বিন। কোনায়। ধাতুর। একটু বেঁকে গেছে। ঢাকনাটি একদিকে ঠিকমতো মেলে না, কাত হয়ে বসে থাকে, যেমন টেবিলের ওপর টুপি, যেমন চেয়ারে তুমি। এই জায়গায় যেন সব কিছুই সামান্য বেঁকে আছে; একেবারে সোজা কিছু নেই।
তলায় কিছু আছে বোধ হয়। তাকিয়ে দেখো না। দেখার প্রয়োজনও নেই।
বিনের একটি নিজস্ব গন্ধ আছে। মৃদু, টক-মিষ্টি, পচে-যাওয়া ফলের দূরবর্তী ছায়ার মতো। যা ছিল, এখন আর নেই; তার গন্ধ। ব্যবহারের, ব্যবহৃত হবার, তারপর ফেলে-দেওয়া হয়ে যাবার গন্ধ। এই গন্ধ তুমি চেনো। তোমার ভেতরেও তো এই গন্ধ লেগে আছে, যেন যে-মানুষটিকে বাতিল করে বাইরে ফেলে রাখা হয়েছে, আবর্জনার সঙ্গে যার নাম লিখে রাখা হয়েছে, তার স্থান এখন বিনের পাশেই।
তুমি এখনও বিনের ভেতরে পড়োনি, এখনও না। কিন্তু তার পাশেই আছ, গা ঘেঁষে, একই পরিণতির অংশ হয়ে। বাতিল। ব্যবহৃত। শেষ। আর-দরকার-নেই।
একই কোনা ভাগ করে নিচ্ছ, একই গন্ধ, একই অবস্থা। এখনও তুমি আছ, শুধু তুলে নেওয়া হয়নি। বিনের মতোই বসে আছ কোনায়, দেয়ালের ধারে, ধূসরের পাশে, অপেক্ষা করে, যে-অপেক্ষার পূরণ হয় না। আদৌ কখনো কেউ আসবে কি না, বলা যায় না। হয়তো কেউ আসবে না। হয়তো তুমি আর বিন, দু-জনেই, সেই কোনায় বসে থাকবে চিরকাল।
বিন ধৈর্য ধরে। তুমিও। যদিও ধৈর্য বলে আলাদা কোনো গুণের কথা এখানে বলা যায় না; অন্য উপায় না থাকাকেই হয়তো ধৈর্য বলে। বিন জানে না কিছুই। আর না-জানাটাই তো শেষপর্যন্ত একধরনের গুণ, যদি গুণ বলতেই হয়।
ধরো, সেখানে দুটো বিন আছে; পাশাপাশি, কোনায়। হয়তো তুমি আগেও দেখেছ, অথচ দেখোনি। দুই বৃদ্ধের মতো পাশাপাশি বসে আছে তারা; একসঙ্গে মরচে ধরেছে, একসঙ্গে বাইরে পড়ে আছে। প্রত্যেকের আলাদা দেহ, আলাদা ঢাকনা, আলাদা আবর্জনা, তবু বছরের পর বছর পাশাপাশি।
মনে হয়, যেন একজন মাঝে মাঝে ঢাকনা তুলে অন্যজনকে কিছু বলতে পারে; তারপর অন্যজনও ঢাকনা তুলে উত্তর দেয়। এরপর দু-জনেরই ঢাকনা নেমে যায়, আর তারা নিজ নিজ অন্ধকারে ডুবে থাকে; পাশাপাশি, অথচ আলাদা। মাঝখানে ধাতুর পাতলা প্রাচীর। যেমন তোমার আর প্রতিবেশীর মাঝখানে দেয়াল। যেমন সব মানুষের মাঝখানেই শেষপর্যন্ত একটি-না-একটি দেয়াল থাকে।
বিন দুটি একে অন্যকে স্পর্শ করে না, তবু তারা কাছাকাছি। তোমার আর পৃথিবীর যে-কোনো কিছুর চেয়ে কাছাকাছি। তোমার আর লাঠিওয়ালা লোকটার চেয়েও অনেক বেশি। আর কখনো কখনো, যখন হাওয়া একটির ঢাকনা তোলে, তারপর অন্যটির, তখন মনে হয়, অস্ফুট স্বরে শোনা যাচ্ছে একটি কথোপকথন। পুরো শব্দ নয়, বাক্যও নয়, শুধু মৃদু গুঞ্জন, যেন স্মরণেরও আগের কোনো আওয়াজ।
ধরো, একটি হ্রদ ছিল, অনেক দিন আগে। বিনের আগে, বাইরে-ফেলে-রাখা ব্যাপারটা ঘটার আগে, সব কিছুর আগের কোনো সময়ে। সেদিন রোদ ছিল, আলো ছিল, জল নীল ছিল। ঝিলমিল করত, ধূসর ছিল না।
সেই জলের ওপর নৌকা ভাসত ধীরে ধীরে। কোনো তাড়া ছিল না। একজন অন্যজনের গায়ে হেলান দিত, আর অন্যজন তাকে ধরে রাখত। নৌকাটি দু-জনকে খুব আলতো করে দোলাত। আর হ্রদ…হ্রদ যেন নৌকোকে, তাদের দু-জনকে, সব কিছুকেই ধারণ করে থাকত। মনে হতো, পৃথিবীতে সেদিন ওই হ্রদ, ওই নৌকা, আর ওই দু-জন মানুষ ছাড়া আর কিছুই নেই।
বিনের আগে। ঢাকনার আগে। অন্ধকারের আগে। সব কিছুর আগে।
এখন সেই হ্রদই যেন বিনের মধ্যে আশ্রয় নিয়েছে। বিন যদি কিছু মনে রাখে, তবে সেই হ্রদকে। হাওয়া যখন একমুহূর্তের জন্য ঢাকনা তুলে দেয়, ভেতর থেকে যে-গুঞ্জন শোনা যায়, তা যেন সেই হ্রদেরই খবর বহন করে। তারপর আবার ঢাকনা নেমে আসে, আর অন্ধকার ফিরে আসে।
পাশাপাশি বসে-থাকা সেই বিনদুটি, ধূসরতার কোনায়, এখনও হ্রদটিকে মনে রাখে। একেবারে তলায়; আবর্জনার তলায়, ব্যবহৃত জিনিসের তলায়, ফেলে-দেবার তলায়, সব কিছুর তলায় হ্রদটি এখনও রয়ে গেছে। নীল। বিনের অন্ধকারের মধ্যেও সেই নীল অমলিন; ধূসর হয়ে যায়নি, কোনোদিন হবে না।
সম্ভবত এটাই ভালোবাসা। যদি এই ধূসর পৃথিবীতে ভালোবাসা বলে কিছু এখনও থেকে থাকে। বিনের মধ্যে হ্রদ। ধূসরের তলায় নীল। অন্ধকারের গভীরে আলোর স্মৃতি। পাশাপাশি।
তারপর দেয়াল ধরে এগিয়ে যাও, যতক্ষণ না দেয়াল শেষ হয়। তারপর শুরু হয় পাথর, অথবা কংক্রিট; চাঙড়ের পর চাঙড় জোড়া দিয়ে বানানো, ঢেউ ভাঙার জন্য। আজ ঢেউ নেই। শুধু চ্যাপ্টা ধূসরের বিস্তার, দিগন্ত পর্যন্ত।
আর তার ওপারে? এতদিনে নিশ্চয়ই জেনেছ, আরও একই ব্যাপার। সবসময় সেই একই। দিগন্তের শিক্ষা, যদি একে শিক্ষা বলা যায় আর কি, এটাই যে, ওপারে যা আছে, এখানেও তা-ই আছে, শুধু আরও দূরে। আর যা আরও দূরে, সেটিও একই, শুধু আরেকটু দূরত্বে সরে গেছে। এভাবে শেষ নেই, একই-য়েরই অন্তহীন সম্প্রসারণ।
ধূসরতা চলতে থাকে, ক্লান্ত হয়েও। তুমিও চলতে থাকো। সব কিছুই চলে, শেষ ছাড়া, উদ্দেশ্য ছাড়া। এ চলা তোমাকে ছাড়াও চলত, তোমার আগেও চলেছে, তোমার পরেও চলবে। শেষপর্যন্ত এই ব্যবস্থায় তুমি আছ কি নেই, তার খুব বেশি পার্থক্য পড়ে না। হয়তো কোনোদিনই পড়ত না।
কংক্রিটে বসো। ঠান্ডা। কঠিন। ভেবো না, অথবা ভাবো যে, ভাবছ না, আর সেটাও তো আর-এক রকম ভাবা। না-ভাবা নিয়েও ভাবা, এ মনের সেই পুরোনো অসুখ, যার আর আরোগ্য নেই। মন থামতে রাজি নয়। হাওয়া হতে রাজি নয়, গাঙচিল হতে নয়, সমুদ্রও হতে নয়। মন মনই থেকে যায়; যে জানে, আর সেই জানাকে থামাতে পারে না।
কেউ যদি তোমাকে এখন দূর থেকে দেখত, ধরো, শহরের কোনো জানালা থেকে, দেখত, বন্দরের শেষ প্রান্তে, কংক্রিটের চাঙড়ে, ধূসর পাটাতনের ওপর বসে আছ তুমি। ধারের কাছে শ্যাওলা ধরেছে, জলের গা ঘেঁষে সবুজ, দূরে নোনা হাওয়ার স্বাদ এসে ঠোঁটে লাগে। ধূসরের মধ্যে এক মানুষ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে।
সে কী দেখত? হয়তো এক ভাঁড়। রং-মাখানো মেলার ভাঁড় নয়; অন্য এক ভাঁড়, যে জানেই না, সে ভাঁড় হয়ে উঠেছে। ছেঁড়া জামা গায়ে, সব চেষ্টায় ব্যর্থ, নিজেরই ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে আছে, শূন্যের দিকে তাকিয়ে। যেন জীবনের সব কৌশল, সব গাম্ভীর্য, সব অভিনয় খসে পড়ে যাবার পরে এই এক অবশিষ্ট ভঙ্গি: বসে থাকা, আর তাকিয়ে থাকা।
অথচ এই বসে থাকার মধ্যেই, এই শূন্যের দিকে চেয়ে থাকার মধ্যেই, এক অদ্ভুত মর্যাদা জন্ম নেয়। সেই মর্যাদা নয়, যা সোজা হয়ে হাঁটা মানুষের, সফল মানুষের, এগিয়ে-যাওয়া মানুষের। এ অন্য মর্যাদা; পড়ে-যাওয়া মানুষের মর্যাদা, ধুলো-মাখা, থেমে-যাওয়া, শেষ হয়ে-আসা মানুষের মর্যাদা। আগের সব মর্যাদা সরে গেলে, সব ভান ঝরে গেলে, তবেই যে-মর্যাদা আসে।
ভাঁড়ের মর্যাদা, যে সব হারিয়েছে, এমনকি হারানোর সচেতনতাটুকুও।
এই কংক্রিটে বসে, ধূসর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তুমি হয়তো জানো না, তবু কোনো গভীর স্থানে টের পাও যে, কোনো চলমান মানুষের চেয়ে তুমি এই মুহূর্তে বেশি সামনে, বেশি সত্যি, বেশি জীবন্ত, বেশি উপস্থিত। কারণ যে চলে যাচ্ছে, সে তো পুরোপুরি এখানে নেই; সে পরের জায়গায় পৌঁছতে ব্যস্ত। সে সর্বদা সামান্য অনুপস্থিত।
আর তুমি কোথাও যাচ্ছ না বলেই পুরোপুরি এখানে। সম্পূর্ণভাবে।
ভাঁড়ের এ-ই সুবিধে। সে ঠিক যেখানে আছে, সেখানে সম্পূর্ণভাবে আছে। কারণ তার আর কোনো ‘অন্যত্র’ নেই। “আর-কোথাও”-র সঙ্গে তার বন্ধন কেটে গেছে। সে ছিঁড়ে পড়েছে খাঁটি এখানকার মধ্যে; কংক্রিট, সমুদ্র, ধূসর, বসে থাকা।
এটাই ভাঁড়ের উপহার। ব্যর্থতার একমাত্র বিশুদ্ধ দান। যে-জায়গায় সফলতা কোনোদিন পৌঁছতে পারে না, ব্যর্থতা সেখানে পৌঁছে যায়; এখানে থাকা, অন্য কোথাও থাকতে চাওয়া ছাড়া।
মাঝে মাঝে তুমি কিছু-একটা টের পাও। দেয়ালে হাত ছুঁইয়ে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, লাঠিওয়ালা লোকটাকে পেরিয়ে যেতে যেতে। বুকের গভীরে সামান্য কিছু নড়ে ওঠে। তার নাম দিতে পারো না। তাকে দয়া বলবে কি না, তা-ও নিশ্চিত নও।
তুমি যেন আর আগের সেই তুমি নেই, তবু এই অনুভূতিটুকু রয়ে গেছে। এটা জ্ঞান নয়, দর্শনও নয়, নিছক কষ্টও নয়। অন্য কিছু। পুরোনো, সরল, গভীর; জীবনের সমস্ত ছাঁটাই, ক্ষয়, অপসারণ পেরিয়েও যা টিকে থাকে।
ইচ্ছে চলে গেছে, চাওয়া চলে গেছে, পরোয়াও প্রায় নিঃশেষ. সব কিছু সরে যাবার পরেও এক শেষ অতিথির মতো এটি থেকে গেছে, যে কিছুতেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায় না।
করুণা। অথবা করুণার কাছাকাছি কোনো নাম।
নিজের জন্য নয়, তা তুমি পেরিয়ে এসেছ। এই অনুভূতি অন্যের দিকে যায়। লাঠিওয়ালা লোকটার দিকে, যে ধূসরের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে বন্দরের দিকে নেমে যাচ্ছে। কাউন্টারের মেয়েটির দিকে, যে দাম বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সেই গাঙচিলের দিকে, যে কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছাড়া ডেকে যায়। সেই শহরের দিকেও, যে একটি একটি করে দোকান বন্ধ করতে করতে মারা যাচ্ছে।
এমনকি সমুদ্রের প্রতিও, যে কোনো পুরস্কার ছাড়া টিকে আছে। কংক্রিটের প্রতিও, যে তোমাকে নিচে ধরে রেখেছে, কোনো ধন্যবাদের অপেক্ষা না করে। এক বিশাল, আকারহীন, নীরব করুণা, যা-কিছু আছে, তার প্রতি; যা-কিছু চলছে, অথচ জানে না, কেন চলছে, তার প্রতি।
সম্ভবত এটাই শেষ আবেগ। বাকি সব মরে গেছে; এটা বেঁচে আছে। আর হয়তো মরবেও না।
একে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ কিছুর দরকার হয় না। অন্যের ‘কেবল থাকা’-ই যথেষ্ট। পাথরের থাকা, গাঙচিলের থাকা, ধূসরের থাকা। এমনকি নিজের থাকার প্রতিও একধরনের করুণা জন্মায়, এজন্য যে, থাকা থামে না। উদ্দেশ্য পেরিয়ে গেছে, ব্যাখ্যা পেরিয়ে গেছে, প্রয়োজন পেরিয়ে গেছে, তবু থাকা চলতেই থাকে।
তখন তুমি ভাবো, এই করুণা, এই বিশাল, আকারহীন, সর্বশেষ অবশিষ্ট অনুভূতি, সব কিছু ছেঁটে ফেলার পরেও যা থেকে গেছে, সবচেয়ে সত্যি জিনিস কি এটাই? চাওয়ার চেয়েও সত্যি? ভালোবাসার চেয়েও? পরোয়ার চেয়েও? কারণ চাওয়া প্রায়ই নিজের দরকারে মলিন ছিল, ভালোবাসা প্রতিদান চেয়েছিল, পরোয়া প্রত্যুত্তর আশা করেছিল। কিন্তু করুণা কিছু চায় না। কিছু আশা করে না। কিছু ফেরতও চায় না।
লাঠিওয়ালা লোকটাকে দেখে সে শুভকামনা জানায় না, প্রার্থনাও করে না; শুধু দেখে, ধূসরের মধ্যে, ধীরে ধীরে, একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। আর এই দেখাটাই করুণা। করুণাটাই দেখা। দুটোর তফাত কোথায়, তা তুমি জানো না; তবু সব কিছু সরে যাবার পরেও ঘর খালি হলে যে শেষ জিনিসটি পড়ে থাকে, মনে হয়, সেটাই।
করুণা মানে মনোযোগ। মনোযোগ মানে করুণা। যেমন চোখ পলক না ফেলে কোনো কিছুর ওপর স্থির থাকে, তেমনি চোখ, যা আছে, তার ওপর নীরবে এসে বসে থাকে, ওটিকে অন্যরকম হবার দাবি জানানো ছাড়া। কাপ যেমন টেবিলের ওপর থাকে, টেবিলকে বদলাতে বলে না; কোট যেমন হুকে ঝুলে থাকে, হুককে অন্য কিছু হতে বলে না। করুণার ভেতর একটি গুণ আছে, সে বোবা, যা বিশ্বস্ত হবার গুণ; সে ধরে রাখে, অথচ কিছুই দাবি করে না।
কাপ চা ধরে। চেয়ার ভার বইতে থাকে। টেবিল দাগ সয়ে যায়। করুণা তেমনি পৃথিবীকে ধরে রাখে; গোঙানি ছাড়া, ধন্যবাদ না চেয়ে, প্রতিদান না চেয়ে। সাধারণ নিয়মে। শেলফ যেভাবে আপন ভেবে, জিনিসপত্র যা রাখা হয় তার ওপরে, সেসব নিঃশব্দে বহন করে।
তুমি বসে আছ। তাকিয়ে আছ। হাওয়া এসে লাগছে। ধূসরতা চারদিকে ছড়িয়ে আছে। দড়ি ধাতুর গায়ে ঠকঠক করছে। পেছনে কোথাও শহর তার আবছা কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। আর তুমি বসে আছ।
এইটুকুই।
আবারটুকুই জীবন: নয়
লেখাটি শেয়ার করুন