১৯। মূর্তির ভেতর শূন্য
এটি না পুরো অন্ধকার, না পুরো রাত্রি, বরং যেন স্মৃতি ও অবহেলায় ঢাকা এক জগৎ; তাই সংগ্রহশালার ধুলো সরাতে হয়। চারদিকে ক্ষয়, পোকায়-কাটা অবস্থা, কিন্তু তবু শুধু সংকলন বা জমিয়ে রাখার ভেতর নিজেকে আটকে রাখা চলে না। কোনো মন্ত্র বা আচার নয়, বরং সমস্ত জীবনের দেবীসত্তার কাছে বার বার ফিরে গিয়ে তার ছন্দ খুঁজে নিতে হয়।
কোনো এক অদ্ভুত শক্তিতে নদী যেন ভয়ংকর হয়ে ওঠে; তার কালো জলে কবির হাড়ের মতো স্মৃতি ডুবে থাকে। মৃত্যুর স্মারক লিখতে লিখতে আমি জীবনের সহজ সুখ পিঠে-পায়েসের গন্ধ ভুলে গেছি। পাড়ের দিকে যে-সুখ দেখা যায়, তা যেন সুতোয়-বোনা এক ভ্রমমাত্র। অথচ কোথা থেকে বার্ধক্য বা ক্ষয় নিখুঁতভাবে ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে; আর তুচ্ছ প্রাণীরাও জীবনযুদ্ধের ভেতর পাপ-পুণ্য আর অন্নের জন্য কাঁদে।
এই পৃথিবীতে মৃত্যুর স্মারকও বাজারদরে কেনাবেচা হয়। বাহ্যিক সাজসজ্জা পরে সামনে এগোতে গিয়ে দেখা যায়, হাসি আর সত্যিকারের হাসি নেই, রয়ে গেছে কেবল তার খোলস। চারদিকে ধাতব, কঠিন, বিষাক্ত সভ্যতা; তেজস্ক্রিয় মেঘে আকাশ ভারী। এমনকি জন্মের ভোরেও বৃষ্টিতে ভিজে ওঠার মতো নির্মল মানবিক উপস্থিতি আর নেই।
২০। সাঁতার-হারানো বালি
লতা, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তোমার সবুজ আভা ম্লান ও ক্ষুদ্র হয়ে গেছে, যেন কঠিন নুড়িপাথরের মধ্যে পড়ে সংকুচিত হয়েছে। আশা, তুমি আসলে কার, তা-ও অনিশ্চিত। সামান্য বিষ, সামান্য ক্ষত, সামান্য অশুভ জমতে জমতেই রাতের আলো নিভে গেছে।
হারিয়ে-যাওয়া সাঁতারের স্মৃতি থেকে যেন আবার জল তুলে আনা হয়; অশ্বত্থের চারা এনে বসানো হয়, আবার ফিরে আসে বরফ, পায়ের ছাপ, নীল পাথরের বিষণ্ন বিকেল। উপত্যকার কুয়াশার ভেতর যে গল্প শেষ হওয়া আর শুরু হওয়ার মাঝখান থেকে ডাক দেয়, তার জন্যই মানুষ ফুল, ফল, বংশধর, প্রদীপ, সব উৎসর্গ করতে চায়।
আর কিছু না পারলেও অন্তত এইটুকু জিজ্ঞেস করবে: ফিরে এলি, ছেলে? কারণ বালি ঠিকই জানে, সাঁতার-কাটতে-নামা মানুষ কোথায় ডুবে গেছে; কিন্তু সে কিছু জিজ্ঞেস করে না, কিছু বলে না।
২১। এইটুকুই সম্বল
ওরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল, খাবার দিয়েছিল, কাপড়ও দিয়েছিল; নিজেদের হাতে-বোনা কাপড়। সেই কাপড়ের গন্ধে এমন গভীর স্মৃতি মিশে আছে যে, তাকে ভাষায় পুরো প্রকাশ করা যায় না।
তার দুই হাত ছুঁয়ে বিস্মিত হয়ে আমি তাকে আমার বাঁ-হাত দিলাম; আর ডান-হাতে কানের লতি ছিঁড়ে যেন এক নতুন সম্পর্কের চিহ্ন, সবুজ পাথরের অলংকার, তার হাতে তুলে দিলাম। চোখের পাতা আর নরম পালকের মতো কোমল এই সামান্য চিহ্নটুকু যেন যত্নে রেখে দেওয়া হয়।
সবুজ পাথর ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়। কানের লতির রক্ত শুকিয়ে যায়। মাটি সব কিছুই শেষপর্যন্ত ধরে রাখে, কিন্তু ঠিক কাকে ধরে রাখে—মানুষকে, স্মৃতিকে, না চিহ্নকে, তা স্পষ্ট নয়।
২২। পরিযায়ী
কাঁথার ওপর বৃষ্টির শব্দ পড়ছে, আর তার ভেতরেই যেন এক নৈতিক বিধি শোনা যায়, অন্যের জিনিস নেওয়া যাবে না। ক্ষুধা, জন্মের উপাদান, শরীরের প্রাথমিক বিকাশ, সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে জীবনের দেহ গড়ে ওঠে।
দূর, প্রায় কল্পলোকের শীত আর বরফ পেরিয়ে ফিরে এলে মা লাল আটার রুটি বানান, আর চারদিকে লেবুবনের স্মৃতি জেগে ওঠে। ছেঁড়া কাগজের গন্ধ, পাড়া-মহল্লার নানা স্তর, নানা জাত-সমাজের ভাঙা ভিটে, এসবের মধ্য দিয়ে এক বুড়ো মানুষ আমাকে তুলে নিয়ে যায় এক পরিত্যক্ত পুরোনো জায়গায়।
সেই রাতে নতুন নক্ষত্র দেখা গেল, যাদের আলো এইমাত্র পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে, যদিও তারা নিজেরা হয়তো ততক্ষণে নিভে গেছে। তবু তাদের আলো বেঁচে আছে।
তারপর যেন আমি নিজেই জাহাজ তৈরি করলাম, সমুদ্রও বানালাম। শীতের তীক্ষ্ণ ভোরে তোমার নাম উচ্চারণ করলাম। নানা দুঃখ, ক্ষত, মৃত্যু, ভাঙন পেরিয়ে এসে দেখি, সেই বুড়ো কোথায় হারিয়ে গেছে। শুধু একটি ছোট্ট অন্ধ বাছুর কোলে শুয়ে আছে—অবিশ্বাস্য কোমল, সাদা, নীরব।
২৩। শীতার্ত সাদা হাত
হে আদিম সত্তা, তোমার আগেও আমার তৃষ্ণা ছিল, আমার জলের প্রয়োজন ছিল। মাটি ভেঙে আমি জল খুঁজেছি; তৃষ্ণায় পাথর চেটেছি, আর উপায় না পেয়ে নিজের রক্তও পান করেছি। অসংখ্য মৃত্যু আর জন্মের আগুনের ভেতর দিয়েই এই দেহ, এই রং, এই মাংসের সৃষ্টি হয়েছে। তাই তোমার কাছে এখন সেই আদিম জলের প্রার্থনা জানাই।
তুমি যেন নিজেই এসে উপস্থিত হলে, অন্ধ অস্থিরতার এক চিত্রকর হয়ে। তোমাকে দেখার আগেই পাখি মরে গেছে; তোমার ঘুমের ওপর আচ্ছাদনের মতো পাতা বিছানো। তোমার রূপ গড়া হয়েছে মাটির ঘষা রং, নখের তুলির আঁচড়, হাড়-মাংসের কাদামাটি, কবরের মাটি, শরতের রোদ আর ঘামের উপাদানে।
তুমি ঘুমোতে যাবার আগে লাল দুধধারার মতো জীবনরস বইছিল; তারপর সময়ের বিরাট ব্যবধানে যেন এক মহাপ্লাবন নেমে এল। তুমি একই সঙ্গে আদিম বীজ, আবার সেই বীজ-ধারণকারী সবুজ জরায়ুও। সারারাতের জ্বরের মধ্যে তোমার আবছা স্পর্শ অনুভূত হয়; এক হাত স্নিগ্ধ, আরেক হাত যেন অসুস্থ কণ্ঠ চেপে ধরে। শেষে রয়ে যায় এক শীতার্ত, সাদা হাতের অনুভব।
২৪। নামহীন নদী
ভোর হলেও চারদিকে এখনও অন্ধকার, তাই বোঝা যায় না সেটাকে রাত বলব কি না। আগামী দিনের সম্ভাবনাও যেন খুব সরু এক পথ ভেদ করে দূরে সরে গেছে। ঝরে-পড়া মাদারগাছ, হারিয়ে-যাওয়া সময়, আর নামহীন এক নদীর আহ্বান, এসবের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে তোমার চোখ যেন আমাকে থামতে বলছে।
মাদারের আঠা দিয়ে রঙিন কাগজ জোড়া লাগে, জলা-জঙ্গলের ভাঙাচোরা বাস্তবতা তবু থেকে যায়। আষাঢ়-শ্রাবণের ভয়, বন্যা, ভাঙন সব সীমা ভেঙে এসে মানুষকে কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। এমনকি সাদা হাড় চোখে পড়লে তখন প্রশ্ন জাগে, এই মানুষটির, এই প্রাণের, কোনো ঘর ছিল কি?
পায়ের নিচের মাটি কখন যে নোনা ও অনিরাপদ হয়ে গেছে, বোঝা যায় না। তবু শেষ ট্রেন ধরার জন্য দীর্ঘ পথ পেরোতে হয়। শরীরে যেন বহু আদিম, বন্য ইতিহাসের রক্ত বয়ে চলেছে; জীবনের ভেতরে ভয়, অজানা পথ এবং সহিংসতার সঙ্গেও একসময় মানিয়ে নিতে হয়। তারপর সেই শেষ ট্রেনই যেন শরীরের ভেতর কালো ধোঁয়ার মতো বিঁধে যায়।
দুটি পিঁপড়ের সামান্য মুখোমুখি হওয়াও এত ক্ষুদ্র, এত সহজে হারিয়ে যাবার মতো। তাই তুষারযুগ নেমে আসার আগেই তাকে ঢেকে রাখতে হয়। শেষপর্যন্ত সেই ট্রেন আর ফিরে আসে না, আর যে-নদী একসময় এত কিছু বহন করছিল, তার নামটুকুও কেউ জানতে চায় না।
২৫। দেহহীন
স্পর্শ, হাসি, কান্না, ম্লান উষ্ণতা, সব কিছুকেই ডাকা হচ্ছে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে: এই ভেঙে-যাওয়া, বিষাক্ত, দেহহীন সত্তার ভেতরে তারা এসে কোথায় আশ্রয় নেবে? আমি যেন বিষের ধোঁয়াও, আবার ভাষাও; বহু আগেই আমি আমার পুরোনো শরীর ছেড়ে এসেছি। এখন জ্বর, ক্লান্ত দুপুর, অদক্ষ হাতে আঁকা জীবনের মতো এক বিশৃঙ্খল অস্তিত্ব আমাকে ঘিরে আছে।
স্মৃতির ভেতর দেখা যায় লাইব্রেরির বারান্দা, নিভে-যাওয়া আলো, ভারী বই, সাদা শাড়ি, বীণা-হাতে এক অবয়ব, আবার আধুনিক নাগরিকতার আড়ালে ঝাপসা কিশোর প্রেম। শীতের হঠাৎ সন্ধ্যায় কোনো সুর বেজে ওঠে, কিন্তু কেউ তার দিকে মন দেয় না।
একসময় শুধু শব্দ ছিল। তখনও ছন্দ, রাত্রি, বা অনুভূতির স্থির রূপ তৈরি হয়নি। আজ সেই শব্দই অন্য এক মাধুর্যের ঢেউয়ে শিথিল হয়ে ভাসছে। প্রশ্ন জাগে, কেন কিছু থেকে যায়, কেন কিছু মুছে যায় না।
প্রকৃতির আদিম অন্ধকার, কালো জল, ক্ষুদ্র প্রাণ, অজানা জীব, সব মিলিয়ে এক প্রবাহ বয়ে যায়। যখন সেই প্রবল জল সরে যায়, তখন তীর যেন শূন্য আকাশে ঝুলে থাকে; দেশ, কাল, ব্যক্তি, সম্পর্ক, সব পরিচয় মুছে যায়।
জন্মদিনের মিষ্টি, বাবার কণ্ঠ, কালো বালিকাবধূর বড়োজোর-রাজধানী-দেখা স্বপ্ন, এসবের মধ্যেও বক্তা নিজেকে খুঁজে পায় এক রোগা, দুর্বল ডানহাতের মতো, যেন অন্য কারও জীবনেরই অংশ। শেষে এসে প্রশ্ন থাকে: শরীর না-ও থাকতে পারে, কিন্তু গান কি থেকে যায়?
শরণার্থীর ঈশ্বর: তিন
লেখাটি শেয়ার করুন