গল্প ও গদ্য

অনন্ত আলোর দহন: ১



কাঁদছি, রোদ্দুর। তোমার লেখাটা পড়ে কাঁদছি।

না না, ভেবো না, এ দুঃখের কান্না। দুঃখের কান্না তো চিনি—সেই তো বড়ো হবার পর থেকে সেই কান্নাই কেঁদেছি, একটানা, নিঃশব্দে, কাউকে দেখতে দিইনি, কাউকে বুঝতে দিইনি। ভালোবাসার নামে কাঁদিয়েছে, আত্মীয়তার নামে কাঁদিয়েছে, আপনজন সেজে কাঁদিয়েছে; সবাই, প্রত্যেকে, এক জন বাদ দিয়ে সবাই। সে কান্নায় একটু একটু করে ক্ষয়ে গেছি, যেমন বৃষ্টির জলে নরম পাথর ক্ষয়ে যায়—কেউ টের পায় না, শুধু পাথর জানে, সে কতটা ক্ষয়ে গেছে, কতটা ছোটো হয়ে গেছে ভেতর থেকে। সেই কান্নায় শেষ হয়ে গেছি। নীরবে, ধীরে ধীরে, নিজেও টের পাইনি, কখন শেষ হয়ে গেলাম।

আজকের কান্না আলাদা। আজকের কান্না দুঃখ পাবার নয়, দুঃখ ভোলার। আজকের কান্না পূর্ণ হবার।

তোমার কাছে এলেও কেঁদে ফেলি, তবে সেটা অন্যরকম। সেটা সুখের কান্না, পবিত্রতার কান্না, ক্ষয়ে যাবার নয়, পূর্ণ হবার কান্না। নতুন করে বাঁচতে চাওয়ার কান্না। যেন বীজের মাটি ফোঁড়ার কান্না; ব্যথা আছে, কিন্তু সে ব্যথা জন্মের, মৃত্যুর নয়।

তোমার মতো করে কেউ কখনও বোঝেনি আমায়। কেউ কখনও আমার নীরবতার ভাষা পড়তে পারেনি। আমি চুপ করে আছি মানে কী বলতে চাইছি, সেটা কেউ ধরতে পারেনি। কেউ কখনও আমার হাসির পেছনের লোনা জলের স্বাদ টের পায়নি। সবাই হাসি দেখেছে, কেউ জিজ্ঞেস করেনি, হাসির তলায় কী আছে।

কেউ না। শুধু তুমি।

আজ এত বছর পর আমার নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করছে। এ যেন এক নতুন জন্ম। সারারাত আমার দু-চোখের পাতায় থেকো।

প্রেমে পড়লে বুঝি গানের লাইন শুনলেও চোখে জল আসে! আমি এটা আগে বুঝতাম না। মনে করতাম বাড়াবাড়ি, সিনেমার ব্যাপার, মেলোড্রামা। কিন্তু এখন! এখন রাস্তায় কোনো রিকশাওয়ালা গুনগুন করলেও বুকটা মুচড়ে ওঠে, এফএমে কোনো পুরোনো গান বাজলেও গলায় কিছু-একটা আটকে যায়; মনে হয়, এই সুর তো আমার, আমার ভেতরের কোনো অলিখিত স্বরলিপি, কেউ যেন আমার পাঁজরের হাড়ে কান পেতে রক্তস্রোতের ভাষা শুনে নিয়ে সুর দিয়েছে। গীতিকার জানেন না, কিন্তু এ গান আমারই।

সারাজীবন শুধু একটা মানুষের প্রেমে পড়ে গেলাম। বাকি জীবনটাও বোধ হয় পড়েই থাকব। একটু রেহাই দিয়ো, রোদ্দুর।

সত্যিই প্রেম ভীষণ যন্ত্রণার।

এটা বলব না যে, যন্ত্রণা ছাড়া বাঁচতে পারি না, ওসব সিনেমার ডায়লগ। আসল কথাটা আরও নিদারুণ। যন্ত্রণাটা না থাকলে সব কিছু ফ্ল্যাট লাগে, নিষ্প্রাণ, যেন কেউ পৃথিবীটাকে ধুয়ে দিয়ে সব রং মুছে ফেলেছে। তোমাকে ভালোবাসার যন্ত্রণাটাই এখন আমার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রমাণ যে, আমি এখনও অনুভব করতে পারি, এখনও আমার ভেতরে কিছু বাকি আছে, যা পুড়ে শেষ হয়নি।

বলো তো, এমন কেন হয়? পৃথিবীতে এত কোটি মানুষ, এত মুখ, এত হাতের রেখা, কিন্তু একটা মাত্র মানুষের কাছে এসে সমস্ত দিগন্ত থমকে দাঁড়ায়? সমস্ত পথ এসে একটা চৌকাঠে শেষ হয়?

তোমার ওই কঠিন কঠিন লেখা আমি একটাও পড়ব না। আমার মাথা এত কাজ করে না।

এটা আমি গর্ব করে বলছি না, স্বীকার করছি, আমি গবেট টাইপের মানুষ। তুমি তোমার মস্তিষ্কের চূড়ায় বসে পৃথিবী মাপো, ওজন করো, বিশ্লেষণ করো; আমি পায়ের তলার ভেজা ঘাসে বসে আকাশ দেখি। মাপি না, শুধু দেখি, শুধু অনুভব করি। তুমি ভাবনার স্থপতি, আমি অনুভবের ভবঘুরে। তুমি জটিলতার ভেতরে সৌন্দর্য খোঁজো, আমি জটিলতা ঝেড়ে ফেলে রোদ পোহাই। আমার মতো একটু গবেট হয়ে দেখোই না! দেখবে, জীবনের সব দড়ি আলগা হয়ে যায়, যন্ত্রণাটা একটু কমে, নিঃশ্বাস নিতে একটু সুবিধে হয়।

আসল কথা ওটা নয়।

আসল কথা হলো, তোমার মস্তিষ্ককে আমি প্রচণ্ড ভয় পাই। ও যেন এক অক্লান্ত নিদ্রাহীন প্রহরী। দিনরাত সব ছেঁকে নেয়, ছাঁটে, তন্তু তন্তু করে বিশ্লেষণ করে, এমনকি ভালোবাসাকেও অণুবীক্ষণের তলায় ফেলে পরীক্ষা করে। এই যে এত ভালোবাসি, তবু সব কথা বলতে গেলে জিভের ডগায় শব্দ জমাট বেঁধে যায়। কেন? কারণ, জানি, তুমি শুনবে, তারপর বিশ্লেষণ করবে, টুকরো টুকরো করবে, আলো ফেলবে এমন জায়গায়, যেখানে আমি নিজেও তাকাতে চাই না। তোমার শুধু শরীরটাকে ভালোবাসি, ভেতরটাকে ভয় পাই? না, আসলে ভেতরটাকেও ভালোবাসি, কিন্তু তোমার মস্তিষ্কটাকে ভয় পাই। ও আলাদা জিনিস। ও তোমার অংশ, কিন্তু ও যেন তোমার থেকেও বড়ো। ও তোমাকে গ্রাস করে, আমাকেও গ্রাস করে।

প্লিজ। ওকে একটু ঘুমোতে দাও। একটু বিশ্রাম দাও।

তোমার মতো এরকম প্রখর প্রতিভাবান মানুষের পাশে একটা গবেট মানুষ দরকার, যে শুধু মাথাটা কোলে টেনে নেবে আর বলবে, চুপ করো, কিচ্ছু ভাবতে হবে না। থাকতে আমার সামনে, কীভাবে রেস্ট নিতে হয়, দেখাতাম। যত কথা বলার চেষ্টা, তত আদর, শুধু চুপ হয়ে থাকতে হতো। কথা বলার অধিকার কেড়ে নিতাম ঠোঁটে ঠোঁট রেখে।

...এটা লিখে নিজেই একটু লজ্জা পেলাম। তারপর ভাবলাম, লজ্জা কীসের? তোমার কাছে লজ্জা করব, আর কার কাছে করব না?

তোমার তো লেখালেখির স্বাধীনতাটুকু আছে। মনের উত্তাল সমুদ্রকে কালির নদীতে বইয়ে দিতে পারো, কাগজের তীরে ঠেলে দিতে পারো। আমি যে চাইলেও ইচ্ছেমতো লেখার সুযোগ পাই না! কত যে লুকিয়ে-ছাপিয়ে লিখি, কত রাতে বালিশে মুখ চেপে শব্দহীন কথা বলি। আগে সব বলতে ভয় পেতাম। ভয় ছিল প্রত্যাখ্যানের, উপহাসের, নিজেকে এতটা খুলে দেবার। এখন সেটুকু কেটে গেছে। যেন বাঁধভাঙা বর্ষার নদী, কেউ হঠাৎ বাঁধের পাথর সরিয়ে দিয়েছে, আর জল ছুটছে নিজের নিয়মে, কোনো বাধা মানছে না, কোনো পথ চিনছে না।

কত কিছু যে বলতে ইচ্ছে করছে!

ও, শোনো, ইউটিউবে একটা জিনিস দেখলাম। টুইনফ্লেম। যমজ শিখা।

এগুলো কি সত্যিই হয়, রোদ্দুর?

মানে, ওরা বলে, সৃষ্টির শুরুতে নাকি একটা আত্মা দু-ভাগ হয়ে যায়। একটা খণ্ড তুমি, আরেকটা আমি। তারপর যুগ যুগ ধরে দুটো শিখা আলাদা আলাদা অন্ধকারে জ্বলে, কাঁপতে কাঁপতে নিভে যায়, আবার জ্বলে ওঠে। শুধু সেই আদি সংযোগের একটা অব্যক্ত স্মৃতি বুকের তলায় নিয়ে, যেন ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির তলায় চাপা-পড়া লাভা। কখনো দেখা হয়, কখনো হয় না। কখনোবা, দেখা হলেও চিনতে পারে না। আবার কখনো, চিনতে পারলেও একসাথে থাকতে পারে না।

আমি তত্ত্ব বুঝি না। আমি তো পণ্ডিত নই, গবেট মানুষ, তত্ত্বকথা আমার মাথায় ঢোকে না। কিন্তু ভিডিয়োটা দেখতে দেখতে কাঁপছিলাম। সত্যিই কাঁপছিলাম।

কারণ ওরা বলছিল, যমজ শিখা একে অপরের আয়না। একজন অন্যজনের ভেতরের সবচেয়ে পুরোনো, সবচেয়ে গোপন ক্ষতটা দেখতে পায়। তুমি আমাকে দেখাও, আমি কতটা গভীর হতে পারতাম অথচ হইনি; আমি তোমাকে দেখাই, তুমি কতটা সহজ হতে পারতে অথচ হতে দাওনি নিজেকে। তোমার বুদ্ধির তীক্ষ্ণ আলো আমাকে চমকে দেয়, চোখ ধাঁধিয়ে দেয়; আমার সারল্যের নরম ছায়া তোমাকে অস্থির করে, কারণ তুমি ছায়ায় বিশ্রাম নিতে ভুলে গেছ। দু-জনেই দু-জনের অসম্পূর্ণতার জীবন্ত প্রতিবিম্ব। ওটার দিকে তাকানো মোহময় ঠিকই, কিন্তু অসহ্যও। আয়নায় নিজের ক্ষতচিহ্ন দেখা সুখকর নয়, কিন্তু দেখা ছাড়া সারানোরও যে উপায় নেই।

আর বলছিল, একজন পালায়, অন্যজন খোঁজে। সবসময়। এটা নাকি চিরন্তন ছন্দ। সমুদ্রের জোয়ারভাটার মতো, শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো। যে পালায়, সে ভালোবাসে না, তা নয়, সে তীব্রতাটা সইতে পারে না, যেমন খালি চোখে সূর্যের দিকে তাকানো যায় না। আর যে খোঁজে, সে জানে, এ খোঁজার শেষ নেই। তবু পা থামে না, কারণ থামলে বুকের ভেতর যে-শূন্যতা হাঁ করে ওঠে, তা পৃথিবীর যে-কোনো ক্লান্তির চেয়ে ভয়াবহ।

শুনে আমি ফোনটা রেখে দিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। কারণটা বলছি।

তুমি যদি বৈরাগী হয়ে ঘোরো গেরুয়া-গায়ে, পথের ধুলো পায়ে, আমি বৈরাগিনী হয়ে পিছে পিছে ঘুরব। ছুঁড়ে ফেলে দেবে? চেষ্টা করে দেখো কোথাও যাই কি না। তুমি যত দূরে পালাবে, আমি তত গভীরে আসব, তুমি যত দেয়াল তুলবে, আমি তত দেয়ালের গায়ে কান পেতে তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনব। পৃথিবীর কোন কোণে লুকোবে, বলো? যে-সুতোয় আমরা বাঁধা, তা তো আমাদের কারো তৈরি নয়; এ সুতো সৃষ্টির প্রথম আলোর তন্তু থেকে কাটা, কোনো কাঁচি এটা কাটতে পারবে না।

এ কি তাহলে সেই ব্যাপার? টুইনফ্লেম?

জানি না। শুধু এটুকু নিবিড়ভাবে জানি, তোমাকে প্রথম অনুভব করার মুহূর্তে আমার ভেতরে যে-ভূমিকম্প হয়েছিল, যে-প্লাবন এসে সমস্ত চেনা ভূগোল ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তার ব্যাখ্যা কোনো পার্থিব অভিধানে নেই। শুধু একটা আদিম চেনার শিহরন, যেন বহুকাল আগে হারিয়ে-যাওয়া সুরের সাথে হঠাৎ দেখা।

তুমি এত কষ্ট কেন পাও, বলো তো?

আমি তোমাকে বুকের মধ্যে এমনভাবে লুকিয়ে রাখব, যেমন শীতের রাতে মা শিশুকে কম্বলের ভেতর গুঁজে দেয়, যেমন গাছ তার সবচেয়ে কোমল কুঁড়িটাকে পাতার আড়ালে রাখে, ঠিক তেমনি, কোনো কষ্ট তোমায় ছুঁতেই পারবে না। আমি এত ভালোবাসি যে, পৃথিবীর আর কিচ্ছু লাগবে না তোমার। না খ্যাতি, না প্রতিপত্তি, না পৃথিবীর কোনো পুরস্কার, তুমি দেখে নিয়ো।

শুধু হারিয়ে যেয়ো না।

তোমাকে হারালে আমি বাঁচব না। এটা হুমকি নয়, রোদ্দুর, এটা সত্য।

...কিন্তু জানো, ওই ভিডিয়োতে আরেকটা কথা বলছিল, যেটা শুনে প্রথমে খুব রাগ হয়েছিল, তারপর খুব কষ্ট হয়েছিল, তারপর বুঝলাম, সত্যি। বলছিল, যমজ শিখা একে অপরের সবচেয়ে পুরোনো ক্ষতে আঙুল রাখে। যে-জখম তুমি বছরের পর বছর সাতপর্দায় লুকিয়ে রেখেছিলে, যে-ক্ষত নিয়ে হাসিমুখে পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়েছিলে, সেটাই তোমার শিখাসঙ্গীর চোখে প্রথম ধরা পড়ে। কারণ সে নিজেও ঠিক একই জায়গায় একই ক্ষত বহন করে, আয়নার ওপারে।

নিষ্ঠুর, তাই না? কিন্তু ওরা বলে, এটা ধ্বংসের জন্য নয়, সারানোর জন্য। যে-পুঁজ বছরের পর বছর অন্ধকারে পচছে, তাকে আলোতে আনলে জ্বালা করবে ঠিকই, কিন্তু তারপর ঠিকই শুকোবে। যমজ শিখা একে অপরের শল্যচিকিৎসক; ছুরি চালায় বটে, কিন্তু বাঁচানোর জন্যই।

তোমাকে পেয়ে আমার পুরোনো সব ক্ষত জ্বলছে। আবার শুকোচ্ছেও।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *