১০। পলকের দেশ
এখনও পড়শির ক্ষেত থেকে আখ চুরি করার মতো দুষ্টুমি ঘটে। দু-জন কিশোর, শীতের দুপুর। ওরা খালিপায়ে ছুটে বেড়ায়। লালদিঘিতে প্রতিদিন সাঁতার কাটা, তোমার জন্য কলমিলতা আর ডালের বড়ি জোগাড় করা, এসবই ছিল স্নেহ ও ভালোবাসার সহজ, গ্রামীণ প্রকাশ। যেন সেই ছোট্ট চুরিটুকু না করলে ভালোবাসা সত্যি করে প্রকাশ পেত না।
দুই ভাই নোংরা হাত নিয়ে নর্দমা থেকে কাঁকড়া আর সোনাব্যাঙ ধরে। একজন হামাগুড়ি দেয়, আরেকজন ঘোড়ার মতো ডাক দেয়। তোমার সিঁথির ফাঁকা, দীর্ঘ পথে যেন কল্পনার ঘোড়া ছুটে চলে; কিন্তু সেই দৃশ্য, সেই উত্তেজনা, রাতের পান্তাভাতের মতো খুব তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে যায়।
ট্রেনের পর ট্রেনে গান বেজে চলে, আর এক অদ্ভুত মোহের মধ্যে যেন প্রজাপতিও ধরা পড়ে। হলুদের আভা-লাগা চিঠিতে ঋতুর মতো, জীবনের মতো নানা স্মৃতি লেখা থাকে। প্রজাপতির ডানার রেণুর মতোই এই সব অনুভূতি—জোর করে ধরতে গেলে হারিয়ে যায়, আর ছেড়ে দিলে নিজে থেকেই এসে কাছে বসে।
১১। পাথরে শেকড়
যাও, গীতা।
এই বিশাল সময়ের বালুচরে বহু পুরোনো, অস্পষ্ট চিহ্ন পড়ে আছে, যেন সাপের সরণরেখা। তোমার বিস্তারের ভেতর থেকে আমি এক অদ্ভুত আকৃতি আলাদা করে দেখি, যা দীর্ঘ ছিল শ্বাসের মতো, যা ঠান্ডা ঠোঁটের নীরব বার্তার মতো, যা ছিল হাসির ভেতরে লুকিয়ে থাকা কান্নার মতো। সেটি যেন আমিই, অথচ আমার সম্পূর্ণ উলটো এক সত্তা।
চারপাশে বালি, জটপাকানো চুল, অচেনা গান, পূর্ণিমার আলো। লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের মতো শুভতার চিহ্ন ভেদ করে যখন তুমি উঠে আসো, তখন তোমাকে আলাদা করে চিনতে পারি। ছাপা কাগজের গন্ধ এত তীব্র যে, তা যেন জিভেও লেগে থাকে। রথের দিনের ছুটির মতো ক্ষণিক উৎসবের মধ্যে মৃত্যু, জন্ম, আর একধরনের মাতাল করা অভিজ্ঞতা খুব দ্রুত পরপর এসে যায়।
যাও, গীতা।
কে যেন অনেক আগে এই জেলের লতা পুঁতে রেখে গেছে, কিন্তু আজ আর বোঝা যায় না, তারা কারা ছিল। যেমন পাথরের ভেতর দিয়ে শেকড় ছড়িয়ে যায় নিঃশব্দে, তেমনি কিছু গভীর পরিবর্তন কিংবা সংযোগ কোনো শব্দ না রেখেই ঘটে যায়।
১২। কাঁটার মোহর
একটি বাক্সের ভেতরে গোলাপ রাখা আছে। কিন্তু তার তালার পেতলে অসংখ্য দাগ, ছোটো-বড়ো আঁচড়, জমে আছে, যেন অনেক ভুল চাবি দিয়ে বার বার খোলার চেষ্টা করা হয়েছে। দুর্গের ব্রোঞ্জ-কামানের গহ্বরে থেমে আছে এক আটকে-পড়া, অসহায় শৈশবের ইঙ্গিত। এই দেনমোহর, এই প্রতিশ্রুতি, এই সংরক্ষিত বস্তু আসলে কার জন্য, তা স্পষ্ট নয়। শুধু এতটুকু জানা যায়, সেই গাছটি এখনও রয়ে গেছে, কিন্তু কে তাকে টিকিয়ে রেখেছে, তা অজানা।
বাইরে থেকে তাঁকে কোমল, সরল, স্নিগ্ধ, নিরীহ বলে মনে হলেও, তাঁর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর বেদনা, বিষ এবং ইতিহাসের আঘাত। সৌন্দর্য এখানে শুধু সৌন্দর্য নয়; তার আড়ালে আছে নিপীড়ন, বন্দিত্ব এবং নীরব যন্ত্রণা। যে-মুক্তিকে মুক্তি বলে মনে হয়, সেটিও অনেক সময় দুঃখ, মূল্য বা আত্মবলিদানের ভিতর দিয়ে আসে; তাই তা নির্মল নয়, ক্ষতবহ। ঝরোখার ছায়ায় কাটানো জীবন—সে উচ্চবংশীয় পুরুষের হোক বা রাজপরিবারের নারীর, কখনোই স্থির, নিরাপদ বা নিশ্চিন্ত নয়। ভাদ্রের মেঘ যেমন জমে আবার সরে যায়, তেমনি এই জীবনও অনিশ্চয়তা, অস্থায়িত্ব এবং অদৃশ্য বিষাদের মধ্যে দুলতে থাকে।
কোনো অপরাধী হাত একদিন বালি আর তরমুজ এঁকেছিল; কিন্তু ইতিহাসের দিদিমণি জানেন না, জুলেখা কে; আনোয়ার জানে, তবু চুপ করে থাকে। কারণ বাহ্যিক কাঁটার ভেতরে যেমন লুকিয়ে থাকতে পারে মোহর, তেমনি মাটির নিচে পাথরও লুকিয়ে থাকে—দৃশ্যমানের ভেতরে অদৃশ্য সত্য চাপা পড়ে থাকে।
১৩। মাটির মৌচাক
আমি এক বিধ্বস্ত শহরের বন্ধ দরজাগুলোর সামনে ঘুরে বেড়িয়েছি। শীত কেটে বরফ গলে গেলে ফিরে দেখি, চারদিক যেন এক অস্পষ্ট, কঠিন, কাঁকরমাটিতে ঢাকা বাস্তবতায় মোড়া। প্রতিদিন নতুন করে আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটার মতো করে জীবন চালাতে হয়। সেখানে শস্যও আছে, আবার তুষও আছে; প্রাচুর্য ও শূন্যতা পাশাপাশি থাকে।
অল্পক্ষণ কোথাও ঘুরে এসে আবার বালুচরে ফিরে দিনের অন্ন জোটে ধোঁয়া-ধরা বাস্তবতায়। ভিক্ষার পাত যেন উপচে পড়ে, অথচ পিপাসার শরীর তাতে ডুবে যায়। পাবার ভেতরেও অপূর্ণতা থাকে। চারদিকে শুধু রাত, শুধু এক সরল, অজ্ঞান সত্তা; আর এক কালো মেয়ের অভিশাপে গানভরা নৌকাও ডুবে যেতে পারে।
মৌমাছি নিজেও জানে না, সে ভিক্ষা করছে, না নিজের জন্য সংগ্রহ করছে। ভাঙা শহরের ফুলে আদৌ মধু আছে কি না, তা-ও সে জানে না। তবু সে থামে না, শুধু উড়ে যায়, খুঁজে যায়।
১৪। মরা নদীর ডানা
রাত অস্থির হয়ে উঠলে আমি সেই নির্জন, মৃতপ্রায় নদীর ধারে এসে দাঁড়াই। কোথা থেকে যেন রঙিন-ডানা-মেলা এক অদৃশ্য সত্তা উড়ে আসে; তাকে চোখে দেখা যায় না, শুধু তার শব্দ শোনা যায়। সেই শব্দ লোহার খাঁচার সীমানা পেরিয়ে মৃত নদীর জলে পড়ে, জল একটু কেঁপে ওঠে, তারপর আবার স্থির হয়ে যায়।
আমি শেষ জলধারাটুকুও হারিয়ে ফেলেছি; অথচ সে একদিন অকালেই মেঘ ডেকে এনেছিল। বাতাস যেন বার বার আশার খবর আনে…বাঁচব, বাঁচব। গাছের ডালপালাও যেন তাতে সাড়া দেয়। দেয়ালে-লেখা অন্ধকার নিষেধের কথাগুলোও কোনোভাবে সরে যেতে থাকে, আর লুকিয়ে-থাকা স্মৃতিরা ফিরে এসে কথা বলে।
শ্রাবণের বৃষ্টিও যেন কোথাও দ্বিধাগ্রস্ত। শীতের পাখি উড়ে যায়, সে যেন এমন এক সত্তা, যে মেঘের সীমাও ছাড়িয়ে যেতে চায়। সেই দূরে-চলে-যাওয়া, কোনো ঘর না-মানা আলোর ঝলক এখনও চোখে ভাসে। চারদিক ঘন নীলের স্তরে ঢেকে যায়। আর আমি আবার ফিরে এসে দাঁড়াই সেই একাকী মৃত নদীর ধারে।
১৫। মেরুর আলো
এমন কঠিন সময়েও বলা যায়, এই দিনটিও কেটে যাবে; অন্ধকার, ভারী, দীপহীন বাস্তবতার মধ্য দিয়েও। তারপর শীত নেমে আসে; রাত ফ্যাকাশে, রংচটা, আর ছায়া আরও গভীর কালো হয়ে ওঠে।
তবু, যদি তুমি একবার মাঠজুড়ে নিজের উপস্থিতি জানাতে পারো, যদি তোমার সুর বা আবির্ভাবে সময় যেন থমকে দাঁড়ায়, তবে এক বিরল আলোর জন্ম হয়, যে-আলো বাইরে স্পষ্ট লেখা থাকে না, কিন্তু যার স্মৃতি গভীরভাবে থেকে যায়। যেমন মেরুর বরফ তার ওপর পড়া এক বিশেষ আলোর ছাপ ভুলতে পারে না, তেমনি সেই মুহূর্তও বিস্মৃত হয় না।
১৬। মৃত্যু কোথায় ছিল
আকাশের বিদীর্ণ, অস্থির মেঘের ভেতর প্রথম আগুনের আভাস দেখা দিল। শীতের পাতা সেই আগুনকে চিনে নিল ঝরে পড়ার আগেই, ভোরের আলোয়, বনলতার নিঃশব্দ পরিবেশে।
প্রজাতির শেষ জীবটিও তখন ডানা মেলে বাঁচার চেষ্টা করছে। প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল, হিংসা, বেঁচে থাকা, সব একসঙ্গে সক্রিয়। উত্তপ্ত, আদিম মাটি থেকে শরীরের জন্ম হলো; তার পেছনে আছে দীর্ঘ ঝড়, প্রাগৈতিহাসিক প্রাণ, পাহাড়ের ধারে জমে-থাকা অচেনা কোনো সত্তার কান্না।
আধোঘুমন্ত হাতে, মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েই আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি। তাই প্রশ্ন জেগে থাকে, যে-মুহূর্তে সৃষ্টি হলো, সেই মুহূর্তে মৃত্যু কোথায় ছিল? ঘুমের গভীরতাতেও এই প্রশ্ন নিঃশব্দে জেগে থাকে।
১৭। কোকিলের মিথ্যা
জারুল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে কোকিল ডেকেছিল, আর তুমি সেই ডাককে প্রেমের গান ভেবেছিলে। তারপর ধীরে ধীরে সব কিছু রাতের শেষ সীমার দিকে মিলিয়ে গেল। লোডশেডিং, গরমে ঘাম, সংসারের হিসাব, এই বাস্তবতার ভেতরে কোকিলের জীবনের নিজস্ব কঠিন দিকও আছে, কিন্তু সেসব আমরা খুব কমই ভাবি।
তুমি এক সিনেমা দেখে, রাতজাগা ক্লান্ত চোখ মুছে, সাজানো নীল ওড়না পরে ফিরছিলে। আর আমি উত্তেজনা বা অস্থিরতায় ঘুগ্নির দোকানে কয়েকটি প্লেট ভেঙে ফেললাম। সেই মুহূর্তের হাসি কোথায় হারিয়ে গেল, কেউ টের পেল না।
হেমন্ত গাইন মাইনে কেটে নিলে যেমন একরকম আঘাত লাগে, তেমনি পুকুরের জলে ভাসা চাঁদের প্রতিবিম্বও ভাঙা যায়; কিন্তু পুকুর তাতে শোক করে না, আবার নিজেই জোড়া লেগে যায়। কোকিল হয়তো এই মেরামত-হয়ে-যাবার নিয়ম জানে না, তবু বছর ঘুরে সে আবার ফিরে আসে।
১৮। বাঁ-চোখের পলক
আজকের মেঘের রং কেমন, তা ধরতে গিয়ে আমি নানা উপাদান মিশিয়ে দেখেছি; ফুল, পাতা, পাথর, চুনাপাথর, পৃথিবীর এই স্তরগুলোর ভেতর কোনো এক সময়ে হিংসা ও ধ্বংস ঢুকে পড়েছে। তারপর থেকে যে-হাত একসময় রঙের জন্ম দিতে পারত, সেই হাত আর আগের মতো সৃষ্টিশীল নেই।
শেয়ালের মতো ধূর্ত ও লোভী শক্তি যেন জীবন ও মৃত্যুর সীমানা ভেঙে মানুষের মগজ, বুদ্ধি, চেতনা নিয়ে চলে গেছে। আমি নিজেকে ধুলোর জননী বলে মনে করি; পৃথিবী থেকে ধুলো ফুরিয়ে গেলে কারও ক্ষতি হবে—এই আশঙ্কায় আমি মরুভূমির খেজুরগাছের শুষ্ক নিঃশ্বাসের ভেতর আশ্রয় নিয়েছি।
যদি আমার দৃষ্টির এক অংশ কেড়ে নেওয়া হয়, তবু সেই অন্ধকার রাতে আমার জন্য অন্তত একমুহূর্তের দেখার সুযোগ রেখো। যে-কাক তা নিয়ে উড়ে গেছে, সে নিজেই জানে না, সে কী বহন করছে। কিন্তু শেয়াল-যুগল সব হিসেব করে যাচ্ছে, সব নজরে রাখছে।
শরণার্থীর ঈশ্বর: দুই
লেখাটি শেয়ার করুন