ক্লাসে শিক্ষক ঢুকলে যদি ছাত্ররা উঠে না দাঁড়ায়, তবে ওতে কি কোনও ভুল করা হয়? অন্তরে শ্রদ্ধা থাকলেই তো হলো, ওটা বাহ্যিকভাবে দেখানোর কী আছে, তাই না?
রুমে গুরুজনদের কেউ ঢুকলে যে আমরা উঠে সম্মান দেখাই, তারও-বা কী দরকার? বিনয় তো মনের মধ্যে আছেই, লোকদেখানো বিনয়ের কী মানে তাহলে?
ধরুন, আপনি একজনকে খুবই অপছন্দ করেন। তো একদিন ভাবলেন, আজ তার উপর থেকে সমস্ত রাগ-বিরক্তি ঝেড়ে ফেলব। বিদ্বেষের ভার বহন করে চলা তো আর সহজ কাজ নয়! তাই ঠিক করলেন, তার বাসায় যাবেন হাতে করে কিছু মিষ্টি নিয়ে। তাকে ও তার পরিবারকে মিষ্টিমুখ করিয়ে দূরত্ব কমিয়ে ফেলবেন। কিন্তু দেখা গেল, আপনি কী এক অদৃশ্য শক্তির বলে কাজটা কিছুতেই করতে পারছেন না। আপনার ভেতরের কিছু-একটা আপনাকে বাধা দিচ্ছে, আর লোকটার সাথে দেখা করতেই দিচ্ছে না কোনোমতেই। মনে মনে তখন ভেবে নিলেন, থাক, আমার মনে তার প্রতি কোনোরূপ বিদ্বেষ না থাকলেই তো হলো! তাকে এসব দেখানোর কী দরকার?
কাউকে ভালোবাসেন। কাউকে ভালোবাসার মানেই তো তাকে সুখী করা; তাই তার সুখের জন্য অনেককিছুই করতে আপনার মন চায়, কিন্তু শেষমেশ কিছুই করা হয়ে ওঠে না। আপনার ভালোবাসায় কোনও খাদ নেই, তাকে সুখী করার ইচ্ছেটাও আন্তরিক; তবে যা করলে সে সুখী হয়, তা করার বিষয়ে কখনোই নিজেকে সচেতনভাবে ন্যস্ত করেন না। মনে মনে তাকে অনেক ভালোবাসেন, আপনি তাকে সুখী করার জন্য জীবনও দিতে পারেন বলে দাবি করেন। তবে ওই দাবি করা পর্যন্তই; দাবির সমর্থনে কিছু করতে সে বা অন্যকেউ কখনও আপনাকে দেখেনি।
মনের কোণে যা-ই উঁকি মারুক না কেন, বাস্তবে সেটা হাতেকলমে না করলে শেষমেশ কাজের কিছুই আর হয় না। মানুষকে প্রার্থনা করতে হয় সৃষ্টিকর্তাকে সন্তুষ্ট রাখতে নয়, নিজের অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধ রাখতে। আমাদের সমস্ত ধর্মাচরণ আমাদেরই প্রয়োজনে, সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজনে নয়। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, স্নেহ ইত্যাদি প্রবৃত্তি প্রকাশ না করতে না করতে একসময় ধীরে ধীরে উবে যায়। ওসবকে তখন আর ফেরানো যায় না। যে চিন্তায় আমরা অস্থির হয়ে উঠি, তা যদি করে দেখাতে না পারি, করতে না পারলেও অন্তত করার জন্য দৃশ্যমান চেষ্টা আমাদের না থাকে, সেই চিন্তার নাম অলস ইচ্ছে।
মানুষ জীবনে কিছু করতে পারে না স্বপ্নের অভাবে নয়, অলস ইচ্ছের অভিশাপে। ঈশ্বরের কাছে মানুষের ইচ্ছের নয়, কেবলই কর্মের আদর আছে।
অলস ইচ্ছের অভিশাপ
লেখাটি শেয়ার করুন