গল্প ও গদ্য

মৃৎপিণ্ডের নিবেদন



দেখো, আমি মনে করি, আমি তোমার নিজহাতে গড়া একটি মানুষ। আমি ছিলাম কাদামাটি—নিরাকার, নিরালম্ব, নিষ্প্রাণ—নদীর কোলঘেঁষে পড়ে-থাকা এক অচেতন মৃৎপিণ্ড, যার গহনে না ছিল কোনো আকাঙ্ক্ষার বীজ, না ছিল কোনো স্বপ্নের শ্বাসপ্রশ্বাস। তুমি সেই কুম্ভকার—যে অপরিমেয় ধৈর্যে, অক্লান্ত মমতার জলসেচনে, প্রতিদিন নতুন নতুন রেখা টেনে এই জড় মাটিকে প্রাণবান করে তুললে।

দয়া কীভাবে ধারণ করতে হয়, ভালোবাসা নিঃশব্দ কর্মের ভাষায় কীভাবে উচ্চারণ করতে হয়, দায়িত্বের ভার বহন করে কী করে সোজা হয়ে দাঁড়াতে হয় পৃথিবীর সামনে—এসব তুমিই শিখিয়েছ। তোমার দেওয়া প্রতিটি পাঠ যেন এই মাটিতে একেকটি নতুন খাঁজ, একেকটি অপ্রত্যাশিত বাঁক—যা তাকে ক্রমে ক্রমে আরও গভীর, আরও পরিণত, আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে।

তুমি ভাঙো, তুমি গড়ো, তুমি নিরন্তর নতুন ছাঁচে ঢেলে দাও—কিন্তু কোনোদিন তোমার মুখ থেকে বিচ্ছেদের বাক্য ঝরেনি, পরিত্যাগের সংলাপ উচ্চারিত হয়নি, অন্য কারো অভিমুখে পা বাড়ানোর ইশারাটুকুও আসেনি। শৈশবের একেবারে গোড়া থেকে ভালোবাসা বলতে আমি কেবল একটিই মুখ চিনে এসেছি—তোমার মুখ। তুমি আমার প্রেমের আদিপাঠ, তুমিই তার অন্তিম টীকাভাষ্য। বলে, ভালোবাসার নাকি কোনো মূর্ত রূপ হয় না—তবু আমি যদি চোখ বুজে ভালোবাসাকে কল্পনা করি, আমার সামনে কেবল তোমারই অবয়ব এসে দাঁড়ায়।

"বিরতি নাও, ভালো না লাগলে সরে যাও"—দোহাই তোমার, এই জাতীয় কথা বলে আমার সম্পর্কটিকে কখনও খাটো কোরো না। এ আমার গভীরতম আদরের সম্পর্ক, অশেষ সাধনায় লালিত সম্পর্ক। মা যেমন গর্ভের অন্ধকার থেকে আলোর মুখে এনে নিজের বুকের উষ্ণতায় সন্তানকে বড়ো করে তোলে—আমিও ঠিক তেমনি করে এই সম্পর্কটিকে পালন করে এসেছি, সন্তানবাৎসল্যে, সন্তানের মতোই। এত বছর ধরে বুকের খাঁচায় আগলে রেখেছি—শীতে, গ্রীষ্মে, ঝড়ে, জ্বালায়।

মানুষের দাম্পত্যও এত বছর টেকে না, যত বছর আমার এই সম্পর্ক টিকে আছে। অথচ দাম্পত্যের পেছনে কত খুঁটি—সামাজিক চাপ, ধর্মীয় বিধান, সন্তানের মুখ, রক্তের বাঁধন, পারিবারিক মর্যাদা, আইনের শাসন, আরও কত কিছু। আর আমার সম্পর্ক? এ টিকে আছে এমন কিছুর ওপর, যা চোখে ধরা পড়ে না, আঙুলে ছোঁয়া যায় না, কোনো দাঁড়িপাল্লায় ওজন করা যায় না—বিশ্বাসের ওপর, ভালোবাসার ওপর, মায়ার ওপর, টানের ওপর, আন্তরিকতার ওপর, দুটি অন্তরের সেই নিঃশব্দ সমঝোতার ওপর, যা কোনো দলিলে লেখা নেই, অথচ কোনো দলিলের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়।

আমার পিঠে যদি ডানা গজিয়ে থাকে, তবে সেই পালকের একটি একটি করে প্রতিটি রোপণ করেছে তোমার হাত। তোমার ছায়ায় দাঁড়িয়েই আমি প্রথম শিখলাম মাধ্যাকর্ষণকে অমান্য করতে, শূন্যতার বুকে ভর দিয়ে ওড়ার দুঃসাহস করতে। আমার দেহের প্রতিটি শিরায়, প্রতিটি ধমনিতে, প্রতিটি রক্তবিন্দুতে তোমার পরশের স্বাক্ষর খোদাই করা আছে। আর শোনো—যে-ডানা কোনোদিন তোমার চোখে বিরক্তির ছায়া ফেলবে, সেই ডানা ছেদন করতে গিয়ে যদি আমার শরীরের শেষ ফোঁটা রক্তটুকুও মাটিতে ঝরে যায়, তবু আমি পলকমাত্র দ্বিধা করব না। তোমার প্রশান্তির বেদিমূলে আমার যাবতীয় উড্ডয়নের অহংকার চিরতরে নিবেদিত।

জীবনের কাছে আমার কোনো মহৎ আবদার নেই, কোনো বিশাল প্রত্যাশার পসরা নেই। শুধু তোমার পাশে থাকার অধিকারটুকু—এটুকুই আমার সকল আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু। শুধু তোমার চরণতলে আমার যা-কিছু সম্মান, যা-কিছু অর্জন, সব এনে অর্ঘ্যের মতো সাজিয়ে রাখার জন্যই আমার এত অবিশ্রাম পরিশ্রম। শুধু তোমাকে আমার বুকে আজীবন ধরে রাখতে পারব—এই একটি মাত্র নিশ্চয়তার জন্যই এত সাধনা, এত তপস্যা, এত নীরব লড়াই। যাতে এই আলিঙ্গনের মধ্যিখানে কোনো অনভিপ্রেত ছায়া এসে না পড়ে, কেউ যেন এই গ্রন্থিতে ফাটল ধরাবার স্পর্ধা না রাখে—তাই ধৈর্যের সুতোয় ভর করে আমার এই দিনরাত্রির প্রহরা। সবসময়ই স্বীকার করি—এই লড়াইয়ের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্তগুলোতে তুমিই আমাকে আড়াল দিয়েছ, ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছ, তোমার নিশ্চুপ উপস্থিতি দিয়ে কষ্টের আগুন নিভিয়ে দিয়েছ।

তোমার দুটি চোখ ধার করেই আমি স্বপ্ন দেখি—আমার নিজের চোখে অতটা সাহস নেই। তোমার বুকের ছন্দ ধার করেই আমি প্রতিটি মুহূর্তকে বেঁচে থাকা বলে গণনা করি। এই পৃথিবীতে যদি একটি মাত্র অলৌকিক ঘটনাও ঘটে, আর সেই ঘটনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যদি আমাকে বলা হয়—"চাও, যা খুশি চাও"—সমস্ত সম্ভাবনার অরণ্য ছেড়ে আমি তবু তোমাকেই চাইব। কেবল তোমাকে। বার বার তোমাকে। চিরকাল তোমাকে।

আমার ইবাদত তোমার নাম ধারণ করে, আমার চোখের প্রতিটি পলক তোমার স্মৃতি বহন করে যায়। তবে বলো—সেখানে কী করে আমার পক্ষে তোমাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবা সম্ভব? কী করে তোমাকে কষ্ট দেবার চিন্তা আমার মস্তিষ্কে প্রবেশের অনুমতি পেতে পারে—যেখানে আমার মাথার প্রতিটি স্নায়ুতন্তু তোমারই দখলে, তোমারই অধীনে, তোমারই সাম্রাজ্যের পতাকা বহন করে?

শোনো—ঘুম আসার আগে যখন সমস্ত পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে যায়, আর ভোরের আলো ফোটার আগে যখন চেতনা সবে জেগে উঠতে শুরু করে—সেই দুটি নিভৃত সন্ধিক্ষণে সৃষ্টিকর্তার পবিত্র নামের ঠিক পাশেই যে-নামটি আমার ঠোঁটে আপনা থেকে উঠে আসে, সেটি তোমার। সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা কতখানি, তুমি কি তার আন্দাজ পাও? তিনি স্বহস্তে তুমি নামের এই ফেরেশতাকে আমার জীবনে পাঠিয়েছেন—এই অযোগ্য, এই রুক্ষ মাটির জীবনকে তোমার স্পর্শযোগ্য করে তুলেছেন।

তবু—আমার মাঝে মাঝে সৃষ্টিকর্তার ওপর অভিমান দানা বাঁধে। কেন তিনি আমাকে এত কষ্ট সহ্য করার জন্য বারংবার বাঁচিয়ে রাখেন? কেন এই যন্ত্রণার আয়ু এত দীর্ঘ করেন? কিন্তু সেই অভিমান বেশিক্ষণ টেকে না—দাঁড়িপাল্লার অপর প্রান্তটি নিজে থেকেই ভারসাম্য খুঁজে নেয়। মুহূর্তেই চোখ ভিজে আসে এই ভেবে যে, তিনি তো আমার জীবনে একজন ফেরেশতাও প্রেরণ করেছেন। যিনি আঘাত করেন, তিনিই উপশম পাঠান। যিনি ক্ষত আঁকেন, তিনিই প্রলেপের ব্যবস্থা রাখেন।

ভালোবাসার মানুষের নাম জপের জন্য যদি কোনো তসবিহ থাকত পৃথিবীতে—তবে সেই তসবিহ পাঠের রেকর্ডে আমাকে কেউ কোনোকালে ছাড়িয়ে যেতে পারত না। আমার সেই রেকর্ড ভাঙার দুঃসাহস কারো কল্পনাতেও উঁকি দিত না—কারণ যেখানে প্রেম উপাসনায় পরিণত হয়, সেখানে উপাসকের নিষ্ঠা অনন্তকালকেও হার মানায়।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *