গল্প ও গদ্য

শেষ দেশলাই

মিরাকল কি সত্যিই ঘটে? দেখা যাক।

ঘটনাটি বেশ আগের। ১৯২১ সালে ব্যাবসায়িক প্রয়োজনে ফ্রান্সে গিয়েছিলেন টি জে কাভানাঘ। কাজ সেরে সেইন্ট ওমারের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তাঁর মনে এল, তাঁর ছেলেবেলার পুরোনো বন্ধু উইলিয়াম মার্টিন ব্রান্ড প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই এলাকার আশেপাশেই খুন হয়েছিলেন ১৯১৭ সালে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, বন্ধুর কবর খুঁজে বের করবেন।

খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, ওই জায়গা থেকে দেড় মাইল দূরেই লংগের্সে ব্রিটিশ মিলিটারি সিমেট্রি। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সিমেট্রির উদ্দেশে পায়ে হেঁটে রওনা হলেন। যখন সেখানে পৌঁছলেন, তখন দিনের আলো নিভে গিয়েছিল এবং সিমেট্রির গেইট‌ও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

কাছেই ছিল একটি ক্যাফে। তাঁর কথা শুনে সেখানকার এক মহিলা বললেন, "সিমেট্রির পেছন দিকে চলে যান। ওদিকের দেয়ালটা নিচু; আপনি খুব সহজেই দেয়াল টপকে ভেতরে যেতে পারবেন।"

পকেটে মাত্র এক বক্স দেশলাই নিয়ে মিস্টার কাভানাঘ সিমেট্রির ভেতরে ঢুকে একটার পর একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে বন্ধুর সমাধিফলক খুঁজতে লাগলেন।

একসময় বুঝতে পারলেন, এভাবে হবে না। এতগুলি কবরের মধ্য থেকে সারি সারি কাঠের ফলক হাতড়ে হাতড়ে এই অল্প আলোয় প্রিয় বন্ধুর নাম খুঁজে বের করা রীতিমতো অসম্ভব। অগত্যা হাল ছেড়ে দিয়ে তিনি ক্যাফেতে ফিরে গেলেন এবং মহিলাটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, "আজ আর হবে না। আমি ফিরে যাচ্ছি।"

কী জানি মনে করে মহিলাটি তাঁকে বললেন, "একটু দাঁড়ান। আমি আপনার জন্য একটা মোমবাতি নিয়ে আসছি। আমার ছোটো মেয়ে আপনার সঙ্গে যাবে। ও মোমবাতি ধরবে, সেই আলোয় আপনি কবর খুঁজবেন।"

তিনি মেয়েটি-সহ অনেক খোঁজাখুঁজি করেও যখন বন্ধুর কবর পেলেন না, তখন একসময় ক্লান্ত হয়ে বললেন, "চল মা, আমরা ফিরে যাই। আজ আর পারছি না, আরেকদিন..."

দু-জন মিলে ফিরে যাচ্ছিল। হঠাৎ মেয়েটি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল এবং বলল, "আরেকটু খুঁজে দেখলে হয় না?" ছোট্ট মেয়েটিকে খুশি করার জন্য‌ই মিস্টার কাভানাঘ মেয়েটির হাত থেকে মোমবাতিটি নিলেন এবং মেয়েটি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তার সামনের কবরটির ক্রুশের কাছে আলো ধরলেন।

তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, সেটিই ছিল তাঁর বন্ধুর কবর! কাঠের ফলকে এই নামটিই লেখা: উইলিয়াম মার্টিন ব্রান্ড!

এই অদ্ভুত ঘটনাটি ঘটল কী করে?! এ কি নিছকই কাকতালীয়? না কি ঈশ্বর নিজেই মেয়েটিকে ঠিক সেখানেই থামিয়ে দিয়ে তার মুখ দিয়ে উচ্চারণ করালেন: আরেকটু খুঁজে দেখলে হয় না?

কাভানাঘ সৌভাগ্যবান। তাঁর সাথে সেদিন এমন সব ঘটনা ঘটেছিল, যেগুলি তাঁকে সকল বাধা অতিক্রম করিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছে। অতটা সৌভাগ্য সবার হয় না। তাই আমরা যেন নিজের হৃদয়ে এই ছোট্ট বাক্যটি আমৃত্যু গেঁথে রাখি... আরেকটু খুঁজে দেখলে হয় না?... আর চেষ্টা করা পুরোপুরি থামিয়ে দেবার আগে নিজেকে কথাটি মনে করিয়ে দিই।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *