সেদিন আমার এক ঠাকুমাকে দেখতে গিয়েছি। তাঁর বয়স হয়েছে, বাইরে বেরোতে পারেন না, সারাদিনই ঘরের ভেতরে বসে টিভি দেখেন। বাড়ির লোকজন তাঁকে তেমন একটা সময় দেয় না বলেই জানি। বার্ধক্যের বড়ো অভিশাপ এই একাকিত্ব।
আমি গিয়ে দেখি, উনি জি-বাংলায় তাঁর পছন্দের সিরিয়ালটি দেখছেন। আমাকে দেখে ইশারায় বসতে বললেন। আমি দেখলাম, উনি খুব মন দিয়ে সিরিয়াল দেখছেন এবং চরিত্রগুলির সাথে তাঁর চোখ ও মন যেন মিশে আছে অনেক দিন ধরেই।
সিরিয়াল শেষ হলে টিভি অফ করে উনি আমাকে বললেন, দাদুভাই, কিছু মনে কোরো না, তোমাকে বসিয়ে রাখলাম। সিরিয়ালটা দেখতে তোমার খারাপ লেগেছে কি? আমি বললাম, না না ঠাকুমা, খারাপ লাগেনি। আপনি কেমন আছেন? কথার উত্তর না দিয়ে তিনি বললেন, এই যে আমি সারাদিন বসে টিভি দেখি, এটা ওরা কেউ পছন্দ করে না। কিন্তু কী করব বলো, আমাকে তো কেউ সময় দেয় না। আমি তো কথা বলার জন্য কাউকেই কাছে পাই না। আমারও তো একা লাগে, বয়স হয়েছে তো! জীবনের এই শেষ ক'টা দিন আমার বন্ধু হারাবার দিন, আমি তা মেনে নিয়েছি। আমার বন্ধু বলতে এখন টিভির ভেতরে থাকা ওই মানুষগুলোই। ওরা কক্ষনো আমাকে ছেড়ে যায় না, প্রতিদিনই আমাকে সঙ্গ দিতে আসে। তাই আমি ওদের কাছেই থাকি। আমাকে বাঁচতে হবে তো!
ঠাকুমার অনুভূতিটা আমি ঠিকঠিক বুঝতে পেরেছিলাম। এ পৃথিবীর অনেক মানুষ কেবলই টিভির উপর নির্ভর করে বাঁচে। এতে দোষের কিছু নেই। যাকে কেউ সময় দেয় না, যার আবেগের মূল্য দেবার সময় কারও হাতে নেই, সে আর কী করবে? তাদেরই টিভি লাগে না, যাদের হাতে করার মতন কাজ আছে, যাদের জীবনে কথা বলার মতন মানুষ আছে। টিভি, মোবাইল, কম্পিউটার অনেক মানুষকেই এভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে।
বার্ধক্যের ঘর
লেখাটি শেয়ার করুন