হেমন্তের এক বিকেলে কিছু বন্ধু কফিশপে মিলিত হয়েছিলেন। ওঁদের সবাই-ই ছিলেন ষাটোর্দ্ধ। সেখানে এমন কেউ কেউ ছিলেন, যাঁরা পরস্পরকে চিনতেন না। ওঁরাও এসেছিলেন বন্ধুর সাথে। গল্প করতে করতে দু-জন প্রবীণ জানতে পারলেন, তাঁরা একই স্কুলে একই সেকশনে পড়েছেন। একজনের রোল নম্বর ৪৭, আরেকজনের ৫৪। এই আকস্মিক যোগাযোগ দু-জনকে আপ্লুত করে দিল। খুশিতে তাঁরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলেন। স্কুলদিনের বন্ধুত্বের চাইতে নির্মল সম্পর্ক কমই আছে।
আহা, এতগুলি বছর পর এসে দু-জন মানুষ স্কুলের বন্ধু খুঁজে পেলেন! বন্ধুত্বসৃষ্টির ক্ষেত্রে স্কুল বড়ো সুন্দর একটা জায়গা! ওঁদের দু-জনই ছিলেন আর্থারাইটিস আক্রান্ত, চলতে-ফিরতে বেশ কষ্ট হতো। মজার ব্যাপার হলো, এই সমস্যাটি নিয়ে দু-জনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল দু-রকমের। একজন ধরে নিয়েছিলেন, এ বয়সে এমন হবেই। কিচ্ছু করার নেই। এটাকে মেনে নিলেই ভালো। আরেকজন ভাবতেন, প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে আর্থারাইটিসকে জয় করা সম্ভব। নিজেকে ঠিক রাখতে পারলে এ রোগ একসময় সেরে যাবে।
দু-জনের দর্শনই চমৎকার ও জরুরি। কীরকম? এ পৃথিবীতে অনেককিছুই ঘটে, যেগুলির উপর আমাদের কোনও হাত থাকে না, খুব চেষ্টা করেও কিছু সমস্যার সমাধান করা যায় না। তখন অদৃষ্টকে মেনে নেওয়া বাদে আর কী-ইবা করার থাকে? যুদ্ধ করলেই কি আর সবকিছু পাওয়া যায়? কিছু ঘটনা মেনে নিলেই বরং বেঁচে থাকাটা স্বস্তির হয়। আবার আরেকজনের ভাবনা ও বিশ্বাস নিয়ে যদি বলি, বাঁচতে গেলে প্রায় সময়ই মনের শক্তি খুব কাজে লাগে। ষাটোর্দ্ধ একজন মানুষের যদি মনের শক্তিটাই কমে যায়, তবে তাঁর পক্ষে বেঁচে থাকাটা ভীষণ কষ্টের। যার মনের শক্তি ফুরিয়ে যায়, তার কাছে জীবন ও মৃত্যু দুই-ই সমান। মানুষ বাঁচে মূলত মনের জোরে। মনের শক্তি কমে গেলে কেউ চল্লিশেই বুড়িয়ে যায়, আবার মনের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কেউবা সত্তর পেরিয়েও তারুণ্য ধরে রাখতে পারে।
সেই বিকেলটা দু-জন পুরোনো বন্ধু, যাঁদের মধ্যে কোনও যোগাযোগ ছিল না প্রায় চার যুগ, তাঁদের কাছাকাছি এনে দিয়েছিল। জীবনের বাকিটা সময় কাটানো তাঁদের পক্ষে সহজ ও সুন্দর হয়েছিল। ধরার মতো হাত পেলে নিজের হাতের জোর অনেক বেড়ে যায়। মানুষ একা বাঁচতে পারে না, তা নয়; তবে যদি পথ চলতে গিয়ে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়, যার সাথে বাকিটা পথ চললে মনের জোর বাড়ে, বাঁচার ইচ্ছে বাড়ে, প্রশ্নের ভার কমে, তাহলে আয়ুর অভিশাপ ধীরে ধীরে উবতে থাকে। বন্ধুত্বের চেয়ে বড়ো ঐশ্বর্য আর নেই।
হেমন্তের কফিশপে
লেখাটি শেয়ার করুন