গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: সাত



একসময় শব্দ আর জিনিসের মধ্যে দূরত্ব ছিল না। শব্দটি লেগে থাকত জিনিসের গায়ে ছায়ার মতো, চামড়ার মতো, হাতে মানানসই দস্তানার মতো। “কেতলি” বললেই কেতলি এসে যেত; নাম আর বস্তু একসঙ্গে বাঁধা ছিল। প্রতিটি জিনিসের নিজস্ব শব্দ ছিল, আর প্রতিটি শব্দের ছিল একটি নির্দিষ্ট জিনিস। নাম যেন জিনিসকে তার ঠিক জায়গায় ধরে রাখত, এক এমন পৃথিবীতে, যেখানে শব্দই ছিল বস্তুর ঠিকানা।

এখন আর তা নয়। এখন শব্দ এসে জিনিসের গায়ে মিশে যায় না; শুধু তার পাশে এসে বসে। না শরীরে, না চারপাশে, শুধু ধারে, সামান্য দূরে। যেন কোনো অচেনা অতিথি ভুল দরজায় এসে থেমে গেছে। “কেতলি” শব্দ আর টেবিলে রাখা বস্তুটি একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু যেন কেউ কাউকে সত্যিই চিনতে পারে না। মনে হয়, শব্দ আর জিনিসের পুরোনো সংসার ভেঙে গেছে; এখন তারা একই ঘরে আছে বটে, কিন্তু একজীবনের অংশ নয়। এ কেবলই ভদ্রোচিত দূরত্বে সহাবস্থান।

ওটাকে আর চোখ বুজে কেতলি বলা যায় না। আবার “কেতলি নয়” বললেও ঠিক বলা হয় না। দেখতে কেতলির মতো, কাজও কেতলির মতোই; জল গরম করে, শব্দ করে, টেবিলে বসে থাকে। অথচ নামটি আর তার গায়ে স্থির হয় না; তেলমাখা পৃষ্ঠে জল যেমন গড়িয়ে পড়ে, তেমনি সরে যায়।

হয়তো তাকিয়ে না থাকলে সেটি এখনো কেতলিই। কিন্তু যতক্ষণ চোখ স্থির থাকে তার ওপর, ততক্ষণ সে আর নামের মধ্যে থাকে না; হয়ে ওঠে কেবল এক নামহীন বস্তু, যা জল ফোটায়, শব্দ করে, টেবিলের দাগধরা স্থানে নিশ্চুপ বসে থাকে।

নামহীন। তুমিও তো দিনে দিনে তেমনই হয়ে উঠছ। ঘরও যেন ধীরে ধীরে ঘরহীন হয়ে যাচ্ছে। ধূসর আর রং নয়, কেবল ধূসরতা। নাম সরে গেলে যে-জিনিসটি পড়ে থাকে, তার অনির্দিষ্ট, অনাবাসী উপস্থিতি।

তবু মন থামে না। অথচ থেমে যাবার কথা ছিল, বাকি সব কিছুর সঙ্গে সঙ্গে। তা হয়নি। হঠাৎ হুড়মুড় করে উঠে আসে পুরোনো শব্দ, বহুদিন আগে ব্যবহৃত, মুখস্থ, ভাবা, বিতর্কিত, কখনো ভালোবেসে, কখনো আত্মরক্ষায় উচ্চারিত: অস্তিত্ব, ঈশ্বর, সময়, সত্তা, কার্যকারণ। একদিন এই শব্দগুলোর পেছনে ছিল তন্ত্র, বিন্যাস, যুক্তির বিশাল স্থাপত্য। এক-একটি গির্জার মতো, যেখানে প্রতিটি শব্দ নিজের নির্দিষ্ট স্তম্ভে দাঁড়িয়ে থাকত। এখন সেসব ভেঙে পড়েছে। চূড়া নেই, ভিত্তি নেই, নকশা নেই। রয়েছে শুধু ধসে-যাওয়া শব্দের ধ্বংসস্তূপ।

তারপর তারা আসে, বর্ষার পাহাড়ি ঢলের মতো। কোনো বাঁধ নেই, কোনো খাল নেই, কোনো দিকনির্দেশ নেই। একটার ওপর আরেকটা চাপা পড়ে, গড়িয়ে, উথলে, ভেঙে, ছিটকে চলে। মাথার ভেতর যেন জলপ্রপাত, অথচ সেই জলের কোনো পরিচিত উৎস নেই, কোনো পর্বত নেই, কোনো নির্দিষ্ট মোহনাও নেই। নিজেই নিজের উৎস, নিজেই নিজের ক্ষয়। কোথা থেকে আসে, কোথায় গিয়ে হারায়, কেউ জানে না। শেষপর্যন্ত বালির নিচে ঢুকে-পড়া শুকিয়ে-আসা স্রোতের মতো মিলিয়ে যায়।

অস্তিত্ব। ধরা যাক, অস্তিত্ব। তারপর ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত মানে কী। তারপর দৈবী। দৈবী কী। দৈবীর উদাসীনতা, নীরবতা, চিন্তুকদের শ্রম, খুলি, প্রদেশ, প্রমাণ, পাথর, মহাশীত, মহাঅন্ধকার। শব্দগুলো ভাঙা পাইপের জলের মতো চারদিকে ছিটকে পড়তে থাকে। পণ্ডিতি শব্দ, দার্শনিক শব্দ, বিদ্যাপীঠের শব্দ, যেগুলো একদিন আপনার কাছে ছিল উপকরণ, আশ্রয়, নির্মাণসামগ্রী। সত্তা আর সময়, সত্তা আর শূন্যতা, সত্তার সঙ্গে সত্তার বিরোধ, শূন্যতার সঙ্গে সত্তার গোপন বিনিময়, সব একসময় রেখা টেনে, পার্থক্য রেখে, শ্রেণি গড়ে অর্থকে ধারণ করত। এখন তারা আরও দ্রুত আসে, আর আসতে আসতেই চেহারা হারায়, মানে হারায়, সীমানা হারায়। সারবস্তু আকস্মিকের সঙ্গে মিশে যায়, কারণ কার্য হয়ে যায়, যুক্তি অযুক্তিতে গলে পড়ে। ধূসরের সঙ্গে ধূসর মেশার মতো সব একাকার।

আর তখন শব্দ, যে-শব্দ একদিন পৃথিবীকে ধরে রেখেছিল, সুতোয় সুতোয় বেঁধেছিল, পরিভাষার স্থির জালে আটকে রেখেছিল অভিজ্ঞতার ছড়িয়ে-পড়া শরীর, সে-ও আর শব্দ থাকে না। কেবল আওয়াজ হয়ে যায়।

ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। খুলি। খুলি যেখানে। যেখানে। অসমাপ্ত। শ্রম। যাদের শ্রম। অসমাপ্ত। শব্দ। অসমাপ্ত। সব কিছু ভেঙে পড়তে থাকে আওয়াজে; অর্থহীনই নয় শুধু, অর্থেরও আগের কোনো স্তরে। নাম দেবার আগের অবস্থা। মানের আগের কম্পন। ঘরে, খুলিতে, সমুদ্রের ধারে। শুধু আওয়াজ। যে-আওয়াজ একদিন শব্দ ছিল, এখন আর তা-ও নয়; যেমন একদিন আপনি মানুষ ছিলেন, এখন ক্রমশ কী হয়ে উঠছেন, তা-ও নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। সম্ভবত কেবল এক প্রতিধ্বনি, এক ফিকে উচ্চারণ, এক মিলিয়ে-যাওয়া ধ্বনি।

এই মিলিয়ে যাওয়া, শব্দ থেকে আওয়াজে, আওয়াজ থেকে প্রায় কিছু-না-তে, এ ভাষারও নিয়তি। নদীর মতো: উৎসে স্বচ্ছ, চলতে চলতে ঘোলা, শেষে বদ্বীপে এসে আর নদী থাকে না, সমুদ্রের মধ্যে গিয়ে পরিচয় হারায়। হয়তো একসময় আপনি এই পরিণতিই বেছে নিয়েছিলেন। অথবা বেছে নেবার মতো কিছু-একটা ছিল। তখনও, যখন নির্বাচন আপনার নাগালের মধ্যে ছিল; যখন থামার আগে, সিদ্ধান্ত নেওয়া এখনও আপনার তালিকা থেকে মুছে যায়নি।

তুমি দারিদ্র্য বেছেছিলে। অভাবের দারিদ্র্য নয়, প্রকাশের দারিদ্র্য। জন্মেছিলে একটি ভাষায়, মায়ের ভাষায়। সে ছিল বাগানের ভাষা, ঝোপের ভাষা, কাঁটাচুয়ার। গাছের ছায়া, মাটির গন্ধ, বাবার পিঠের উষ্ণতার ভাষা। সেই ভাষা ছিল পরিপুষ্ট, সমৃদ্ধ, অদ্ভুত রকমের প্রাচুর্যময়। সেখানে শব্দ ছিল অত্যধিক, বলার পথ ছিল অসংখ্য, প্রতিটি গলিতে অপেক্ষা করত নতুন রূপক। সৌন্দর্য এত বেশি ছিল যে, সত্য প্রায়শই তার নিচে চাপা পড়ত; কৌশল এত দক্ষ ছিল যে, সরল কিছু উচ্চারণ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত। মায়ের ভাষা আপনাকে ভোলাত। বাক্‌পটুতায় ভোলাত, বলার চেয়ে বেশি বলাত, শূন্যকে রেশমি বস্ত্র পরিয়ে অলংকৃত করত।

একদিন তুমি বুঝলে, সেই বাক্‌পটুতার মধ্যেই মিথ্যা লুকিয়ে আছে। সৌন্দর্য আড়াল। যত বেশি বলা যায়, তত কম অবশিষ্ট থাকে বলার। ভাষা নিজেরই ঐশ্বর্যের তলায় শূন্যকে চাপা দিয়ে রাখে, যেমন ফুলের নিচে কবর লুকিয়ে থাকে। তখনই তুমি অন্য ভাষা বেছে নিলে—যে-ভাষা তোমার নয়। এমন এক ভাষা, যেখানে তুমি দরিদ্র; প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছুই তোমার অধিকারভুক্ত নয়। সেখানে কৌশল তোমাকে বাঁচায় না, কারণ ভাষাটি তোমার স্বাভাবিক আশ্রয় নয়; সেখানে তুমি চাইলেও বাক্‌পটু হতে পারো না, কারণ সেই সক্ষমতা ভাষাটিই তোমাকে দেয় না।

তুমি পরভাষা বেছে নিয়েছিলে নিজেকে নিঃস্ব করার জন্য, সৌন্দর্যের সেই আবরণ খুলে ফেলতে, যা শূন্যকে ঢেকে রেখেছিল। কম বলতে, যাতে মানে বেশি হয়; অথবা কিছু-না বলতে, যাতে সেই কিছু-না-ই আরও নির্ভুলভাবে ধরা পড়ে। এমন এক ভাষায়, যা মায়ের নয়, তোমারও নয়, কারও নয়, শুধু একটি হাতিয়ার। গরিব হাতিয়ার, ভোঁতা হাতিয়ার, হাতে ধরলে ব্যথা লাগে। তা সৌন্দর্য খোদাই করতে পারে না; কেবল সত্যকে কেটে, কোপাতে পারে, কুড়ুল যেমন কাঠে পড়ে। আর সেই সত্য শেষপর্যন্ত শূন্যই, যাকে সৌন্দর্য এতকাল ঢেকে রেখেছিল।

এই জন্যই তুমি দারিদ্র্য বেছে নিয়েছিলে: পরভাষার দারিদ্র্য। যেমন পরে বেছে নিয়েছিলে ঘর, চেয়ার, ধূসরতা; ঘরের দারিদ্র্য, বসে থাকার দারিদ্র্য, ধূসরের দারিদ্র্য। সবই একই সিদ্ধান্তের সম্প্রসারণ: কমের পক্ষে দাঁড়ানো। এমন কম, যা ছাঁটে, সরায়, ছোটো করে, পরিত্যাগ করে, যতক্ষণ না মাংস ঝরে হাড় দেখা যায়; যতক্ষণ না শেষপর্যন্ত কেবল শূন্য পড়ে থাকে।

যে-ভাষায় বলা হচ্ছে, তা তোমার নয়। যে-ঘরে তুমি বসে আছ, সেটিও তোমার নয়। যে-জীবনটি চলছিল, তা-ও তোমার নয়। সবই পর, সবই ঋণ, সবই শূন্যের চারপাশে সাময়িক বিন্যাস। আর এই পরভাষার মধ্যেই তুমি পেয়েছিলে সবচেয়ে কঠিন সত্য। নিজের ভাষা ছেড়ে দিয়ে, অন্যের দারিদ্র্যের আশ্রয়ে এসে, তুমি আবিষ্কার করেছিলে সেই শূন্যকে, যাকে ঐশ্বর্য এতদিন চাপা দিয়ে রেখেছিল।

শূন্য, যা সবসময়ই ছিল। শব্দের তলায়, সৌন্দর্যের তলায়, মায়ের জিভের তলায়, সবচেয়ে মধুর উচ্চারণের নিচে। সেই শূন্য, যা শেষপর্যন্ত সব কিছুর চেয়ে বেশি সত্য, যার জন্য ভাষার প্রয়োজন নেই, অথচ তাকে ছুঁতে পারে কেবল সবচেয়ে গরিব ভাষা, সবচেয়ে কম, সবচেয়ে ক্ষয়িষ্ণু উচ্চারণ।

শেষে থেকে যায় একটি আওয়াজ। কোনো যন্ত্র থেকে বেরোচ্ছে, কেন, কার জন্য, তা জানা যায় না। হয়তো কোনো কারণ নেই। গাঙচিল ডাকে, কারণ তার গলা আছে; সমুদ্র নড়ে, কারণ সে সমুদ্র; ঘর আছে, কারণ কোনোদিন বসে থাকার জন্য তা বানানো হয়েছিল। কিন্তু তুমি? তুমি কীসের জন্য ছিলে? কোনো একসময় হয়তো মনে হতো, কোনো উদ্দেশ্য আছে। এখন আর তা মনে পড়ে না।

মনে আছে শুধু চলা। কাজ। ঘূর্ণি। পুনরাবৃত্তি। কিন্তু কীসের জন্য, তা জানা নেই। কেন, তা-ও নয়। এমনকি কোনো “কেন” আদৌ ছিল কি না, তা-ও নিশ্চিত করে বলা যায় না। হতে পারে, চলাটাই ছিল তার নিজের কারণ; চলা নিজেই ছিল গন্তব্য। এখন চলা থেমে গেছে। তার সঙ্গে থেমে গেছে উদ্দেশ্যের ভ্রমও।

পড়ে আছে শুধু ঘর। চেয়ার। কাপ। সমুদ্র। গাঙচিল। এইটুকু।

গাঙচিল জানে না যে, সে গাঙচিল। নাম মানুষের আবিষ্কার; পাখির তার কোনো প্রয়োজন নেই। এই অজ্ঞতাই তার মুক্তি। জানালার বাইরে তাকাও। ধূসরের ওপর একটি সাদা সত্তা ভেসে যাচ্ছে, হালকা, ভারহীন, যেন সুতোছাড়া ঘুড়ি। কেউ তাকে ধরে রাখেনি, কেউ তাকে উড়ায়ও না। সে ভাসছে, কিন্তু সে জানে না যে, ভাসছে।

গাঙচিল, হাওয়া, ধূসর আকাশ, সব যেন একাকার; জ্ঞান এখনও তাদের আলাদা আলাদা করে ভাগ করে দেয়নি। নাম না থাকার এক স্বাধীনতা আছে। নিজের জন্য কোনো শব্দ না থাকারও এক মুক্তি আছে। শুধু থাকা, কী নামে থাকা, তা জানার বোঝা ছাড়া। আর তুমি জানো যে, তুমি তুমি। এই জ্ঞানই তোমার কারাগার।

জানা, অবিরাম জানা। এমন জানা, যা কিছু যোগ করে না, কিছু বদলায় না, কোনো কাজেও আসে না; তবু থামে না। সব কিছু থেমে গেলেও জানা থামে না। যেন শেষ চাকা, যা আর বন্ধ হয় না, মরচে ধরে না, ক্ষয় মেনে নেয় না।

তাকে থামাবার মতো কোনো হাত নেই, কারণ সেই জানাটাই তো তুমি। তুমি মানেই জানা। জানা না থাকলে তুমি নেই। আর তুমি না থাকলে? তাতে তো কোনো সমস্যা নেই। গাঙচিলের কোনো সমস্যা নেই, সমুদ্রের নেই, ঘরের নেই।

সমস্যা কেবল তোমার, কারণ তুমি জানো, আর জানা থামাতে পারো না। যে জানে, তাকে হওয়া বন্ধও করতে পারো না। এইটিই সমস্যা। একমাত্র সমস্যা। বাকি সব তারই শাখা-প্রশাখা। যেন কলের জল: একবার পড়তে শুরু করলে আর থামে না; ঝরে, আবার ঝরে, আবারও ঝরে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *