সহজ করে বললে, খুদি মানে এই জ্ঞান: “আমি তুচ্ছ নই, আমি উদ্দেশ্যহীন নই, আমি শুধু ভেসে-চলা ধুলো নই; আমার ভেতরে এক অর্পিত আগুন আছে।” কিন্তু এখানেও সাবধানতা আছে। খুদি মানে নিজের ইচ্ছাকে স্রষ্টার ওপরে বসানো নয়; বরং নিজের সত্তাকে এত নির্মল, দৃঢ়, শুদ্ধ ও জাগ্রত করা, যাতে তা স্রষ্টার ইচ্ছার বাহক হতে পারে। তাই ইকবালের কাছে খুদি একদিকে আত্মপ্রতিষ্ঠা, অন্যদিকে আত্মশুদ্ধি; একদিকে শক্তি, অন্যদিকে আত্মসমর্পণ।
ইকবালের ভাষায় খুদিকে তলোয়ার বলা হয়, আর “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” তার ধার। এর মানে, খুদির আসল শক্তি আসে তাওহিদ থেকে। যতক্ষণ মানুষ নানা ভয়, মোহ, দাসত্ব, পরনির্ভরতা, হীনম্মন্যতা, মিথ্যা দেবতা, সামাজিক প্রশংসা, বা নফসের দাস হয়ে থাকে, ততক্ষণ তার খুদি দুর্বল। কিন্তু যখন সে সত্যিকার অর্থে বলে, “আল্লাহ্ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই”, তখন সে ভেতরে ভেতরে মুক্ত হতে শুরু করে। তখন খুদি শক্ত হয়, কারণ সে আর ভিড়ের দাস নয়।
খুদি হচ্ছে আত্মার জাগ্রত মর্যাদা, তবে এমন মর্যাদা, যা আল্লাহ্কে অস্বীকার করে না; বরং আল্লাহ্র দান বলেই নিজের সত্তাকে চিনে। বাংলায় একে বলা যেতে পারে: আত্মসত্তার জাগরণ, স্রষ্টামুখী আত্মমর্যাদা, বা রুহানি আত্মপ্রতিষ্ঠা। খুদি মানে নিজের ভেতরের সেই রাজকীয় সত্তাকে চিনে নেওয়া, যে বিধ্বস্ত নয়, ভিখিরি নয়, বরং আল্লাহ্র নুরে জাগ্রত।
বাংলার বাউলসাধনার আবহে এই সত্য আর-এক সুরে ফিরে আসে: “আপন ঘরের খবর নে না, ঘুরিস রে মন কোথায়?” তোমার নিজের ঘরেই আলো জ্বলছে, অথচ তুমি বাইরে বাইরে মশাল খুঁজে ফিরছ। যে-আলো তোমার ভেতরে স্থিত, তাকে না চিনে তুমি বহির্জগতের আলোকে পরিত্রাণ ভাবছ।
দোঁহা: নিজ ঘরে আলো জ্বলে, চোখ খুলে দেখো না, বাইরে খুঁজে মরো যারে, সে তো যায় না, যায় না।
ভাবো, একটি পাখি, তার ডানা ভেঙে গেছে। এখন সে নিশ্চিত হয়েছে যে, ওড়াটা তার জন্য ছিল না, আকাশ অন্যদের জন্য; ঈগলের, বাজপাখির, মেঘের। সে মাটিতে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর নিজের ভাঙনকেই নিজের নিয়তি বলে ভুল করে। কিন্তু সে জানে না, তার ভাঙা ডানাই তার সবচেয়ে গভীর ডানা। কারণ যে-ডানা কখনও ভাঙেনি, সে কখনও ওড়ার মূল্য বোঝে না। ভাঙা ডানা অক্ষমতার নিদর্শন নয়; তা অভিজ্ঞতার চিহ্ন। যে-পাখি একবার আকাশ থেকে পড়েছে, সে আকাশকে এমন এক তীব্রতায় জানে, যা নিরবচ্ছিন্ন উড্ডয়নে থাকা পাখি কখনও জানে না। কারণ হারানোর জ্ঞান থেকেই জন্মায় তৃষ্ণা, আর তৃষ্ণা থেকেই ওঠে ওড়ার আগুন।
এখানে ভগবদ্গীতা (৬.৫)-য় কৃষ্ণের বাণী যেন গভীরভাবে অনুরণিত হয়: “উদ্ধরেদ্ আত্মনাত্মানং নাত্মানমবসাদয়েৎ / আত্মৈব হ্যাত্মনো বন্ধুরাত্মৈব রিপুরাত্মনঃ”। “নিজেকে নিজেই উদ্ধার করো, নিজেকে অধঃপাতে নিক্ষেপ কোরো না; কারণ আত্মাই আত্মার বন্ধু, আত্মাই আত্মার শত্রু।” এই শ্লোকের অন্তর্গত কঠিন সত্য হলো: তোমাকে উদ্ধার করার জন্য বাইরে থেকে কেউ আসবে না। তোমাকেই নিজের উদ্ধারকর্তা হতে হবে। ভাঙা ডানার পাখিকে কেউ কোলে করে আকাশে তুলে দেবে না; তাকে নিজেকেই আবার ডানা মেলতে শিখতে হবে। কিন্তু “নিজে” মানে কে? সেই আত্মা, যে ডানার চেয়েও বড়ো, আকাশের চেয়েও বড়ো, ভাঙনের চেয়েও বড়ো। রুমি যাকে নলখাগড়ার অন্তঃস্থ শূন্যতার ভাষায় অনুভব করেন, লালন যাকে অচিন পাখি বলে ডাকেন, কৃষ্ণ যাকে আত্মা বলেন, সেই একই সত্তা, যে তোমার বন্ধুও হতে পারে, শত্রুও হতে পারে; এটা নির্ভর করে তুমি তাকে চিনতে পেরেছ কি না, তার উপর।
এখানে এসে স্মৃতির আর-এক রহস্য উন্মোচিত হয়। একটি গান ছিল, যা সে একদিন গলার গভীরে বহন করত, যেমন কুয়ো নিজের মধ্যে জল বহন করে। গানটি এখনও আছে, কিন্তু কেন গাওয়া হতো, কাকে উদ্দেশ করে গাওয়া হতো, তা আর মনে নেই। যেন চিঠি আছে, অথচ প্রাপকের ঠিকানা বৃষ্টিতে ধুয়ে গেছে। আর এটাই হয়তো সবচেয়ে মর্মান্তিক বেদনা, গান পুরোপুরি ভুলে যাওয়া নয়, বরং গানটি মনে থাকা সত্ত্বেও, কার জন্য গাইছিলে, তা ভুলে যাওয়া।
প্রেমের স্মৃতি শরীরে গেঁথে থাকে। হাতের কোনো ভঙ্গিতে, ঠোঁটের কোণের কোনো অন্যমনস্ক বক্রতায়, বুকের এমন এক স্থানে, যেখানে শীত একটু বেশি লাগে। নাম মুছে যায়, মুখ ঝাপসা হয়ে আসে, সম্বোধন ভেসে যায়; কিন্তু অনুভূতি থেকে যায়। যেমন ফুল শুকিয়ে যাবার পরেও গন্ধ কিছুক্ষণ বাতাসে থেকে যায়, যেমন আগুন নিভে যাওয়ার পরেও উষ্ণতা পাথরে, ছাইয়ে, হাতে লেগে থাকে। সুফিরা বলেন, এই অবশিষ্ট উষ্ণতাই আল্লাহ্র ইশারা। তিনি চলে যাননি; তিনি কেবল রূপ বদলেছেন।
তোমাকে ভালোবাসতে তার তেমনই কষ্ট হয়, যেমনটা একটি মোমবাতির কষ্ট হয় জ্বলতে। কারণ জ্বলা মানে নিজেকে খরচ করা, গলা মানে ক্রমে ছোটো হয়ে আসা, আলো দেওয়া মানে অন্ধকারের দিকে একটু একটু করে নিজেকে সমর্পণ করা। তবু মোমবাতি কি কখনো জ্বলতে অস্বীকার করে? সে জানে, তার জ্বলাটাই তার অর্থ, তার গলাটাই তার গৌরব, আর তার শেষ হয়ে যাওয়াটাই তার পূর্ণতা। প্রেমও তেমন। প্রেমিক যখন ভালোবাসে, তখন সে কেবল অনুভূতি প্রকাশ করে না; সে নিজের অস্তিত্বকে আর্দ্র আগুনে গলিয়ে দেয়।
রবীন্দ্রনাথের নিবেদনের সুর আমাদের এই সত্যের কাছেই নিয়ে যায়। আমি যা দিচ্ছি, তা আসলে আমার নয়; তোমারই ছিল, আমি কেবল ফিরিয়ে দিচ্ছি। মোমবাতি আলো সৃষ্টি করে না; সে সেই আলোকে প্রকাশ করে, যা তার মোমের অন্তরালে সুপ্ত ছিল। প্রেমিকও ভালোবাসা “দেয়” না; বরং নিজের বুকের গভীরে যে অর্পিত ধন বহু আগে থেকে নিভৃত ছিল, তাকেই ফিরিয়ে দেয়। সুফি তত্ত্বে যে “কুনতু কানযান”-এর গুপ্ত ধনের সুর শোনা যায়, প্রেমিক যেন সেই অদৃশ্য ভাণ্ডার থেকেই ভালোবাসাকে প্রকাশ্যে আনে। অর্থাৎ প্রেম অর্জন নয়, উদ্ঘাটন; সৃষ্টি নয়, প্রত্যর্পণ।
"কুনতু কানযান", অর্থাৎ "আমি ছিলাম এক গুপ্ত ধনভাণ্ডার", এটি কেবল শব্দগুচ্ছ নয়, এটি সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টির অন্তর্নিহিত এক শাশ্বত দার্শনিক স্পন্দন।
বিশুদ্ধ আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর গভীরে প্রবেশ করলে আমরা পাই এক অসীম প্রেমের আখ্যান। যখন দৃশ্যমান কোনো জগৎ ছিল না, সময় বা স্থানের কোনো সীমানা ছিল না, তখন সেই পরম সত্তা তাঁর নিজের অনন্ত পূর্ণতা, অসীম জ্ঞান এবং অনিন্দ্য সৌন্দর্যের মাঝে একাকী বিরাজমান ছিলেন। তাঁর এই অসীম ঐশ্বর্যই হলো সেই 'গুপ্ত ধনভাণ্ডার', যার কোনো দ্রষ্টা ছিল না, যার কোনো আস্বাদনকারী ছিল না।
কিন্তু প্রেমের নিজস্ব স্বভাবই হলো নিজেকে বিকশিত করা। সেই পরম সত্তার ভেতরে এক গভীর আকুলতা জাগল, এক অকৃত্রিম আকাঙ্ক্ষা, যেন তাঁর এই অনন্ত সৌন্দর্য ও প্রেম কেউ উপলব্ধি করে। তিনি চাইলেন নিজের এই গুপ্ত ঐশ্বর্যের প্রকাশ ঘটাতে। নিজেকে জানার এবং অন্যকে জানানোর এই তীব্র প্রেম থেকেই অনন্ত শূন্যতার বুক চিরে জন্ম নিল এই সুবিশাল সৃষ্টিজগৎ।
নক্ষত্ররাজি, নীহারিকা, বিশাল মহাসাগর, অরণ্য এবং সর্বোপরি মানবাত্মা, এ সবই হলো সেই পরম সত্তার আত্মপ্রকাশের এক একটি মাধ্যম। মানবহৃদয়কে কল্পনা করা হয় এক স্বচ্ছ আয়না হিসেবে, যেখানে পরম সত্তা নিজেরই অপরূপ প্রতিবিম্ব দেখতে পান। মানুষ যখন গভীর প্রেম ও আত্মানুসন্ধানের মধ্য দিয়ে সত্যকে উপলব্ধি করে, তখন বস্তুত সেই গুপ্ত ধনভাণ্ডারেরই সন্ধান মেলে।
এই সৃষ্টিজগতের আদি কারণ কোনো যান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়, বরং তা হলো আত্মোপলব্ধির বাসনা এবং বিশুদ্ধ প্রেম। প্রতিটি অস্তিত্বই সেই মহাজাগতিক প্রেমের এক একটি স্ফুলিঙ্গ বহন করে চলেছে, আর জীবনের গূঢ় উদ্দেশ্য হলো সেই পরম প্রেমময় সত্তাকে অনুধাবন করা। এই দর্শনে স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝখানের দেয়াল মুছে যায়, অবশিষ্ট থাকে কেবল এক অবিচ্ছেদ্য প্রেমময় সম্পর্ক।
এই কারণেই প্রেমিক কখনও বিদায় বলে না। বিদায় এমন একটি শব্দ, যা কেবল তারাই ব্যবহার করে, যারা দূরত্বে বিশ্বাস করে, যারা মনে করে, “এখানে” আর “সেখানে” সত্যিই আলাদা, “এখন” আর “তখন” সত্যিই বিচ্ছিন্ন। কিন্তু প্রেমের ভূগোলে “এখানে” আর “সেখানে” এক হয়ে যায়, কারণ মাশুক সর্বত্র। কুরআন (সূরা আল-বাকারাহ ২:১১৫)-এ বলা হয়েছে: “ফা-আইনামা তুওয়াল্লু ফাসাম্মা ওয়াজহুল্লাহ”। “তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও, সেদিকেই আল্লাহ্র মুখ।” প্রেমিকের জন্য এই আয়াত অপার সান্ত্বনা: এমন কোনো দিক নেই, যেখানে তিনি নেই। পূর্বে তাকাও, তিনি আছেন; পশ্চিমে তাকাও, তিনি আছেন; চোখ বন্ধ করো, তিনিই আছেন তোমার অন্তর্দৃষ্টির নীরবতম কেন্দ্রে। তখন বিদায় অসম্ভব হয়ে যায়। কারণ বিদায় নিতে হলে তাঁর থেকে দূরে সরে যেতে হয়, আর দূরে যাবার মতো কোনো দিকই তো নেই।
প্রেমের কালপঞ্জিতেও “এখন” আর “তখন” আলাদা থাকে না। ইশকের অন্তর্লোকে সময় খণ্ডিত নয়; সেখানে চিরন্তনতা এক অবিভক্ত বর্তমানের মতো জেগে থাকে। ভগবদ্গীতা (২.১২)-য় কৃষ্ণ বলেন: “ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ / ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃ পরম্”। “এমন কোনো কাল ছিল না, যখন আমি ছিলাম না, তুমি ছিলে না, এরা ছিল না; আর এমন কোনো কালও আসবে না, যখন আমরা থাকব না।” এই বাণী প্রেমের দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে বিদায়ের অলীকতা আরও স্পষ্ট হয়। বিদায় কেবল রূপের স্তরে ঘটে। দেহ বদলায়, ঘর বদলায়, শহর বদলায়, সম্বোধন বদলায়; কিন্তু যে-সত্তা তোমাকে ও আমাকে গভীরতর স্তরে সংযুক্ত করে, সে ছিন্ন হয় না। কারণ সে সময়ের মধ্যে আবদ্ধ নয়; সে বরং সময়কেই ধারণ করে। তাই প্রেমের গভীরতর সত্যে বিদায় বলে কিছু নেই, আছে শুধু রূপান্তর, আবরণবদল, আর অন্তর্লীন উপস্থিতির নতুন নতুন প্রকাশ।
আর সে এত পথ হেঁটেছে যে, সে এখন জানে, দূরত্ব বলে সত্যিই কিছু নেই। আছে কেবল মাশুক, যিনি ধীরে ধীরে তাঁর মুখ ফেরাচ্ছেন সেই নলখাগড়ার দিকে, যে একমুহূর্তের জন্যও গান থামায়নি। ইকবালের খুদি-চিন্তার সঙ্গে এইখানে এক গভীর সত্য এসে মিলে যায়: নলখাগড়া গান গায় না এই কারণে যে, সে এখনও অক্ষত আছে; সে গান গায়, কারণ তাকে নলবন থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে। বিচ্ছেদ তাই প্রেমের প্রতিপক্ষ নয়; বিচ্ছেদই প্রেমের বাদ্যযন্ত্র। ক্ষত সংগীতকে ভেঙে দেয় না; ক্ষত নিজেই সংগীত হয়ে ওঠে।
এই একটি উপলব্ধির মধ্যেই যেন সমগ্র মাসনাভি-র গূঢ় রস জমা আছে। রুমির সেই বিশাল কাব্য, প্রায় ছাব্বিশ হাজার পঙ্ক্তির অবিরাম আত্মবর্ণনা, শেষপর্যন্ত ফিরে ফিরে এই একটিই কথা বলে: যে-বাঁশি কাঁদে, সে কেবল কাঁদে না, সে গায়; যে-প্রেমিক পোড়ে, সে নিছক দগ্ধ হয় না, সে আলো দেয়; যে-আত্মা ভেঙে যায়, সে আসলে নিঃশেষ হয় না, বরং খুলে যায়। মানুষের প্রাচীনতম ভুল বোঝাবুঝি এখানেই: আমরা ভাঙনকে ধ্বংস বলে ভয় করি, অথচ ভাঙনই আমাদের জানালা। আমরা ক্ষতকে অভিশাপ মনে করি, অথচ ক্ষতই আমাদের গান। আমরা বিচ্ছেদে ক্রন্দন করি, অথচ বিচ্ছেদই আমাদের বাঁশির ছিদ্র; আর সেই ছিদ্র না থাকলে কোনো সুর কোনোদিন বেরোত না।
শূন্যের সপ্তক: ১৯
লেখাটি শেয়ার করুন