গল্প ও গদ্য

উপকারের শাস্তি

ধরুন, আপনার অপরিচিত কেউ কোনো একভাবে আপনার দ্বারা উপকৃত হলো। আপনার কোনো একটা কাজ বা কথা তাকে কিছু সময়ের জন্য সুন্দর সঙ্গ দিল বা সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করল।

তারপর সে আপনার কাছ থেকে তার নিজের মতো করে কিছু পরামর্শ বা সাহায্য চাইল। সময়ের, সুযোগের, সামর্থ্যের কিংবা স্রেফ ইচ্ছের অভাবে আপনি তার চাহিদা তার মনের মতো করে পূরণ করতে পারলেন না। এমন‌ও হতে পারে, করতে পারলেও করতে চাইলেন না বলে করলেন না। আপনার জীবন, আপনার সময়। কাকে সেখানে কত সময়ের জন্য রাখবেন বা রাখবেন না, তা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে আপনি তাকে সময় দিতে বাধ্য নন, তাই সে অধিকার হিসেবে সময় চাইতেই পারে না। অপরিচিত কারও পেছনে সময় দেবার মতো সময় বা ইচ্ছে সবসময় আপনার না-ও থাকতে পারে।

এই সহজ ব্যাপারটা সে বুঝতে চাইবে না। বুঝতে পারলেও মানতে চাইবে না। ভালো কথা, সে কিন্তু আপনাকে না চিনলেও ইতোমধ্যেই জাজ করে ফেলেছে। সে তার মাথায় কিছু অনুমাননির্ভর জাজমেন্ট সেট করে করে নিয়েছে আপনার সম্পর্কে। সেগুলিকে সত্য হিসেবে নিজে নিজেই প্রতিষ্ঠিত করে আপনাকে দিয়ে তার উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য অদ্ভুত সব প্রত্যাশা তার মনের মধ্যে সে তৈরি করে ফেলেছে কোনো যুক্তির পরোয়া না করেই। অধিকার ও আনুকূল্যের পার্থক্য বুঝতে কিংবা বুঝলেও মানতে বেশিরভাগ (বাঙালি) মানুষই চায় না। এই সামান্য স্মার্টনেস ও কমনসেন্স ছাড়াই জীবন পার করে দিতে ওদের একটুও খারাপ লাগে না। সম্পূর্ণ অপরিচিত কারও কাছে ন্যূনতম‌ও কারণ ছাড়াই নিজের আবেগ ও সমস্যার ঝুলি মেলে ধরতে কেবল আমরাই পারি। মেলে ধরেই থেমে যাই না, তার অ্যাটেশন পেতে রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠি! অ্যাটেশন না পেলে পারলে তাকে ধরে মাইর দিই!

যার আবেগ, তার কাছে বড়ো। যার প্রয়োজন, তার কাছে বড়ো। একজন অপরিচিত মানুষের কাছে তার আবেগ ও প্রয়োজনের দাম শূন্য। এটা না বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না, বাঙালি হলেই চলে। ঘটনাটা এখানে শেষ হয়ে গেলে অসুবিধে ছিল না। আপনার মাধ্যমে যে একটু হলেও উপকৃত হয়েছে, সে যখন আপনার দ্বারা তার মনের মতো করে বিনা পয়সায় ও কারণে আরও উপকৃত হতে পারবে না, তখন সে আপনাকে অপছন্দ করতে শুরু করবে; এমনকী কখনো কখনো ঘৃণা করতে ও সেই ঘৃণা ছড়াতেও পারে। এমন‌ও হতে পারে, সে আপনার পেছনে লেগে যাবে, আরও হেটার জোগাড় করে দল ভারী করার চেষ্টা করবে, আপনার ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। গালাগালি ও জাজমেন্টের শিকার তো হবেন‌ই, ওসব এক্ষেত্রে কমন জিনিস। বাঙালিকে একবার ফ্রি খাওয়ালে ফ্রি খাওয়াটাকেই সে অধিকার মনে করে এবং ফ্রি খেতে না পারলে মারামারি-ভাঙচুর করতেও পিছপা হয় না, লজ্জা পায় না।

গড়পরতা বাঙালি মাত্র দুইটি কারণে অন্যের 'পেছনে' লাগে: এক, যদি সে গ্যাস্ট্রো-সার্জন হয়। দুই, যদি সে গ্যাস্ট্রো-সার্জন না হয়।

শুরুতে যদি সে আপনার দ্বারা কখনোই উপকৃত না হয়, তবে সে আপনাকে কখনোই চিনবে না, ফলে আপনি তার হাত (রাগ ও আক্রোশ) থেকে নিরাপদ। যে কাজে লাগে, সে-ই বাজে আচরণ পায়। যে কার‌ও কাজে লাগে না কখনও, যাকে কেউই চেনে না, তার বিপদ কম এবং শান্তি বেশি। উপকার করবেন তো একেবারে মরমে মরবেন!

মাই কিউরিয়াস মাইন্ড ওয়ন্টস টু নৌ, এমন অদ্ভুত রকমের মানসিক সংকট কি অবাঙালিদের মধ্যেও দেখা যায়? আমি অবাঙালিদের সাথে মেশার সুযোগ পাইনি, তাই আপনাদের কাছে জানতে চাইছি।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *