গল্প ও গদ্য

যতটুক রয়ে গেল: তিন



মায়ের চেয়েও গরিয়সী

এখানেই তোমার প্রণাম অর্পণ করো, এই জরাজীর্ণ স্তূপের কাছে, এই ভাঙা মন্দিরের দেউলে। বট ও অশ্বত্থের নিবিড় ছায়াতলে কিছুক্ষণ নিজের ক্লান্ত সত্তাকে শান্ত হতে দাও। নিঃশ্বাসের পর নিঃশ্বাসে বাতাসকে ধ্বনিময় করে তোলো, যেন নীরবতাও এক গভীর আরাধনায় পরিণত হয়।

এই দেশ তোমার, মাতৃসমা, বরং তারও চেয়ে অধিক পূজনীয়া, অধিক গরিয়সী। এর মাঠ, এর আকাশ, এর আলো, এর দুঃখ, দৈন্য, রোগ, শোক, সব কিছুর সঙ্গেই তুমিও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছ। এই মাটির বেদনা তোমারও, এই বিস্তারের আনন্দও তোমারই অংশ।

এ দেশ কোনো ভাগ-বিভক্ত ভূগোলের সংকীর্ণ শুভংকরী নয়; সব খণ্ড, সব অঞ্চল, সব ইতিহাস, সব ব্যথা ও গৌরব নিয়ে সে এক অখণ্ড মাতৃমূর্তি। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কর্ণফুলী। যত তীর তত আপন; যত ঘর, ততই ভ্রাতৃত্বের বিস্তার।

তাই চিত্তের চিন্ময় অন্তর্লোকে নীরবে তোমার প্রণাম রেখে দাও। দিনরাত, অবিরাম, একই মন্ত্রে, একই প্রেমে, একই বন্দনায় তাকে স্মরণ করো।

ভাড়াটে ঘূর্ণমান মেঘ

আজকাল চারদিকে যেন প্রতারণারই ঘন অন্ধকার; কাব্যেও, শিল্পেও, সর্বত্র সিঁদকাটা চোরের গোপন আনাগোনা। কথাগুলো বার বার ফিরে আসে, রূপ পালটায়, ভঙ্গি বদলায়, অথচ শেষপর্যন্ত সবই ছলনার আর-একটি আয়োজন বলে মনে হয়।

এখন আর কোথাও প্রেমের নিশ্চয়তা নেই, হৃদয়ের গভীর অভিঘাত নেই, ভালোবাসার নির্মল সত্যও যেন অনুপস্থিত। মানুষের আঁচলে আজ উড়ে বেড়ায় শকুনের ডানা, তা-ও আবার ছায়াহীন, অশুভ, অনির্বচনীয়। বাইরে আপাদমস্তক সুখের প্রসাধন, ভেতরে কিছু সাজানো গন্ধ, কিছু সুগন্ধি সংলাপ, কিছু মেকি উজ্জ্বলতা।

আজকাল বেঁচে থাকাও যেন আর জীবনের সত্য অভিজ্ঞতা নয়; বরং ভাড়া-করা এক ঘূর্ণায়মান মেঘ, শুরু থেকে শেষপর্যন্ত অভিনীত এক নকল নাটক। আর শেষে মঞ্চের আলো নিভে গেলে বোঝা যায়, দর্শকও নেই, তালি দেবার কেউও নেই।

শিকারের দর্শন

টুপটাপ ফুল ঝরে পড়ছে, ঝরাপাতার মুখে বাতাস ঘুরে বেড়ায়, আকাশে জমে আছে অনিঃশেষ আকাঙ্ক্ষার মতো মেঘ, তবু কোনো কিছুতেই আমার আর ভালো লাগে না। প্রকৃতির এই নিবিড় মায়া, এই নীরব রূপমুগ্ধতা, কোথাও যেন এসে আমার অনুভূতির দরজায় থেমে যায়।

অথচ যখন আমারই ছোড়া গুলিতে কোনো কবুতর বা হরিয়াল পাক খেতে খেতে নিচে নামে, কিংবা কোনো শশক নিজের রক্তেই লুটিয়ে পড়ে, তখন এক অদ্ভুত তীব্র সুখ আমাকে ভরে ফেলে। শিকার যত বড়ো, যত সজীব, যত কলরবময়, উল্লাসও তত বেশি বলে মনে হয়।

কিন্তু শেষপর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ, সবচেয়ে উত্তেজনাময় শিকার তো মানুষই। তাই শিখে নিতে হয় ডান-বাম, সাদা-কালো, বিভাজন আর পরিচয়ের ভূগোল; নইলে এত বড়ো, এত তথাকথিত মহৎ শিকারের আস্বাদও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

তবু রক্তেরও স্থায়িত্ব নেই। ঘাসের ওপর তা শুকিয়ে যায়। আর পরদিন সেই জায়গাতেই আবার নতুন ঘাস গজায়।

কারখানার গোপন বসন্ত

কারখানার এই ছোট্ট সহকারীর সামান্য অফিসঘরে মুখোমুখি হয়ে নিঃশ্বাস নেবারও যেন অবসর নেই। অতিব্যস্ত টাইপরাইটারের নিষ্প্রাণ চাবিগুলোর ওপর আঙুল পড়ে অবিরাম। ডিকটেশন, ড্রাফট, হিসেব, ভুলহীন অঙ্ক, লাভ-ক্ষতির নির্লিপ্ত যোগ-বিয়োগ। আরও দ্রুত, আরও সতর্ক, আরও মনোযোগী হয়ে ওঠার নিরন্তর চাপ।

সারাদিন টেবিলজুড়ে স্তূপ হয়ে থাকে ফাইলের মৃত ভার। এমনও দিন যায়, যখন কোনো এক সাহেবের চোখ তুলে তাকানোরও সময় জোটে না।

এই যান্ত্রিকতার মাঝখানে হঠাৎ একদিন বিস্ময়ে দেখি, সেকশনের সেই দুঃসাহসী জুটি, সাহানা আর সাগ্নিক, সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে তাদের হলুদ-ছোঁয়ানো নিমন্ত্রণের খাম। তেরোই ফাল্গুন।

অমনি যেন একরাশ প্রজাপতি বাতাসে ভেসে ওঠে, নিঃশব্দে জ্যোৎস্নার গন্ধে ভরে যায় চারপাশের নিঃশ্বাস। গেটের সামান্য ওপারেই করবী ফুলে ফুলে হঠাৎ এতটাই উচ্ছল হয়ে ওঠে যে, মনে হয়, এই কঠোর, ক্লান্ত, হিসেবময় পৃথিবীর মধ্যেও জীবন তার নিজস্ব কোমল, দীপ্ত, অপ্রত্যাশিত রূপে ঠিকই এসে দাঁড়ায়।

এ-ই জীবন।

দরজা বন্ধ করলেও

শোনা যায়, এখন আর পৃথিবীর কোনো বাজারেই ক্রীতদাস বিকোয় না। কিন্তু সত্যি কথা এ-ই, ক্রীতদাসেরা হারিয়ে যায়নি; বরং তারা আজ আরও সহজলভ্য, আরও বিস্তৃত। শুধু তাদের চেহারা বদলেছে। শৃঙ্খলের জায়গায় তারা এখন পরে ইউনিফর্ম।

একসময়ের দাসত্ব ছিল দেহের ওপর, আজকের দাসত্ব মনকে ঘিরে। মুখে তাদের তোতাপাখির মতো শেখানো বুলি, শরীরে বিচিত্র রঙের বাহারি আবরণ; বাইরে চাকচিক্য, ভেতরে অনুগত্যের গভীর অভ্যাস।

তারা আপনার দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াবে। আবেগে নয়, আপনতার টানে নয়, বরং নিজেদের স্বার্থে, নিজের কাজ গুছিয়ে নিতে। তারা প্রবেশের পথ খুঁজবে, কারণ সেটাই তাদের প্রয়োজন।

আপনি দরজা বন্ধ করলে তারা জানালার দিকে যাবে। কারণ দাসত্ব শুধু বাঁধাই পড়ে না, সে সুযোগও খোঁজে।

শরৎচন্দ্র দিয়েছিলেন যা

তোমার কাছেই আমি একান্তভাবে শিখেছিলাম, যে-জীবনে বাহ্য সমারোহ নেই, আড়ম্বর নেই, আর যা আপাতদৃষ্টিতে তিক্ত, ক্লান্ত, পোকায়-কাটা, এমনকি ঘৃণিত বলেও মনে হয়, তার মধ্যেও এক নির্মল অনুসন্ধান লুকিয়ে থাকতে পারে। কাদামাটিরও যেমন অন্তরালে পদ্ম ফোটাবার গোপন ইচ্ছে থাকে, তেমনি জীবনের অবহেলিত অন্ধকারও কখনো কখনো সৌন্দর্যের সম্ভাবনা বহন করে।

এর আগে সেই আবর্জনার স্তূপে নেমে, তাকে আপন নিরবচ্ছিন্ন উত্তাপ দিয়ে খুঁড়ে তুলে, আর কেউ তাকে মণিময় করে তোলেনি। তুমি পচনের মধ্যেও সম্ভাবনা দেখেছিলে, অবমাননার মধ্যেও অনাহত দীপ্তির আভাস চিনেছিলে।

অথচ পৃথিবীজুড়ে অভিযোগ ছিল, এখনও আছে। মানুষ বিচার করেছে, দূরে সরে গেছে, আঙুল তুলেছে। আর তুমি সেইসব অভিযোগ সরিয়ে রেখে, অব্যক্ত, এঁদো, অস্বচ্ছ জলে পর্যন্ত এনে দিয়েছিলে স্বচ্ছ আকাশের প্রতিবিম্ব।

মানুষ যে বহুস্বর, বহুমাত্রিক, জটিল, এ সত্য বটে। কিন্তু তারও চেয়ে বড়ো সত্য বোধ হয় এ-ই, তুমি তাদের যে ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখেছিলে, সেই দৃষ্টিই তাদের আরও সত্য, আরও গভীর, আরও মানবিক করে তুলেছিল।

ধাবমান মৃত্যু ও বিস্মৃতি

চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকালে মনে হয়, চারপাশের সব কিছুই পিছিয়ে যাচ্ছে। মাঠ, গ্রাম, ঘন লাল পানায় ঢাকা পুকুর, দিগন্তে দুলতে-থাকা বাঁশঝাড়, ছাইয়ের পাশে কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে থাকা আধঘুমে আচ্ছন্ন কুকুর। দৃশ্যগুলো একে একে সরে যায়, মিলিয়ে যায়, দূরে হারায়।

শুধু কি ওরাই সরে যায়? তাদের চেয়েও অস্থির তো আমি নিজেই, অবিরাম চলমান এক পিপাসা, যে নিরন্তর ধাবিত হয় নিজেরই পশ্চাতে ফেলে-আসা প্রেমের দিকে।

এভাবে যেতে যেতে আমি যেন সামনে নয়, ক্রমশ পেছনের দিকেই অগ্রসর হই। দিনশেষের দেহলি পেরিয়ে ফিরে যাই যৌবনের তন্ময় পূর্ণিমায়, নিদ্রাহীন আবেগে ভরা আলিঙ্গনের দিনে; সেখান থেকে আরও পেছনে গিয়ে কৈশোর, তারপর তারও আগের স্নিগ্ধ শৈশব, মধুভরা মায়ের সান্নিধ্যের নির্মল আশ্রয় ফিরে আসে।

যত চলি, ততই যেন পিছিয়ে পড়ি। বেলা বাড়ে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে অন্তর্গত ব্যাকুলতা।

এভাবেই যদি দিন ফুরিয়ে যায়, তবে শেষে হাতে থাকবে শুধু ছিন্ন স্বপ্নের ধুলোমুঠি; আর দীর্ঘ যাত্রার অন্তে নেমে আসবে অন্ধকারের যবনিকা।

রাত্রির আরেক প্রকাশ

যদিও শেষপর্যন্ত মৃত্যুই অনিবার্য সত্য, এবং জীবনের সেই রুদ্র নির্মাতা একদিন সব কিছু ভেঙে, চুরমার করে মুছে দেয়; বিধ্বংসের নির্লিপ্ত ধুলোয় ঢেকে যায় সস্নেহ রোদে ভরা আকাশ, দিগন্তের দীপালিও নিভে আসে। যা ছিল উজ্জ্বল, আপন, স্পন্দিত, সবই যেন একসময় বিলুপ্তির আবরণে আচ্ছন্ন হয়।

তবু আশ্চর্য, সেই সমাপ্ত সংলাপের অন্তরাল থেকেই আবার জন্ম নেয় অন্য এক সূচনা; নিভে যাবার ভেতর থেকেই অঙ্কুরিত হয় আর-এক দীপ্ত, আর-এক বিস্তৃত ভূমিকা। যেন অবসান নিজেই গোপনে পরবর্তী উন্মেষের বীজ বহন করে।

যবনিকা নেমে এলেও তা কেবল বিষাদের চূড়ান্ত নাম নয়। কারণ রাতও তার গভীরে প্রভাতের আর-এক প্রকাশকে ধারণ করে। এই গোপন নিয়ম সূর্য জানে, পাখি জানে, মাটিও জানে।

ক্ষমতার প্রাচুর্যে নতুন মানুষ

বর্ষের অবসান আসে চৈত্রের শেষ প্রহরে, আর সেই তিরিশে চৈত্র পেরোতেই বৈশাখের প্রথম দোরগোড়ায় ভিড় করে কত নতুন ইচ্ছা, কত অনাগত সংকল্প। মনে মনে কতবার বলি, আরও ভালো হব, আরও শুদ্ধ হব তেজে, শিক্ষায় আরও উজ্জ্বল; বিনয়ে নম্র, আত্মায় পরিচ্ছন্ন হয়ে সব গ্লানি, সব মলিনতা ধুয়ে মুছে পৃথিবীকে নতুন করে সাজিয়ে তুলব।

সেখানে ঈর্ষা থাকবে না, দ্বন্দ্ব থাকবে না, হিংসার ছুরিতে একে অন্যকে বিদ্ধ করার অন্ধতা থাকবে না। থাকবে শুধু নিরংকুশ ভালোবাসা, নিবিড় প্রণয়, এমন এক নির্ভয় সহাবস্থান, যেখানে তুমি আর আমি মিলেমিশে আকাশের মতো বিস্তৃত হয়ে উঠতে পারি।

লুণ্ঠন, বন্ধন, আর নিরুপায় মানুষের নিঃশব্দ কান্নায় কালিমালিপ্ত এই পৃথিবীকে একদিন ভেঙেচুরে মুক্ত করা যাবে, এমনই এক নবপ্রভাতের বিশ্বাস জেগে ওঠে অন্তরে। যেন সব কারাগার একে একে ভেঙে পড়বে, সব অবরোধ সরে যাবে।

নতুন বছরের প্রথম সকালে ঘাস তখনও শিশিরে ভেজা থাকে। তারপর ধীরে ধীরে রোদ ওঠে। আর সেই আলোয় আবার শুরু হয় জীবনের নতুন অধ্যায়।

জীবনানন্দের কাছে ফেরার কথা

এখন আর সেই রূপসী বাংলা যেন কোথাও দেখা যায় না; সেই নিবিড়, সেই গভীর আশ্রয়ও আর অবশিষ্ট নেই। শতভঙ্গুর বেকার দিনের ক্লান্তি শিমুলের ডাল থেকেও ঝরে পড়ে। জীবন ঘোলাটে, হতাশায় আচ্ছন্ন; সাগরের ফেনাও যেন তেতো লাগে। নির্জন বনলতা সেনের মতো এক গভীর নৈঃশব্দ্য চারদিকে ছড়িয়ে আছে। উজ্জ্বল আবেগও যেন আর নেই। মনে হয়, এতদিন আপনি কোথায় ছিলেন?

তবু আশ্চর্য, আজও সেই নিহত নাটোরে কুয়াশার ভিড়ে ভোর নামে। রাতভর বাদুড়ের ডানা অন্ধকারে উড়ে বেড়ায়, আর প্রকৃতির অন্তর্গত বুকে জমে থাকে এক অদ্ভুত তৃষ্ণা, এক অনির্বচনীয় আকাঙ্ক্ষা।

আপনি যতই অন্তর্লীন সৌন্দর্য ভেঙে ভেঙে নতুন প্রতিমা গড়তে চান, শেষপর্যন্ত যে-মুখটি ফুটে ওঠে, তা একান্তই আপনার। সব রূপ, সব নির্মাণ, সব অন্বেষা যেন এসে আপনারই আভায় থামে।

তাই প্রতিদিনের প্রতীক্ষা একটিই, আপনি আসুন। কারণ আপনারও তো একদিন ফিরে আসার কথা ছিল, আবার।

লজ্জাবতীর ওপার

ছুটির দিন। কাজের তাড়া নেই। ছুটির অলস দুপুরে শুয়ে শুয়ে শুধু তাকিয়ে থাকা যায়। দু-ধারে ফলন্ত মাঠ, ফসলের নির্ভেজাল সবুজ, যেন স্মৃতির ভেতর জমে-থাকা কোনো প্রশান্ত সুখ। অনেক দূরে নদীও তখন এক ছবির মতো স্থির হয়ে থাকে।

জীবন আসলে ততটা দুর্বোধ্য নয়; সুখ, আরাম, সাজানো পৃথিবীর মেহগনি-রঙা ঘুম, সবই যেন সহজের এক আবরণ মাত্র। অথচ সেই সরলতার আড়ালেই আমি নিজেকে কখনো দেখি এক ক্লান্ত শকুনের মৃতদেহের মতো নিঃশেষ, অবসন্ন। তবু এই নিঃসাড়তার মাঝখানেই হঠাৎ এক সোনামুখ, লাজুক মেয়ে এসে দাঁড়ায় বুকের উঠোনে।

তারপর অনেক সময় বয়ে যায়; অবিরাম, অগণন, আর হৃদয়ের গভীরে গলে গলে জমা হয় কত অচেনা আনন্দ। কেন জানি বার বার সেই মুখটি ফিরে আসে, তার দু-চোখে আবীরের আভা লেগে থাকে; মনে হয়, কৈশোরের কোনো টলমল দিঘির ওপার থেকে সে আজও আমাকে ডেকে যাচ্ছে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *