সব জিনিসেরও। যা এখানে, তার চেয়ে, যা এখানে-নয়, তার ভাগ সবসময় বড়ো। এখানে-নয়-ই প্রায় সমগ্র পৃথিবী; এখানে আছে সামান্য, প্রায় কিছুই নয়। একটি দস্তানা, একটি দেয়াল, আর একটি মানুষ; দেয়ালে হেলান দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। এইটুকুই এখানে। এইটুকুই তোমার। বাকিটা সব এখানে-নয়; অর্থাৎ বাকি পৃথিবী, যাকে তুমি ছেড়ে এসেছ, অথবা যে তোমাকে ছেড়ে গেছে। দুটোর মধ্যে আসলে তফাত কতটুকু?
বাঁধা নৌকোগুলো সামান্য দুলছে। জলে নিজেদের ছায়া দেখছে যেন। দড়ি ধাতুর গায়ে ঠকঠক করছে, মাস্তুলে ছোটো ছোটো আঘাত লাগছে। শব্দগুলো এমন যে, মনে হয়, কেউ যেন অন্ধকারে বসে মোর্স কোডে চিঠি লিখছে। ক্লিক, ক্লিক, ক্লিক। রাতজাগা শব্দ। পুরোপুরি নিয়মিত ছন্দে নয়, তবু নিয়মিতের কাছাকাছি। কারণ কখন বাজবে, তা ঠিক করে হাওয়া। আর হাওয়া তো সময় মেনে চলে না।
হাওয়াই যেন একমাত্র সত্যিকারের ঘড়ি। কখনো দ্রুত, কখনো ধীর, কখনো একেবারে থেমে যায়, আবার শুরু হয়। সে নিয়মিত হবার ভান করে না। কোনো ভানই করে না। আসে, অথবা আসে না। বইতে শুরু করে, অথবা একেবারেই বয় না। তার কোনো সময়সূচি নেই, কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
হাওয়াকে তুমি কী বলবে? পছন্দ করো? “পছন্দ” শব্দটি ঠিক নয়। হাওয়ার তোমার পছন্দের দরকার নেই; তার কোনো কিছুরই দরকার নেই। আর বোধ হয় এই নয়-দরকার, এই না-লাগা, এই উদাসীনতাকেই তুমি একধরনের ভালোবাসা দিয়ে দেখো। হ্যাঁ, হয়তো এই না-লাগাটাকেই ভালোবাসো।
কারণ তুমি নিজে সেই অবস্থায় পৌঁছোতে চেয়েছ, অথচ পারোনি। এখনও তোমার কিছু কিছু লাগে। ঘর লাগে, চেয়ার লাগে, কাপ লাগে, সমুদ্রও লাগে। তুমি এখনও সম্পূর্ণ মুক্ত নও।
তাই হাওয়ার যে-নির্ভরহীনতা, যে-না-লাগা, সেটাই তোমার লাগে। এই জটিলতা তুমি বোঝো; তুমি নির্ভর করো তাদের মুক্তির ওপর, যারা তোমাকে একেবারেই চায় না: সমুদ্র, হাওয়া, গাঙচিল। তুমি যেন সেই মানুষ, যার দরকার, অন্যরা তাকে না-চাক। আর সেটিও একধরনের চাওয়া; সবচেয়ে অসহায়, সবচেয়ে নির্মম চাওয়া, কারণ সে নিজেকে চিনতে পারে, আয়নায় নিজের মুখ দেখে, তবু চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে না।
আবারটুকুই জীবন: আট
লেখাটি শেয়ার করুন