গল্প ও গদ্য

যতটুক রয়ে গেল: চার



জীবনের জ্বলন্ত কামনা

আমার কবিতা যদি কোনোদিন তোমার রক্তের মতো লবণাক্ত ও অন্তরঙ্গ স্বাদ ধারণ করে, যদি সে নরম হরিণীর চোখে জমে-থাকা শিশিরের মতো স্বচ্ছ হয়, কিংবা ক্রৌঞ্চীর শোকে হঠাৎ বিহ্বল হয়ে-ওঠা প্রাচীন শ্লোকের মতো বেদনা ও দীপ্তিতে স্পন্দিত হয়, তবে তাকে আর নিছক সমালোচনার মাপে ধরা যায় না।

যদি তার বর্ণগভীর ডানার আবরণে কোনো নবীন প্রেমিক আকাশে প্রদীপ জ্বালায়, যদি সে মৃগনাভি আর মহুয়ার মাদক দ্বীপের মতো চারদিকে ছড়িয়ে দেয় হিল্লোলিত সুরভি, যদি ছিন্নস্বপ্ন আর বিচ্ছিন্ন ইচ্ছেদের একত্র করে সে কোনো সবুজ নিকুঞ্জে নতুন নীড় নির্মাণ করে, তবে সে আর কেবল ভাষার কারুকাজ নয়, সে এক জীবন্ত অন্তর্লোক।

আর যদি কোনোদিন সেই কবিতা হেমন্তের সোনালি গন্ধে ফসলের মাঠ ভিজিয়ে দেয়, সবুজ নিচোলখানায় শিশির নামায়, কিংবা বৈশাখের দগ্ধ দুপুরে নিষ্ঠার পাথরও ভেঙে ফেলতে পারে, তবে তাকে শুধু কবিতা বললে তার মহিমা ক্ষীণ হয়ে যায়।

তখন সে আর শুধু কবিতা থাকে না; সে হয়ে ওঠে আমার জীবনের জ্বলন্ত কামনা, আমার সমগ্র সত্তার অন্তর্গত অগ্নি।

পৃথিবীর স্থিরচিত্র

কবিতা লিখে কীই-বা হবে? তার চেয়ে অনেক বেশি রসালো, অনেক বেশি জনপ্রিয় এই দিনরাতের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য পরকীয়া নৃত্য। মানুষ আর ভল্লুকের মিলেমিশে-যাওয়া এক অদ্ভুত খেলা, মোড়ের মাদারীকে ঘিরে জমে ওঠা দর্শকের উল্লাস, এখনকার সময় যেন সেদিকেই বেশি আকৃষ্ট।

কোথায় মল্লিকা ফোটে, কোন উপবনে গোপনে সুবাস জমে, তা নিয়েও কারো কারো নিদ্রা হারাম হয়। আবার গলির অন্ধকারে বসে-থাকা অন্ধ মেয়েটি মনে মনে দেখে উত্তমের ‘মৌচাক’ ছায়াছবি। সৌন্দর্য ও অভাব, স্বপ্ন ও বঞ্চনা, উভয়ই পাশাপাশি বেঁচে থাকে।

এই সময়ে কবিতা খোঁজাও যেন অনেকখানি নিষ্ফল পরিশ্রম; তা ঝোলানো বোর্ডে শুকনো কাঁকরের মতো নির্জীব, কিংবা মাঠের কুঁড়েঘরে ইঁদুরের বংশবৃদ্ধির মতো তুচ্ছ ও অনুল্লেখ্য। ভাষার অলংকারের চেয়ে বাস্তবের ক্ষয়, পচন, অবক্ষয়ই যেন বেশি চোখে পড়ে।

তাই আমি আর কবিতা খুঁজি না; খুঁজে ফিরি গলতে-থাকা জীবনকে। কারণ যুগ বদলে গেছে, আর পৃথিবীর স্থিরচিত্র এখন এরকমই; নির্মম, কৌতুকময়, ভাঙাচোরা, তবু অনিবার্য।

থাকো এইখানে

থাকো এই ক্ষেতের পাশে, ডোবা-নালার ধারে, দূরে দূরে ছড়িয়ে থাকা সহোদর গ্রামের সান্নিধ্যে। এই মৃদু, ঘন, নীরব দৃশ্যগুলোর ভেতর একা হয়ে কিছুক্ষণ স্থির থেকো। কোথাও পাশাপাশি দাঁড়ানো দীর্ঘদেহ তালগাছেরা তখন মায়ের স্নেহমাখা হাতের মতো নরম পাখা নাড়তে থাকে।

ধুলোর ঘূর্ণিতে উড়তে-থাকা মেঘ যখন তার মৌসুমি আলাপ সামান্য সরিয়ে দেয়, তখন হঠাৎ মাঠজুড়ে দেখা দেয় হরিয়াল, টিটিভ, ধনেশ; প্রকৃতির অনাকাঙ্ক্ষিত, আকস্মিক সংবাদ যেন।

সময় যদি কখনো অনুমতি দেয়, তবে একদিন একা একাই এখানে এসে দাঁড়িয়ো। এসো, আর নিঃশব্দে এইসব স্থানীয় দৃশ্য, গন্ধ, শব্দ, ছোটো ছোটো অনুচ্চারিত সংবাদ দিয়ে নিজের বুক ভরে নাও।

তারপর বেলা যাক ধীরে, দিনও সরে যাক নিঃশব্দে। আর শেষে মৃদু পদক্ষেপে, গলে-পড়া অন্ধকারের মতো, রাত নেমে আসুক।

যে-হাঁটা থামে না

কোনো এক নিমগ্ন পথিক নিরন্তর হেঁটে চলে; তোমার, আমার, আমাদের সবার বুকের ভেতর দিয়ে টানা অদৃশ্য সড়ক ধরে। সে শুধু জেগে নয়, ঘুমের মধ্যেও হাঁটে; যেন তার যাত্রা বহমান চেতনারও গভীরে প্রোথিত।

তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আধ-কিশোর বয়সের সুখ-দুঃখ, উড়ে-বেড়ানো গুঞ্জন, মুখোমুখি দুপুরের অসংখ্য ইচ্ছের সংলাপ, আর নিভৃত সাধনার নীরব চেষ্টা। চোখের আয়নায় এভাবেই আঁকা হতে থাকে জীবনের এক সমুজ্জ্বল, তবু ক্ষণস্থায়ী ছবি।

একদিন সেই পথিকই কোথাও দাঁড়িয়ে উত্তরের হিমশ্বাসের দীর্ঘ নিঃশ্বাস শুনতে পায়। শুনে চমকে ওঠে। কারণ বেলা পেরোলে যেমন নিটোল রাত নেমে আসে, তেমনি জীবনেরও একসময় অন্য রূপ সামনে এসে দাঁড়ায়।

তবু তার থামা নেই। সে অবিরাম হেঁটে চলে; একাই, নিঃশব্দে, চুপিচুপি। একটি বিরতি থেকে আর-একটি নতুন ভূমিকায়, এক অবসান থেকে আর-এক উন্মেষের দিকে।

রক্তে লুকোনো মৃত্যুঞ্জয়ী রং

জল দেওয়া, কপাল থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরিয়ে মাটিকে কোমল ও উর্বর করে তোলা, জটিল আগাছা উপড়ে ফেলা, এসব দিয়েও বোঝাপড়ার সমগ্র ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। যত্ন আছে, শ্রম আছে, স্নেহ আছে; তবু জীবনকে বোঝা তার চেয়ে অনেক গভীর, অনেক জটিল।

ফুলের সঙ্গে যেমন কাঁটাও অবধারিত, তেমনি সৌন্দর্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আঘাতের স্মৃতি। শুধু সুখ আর স্বপ্ন দিয়ে কোনো প্রতিমা পূর্ণতা পায় না; যন্ত্রণাই শেষপর্যন্ত জীবনের আসল উপাদান। রামধনুর রংও একসময় মিলিয়ে যায়।

তবু আলো আর ছায়ার এই যাতায়াতের গভীরে, রক্তের অন্তস্তলে, লুকিয়ে থাকে এক চিরন্তন মৃত্যুঞ্জয়ী রং, যে-রং ক্ষয়কে অতিক্রম করে, বিলোপের ভেতর থেকেও টিকে থাকে।

সেই কারণেই পরের বর্ষায় গাছটি আবার ফোটে। একই মাটি থেকে, একই গভীরতা থেকে, আবার।

শেষ ইতিহাস

একদিন সবই স্মৃতিতে পরিণত হবে; তুমি, আমি, এই ঘর, ঘরজুড়ে সাজানো অ্যালবাম, সংসারের সৌন্দর্য, শয্যার অন্তরঙ্গতা, প্রভাতের স্তবগান, কিছুই যেন শেষপর্যন্ত স্থায়ী থাকে না।

মন্দির, মিনার, চৈত্য, কারাগার, মানুষের গর্ব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আকাশের দিকে বাড়ানো হাত, সবই একসময় ধীরে ধীরে মুছে যায়। জীবনের যত বৈতালিক, যত নীলকণ্ঠ আর্তি ও গৌরব, তারাও অবশেষে ক্ষয়ের নিয়ম থেকে মুক্ত নয়।

অথচ থেকে যায় কেবল কিছু ভঙ্গুর মাটি, কিছু এলোমেলো ঘাস, কিছু গাঢ় ও নিঃশব্দ রং; যারা দিনরাত, রোদে ও হিমে, আপন সহজতায় ধরে রাখে আকাশের লীলাময় প্রতিচ্ছবি।

হয়তো শেষপর্যন্ত এরাই পৃথিবীর প্রকৃত ইতিহাস; মাটি, ঘাস আর উদাস আকাশ।

শৈশবের চাবি

অনেক খুঁজেছি। পুরোনো ট্রাংকের ভেতর, আলমারির গোপন তাকে, লুকোনো কোণে কোণে। তবু সেই চাবিটাকে আর খুঁজে পেলাম না। কোথায় যে হারিয়ে গেল, তা আর মনে পড়ে না।

অথচ ছোটোবেলায় সেই চাবি হাতে এলেই রক্তে যেন সুরের স্পন্দন জেগে উঠত, হৃদয়ে নেমে আসত সুখের ঝরনা। মনে হতো, দূর সমুদ্রের ওপার থেকে কেউ আমায় ইশারায় ডাকছে…অদৃশ্য, অথচ নিবিড় এক আহ্বানে।

সেই চাবি দিয়েই একদিন হঠাৎ খুলে গিয়েছিল আরেক গোপন দেশের বিস্ময়ময় দেহলি। বাইরে তখন রাত, তুঁতগাছের পাতায় কাঁপতে-থাকা চাঁদের বিন্দু, জমতে-থাকা হিম। সব মিলিয়ে পৃথিবী যেন এক রহস্যময় উন্মোচনের প্রহরে দাঁড়িয়ে ছিল।

কিন্তু সেই চাবি আর কেউ খুঁজে পায় না। কারণ চাবিটি আসলে আর কিছু নয়, সেই বয়স, যা প্রভাতের শিশিরের মতো একবার ঝরে গেলে আর ফিরে আসে না।

মৃত্যুর বিফল চুরি

জীবনের সংরক্ষণশালা থেকেও কত কিছু চুরি হয়ে যায়! পাহাড়পুরের পোড়ামাটির ফলক, মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ইট, ময়নামতির স্তব্ধ বিহার, পানাম নগরের বিবর্ণ জানালা, নকশিকাঁথার মলিন হয়ে-আসা সুতো। কত ইতিহাস, কত শিল্প, কত সঞ্চিত ঐশ্বর্য এভাবেই হারিয়ে যায়, কখনো প্রকাশ্যে, কখনো নিঃশব্দে। নদীভাঙন যেমন গ্রাম কেড়ে নেয়, তেমনি সময়ও কেড়ে নেয় মানুষের গড়া সৌন্দর্যের বহু চিহ্ন।

কিন্তু কোনো প্রিয় মুখের অন্তরঙ্গতা, বুকের খুব কাছে লেগে-থাকা স্পর্শের সৌরভ, কিংবা বর্ষার ভেজা বিকেলে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার নীরব স্মৃতি, এসব কি তত সহজে চুরি যায়? তারা হারায় বটে, দূরে সরে যায় বটে, তবু চিরছায়ার মতো থেকে যায়। যেমন কুয়াশা-ঢাকা ভোরে দূরের গ্রাম স্পষ্ট দেখা না গেলেও তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়, তেমনি ভালোবাসাও অনুপস্থিতির মধ্যেও আপন চিহ্ন রেখে যায়।

মৃত্যু একদিন এসে যবনিকা টানে, ধুলোয় ধুলোয় মুছে দিতে চায় সব। মুখ আর থাকে না, শরীর থাকে না, উঠোনে পায়ের শব্দও থেমে যায়। কিন্তু তবু থেকে যায় উচ্চারিত কিছু নাম, মায়ায় ভেজা কিছু সম্বোধন, স্মৃতির ভেতরে বেঁচে-থাকা কিছু আলো। প্রেম থাকে, ভালোবাসা থাকে, মানুষের জন্য মানুষের গভীর টান থেকে যায়।

সেজন্যই মৃত্যুর সব লুণ্ঠন সম্পূর্ণ হয় না। সে যতই কেড়ে নিতে চায়, কিছু-না-কিছু অমোচনীয় থেকে যায়; বাংলার মাটি যেমন বন্যার পরেও ধান তোলে, তেমনি হৃদয়ও ক্ষয়ের পরেও ভালোবাসার বীজ ধরে রাখে। এই অর্থে মৃত্যু সবচেয়ে পরাজিত, সবচেয়ে ব্যর্থ চোর।

অনন্ত সবুজ জীবনী

এখন আশ্বিনের শুরু। শস্যক্ষেত্র-জুড়ে অগণিত মেঘের ছায়া নেমে আসে; আকাশ আর মেঘ যেন একে অন্যের গায়ে গা রেখে থাকে। পথের দু-ধারে লতাগুলো নত কোনো লাবণ্যময় শরীরের ভঙ্গির মতো মৃদু ছুঁয়ে যায় পথিককে।

গাছের পাতায় জমে থাকে অসংখ্য বৃষ্টিবিন্দুর মুকুট, কাশবনে বোনা হয় শতধা নরম সাদা গাথা, আর মাঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকে অফুরন্ত, নিষ্পাপ ফসলের প্রতিশ্রুতি।

এই দৃশ্যের সঙ্গে সঙ্গে, হয়তো এরও চেয়ে মূল্যবান কিছু, আমরা নিজেরাও নিঃশব্দে বুনে চলি মনে মনে—পুরোনো দুঃখ পেরিয়ে আবার নতুন করে নিজের অন্তহীন সবুজ জীবনরেখা।

আশ্বিনের মাঠে এখন শিশির নামছে। ঘাস নরম মাথা নত করে আছে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *