খুব ঝলমলে কোনও এক ঘোরলাগা পূর্ণিমায় কিংবা অন্ধকার কোনও মধ্যরাতে আমার মরণ হবে। আমার মরণ হবে কোনও এক বিষাদমাখা রাত্রিতে। যার সুখের জীবন নেই, তার সুখের মরণ না হোক।
একরাশ অবসাদ, অফুরন্ত কথা, বলতে-না-পারা হাজারো দ্বিধা নিয়ে আমার সমাপনী গল্পটি লিখিত হবে। শেষ গল্পের সমাপ্তিতেও না থাকুক ছিটেফোঁটাও স্বস্তি।
মরণকালে কেউ জানতেই পারবে না, এ বুকের কতটুক পুড়েছে, এ হৃদয় কতভাগে ভেঙেছে, কতশত বিষণ্ণতায় চুরমার হয়ে একটি তরতাজা গাছ তরতর করে বাড়তে গিয়ে হঠাৎ অতটা নুয়ে পড়েছে। কারুর সহানুভূতি চাই না, তাই করুণাও আমার প্রাপ্য নয়।
আমার অনেক কিছুই জানবে না লোকে। পুড়িয়ে ছাই করে ফেলা সেই ডায়েরির পাতায় পাতায় কোন সে গল্প লিখেছিলাম, বলতে-না-পারা কোন সে কথাগুলো লিখেছিলাম, কেউ জানবে না। লোকে জানলে যে কেবল রক্তাক্তই করে... কী দরকার!
জানলার ধারে রোজ যে শালিকপাখিটি খেতে আসত, আমার জন্য সে অপেক্ষা করবে। পাড়ার মোড়ের পা-ভাঙা আধপাগল কুকুরটা আমায় মনে মনে খুব করে খুঁজবে। হারিয়ে গেলে মানুষ আর খোঁজে না, তবে ওরা ঠিকই খোঁজে।
আচ্ছা, রোজ যে ছবি আঁকতাম, যে গান শুনতাম, যে প্রিয় কথাগুলো আওড়াতাম, ওরা কি আমায় মিস করবে? ওদের কি আমার জন্য মায়া হবে?
... করুক, ওরাও আমায় মিস করুক! আমি যে বিছানায় শুতাম, যে চেয়ারে পড়তাম, যে বারান্দায় রোজ হাঁটতাম, ওরাও যেন আমায় মিস করে একটু-আধটু... আমার শূন্যতায় মন খারাপ করুক ওরাও। ওদের জন্য পূর্ণ হতেই নাহয় আমি শূন্য হব!
আমি চাই, আমার হেঁটে-চলা রাস্তাটা, নুয়ে-পড়া সুপারিগাছটা, এমনকী যেসব তারার সাথে রোজ কথা বলতাম, ওরা সবাই আমাকে মনে রাখুক, মিস করুক... একমাত্র মানুষ ছাড়া সবাই আমার শূন্যতা অনুভব করুক। মানুষ অনুভব করতে জানে না, মানুষ কেবলই কষ্ট দিতে জানে।
আমি নাহয় একটা শালিক হব, ওই মোড়ে রোজ দাঁড়িয়ে আমার অপেক্ষায় থাকা ওই খোঁড়া কুকুরটি হব, নয়তো কারও খুব প্রিয় ব্যালকনিটা হব।
... না না, পরের বার আমি প্রিয়ার সিঁথির সিঁদুর হব, নয়তো হব বিষাদী তালে বাজতে-থাকা করুণ কোনও সুর। সুরের মূর্ছনায় নিবিড়ভাবে মিশে থাকুক আমার সমস্ত অনস্তিত্ব!
হ্যাঁ, একদিন, ভীষণ ঘোরলাগা এক রাতে আমি কারও পায়ের নূপুর হয়ে যাব, নয়তো কোনও বেকার প্রেমিকের চালচুলোহীন শূন্য এক পকেট হব। আর যা-ই হই, পরের বার যেন মানুষ কিছুতেই না হই। মানুষ সব সহ্য করতে পারে... কেবল এক মানুষ বাদে।
অনস্তিত্বের সুর
লেখাটি শেয়ার করুন