গল্প ও গদ্য

ছায়াসঙ্গী

আমার অস্তিত্বের পুরোটা জুড়ে আছে যে মানুষটা, তাকে আমি সবসময়ই উপেক্ষা করি। উপেক্ষা বলতে, তার দিকে আমি কখনোই ভালো করে তাকিয়ে পর্যন্ত দেখি না। মানুষটা আমার দেখা পাবার জন্য, আমার চোখে একটু চোখ রাখবার জন্য অনন্তকালের ছটফটানি নিয়ে আমারই আশপাশ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমি বুঝি, কিন্তু না বোঝার ভানটা ঠিকঠাকভাবে করি। মানুষটা যে এতটা প্রবলভাবে এক্জিস্ট করে আমার জীবনে, সেটাই ওকে কখনও বুঝতে দিইনি।

সকালবেলায় চায়ের কাপে আমি ওকেই অনুভব করি, সকালটা আমার শুরু হয় ওর সাথেই। রাঁধতে রাঁধতে ভাবি, আজ হয়তো ওর মা-ও বাসায় এই পদটাই রাঁধছেন। খেতে বসে ভাবি, আমার পাশের চেয়ারেই মানুষটা আরাম করে গরম ভাত খাচ্ছে আমারই সাথে বসে। দুপুরের ভাতঘুমেও লোকটা আমার সাথে একই কম্বলের নিচে শোয়। আমি ঘুমাই না, শুধু লোকটার গায়ের গন্ধ নিই, আর তার বুকের সাথে মিশে যাই।

মানুষটার সাথে সারাক্ষণই চলে আমার কাল্পনিক কথোপকথন। অথচ ওকেই আমি সবচেয়ে বেশি অবহেলায় রাখি। কেন এমন করি?

আমি জানি, এই সমাজে ভালোবাসা ততক্ষণই সুন্দর, যতক্ষণ তা অগোচরে থাকে; ততক্ষণই পবিত্র, যতক্ষণ তাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা যায়। আমি এই সমাজের নিয়মগুলি জানি। তাই বুকের মধ্যে একসমুদ্র ভালোবাসা আর একযুগ অপেক্ষার তৃষ্ণা নিয়েও আমি সাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপনের ভান করে যাই। আমি জানি, সমাজের বেশিরভাগ মানুষই ভালোবাসাবঞ্চিত, ওরা জানেই না ভালোবাসার সঠিক মানে।

আমি আমার ভালোবাসার মানুষটিকে হারাতে চাই না। তাই তাকে পাশ কাটিয়ে চলার বিকল্প আর কিছুই নেই আমার কাছে।

আমি এই সমাজের ভয়ে ভীত, ওদের হিংসার আগুন সম্পর্কে আমার ধারণা আছে। ওরা মুখে যা বলে, ওদের মনের কথা সম্পূর্ণ তার বিপরীত। ওরা নোংরা, ওরা মিথ্যুক, ওরা কপট। আমি আমার ভালোবাসাকে আমার বুকেই রাখব, তবুও সমাজের ওসব বদমাশ লোকের চোখের সামনে এনে ভালোবাসাকে অপমানিত হতে দেবো না।

আমি বরং ভালোবাসার ঘায়ে শত বার মরতে রাজি, তবু সমাজের হিংস্রতায় এক বার‌ আহত হতেও রাজি ন‌ই।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *