গল্প ও গদ্য

রোদ তবু থাকে



এমন নয়, তাকে আর ভালোবাসি না। ভালোবাসা আছে, থেকে গেছে, যেমন ঘরের পর্দা বদলে যায়, ভেতরের রোদটা তবু একই থাকে। শুধু সেই প্রথম দিনের আগুন, সেই শিখা আর নেই। আঁচ লাগে, পোড়ায় না। ছাই উড়ে যায়নি, শুধু নিভেছে নিঃশব্দে, যেমন রাতের শেষে প্রদীপ নেভে, কেউ ফুঁ না দিলেও।

মাথার ভেতর একটা সময় অপেক্ষার নেশা ছিল। দরজায় পায়ের শব্দ, ফোনের প্রতিটি কাঁপন, জানালার বাইরে প্রতিটি ছায়া, সব যেন তার খবর বহন করে আনত। সে নেশা আজ নেই। বুকের ভেতর ধড়ফড়ের যে-রাজত্ব চলত, প্রতিটি স্পন্দন যার নামে উঠত নামত, সেই সিংহাসন আজ খালি। হৃদয় ছোটে, তবে কারো ইশারায় নয়। শ্বাস বয়, তবে কাউকে মনে রেখে নয়। শরীর বেঁচে থাকার কাজটুকু করে যায়, আর কিছু নয়।

চোখে এক অদ্ভুত ক্লান্তি নেমেছে। সেই ক্লান্তি আমাকে নিস্তরঙ্গ করে দিয়েছে। চোখ আর কিছু খোঁজে না, দৃষ্টি আর ছুটে যায় না রূপের পেছনে। যে-চোখ একদিন ভিড়ের মধ্যেও একটা মুখ খুঁজে বের করত, সে চোখ আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও কাউকে চেনে না। এই দুর্বলতা আমাকে সংযত করেছে। এ প্রেমিকের সংযম নয়, তার চেয়ে নিঃশব্দ একটা-কিছু। রূপের সঙ্গে ছেলেখেলার অভ্যেস চলে গেছে, আগুনের সঙ্গে খুনসুটি করার সাহসও আর নেই। সৌন্দর্য চোখের সামনে এলেও মাথা নত হয় না, চোখ কাঁপে না। এ শুধুই ক্লান্ত এক স্বীকৃতি, এইটুকুই।

তবু অভিযোগ নেই। বেঁচে থাকার দাম মেটাতে ব্যথা তো পেতেই হতো, নাহয় তার কাছ থেকেই পেলাম। অচেনা কারও আঘাত বয়ে বেঁচে থেকে কী লাভ? অন্তত এই ব্যথাটার একটা নাম আছে, একটা ঠিকানা আছে, একটা মুখ আছে। রাতে যখন বুকের ভেতর কিছু-একটা কামড়ে ধরে, তখন অন্তত জানি, কার কথা ভেবে এই যন্ত্রণা। নামহীন কষ্টের চেয়ে নাম-জানা কষ্ট সহ্য করা সহজ। সে না থাকলে হয়তো অন্য কেউ থাকত, অন্য কোনো নাম থাকত—ব্যথা তো থাকত ঠিকই। এ নিয়ে হিসাব মেলাতে বসিনি তাই।

খোদা ভালো জানেন, মৃত্যু আজ কোন গলিতে গিয়ে মরে পড়ে আছে। একসময় তাকে ডেকেছি, বহুবার ডেকেছি, সে আসেনি। এখন সে এলেও বোধ হয় চিনতে পারব না, আমিও বদলে গেছি, সে-ও হয়তো। এ জীবনের দরকারটুকুও ফুরিয়েছে! বেঁচে থাকা এখন আর তৃষ্ণা নয়, অভ্যেস। একটা পুরোনো অভ্যেস, ছাড়তে ভুলে গেছি বলেই রয়ে গেছে। প্রতিদিন সকালে উঠি, কারণ গতকাল উঠেছিলাম। চা খাই, কারণ কাপটা হাতে আসে। বেঁচে থাকি, কারণ মরাটা কেউ শেখায়নি।

এমন নয় যে, তাকে আর ভালোবাসি না। শুধু সেই প্রথম দিনের আকুতি, ভাবনার সেই প্রথম উচ্ছ্বাস আর জাগে না। ভালোবাসা আছে—স্থির জলের মতো, চুপ-করে-থাকা পাথরের মতো, বন্ধ বইয়ের ভাঁজে শুকিয়ে-যাওয়া ফুলের মতো। গন্ধ আছে, রং আছে, শুধু প্রাণ নেই। এখানে কোথাও ঢেউ নেই। একটাই সান্ত্বনা বুকে নিয়ে বসে আছি—ব্যথাটা যার হাতেই পেতাম, তার হাতে পেয়েই ভালো হলো। এই হিসেবটুকুই আমার লাভ, এই একটুখানি সান্ত্বনাই আমার সম্বল।

ঘরে রোদ এলে আলো যতটা, ততোধিক আরাম আসে। আজ আর কথার পিঠে কথা আসে না, নৈঃশব্দ্যের কোলে নৈঃশব্দ্য বিশ্রাম নেয়।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *