গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: তেরো



ঘনতা। এটিই আলাদা করে। দেয়াল নয়, নিছক ফাঁকও নয়, শুধু দূরত্বও নয়। বরং মাঝখানের সেই অদৃশ্য পদার্থ, যা তোমার আর অন্যের মধ্যে, তোমার আর সমস্ত কিছুর মধ্যে জমে ওঠে। অনেক দিন বসে থাকলে, অনেক দিন না নড়লে, এমনকি বাতাসও ঘন হয়ে যায়। তখন বাতাস আর ফাঁকা ফাঁকা থাকে না; তা পদার্থে পরিণত হয়, এমন এক মাধ্যমে, যার ভেতর দিয়ে নড়তে গেলে জোর লাগে, হাত বাড়াতে শক্তি লাগে, যা আগে লাগত না।

চলার দিনে এই ঘনতার কথা টের পাওনি। তখন তুমি যথেষ্ট বেগে এগিয়ে যেতে, যেমন নৌকা জল কেটে চলে, আর দুই পাশে ঢেউ সরে যায়। কিন্তু এখন, এতদিন থেমে বসে থাকতে থাকতে, ঘনতা জমেছে চারপাশে। যেমন পাথরের গায়ে পলি জমে। নড়ার জায়গা ক্রমেই কমে এসেছে। যদি আবার কখনো নড়া আসে, তা হবে ধীর, ভারী; ঘনতা তাকে বাধা দেবে। ধূসরের মতোই এই ঘনতা তোমাকে ঘিরে আছে। তুমি এখন যেন ঘনের মধ্য দিয়েই শ্বাস নিচ্ছ।

পায়ের নিচের তলটাও অদ্ভুত। সামান্য বসে যায়, একটু নেমে আসে, তবু শেষপর্যন্ত ধরে রাখে। তাই তুমি সাবধানে হাঁটো। প্রতিটি পা রাখা যেন পরীক্ষা। প্রতিটি পদক্ষেপে তুমি তলকে প্রশ্ন করো, ধরবে? তল উত্তর দেয়, এই মুহূর্তে ধরব। পরের মুহূর্তে কী হবে, তা সে বলে না। প্রতিটি পা নতুন প্রশ্ন, নতুন উত্তর। হ্যাঁ। হ্যাঁ। হ্যাঁ। এতক্ষণ পর্যন্ত সে তোমাকে ধরে রেখেছে।

তবু তুমি জানো, কোথাও-না-কোথাও একদিন উত্তরটি “না” হবে। নিশ্চয়ই কোথাও একটি সীমা আছে। এক পা-র পর আর-এক পা, তারপর এমন এক পা, যেখানে তল আর সায় দেবে না।

সেই না-র পরে তুমি দেবে যাবে। তলদেশে নেমে যাবে, যেখানে পড়ে-যাওয়া জিনিসেরা জমা থাকে। নাম, মুখ, সম্পর্ক, সুতো, ভাঙাচোরা সমস্ত কিছু, যা কোনোদিন টিকে থাকেনি, সবই যেন নিচে জমে আছে। আর একদিন তুমিও সেখানে যাবে, যদি খুব দূর পর্যন্ত হাঁটো, যদি সেই একটিমাত্র পা এসে পড়ে, যার জন্য তল বলে…না।

কিন্তু থামাও-বা কী করে? পা তো থামে না। পায়ের নিজের এক হিসেব আছে; তুমি তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারো না। সে একের পর এক এগিয়ে চলে, অন্ধভাবে। এক। আর-এক। আর-এক। সেই চূড়ান্ত না-র দিকে, যা কোথাও তলদেশে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। ধৈর্য ধরে, নিশ্চুপ।

আর তারপরই জেগে ওঠো। ঠিক চূড়ান্ত দেবে যাবার আগে। সেই না-র আগেই। যেন তলদেশ শেষপর্যন্ত অজানাই থেকে যায়, যেমন থাকার কথা।

জেগে উঠে বুঝতে একটু সময় লাগে, তুমি আবার তোমার ঘরেই আছ। ওপরে ছাদ। সেই পুরোনো দাগ, মানুষের মুখের চেয়েও বেশি পরিচিত। মুখ ভুলে গেছ, দাগ ভুলোনি। দেয়াল, জানালা, ধূসর আলো, দূরের সমুদ্র, সব তাদের জায়গায় আছে।

তুমি ফিরে এসেছ, যদিও আদৌ কোথাও গিয়েছিলে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে। স্বপ্নের ভাষায় তুমি অনেক দূর গিয়েছিলে; ঘরের ভাষায় এক চুলও সরোনি। দুটো কথাই একসঙ্গে সত্যি, আবার দুটোই অসম্পূর্ণ। যেন প্রত্যেকে নিজ নিজ আধ-সত্য বলছে, বেশি জানার ভান না করে।

সরু বিছানায় শুয়ে থাকো, চিৎ হয়ে, অথবা কাত হয়ে। স্বপ্নের শেষ চিহ্নগুলো ধীরে ধীরে গলে যায়। যেমন চিনির দানা গরম চায়ে মিলিয়ে যায়, চোখে আর দেখা যায় না, তবু স্বাদ বদলে দেয়। স্বপ্নও তেমনি। সে সরে যায়, কিন্তু ঘরের স্বাদ বদলে যায়, দিনেরও।

কিছু-একটা তোমার ভেতর দিয়ে গেছে। কী, তা ঠিক বলে উঠতে পারো না। করিডোর, হাত, তল, প্রশ্ন আর উত্তর, ঘনতা, অন্য। সব মিলেমিশে এক অনির্দিষ্ট ছাপ হয়ে থাকে। ছিল। এখন নেই। তবু তার রেশ রয়ে গেছে। মুখে, মনে, আর সেই ভেতরের দর্শকের কাছে, যে বসে সব দেখে।

এটিই স্বপ্নের আসল অবশিষ্ট, স্বপ্ন নিজে নয়, তার স্বাদ। যেমন ঘণ্টা থেমে যাবার পরও কানজুড়ে তার প্রতিধ্বনি বাজতে থাকে।

তাই মাঝে মাঝে চেয়ারে বসে নিজেকেই গল্প বলার চেষ্টা কোরো। স্বপ্ন আর স্যুপের মাঝামাঝি এক ধূসর ঘণ্টায়। আসল গল্প নয়, কারণ আসল বলে হয়তো কিছু নেই। বরং বানানো গল্প। সময় কাটানোর জন্য। ফাঁক ভরানোর জন্য। এক শূন্য আর পরের শূন্যের মাঝখানে যে অল্প ব্যবধান, সেটুকু সামাল দেবার জন্য।

ধরো, একটা মানুষ আছে। একটি ঘরে। সমুদ্রের ধারে। সে থেমে গেছে। বসে আছে। ধূসরের দিকে তাকিয়ে। তাকে চেনা বলে মনে হয়, অথচ সে তুমি কি না, তা-ও নিশ্চিত নও। যেন তোমারই একটি খসড়া রূপ। তোমার চেয়ে সরল, কম জটিল, কম ভাঙা; এমন এক সত্তা, যার মধ্যে এখনও কোনো দর্শক আলাদা হয়ে বসে নেই, কোনো ফাঁক তৈরি হয়নি। সে শুধু বসে আছে। জানা ছাড়া, বিচ্ছেদ ছাড়া, ব্যাখ্যা ছাড়া।

তুমি তাকে নিয়ে একটি গল্প বলতে চাও। শুরু থেকে বলতে পারো না, কারণ শুরু নেই। শেষ থেকে বলতে পারো না, কারণ শেষও নেই। মাঝখান থেকে বলতে গিয়েও আটকে যাও, কারণ মাঝখানও কোথাও স্থির হয়ে নেই। গল্পের কোনো নির্দিষ্ট গড়ন নেই। না বাঁক, না উত্থান, না চূড়া, না নিষ্পত্তি। আছে শুধু এইটুকু: একটা মানুষ ঘরে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। পুরো গল্প কি তবে এইটুকুই?

তবু গলা থামে না। বলার মতো কিছু নেই, তবু বলবার তাড়না ছাড়ে না। কারণ হয়তো অর্থ দিয়ে নয়, শুধুই আওয়াজ দিয়ে, চেষ্টা দিয়েই কিছু ফাঁক ভরাট হয়। অর্থ তো বহু আগেই সরে গেছে; কিন্তু আওয়াজ এখনও রয়ে গেছে। খুলির ভেতর গলা জ্বলে, যেন খুলি এক লণ্ঠন, আর গলা তার শিখা। তেল ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছে, তবু শিখা নেভে না; সে বলে যেতে চায়, এমন কিছু, যা বলা যায় না।

হয়তো এইটুকুই যথেষ্ট, চেষ্টা। বলা তো অনেক আগেই অসম্ভব হয়ে গেছে; কিন্তু বলার চেষ্টা এখনও চলে। শ্বাসের মতো। হৃৎস্পন্দনের মতো। নিছক চালিয়ে যাবার মতো।

একটি গল্প আছে, যা বার বার ফিরে আসে। অন্য সব গল্পের চেয়ে বেশি। চেয়ারে বসে তুমি বহুবার ঘরকে সেই গল্প বলতে চেয়েছ। গল্পটি শুরু হয় এভাবে: শোনো, একটি মানুষ ছিল।

ছিল, এইটুকু ধরে নিতে হয়। সে হামাগুড়ি দিয়ে এসেছে। পেটে ভর দিয়ে। ধরো, ক্রিসমাসের রাতে, যদিও ক্রিসমাস তোমার কাছে কিছু অর্থ বহন করে না, গল্পের কাছেও না। বরফের মধ্য দিয়ে এসেছে, অথবা ধূসরতার মধ্যে দিয়ে। আসলে কীসের মধ্যে দিয়ে, তা তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সে এসেছে। তার শিশুর জন্য রুটি চাইতে এসেছে। শিশুটি কোনো এক অন্য ঘরে, একটু একটু করে মরছে। এই ঘর নয়, আর-একটি ঘর; সেখানে উষ্ণতা নেই, কেটলি নেই, কাপ নেই, চা নেই, কিছুই নেই।

সে হামাগুড়ি দিয়ে এসেছে রুটি চাইতে। আর গল্পে তুমি সেই মানুষ, যার কাছে সে এসেছে। যেমন এখন চেয়ারে বসে আছ, জানালার ধারে। গল্পের ভেতরেও তুমি চেয়ারে বসে আছ। লোকটি এসে মেঝেতে শুয়ে পড়ে, এবং শিশুর জন্য রুটি চায়। তুমি ওপর থেকে নিচে তাকাও, চেয়ার থেকে, মেঝেতে, তার দিকে, তার চাওয়ার দিকে।

এবং ঠিক এইখানেই গল্প থেমে যায়।

সবসময়। বার বার। এই একই জায়গায় এসে। তুমি চেয়ার থেকে নিচে তাকিয়ে আছ, আর তার চাওয়ার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গল্প আর এগোয় না। কোনো উত্তর আসে না। তুমি জানো না, কী বলবে। হয়তো কোনো উত্তরই নেই। হয়তো কোনোদিন ছিলও না।

লোকটি রুটি চাইছে। শিশুর জন্য। তুমি নিচে তাকিয়ে আছ। তারপর গল্প ভেঙে যায়। আবার শুরু হয়। শোনো, একটি মানুষ হামাগুড়ি দিয়ে এসেছিল। আবার এসে দাঁড়ায় সেই একই জায়গায়: চাওয়া। নিচে তাকানো। নীরবতা। উত্তরহীনতা।

হয়তো এটাই একমাত্র গল্প। যে চায়, আর যে উত্তর দিতে পারে না। যে মেঝেতে পড়ে অনুনয় করে, আর যে চেয়ারে বসে তাকিয়ে থাকে, জানে না, কী দেবে, কী বলবে, আদৌ তার দেবার কিছু আছে কি না। গল্প কখনো চাওয়ার পরে এগোয় না, কারণ চাওয়াটাই গল্প। উত্তর নয়। সাধারণ নিয়মে। গল্পের প্রকৃত স্বরূপই এই চাওয়া; উত্তর তার ধর্ম নয়।

আর বাকি গল্পগুলো? তারা তো এতদূরও পৌঁছতে পারে না। চাওয়ার জায়গা পর্যন্তও নয়। তারা শুরুই হতে পারে না।

তবু গলা চেষ্টা করে। খুলির ভেতরের অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ায়, কোনো এক গল্পের মাথামুণ্ডু ধরতে। যে-কোনো একটি। কোথায়, যদি কোথাও? পা কোথায় যেত, যদি পা মনে রাখত? কে, যদি কেউ থাকত? মুখ কেমন হতো, যদি মুখ মনে রাখত? কী? যদি কিছু বলা যেত? যদি সব কিছু পাথরের নীরবতা আর ধূসরের ভারে ভরে না থাকত?

গলা খুলির ভেতর এইসব প্রশ্নই করতে থাকে। আর শেষপর্যন্ত প্রশ্নই উত্তর হয়ে ওঠে। যে-গলা জানতে চাইছে, পা কোথায় যেত, তার নিজের কোনো পা নেই। যে-গলা মুখের কথা বলছে, তার মুখও নেই। তবু সে জিজ্ঞেস করছে। আর জিজ্ঞেস করাই তার বলা। প্রশ্নই তার উত্তর। কারণ যে-গলা আর কোথাও যেতে পারে না, সে-ও চলতে থাকে। খুলির অন্ধকারের মধ্যে, পা ছাড়া, মুখ ছাড়া, শুধু গলা হয়ে। জিজ্ঞেস করতেই থাকে। কারণ জিজ্ঞেস করা ছাড়া আর কিছুই তার অবশিষ্ট নেই।

আর যা সে বলে, তা শেষপর্যন্ত শূন্যেরই ভাষা। গলা শব্দ বানায়, শূন্যের জন্য, শূন্যকে ঘিরে, শূন্যের দিকে। সেই শব্দ কোথাও পৌঁছয় না। কোনো স্পষ্ট শুরু নেই, কোনো নিশ্চিত গন্তব্য নেই, কোনো সমাপ্তিও নেই।

হঠাৎ গলা বলে ওঠে, না। অবশেষে, না। জানার কিছু নেই। কোনোদিন ছিলও না। নীরবতার ভেতরে জানবার মতো কিছু নেই। তবু চলা চলছে। শূন্য সত্ত্বেও। বরং না থাকার কারণেই।

কিন্তু এই উচ্চারণগুলোও তো আসল শুরু নয়। এগুলো সেই ব্যর্থ শব্দ, যা বেরিয়ে আসে, যখন শুরু করা যায় না। গল্প ধরতে পারা যায় না। প্রথম শব্দ দ্বিতীয় শব্দে পৌঁছয় না। ঘরের মানুষটি উঠে দাঁড়ায় না, দরজার দিকে যায় না, দরজা খোলে না, বাইরে বেরোয় না।

গলা চেষ্টা করে। মানুষটিকে বেরোতে বলে, সে বেরোয় না। তাকে বলতে বলে, সে বলে না। মনে করতে বলে, সে মনে করে না। কোনো আহ্বানেই নড়ে না সে।

তখন গলা, একবার ব্যর্থ হয়ে, আবার চেষ্টা করে। আবার যেন শুরু থেকে শুরু করতে চায়, যদিও সেখানে কোনো শুরু নেই। যা আছে, তা শুধু শুরু করার চেষ্টা। শুরুর চেষ্টার পুনরাবৃত্তি। আবার চেষ্টা। আবার। শব্দের পর শব্দ, শূন্যের দিকে ছুড়ে দেওয়া, শূন্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা, খুলির ভেতর সেই চেষ্টার আওয়াজে ভরে ওঠা।

এ এক অদ্ভুত প্রয়াস: যা শুরু করা যায় না, তাকে শুরু করার চেষ্টা; যা বলা যায় না, তাকে বলার চেষ্টা; এমন এক উচ্চারণের চেষ্টা, যার নিজস্ব ভাষা নেই। তবু শব্দ আসে। একের পর এক জমে ওঠে, যেমন টেবিলের ওপর দাগ পড়ে, তার ওপর আবার দাগ; যেমন ধূসরের ওপর আর-এক স্তর ধূসর জমে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *