৬।
রাতে বেরোও। একা। শহর যখন ঘুমিয়ে পড়েছে বলে মনে হয়, তখন বেরোও; যদিও সত্যি বলতে, শহর কোনোদিন পুরোপুরি ঘুমায় না। শহর কেবল চোখ বন্ধ করে; ভেতরে তার কাজ চলতেই থাকে। বরং ঘুমন্ত শহর জাগ্রত শহরের চেয়ে বেশি সত্য। কারণ তখন আর তার সাজ থাকে না। একে একে আলো নিভে যায়, এ যেন স্ফুটনের উলটো ঘটনা: আকাশে তারা জ্বলে ওঠে, শহরে বাতি নেভে। শেষ গাড়ির শব্দ মিলিয়ে যায়, শেষ কুকুর তার কর্কশ, ভাঙা ডাকটি দিয়ে চুপ করে। আর তারপরই শুরু হয় প্রকৃত রাত।
দিনে পৃথিবী নিজেকে সাজিয়ে তোলে। রাতে সে সাজ খোলে। যা থেকে যায়, তা কাঁচা, অনাড়ম্বর, আদিম। এই রাত মানুষের চেনা “রাত” নয় শুধু; এর বয়স মানুষের ভাষারও আগে। দিনে পৃথিবী আলোয় ঢাকা থাকে। রাতে তা খুলে যায়। অন্ধকার তাই ঢেকে দেয় না; অন্ধকার বরং সরিয়ে দেয় সেই আবরণ, যা দিনের আলো টেনে রেখেছিল। দিনের পৃথিবীর পেছনে যা লুকিয়ে থাকে, রাত তাকে সামনে নিয়ে আসে।
তখন থাকে শুধু তোমার পায়ের শব্দ, তোমার শ্বাস, আর চারপাশের ক্রমশ গভীর-হতে-থাকা নীরবতা। আর যদি কোনো শব্দ থেকে যায়, তবে তা সমুদ্রের। সমুদ্র, দড়ির ঠকঠক, আর কখনো কখনো হাওয়া। কখনোবা হাওয়াও থাকে না। তখন কেবল সমুদ্র। সে ঘুমোয় না। কোনোদিন ঘুমোয়নি। ঘুমানোর প্রয়োজনও তার নেই। ক্লান্তি কী, তা সে জানে না। সে-ই একমাত্র সত্তা, যে কোনো ভান করে না।
আজ বন্দরের দিকে নয়, অন্যদিকে হাঁটো। শহরকে পেছনে ফেলে পাহাড়ের দিকে ওঠো, অথবা পাহাড় না হোক, অন্তত কোনো উঁচু ভূমির দিকে। শেষ বাড়িগুলো পেরিয়ে যাও। যেখানে রাস্তা মেঠোপথে গিয়ে মিশে যায়, মেঠোপথ মাঠে, মাঠ আকাশে। এক সীমা শেষ হতে না হতে আরেক সীমা শুরু হয়, অথচ তাদের মাঝের রেখা পায়ের নিচেই মুছে যেতে থাকে।
আরও ওপরে, যদি “ওপরে” বলে সত্যিই কিছু থাকে, কারণ সবসময়ই তো ‘আরও খানিকটা’ যাওয়া যায়। তবু এক জায়গায় থামো। যেখানে ঘাস ছোটো, হাওয়া ঠান্ডা, আর শরীরের ওপর হালকা কাঁটা দিয়ে ওঠে।
নিচের দিকে তাকালে একপাশে শহর দেখা যায়। আবছা আলো, বন্দর, দেয়াল। নৌকোগুলো আর স্পষ্ট দেখা যায় না; তারা অন্ধকারে ডুবে আছে, কালো জলের ভেতর। তবু তুমি জানো, তারা আছে। দেখা থেকে নয়, শব্দ থেকে জানো। দড়ির সেই পরিচিত ঠকঠক এত দূরেও এসে পৌঁছয় পাতলা হয়ে, ক্ষীণ হয়ে, যেন শব্দ নিজে নয়, শব্দের স্মৃতি। ঘুমন্ত শহরের ওপর দিয়ে ভেসে-আসা কোনো প্রেতধ্বনির মতো।
আর অন্যদিকে শুধু কালো। ধরে নিতে হয়, ওদিকে জমি আছে। অথচ সে জমি ইতিমধ্যে অন্ধকারের মধ্যে চলে গেছে, সেইসব জায়গার দিকে, যেখানে তুমি যাবে না, যেতে পারবে না, যেতে চাওও না। যেন দিগন্তের ওপারের ভূমি; এখানকারই মতো, শুধু আরও দূরে, আরও অন্ধকার, আরও একই, আরও সেই অবিরাম শূন্য, যা দিক বদলালেও বদলায় না।
অন্ধকারই তোমার জন্য যথেষ্ট, এই অর্থে যে, তোমার বাইরে এক বিশাল, অদৃশ্য বাস্তবতা আছে, আর সেটুকু জানাই যথেষ্ট। সেই সত্তা, সেই জগৎ, সেই অস্তিত্ব তোমাকে ছাড়াও চলেছে, ভালোভাবেই চলেছে, এবং তোমার পরেও চলতে থাকবে। তুমি না থাকলেও পৃথিবীর কিছু থেমে থাকে না; এই সত্য প্রথমে কষ্ট দেয়, তারপর অহং ভাঙে, এবং শেষপর্যন্ত এক গভীর শান্তির দিকে নিয়ে যায়।
শহরের আলো একদিন নিভে যাবে, নৌকোগুলো দেয়ালে পচে গিয়ে মিলিয়ে যাবে, মানুষ তোমার নাম ভুলে যাবে, তোমারও বহু পরে সব বদলে যাবে, তবু জমি থাকবে। অন্ধকার হয়ে থাকবে। নিজের জায়গায় থাকবে। এমন এক সত্তা হয়ে থাকবে, যা তুমি নও, কোনোদিন ছিলে না, তোমাকে প্রয়োজনও করে না। তোমার নাম সে জানে না, নিজেরও কোনো নাম নেই। আর তার নামের দরকারই-বা কী।
সে শুধু আছে। অন্ধকার হয়ে, দূরে সরে, উদ্দেশ্য ছাড়া, শেষ ছাড়া, কারণ ছাড়া। কোনো প্রশ্ন না করেই। সাধারণ নিয়মে। যেমন জমি থাকে, সে যে জমি, এই সচেতনতাটুকুও ছাড়াই।
তাই ঘাসে বসো। ছোটো ঘাস। ঠান্ডা। শিশিরে ভেজা। ডগায় ডগায় ছোটো ছোটো ফোঁটা জমে আছে, জোনাকি এলে যেন একমুহূর্তের জন্য জ্বলে ওঠে। বসলে হাঁটু পর্যন্ত ভিজে যাবে।
বসো। হাওয়া থাকলে ঘাসগুলো তোমার চারপাশে নড়ে ওঠে। শিশির ভাঙলে মাটির গন্ধ উঠে আসে।
প্রতিটি পাতাই পরের পাতার মতো, তবু আবার সামান্য আলাদা। কোনোটি একটু বাঁকা, কোনোটি একটু লম্বা। কিন্তু শেষপর্যন্ত তাদের আলাদা করা যায় না। ঘাসের স্বভাব এটাই। দিনেরও তা-ই। ভাবনারও। শ্বাসেরও। সব যেন একই পাতার পুনরাবৃত্তি, একই হাওয়ায় বার বার বাঁকছে। গতকালের পাতা, আজকের পাতা, আগামীকালের পাতা, কোনটা যে কোনটা, তা আর ধরা যায় না।
এই ভাবনা আগেও ভেবেছ। আবারও ভাববে। আসলে হয়তো একটি মাত্র ভাবনাই আছে, আর তুমি বার বার সেটাতেই ফিরে আসো। ক্লান্ত করে, তবু ফেলে দেওয়া যায় না। মনে হয়, একটাই চিন্তা আছে, আর তুমি এই মুহূর্তেও সেটাই ভাবছ, আবারও ভাববে, আবারও…যতক্ষণ না ভাবা থামে। থামবে একদিন, নিশ্চয়ই। কিন্তু এখনই নয়। আজ রাতে নয়।
আজ রাতে ভাবা চলবে। ঘাস যেমন হাওয়ায় বাঁকে, ভাবনাও তেমনি বাঁকবে। তুমি বসে আছ সেই বাঁকা ঘাসের ভেতর, আর তোমার ভাবনা বাঁকছে তাদের সঙ্গে। রাতও যেন নিজের ভারে বাঁকছে। অন্ধকার বাঁকছে। শরীর বাঁকছে। তোমরা সবাই মিলে একই হাওয়ায় নড়ছ, যে-হাওয়া জানেই না, সে কী নাড়িয়ে দিচ্ছে। হয়তো সে-ও নিজে বাঁকছে, কিছু না জেনেই। সে শুধু হাওয়া হয়ে আছে, যেমন ছিল চিরকাল।
এই পাহাড় থেকে একদিন তুমি দিনের বেলায়ও দেখেছিলে, ধূসর আলোয়, নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে। শহর থেকে গ্রামের দিকে যে-পথ গেছে, সেখানে দুটি মানুষ হাঁটছিল। অথবা দু-জন বলে মনে হচ্ছিল।
এত দূর থেকে বোঝা যাচ্ছিল না, তারা পাশাপাশি কি না। একজন শহরের দিকে আসছিল, আরেকজন দূরে যাচ্ছিল, না কি দু-জনেই শহরের দিকে, কিংবা দু-জনেই দূরে, কিছুই স্পষ্ট ছিল না। দূরত্ব সব ইশারা মুছে দেয়। কে আসছে, কে চলে যাচ্ছে, তা আর বোঝা যায় না।
শুরুতে তারা ছিল অনেক দূরে, রাস্তার দুই প্রান্তে, যেখানে বাঁকটি শেষ বাড়িগুলো পেরিয়ে গিয়েছিল।
তারা হাঁটছিল, একে অন্যের দিকে, অথবা উলটো দিকে; এত দূর থেকে নিশ্চিত হবার উপায় ছিল না। বাঁদিকের মানুষটির হাতে ছিল বোধ হয় একটি লাঠি; সে পা টেনে টেনে এগোচ্ছিল, আর মাঝেমধ্যে লাঠির আগা মাটিতে ঠুকে উঠছিল। ডানদিকেরটির মাথায় ছিল যেন একটি টুপি, কাঁধে একটি ব্যাগ। তারা দু-জনেই ধূসর আলোয় রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল। ধীরে, স্বপ্নের মতো ধীরে, যেমন এই উপকূলের শহরে সব কিছুই ধীরে চলে, বিশেষত এমন ধূসর বিকেলে।
তারা একে অন্যের কাছে আসছিল, যদি সত্যিই “কাছে আসা” বলে কিছু থেকে থাকে। তুমি পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে নিশ্বাস আটকে দেখছিলে। আর ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে তাদের দেখা হবার কথা ছিল, যেখানে একজনের অন্যজনকে পাশ কাটাতে হতো, সামান্য সরে দাঁড়াতে হতো, ঠিক সেখানেই, দু-জনের কেউই নেই। যেন মাটি তাদের গিলে নিল। কেউ পাশ কাটাল না, কেউ সরে দাঁড়াল না, কোনো সাক্ষাৎ ঘটল না; হঠাৎ রাস্তায় আর কেউ নেই।
রাস্তা তখন ফাঁকা। এমন ফাঁকা, যেন তা চিরকালই ফাঁকা ছিল; যেন কোনোদিন কেউ সে-রাস্তা দিয়ে হাঁটেনি। যেন ওই দু-জন মানুষ রাস্তার নিজেরই একটি ক্ষণিক স্বপ্ন ছিল, কারণ রাস্তা তো ব্যবহৃত হবার জন্য, যাওয়া-আসার জন্য, পায়ের ধুলো নেবার জন্য; অথচ স্বপ্ন ফুরোলে সে আবার নিজের প্রাচীন শূন্যতায় ফিরে গেল।
আর তুমি ওপর থেকে নিচে তাকিয়ে রইলে, সেই বাঁক-নেওয়া রাস্তার দিকে, যা শেষ বাড়িগুলো পেরিয়ে গ্রামের দিকে হারিয়ে গেছে, যেখানে এখন আর কেউ আসে না, যায়ও না। যে দু-জন মানুষ একমুহূর্ত আগে ছিল, তারা আর নেই। হয়তো কোনোদিন ছিলই না।
তুমি বলতে পারো না, সত্যিই দেখেছিলে, না কি শুধু মনে হয়েছিল, তুমি দেখছ। চোখও তো প্রতারণা করে। তবু এর চেয়ে নিশ্চিত আর কিছু নেই বলে এই অস্পষ্টতাকেই মেনে নিতে হয়। কারণ শেষপর্যন্ত সব কিছুর মধ্যেই তো নিশ্চয়তার অভাব, আর অনিশ্চয়তাই বোধ হয় তোমার প্রকৃত বাসস্থান।
নিচে শহর। অল্প কয়েকটি আলো এখনও জ্বলছে। সেগুলিও ধীরে ধীরে নিভে আসছে।
কে জেগে আছে ওই আলোগুলোর আড়ালে? কেউ নিশ্চয়ই আছে। কী করছে, জানা যায় না, জানার উপায়ও নেই। জানলেও কিছু বদলাত না। হয়তো সে-ও চেয়ারে বসে আছে, জানালার ধারে, অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে, যেমন তুমি তাকিয়ে আছ, শুধু অন্য পাশ থেকে।
হয়তো সে ওপরে তাকাচ্ছে, পাহাড়ের দিকে, যেখানে তুমি। কিন্তু অন্ধকারে তো তোমাকে দেখা যায় না; দেখা যায় কেবল একটি ছায়া, পাহাড়ের গায়ে লেগে-থাকা আর-একটু গাঢ় অন্ধকার। তুমি নও, তোমার অনুপস্থিতির আকৃতি।
তবু হয়তো সে কিছু টের পায়। ঘাড়ের পেছনে হালকা সেই অনুভূতি, কেউ আছে কি নেই, বোঝা যায় না, তবু একধরনের উপস্থিতি, বা অনুপস্থিতির ভার, যা অন্ধকারেও টের পাওয়া যায়। কেউ আছে ওখানে, পাহাড়ে, বাঁকা ঘাসের মধ্যে; দেখছে কি না জানা নেই, তবু আছে।
তার জন্য শুভকামনা করতে ইচ্ছে হয়, অথবা কিছুই কামনা করতে ইচ্ছে হয় না। এখন এই দুটো প্রায় একই। শুভকামনা আর কিছু-না-কামনা দুটোই যেন সমান ফাঁকা। কারণ কামনা করার শক্তিটুকুও তো ধীরে ধীরে সরে গেছে। ইচ্ছার আগে, না পরে, তা আর মনে নেই; শুধু এতটুকু জানা আছে, গেছে।
ইচ্ছে, কামনা, চাওয়া, পরিকল্পনা। মানুষের ভিত গড়ে-তোলা চারটি পুরোনো উপাদান। একে একে চারটিই সরে গেছে। জীবন তাদের ওপর দাঁড়ায়; আর তারা চলে গেলে কী থাকে?
থাকে এইটুকু। এর বাইরে শূন্য। ঘাস। অন্ধকার। হাওয়া। নিচে শহর। আর তুমি…ছোটো ছোটো, ঠান্ডা, শিশির-ভেজা ঘাসে বসে, নিচের আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে আছ, যেখানে কেউ জেগে আছে।
সে যা করছে, তুমি আর তা করো না। সে যা, তুমি আর তা নও। তোমার আর তার মাঝখানে আছে কেবল এই পাহাড়, আর অন্ধকার।
আর শহরের ওপারে, অন্যদিকে, সমতল ভূমি প্রসারিত হয়ে আছে; ঘুমন্ত কোনো পশুর পিঠের মতো, দীর্ঘ, নিঃশব্দ, অন্ধকার। এমন অন্ধকার যে, আকাশ আর মাটির ভেদরেখা মুছে যায়। তখন মনে হয়, অন্ধকারও কি একধরনের রং নয়? ধূসর যেমন রং, তেমনি রঙের অভাবও হয়তো এক গভীরতর রং। সবচেয়ে সৎ রং, কারণ সে নিজেকে সাজায় না। সেই রংহীন রং জমির ওপর ছড়িয়ে আছে।
আর সেই সমতলে যেন কিছু আছে। কী, তা স্পষ্ট বোঝা যায় না। অন্ধকার বেশি, দূরত্বও বেশি। তবু একটি অনুভব থেকে যায়, ওখানে কিছু আছে।
আবারটুকুই জীবন: দশ
লেখাটি শেয়ার করুন