গল্প ও গদ্য

যতটুক রয়ে গেল: পাঁচ



যাওয়াই জীবন

আমি ফিরে যাব, যেমন হাট ভেঙে গেলে হাটুরে মানুষ নিজের নিজের পথে সরে যায়, যেমন সকাল বাড়লে মাঠ থেকে, গাছের পাতা থেকে, সোনার কলসধারী মন্দিরচূড়া থেকেও শিশির নিঃশব্দে মিলিয়ে যায় রোদের ভেতর।

জীবনও তেমনি অবিরাম ঝরে, মুছে যায়, বেয়ে নামে। ডাল থেকে ফুল, ফুল থেকে সৌরভ, স্মৃতি থেকে শেষ স্বচ্ছ টান, সঙ্গের স্বপ্ন থেকে অশ্রু, আর অশ্রু থেকে এলোমেলো, ছিন্ন দীর্ঘশ্বাস।

সবই যায়। আর সেই যাওয়াতেই জীবনের প্রকৃত স্বর নিহিত। কারণ শেষপর্যন্ত যেতে হয় সকলকেই, সব কিছুই।

তখন পথে কে দাঁড়িয়ে ছিল, কে অপেক্ষায় ছিল, তা আর স্পষ্ট দেখা যায় না। সবই ধীরে ধীরে আড়ালে সরে যায়।

মায়ের হাজার মুখ

তুমি কত রূপে আমাদের সামনে উপস্থিত! জননী, জীবনদাত্রী, আশ্রয়দাত্রী। মাঠে, ঘাটে, সীমান্তের অরণ্যে, দূর জনপদের উদার বিস্তারে তুমি ছড়িয়ে আছ। কখনো তুমি ভয়ঙ্কর, বিচ্ছিন্ন, ক্ষুরধার; আবার কখনো স্নেহময়ী, শ্যামল, সিঁথিভরা সীমন্তিনীর মতো শান্ত ও সুখী। এক হাতে তোমার জ্ঞানের দীপ, অন্য হাতে রক্ষার অস্ত্র।

কিন্তু মা, আমরা তো তোমাকে সত্য করে চিনতেই পারিনি। পরের স্নেহের ভিক্ষা চেয়ে, আপন বাৎসল্যের অর্থ না বুঝে, আমরা কতবার আপন ঘর ছেড়ে পরের দোরে সান্ত্বনা খুঁজেছি!

এখন আবার আমাদের শেখাতে হবে, ঘৃণার ভেতরে কোনো আশ্রয় নেই; রক্তের মধ্যেও নয়, বরং হৃদয়ের উত্তাপে ফুল ফোটে। বীজ ফুঁড়ে যেমন উন্মুক্ত গোলাপের জন্ম হয়, তেমনি অন্ধকার ভেদ করেই লাল আভায় ভোরের আলো আসে।

তাই, মা, তোমার উঠোনে এবার পথভ্রষ্ট, নীতিভ্রষ্ট, বিভ্রান্ত সব সন্তানই ফিরে আসুক। তোমার আশ্রয়ে, তোমার করুণায়, তোমার সত্যের কাছে।

মৃত্যুর পরেও যে-সংলাপ চলে

এখন আমি শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকব, বাতাসের গন্ধ নেব, মৃগশিরা আর কালপুরুষকে চিনে নেব রাতের গভীরে। গতকালের যে-বৃষ্টিটা এত সুন্দর ছিল, আজ সেই জলই উঠোনে জমে কাদায় পরিণত হয়েছে। সময়ের হাতে রূপ কত সহজে বদলে যায়।

সারাদিন তো কেবলই ছুটোছুটি। ট্রাম, বাস, খাতাপত্র, অফিসের ব্যালান্সশিট, তারপর হাসপাতালের অন্তহীন লাইন। জীবনের ভারে দিন কেটে যায়, শ্বাস পর্যন্ত যেন নিজের থাকে না।

কিন্তু এখন, যখন চারদিকে মৃত্যুর প্রহর নেমে এসেছে বলে মনে হয়, তখন আমি এক শান্ত, স্বচ্ছ, অন্তর্মুখী মানুষের মতো শুধু আকাশ দেখব। তার বিষণ্ণ, নির্জন, গভীর অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকব।

আর তখন আমার লবণাক্ত বুকের গভীরে যে আর-একজন মানুষ নীরবে বাস করে, তার সঙ্গে আমি নিঃশব্দে কথা বলব। শুধু তার মুখের দিকে তাকিয়ে, নিজের মতো করে, যতক্ষণ ইচ্ছে, যতটুকু সময় আমার থাকে।

ভিড়ে হারানো নিজেকে খোঁজা

মাঝে মাঝে মনে হয়, রক্তের গভীর থেকে কেউ আমাকে ডেকে যায় এদিক-ওদিক, অস্পষ্ট অথচ নিবিড় এক আহ্বানে। কখনো সেই ডাক মিশে থাকে বাতাসের শব্দে, কখনো ঝরে-পড়া পাতার নিঃশব্দে, কখনোবা শিশিরভেজা ঘাসের অনাহত সবুজের মধ্যে। যেন কেউ আমার নাম ধরে, অদৃশ্য থেকে, বার বার ডেকে ওঠে।

একটি ছায়াময় সত্তা অনুক্ষণ পাশাপাশি হেঁটে চলে। অথচ তাকে যখনই আমি খুঁজতে যাই কাজের ভেতরে, ব্যস্ততার ঘূর্ণিতে, কথার শব্দময় অন্তরঙ্গ বৃত্তে, সে যেন কোনো অচেনা ভিড়ের মধ্যে গিয়ে মিশে থাকে, ধরা দেয় না।

তবু সেই ডাকা থামে না। বুকের গভীরে, এমনকি ঘুমের মধ্যেও, সে আমার নাম ধরে ডেকে যায়।

তখন আমি আয়নার সামনে এসে দাঁড়াই। দেখি, আমার নড়ার পরে ছায়াটিও একটু দেরিতে নড়ে ওঠে। যেন সে আমি, অথচ আমিই নয়।

এখনও শব্দ বোনা হয়

এখনও হয়তো কোথাও কোথাও কবিতা লেখা হয়। যদিও এই সময়ের চারপাশ যেন ইট, বালি, পাথরের নির্মম গ্রাসে আচ্ছন্ন; বাতাসে লেগে থাকে পোড়া ডিজেলের বিষাক্ত গন্ধ। পথে পথে ইজেলের রঙিন রুমাল উড়ে, আবার সেই পথই মিছিলের পর মিছিলে ঢেকে যায়।

তবু সব কিছুর মাঝেও কখনো ঘাসের সবুজ কোনো সংকেতে এসে টিকে থাকে; বাদামের ঠোঙা হাতে কেউ কেউ বিভোর বিকেলের হলুদ আঁচলে সামান্য কিছু সময় কাটিয়ে দেয়। অর্থহীন নয় সেই সামান্যতাও, সেখানেও জীবনের এক নরম অবকাশ আছে।

আজকাল অনেক মানুষেরই কাজ নেই, পকেট ফাঁকা, মাথার ওপর ছাতাও নেই। অভাব, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা চারদিক জুড়ে।

তবু বিস্ময় এই যে, এমন সময়েও কোথাও-না-কোথাও কবিতার কিছু শব্দ বোনা হয়ে যায়। জানালার বাইরে বৃষ্টি নামে, আর অন্তরালে কেউ লিখে চলে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *