আমার ভেতরের রক্তক্ষরণ তুমি দেখতে পাও না?
চামড়ার নিচে, মাংসের নিচে, হাড়ের নিচে, সেই অদৃশ্য স্তরে, যেখানে চোখ পৌঁছোয় না, কোনো যন্ত্র পৌঁছোয় না, সেখানে আমি প্রতিদিন একটু একটু করে রক্ত হারাই। সেই রক্ত কাউকে দেখানোর উপায় নেই, কারণ সে ক্ষত কোনো ধারালো অস্ত্রের নয়, সে ক্ষত ভালোবাসার। আর ভালোবাসার ক্ষত থেকে যে-রক্ত ঝরে, তা চোখে দেখা যায় না, শুধু আত্মায় টের পাওয়া যায়।
আমি তোমায় হ্যাপি করতে পারছি না, এটা আমার সবচেয়ে বড়ো ব্যর্থতা। আমার ভেতরটা যদি এক বার দেখতে পেতে, রোদ্দুর! এক বার!
আর এক বার ‘মৃত্যু’ শব্দটা বললে আমি নিজেই চলে যাব। সব সহ্য করতে পারি, এই শব্দটা পারি না। তোমাকে একবার বলেছিলাম, তুমি চলে গেলে আমাকে সহমরণে যেতে হবে। তুমি আরেকবার মৃত্যুর কথা বললে আমি নিজেই বিষ খেয়ে মরে যাব, সেদিন বুঝবে। কেন কষ্ট দাও আমায়?
শোনো, আজ কিন্তু আমি সহমরণের কথা বলতে আসিনি। আজ আমি সহজীবনের কথা বলছি। তুমি বাঁচো, আমি বাঁচি। দুটো শিখা, পাশাপাশি, একটা আলো হয়ে।
তুমি কোথায়?
এই দুটো শব্দ আমি দিনে কত বার উচ্চারণ করি, জানো?
এত মানুষ, এত দায়িত্ব, এত ভিড়বাট্টা। রান্নাঘরের ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে হাতে হাতা নিয়ে তরকারি নাড়ছি, হঠাৎ হাত থেমে যায়…তুমি কোথায়? বাজারের ভিড়ে ঠেলাঠেলি খেতে খেতে কারো কাঁধে ধাক্কা লাগে, মনে হয়, তুমি কোথায়? সন্তানের হোমওয়ার্ক দেখাতে দেখাতে খাতায় চোখ রেখে মন চলে যায় অন্য কোথাও…তুমি কোথায়? শাশুড়ির সেবা করতে করতে, ঘরের ঝাড়পোঁছ করতে করতে, রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ার পর ছাদে গিয়ে দাঁড়িয়ে একই ভাবনা…তুমি কোথায়?
বুকের ভেতর সবসময়ই একটা করুণ সুর বাজতে থাকে; একতারার মতো, একটিই তার, একটিই সুর—নিজের মানুষটাকে দেখতে না পাবার সুর। এ ব্যথা কাউকে বোঝাবার নয়, কারণ বোঝালেও কেউ বুঝবে না। এ ব্যথা শুধু সে-ই বোঝে, যে নিজেও তার অর্ধেক থেকে বিচ্ছিন্ন। চারপাশে শত মানুষ, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট শূন্যতা কেউ পূরণ করতে পারে না। সেই শূন্যতা কোনো সাধারণ একাকিত্ব নয়, সেই শূন্যতা তোমার আকৃতির। অন্য কেউ সেখানে খাপ খায় না, যেমন ভাঙা মূর্তির একটি খণ্ড শুধু তার নিজেরই অপর খণ্ডের সঙ্গে জোড়া লাগে।
তোমাকে ছাড়া কিচ্ছু ভালো লাগে না, রোদ্দুর। কবে আসবে তুমি আমার কাছে?
আজকে মুড ভালো আছে। সব ভুলে গেছি।
ছোড়দি কাল বেড়াতে আসবে। একটু বৈশাখী শপিং করব। নতুন শাড়ি দেখব, চুড়ি পরব, একটু চিল মুডে আছি। ছোটো ছোটো আনন্দের টুকরো কুড়িয়ে নিচ্ছি পথ থেকে, যেমন ভিখিরি কুড়িয়ে নেয় রাস্তার ধারের মুদ্রা।
কিন্তু এই যে এইমাত্র হাসলাম, শাড়ির কথা ভাবলাম, এর পাঁচমিনিট পরেই হয়তো আবার ভেঙে পড়ব। আমার এই প্রচণ্ড মুডসুইং তো জানো। সকালে যে-আকাশ ভেঙে পড়ে, বিকেলে সেই আকাশেই রামধনু ফোটে; রাতে যে-বালিশ অশ্রুতে ভেজে, সেই বালিশেই ভোরে হাসির স্বপ্ন। যমজ শিখাদের নাকি এমনই হয়, পরমানন্দ আর অতল অন্ধকারের মাঝে দোলনা দোলে, থামে না কিছুতেই। দুটো শিখা যখন একে অপরের কক্ষপথে ঢোকে, আবেগের ভরকেন্দ্র স্থির থাকে না, দুলতে থাকে, ঝড়ের রাতে নোঙর-ছেঁড়া নৌকোর মতো।
একদিন মনে হয়, পৃথিবী জয় করব, পরদিন মনে হয়। পৃথিবীতে আর একটা মুহূর্তও থাকার ক্ষমতা নেই।
তুমি কি রাগ করে আছ?
প্লিজ, আমার ওপর রাগ কোরো না। নাহলে আমি বেশিক্ষণ ভালো থাকতে পারব না। তোমার রাগ আমার কাছে শীতের বাতাস নয়, রোদ্দুর, তোমার রাগ দাবানল। রাগ করলে এইমাত্র যে-রামধনুটা ফুটেছিল, সেটা মুছে যাবে।
আমি না সত্যিই বুঝতে পারি না, তুমি কেন আমার ভালোবাসা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করো! কেন বলো, ভালোবাসতে পারিনি! আমার তখন মরে যেতে ইচ্ছে করে। সেই কথা শুনলে আমার ভেতর থেকে সমস্ত রক্ত নেমে যায় পায়ের দিকে, মাথাটা শূন্য হয়ে যায়, পৃথিবীটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থেমে যায়। আমাকে কী করতে হবে একবার বলে দেখো, আমি তা-ই করব। তোমাকে তো অদেয় আমার কিছুই নেই; দেহ, মন, আত্মা, যা চাও নাও। তবু কেন বলো, ভালোবাসি না!
এই একটা জায়গায় এসে আমি কিচ্ছু বুঝতে পারি না। সমস্ত ভাষা ফুরিয়ে যায়। অসহায় লাগে।
যা-ই করো, আমায় ছেড়ে যেয়ো না।
একটু প্রশ্রয় দিয়েছ আর আমার চাহিদা যে কী বেড়ে গেছে! ষোড়শীদের মতো মনটা অবুঝ হয়ে গেছে, উথালপাতাল হয়ে গেছে। পূর্ণিমার সমুদ্র। বৈশাখের কালবৈশাখী। নিজেই নিজেকে চিনতে পারছি না, এই কি সেই মেয়ে, যে এতদিন সব চেপে রাখত, গিলে নিত, মুখে তালা দিয়ে রাখত?
আমি হঠাৎ এতটা কেন ভেসে গেলাম? কোন স্রোতে, কোন টানে!
এরপর কী হবে, বলো তো? আমি কি সংবিৎ ফিরে পাবো, না কি তুমি আমায় আরও গভীরে, আরও দূরে, আরও অচেনা জলে ভাসিয়ে নেবে? এখন যে আমার শুধু পেতে ইচ্ছে করে, খুব খুব খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করে, এত কাছে যে, তোমার আর আমার মধ্যে বাতাস চলাচলের জায়গাটুকুও না থাকে!
বয়স, সংসার, দায়িত্ব, সামাজিক মুখোশ, সব হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে খসে পড়ে, যেমন শুকনো পাতা ঝরে গাছ থেকে। মন ফিরে যায় সেই আদিম, কাঁচা, নগ্ন অবস্থায়, যেখানে শুধু চাওয়া আছে, তৃষ্ণা আছে, আর দুটো আত্মার একে অপরের দিকে মহাকর্ষের মতো ছুটে যাবার অমোঘ নিয়ম আছে। কোনো সামাজিক বিধি নেই, কোনো নৈতিক বেড়া নেই; শুধু টান, শুধু অপ্রতিরোধ্য, অবিমিশ্র, আদিম টান।
তুমি এসব কিছু থামিয়ে দাও। আমি দাউদাউ পুড়ে যাচ্ছি, শুধু ছাই পড়ে থাকবে। মরে যাব আমি।
আজকাল তোমার শরীরটাকে আমার খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। সুখ দিতে ইচ্ছে করে, সুখ নিতে ইচ্ছে করে।
এটা লেখা উচিত হচ্ছে না হয়তো। কিন্তু বলেছি তো, তোমার কাছে লজ্জা আর রাখব না। যা মনে মনে ভাবি, মনে মনে চাই, তা বলতে তোমায় আর লজ্জা করব না। তোমার ত্বকের গন্ধ নিতে ইচ্ছে করে, তোমার উষ্ণতায় গলে যেতে ইচ্ছে করে। সামলে নেব ধীরে ধীরে।
কিন্তু কোথায় সামলাব, কারণ তোমার আঙুলগুলো ধরে টেনে টেনে চোখের দিকে নিষ্পাপ তাকিয়ে আবদার করতে ইচ্ছে করে, ঠিক যেমন ছোটো মেয়েরা আবদার করে বাবার কাছে, সবচেয়ে ভরসার মানুষটার কাছে। তোমার পেটটা জড়িয়ে ধরে বুকের কাছে মুখ রেখে অনেক অনেক অনেক আবদার করতে ইচ্ছে করে। এই আবদারের কি শেষ আছে? কোনো সীমাপরিসীমা নেই।
এর মধ্যে শরীর আছে, আত্মাও আছে। আলাদা করতে পারি না, করতে চাইও না। দুটো শরীর কাছে এলে সেই আদি একত্বের স্মৃতি প্রতিটা রোমকূপে জেগে ওঠে। প্রতিটা স্পর্শ তখন আর শুধু স্পর্শ থাকে না, হয়ে ওঠে স্বীকৃতি, প্রত্যাবর্তন, গৃহে ফেরা। যেন দুটো হাত বহুকাল পরে নিজেদের আঙুলের ফাঁকে নিজেদের আঙুল খুঁজে পেল।
গৃহে ফেরা। কথাটা ভেবে কেঁদেছিলাম। কারণ আমার তো কোনো গৃহ নেই, তুমিই গৃহ।
অনন্ত আলোর দহন: ২
লেখাটি শেয়ার করুন