বেঁচে থাকা কঠিন হোক, মরে যাওয়াও অসম্ভব হোক। দুটোর মাঝখানেই যেন ঝুলে থাকি, না এদিক, না ওদিক। কিন্তু বোধ আছে বলে, টের পাই বলে এত আফসোস হয় কেন? কষ্ট পাই বলেই তো বুঝতে পারি, বেঁচে আছি। যে-মানুষ আর কিছুই অনুভব করে না, সে তো অনেক আগেই মরে গেছে, শুধু দাফনটা বাকি। অনুভূতি আর সচেতনতা, এই দুটোই মানুষের সম্পদ, যত যন্ত্রণাই দিক না কেন। নির্বোধ পাথরের সুখ আমি চাই না। আমি মানুষ থাকতে চাই, কাঁদতে-পারা মানুষ, ভাঙতে-পারা মানুষ।
প্রতিদিন তোমাকে নতুন করে ভাবি, নতুন দিক থেকে ভাবি। কাল রাতে যাকে চিনেছিলাম বলে মনে হয়েছিল, আজ সকালে সে আবার অচেনা। তুমি আমার কাছে এক অদ্ভুত প্রশ্ন, যার উত্তর কোনোদিন মেলে না, অথচ যে-প্রশ্ন ছেড়েও দেওয়া যায় না। উত্তর পেলে হয়তো ভুলে যেতাম; কিন্তু তুমি তো উত্তর নও। তুমি সেই প্রশ্ন, যা প্রতিদিন সকালে নতুন মুখ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। তোমাকে বোঝার দিন ফুরোবে না, কারণ তুমি বোঝার জিনিস নও, তুমি ভাবার জিনিস, বার বার ভাবার জিনিস।
একটা সময় ছিল, যখন আমাদের মাঝে ব্যথা ছিল, তখন আমি তোমার হৃদয়ের ভেতর বসবাস করতাম, তুমি আমাকে মনে রাখতে। দূরত্বই ছিল আমার ঠিকানা, বিচ্ছেদই ছিল আমার পরিচয়পত্র। এখন কাছে আছি, সামনে আছি, হাতের নাগালে আছি, তাই আর কেউ আমার কথা ভাবে না। যা সামনে, তা আর কল্পনার খোরাক নয়; যা পাওয়া গেছে, তা আর স্বপ্নের বিষয় নয়। এটাই প্রেমের নিষ্ঠুর নিয়ম: অনুপস্থিতি স্মৃতি জাগায়, উপস্থিতি তাকে নিভিয়ে দেয়। দূর থেকে মানুষ দেবতা, কাছে এসে শুধু মানুষ।
সুখ হোক দুঃখের আঁচ, দুঃখ হোক সুখের আত্মা। একটা আরেকটাকে জন্ম দেয়, একটা আরেকটার ভেতরে মিশে থাকে, যেমন আলো আর ছায়া, যেমন শ্বাস আর নিঃশ্বাস। সুখের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে দুঃখের বীজ, দুঃখের ভেতর থেকেই একদিন মাথা তোলে সুখ। জীবন যদি এমনই হয়, তবে তাকে আলাদা করে বোঝা ভাবার কী আছে? দুঃখকে শত্রু ভাবার কী আছে? সে তো জীবনেরই রুহ, জীবনেরই শ্বাস। সুখ চাই, অথচ দুঃখ চাই না, এ তো নদী চাই, অথচ জল চাই না বলার মতোই অবাস্তব।
যে তোমার গলি দিয়ে যেতে পারে না, সে আকাশগঙ্গার দিকে তাকিয়ে না থেকে আর কী করবে? তোমার পাড়া এত কাছে, তবু অধরা, তাই চোখ তুলি আরও দূরের দিকে, ছায়াপথের দিকে। মাটির অধরা যখন আকাশের অধরার চেয়েও বেশি ব্যথা দেয়, তখন মানুষ আকাশের দিকে তাকানো ছাড়া আর কীই-বা করতে পারে? যা অধরা, তা যত দূরেই থাক, সমান দূরত্বে। হাতের কাছের না-পাওয়া, আর আকাশের না-পাওয়া, দুই-ই শেষে একই। শুধু আকাশের না-পাওয়াটা একটু সহনীয়, কারণ তাকে অন্তত ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখা যায়।
পড়ে-যাওয়া গাছের বাহু থেকে দূরে সরে যাও। যে-আশ্রয় নিজেই ভেঙে পড়ছে, তার ছায়ায় দাঁড়িয়ো না। সে নিজেই তো রক্ষা খুঁজছে, তোমাকে আর কী রক্ষা করবে? বরং সূর্যের কোলে গিয়ে দাঁড়াও, যা অবস্থাই হোক, তা-ই ভালো। পুড়ে যাওয়া ভালো, চাপা পড়ার চেয়ে। রোদে-ঝলসে-যাওয়া মাথা তুলে দাঁড়ানোর অন্তত একটা গৌরব আছে; ধসে-পড়া ছাদের নিচে শেষ হওয়ায় সে গৌরবটুকুও নেই। খোলা আকাশের নিচে একা দাঁড়ানো ভালো, ভেঙে-পড়া কাঠের নিচে কারও সঙ্গে চাপা পড়ার চেয়ে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মন এমনভাবে ব্যাখ্যা খুঁজে চলেছে, যেন চারপাশের প্রতিটা জিনিসই এক-একটা প্রশ্ন। পাতা কেন ঝরে, নদী কেন বয়, মানুষ কেন চলে যায়, তারা কেন নিভে যায়। উত্তর না পেলেও মন থামে না। প্রতিটা পাথরকে সে ঠুকে দেখে, প্রতিটা নীরবতাকে সে ডেকে দেখে, যদি কোনো গোপন উত্তর বেরিয়ে আসে। এই অস্থির জিজ্ঞাসাই মানুষের নিয়তি; এই না-থামাটাই তার অভিশাপ, এই না-থামাটাই তার গৌরব। পশু পায়, মানুষ খোঁজে, এটাই দু-জনের মধ্যে ব্যবধান।
এই ঘরের ছাদের কোনো ভরসা নেই। দেখো, এই বৃষ্টিতে আমাদের অবস্থা কী হয়। ঘর বলতে শুধু এই চারটে দেয়াল নয়। জীবন, শরীর, সম্পর্ক, বিশ্বাস, যা-কিছু আশ্রয় দেয়, সবই ভঙ্গুর। যে-ছাদের তলায় এতদিন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি, সে ছাদই এখন চুঁইয়ে পড়ছে; যে-দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছি, সে দেয়ালেই ফাটল ধরেছে। বৃষ্টি নামছে, ঝড় আসছে। দেখি, টিকতে পারি কি না। দেখি, ভিজতে ভিজতে নিজেকে কতদূর বহন করতে পারি। হয়তো পারব, হয়তো পারব না। কিন্তু এই না-জানাটাই তো জীবন। ছাদ থাকবে কি থাকবে না, এই অনিশ্চয়তার নিচেই বসবাস।
ভেজা ছাদের নিচে
লেখাটি শেয়ার করুন