গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: চৌদ্দ



এই শব্দগুলো কোথাও যায় না। কোনো অর্থও তৈরি করে না। তবু তারা থামে না। গলা চলতে থাকে। চেষ্টা চলতে থাকে। শূন্যও চলতে থাকে। মনে হয়, শূন্য নিজেই তার শব্দ চাইছে। তার ব্যর্থ সূচনা, তার অসম্পূর্ণ গল্প। তার সেই মানুষদের শব্দ চাইছে, যারা কখনও ঘর ছেড়ে বেরোয় না।

তাই গলা কাজ করে যায়, অন্ধকারে। কারও উদ্দেশে নয়, তবু শব্দ তৈরি করে। শূন্যের জন্য। যেন এ-ই তার ধর্ম।

সাধারণ নিয়মে। গলার নিয়মে। যার বলার কিছু নেই, তবু সে বলে; যার থামার কারণ আছে, তবু সে থামে না। বার বার, শব্দের পর শব্দ, শূন্যের জন্য। কাউকে নয়, অন্ধকারে।

তবু সে চলে। তবু। সাধারণ নিয়মে।

৮।

শরীর। এই একটিমাত্র জিনিসকে ঘিরেই কত বিপুল জট। দর্শনের নিজস্ব গোলকধাঁধা আছে, কিন্তু তার চেয়েও কঠিন রোজকারের ঝামেলা। শরীর তার দাবিদাওয়া নিয়ে প্রতিদিন হাজির হয়। যেন এক মহাজন; জীবন ধার দিয়েছে, আর সে তার সুদ তুলছে প্রতিদিন। আসলটুকু সে কোনোদিন ফেরত পাবে না; মৃত্যু কেবল খাতা বন্ধ করে দেয়।

আসলে দেনা শোধ হয় না, কারণ সত্যিকার কোনো দেনাই ছিল না, পুরোটাই যেন একধরনের প্রাচীন জালিয়াতি। শরীর আর জীবনের মধ্যে যে-চুক্তি, তা কেউ কোনোদিন পড়ে দেখেনি। একদিন সকালে ঘুম ভেঙে তুমি দেখলে, শরীর আছে। কেউ তোমাকে জিজ্ঞেস করেনি, তুমি এটা চাও কি না। দিয়ে দিয়েছে। এখন সামলাও। আর ফেরত দেবার অফিস বহুদিন আগেই বন্ধ।

ঝামেলা হলো, শরীরকে চালিয়ে রাখতে হয়। তার খাবার লাগে, জল লাগে, উষ্ণতা লাগে, বাতাস লাগে, ঘুম লাগে, আলো লাগে। এগুলো ছাড়া সে চলে না। শরীর তার দাবি জানায় নির্মমভাবে। ক্ষুধা এলে পেট মোচড় দেয়, তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়, ঠান্ডায় কাঁপুনি ওঠে। শিশুর মতো জেদ ধরে, না দিলে বিদ্রোহ করে। এইসব চাহিদা নিয়ে কোনো দর-কষাকষি চলে না।

তুমি চেষ্টা করেছিলে, বিশেষ করে থেমে-যাওয়ার পর, শরীরকে বোঝাতে যে, চাওয়ার দিন শেষ, লাগার দিন শেষ, তুমি প্রয়োজনের সওদা থেকে অবসর নিয়েছ। কিন্তু শরীর অবসর শব্দটাই বোঝে না। সে তার পুরোনো আইনেই চলে। ক্ষুধা মানে খাও। তৃষ্ণা মানে পান করো। ঠান্ডা মানে শরীর ঢাকো। এর বাইরে শরীরের কোনো ভাষা নেই। এই নিয়ম বাতিল করার ক্ষমতা তোমার নেই, কারও নেই।

শরীর নিজেই আইন, নিজেই শাস্তি। তুমি মানতে বাধ্য। না মানলে কী হবে? ব্যথা। শরীরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রহরী হলো ব্যথা। সে কোনো তর্ক মানে না। যে-কোনো যুক্তির চেয়ে সে শক্তিশালী। ব্যথা বলে, খাও। ব্যথা বলে, পান করো। সেখানে আলোচনার অবকাশ থাকে না।

এ-ই হলো তোমার আর শরীরের চুক্তি। কেউ বেছে নেয়নি। জন্মের আগেই যেন তাতে স্বাক্ষর হয়ে গেছে। তুমিও বাছোনি, শরীরও নয়।

তাই তুমি খাও। পাহাড়ের নিচে, বন্দরের কাছে একটি জায়গা আছে, সেখানে খাবার মেলে। একটি কাউন্টার, আর তার পেছনে একটি মেয়ে। তাকে দেখলে মনে হয়, সে যেন এক তীর থেকে আরেক তীরে মানুষ পার-করে-দেওয়া মাঝি। তোমার নাম সে জানে না, মুখ চেনে। আপাতত এইটুকুই যথেষ্ট। সপ্তাহে তিনদিন, কিংবা চিরকালই, প্রায় একই জিনিস। একটি বাটিতে ধোঁয়া-ওঠা কিছু, যাকে স্যুপ বলা যায়; এক টুকরো রুটি; এক গ্লাস জল; কখনো হয়তো চা।

স্যুপে বোধ হয় শালগম থাকে, অথবা গাজর, শেকড়-সবজি, যারা মাটির নিচে জন্মায়। তাদের মুখ কেউ দেখে না। তারা অন্ধকারে বড়ো হয়, তোমার মতো, তোমার ভাবনার মতো, এমন সব সত্তার মতো, যাদের বেঁচে থাকার জন্য সরাসরি আলো লাগে না।

শালগম আলো চায় না, এমনকি আলোকে চেনেও না। সে অন্ধকার মাটির ভেতর নিজের পথ নিজে ঠেলে বানায়। অন্ধভাবে, চোখ ছাড়া, জানা ছাড়া। শালগম যেন চালিয়ে যাবার সবচেয়ে নির্মম, সবচেয়ে শুদ্ধ রূপ, মাটির নিচে পোঁতা অস্তিত্বের গোপন অগ্রগতি।

তুমি স্যুপে শালগম খাও, আর অদ্ভুতভাবে মনে হয়, শালগম তোমার শরীরে এসে ‘তুমি’ হয়ে যাচ্ছে, আবার তুমিও ‘শালগম’ হয়ে যাচ্ছ। যেন দেহের কোনো গভীর অন্ধকার কারখানায় সব কিছু অন্য কিছুর মধ্যে রূপান্তরিত হয়; কোনো অনুষ্ঠান ছাড়া, কোনো অনুমতি ছাড়া। শালগম তো চায়নি তোমার শরীর হতে; তুমিও চাওনি শালগম হতে। তবু হয়ে যায়। অন্ধকারে।

এখন চেয়ার যে-মানুষটিকে ধরে আছে, সে-ও তো এক অর্থে শালগমের তৈরি। রুটির। স্যুপের। কলের জলের। ভাবলে প্রায় হাসিই পায়। এখন তুমি আসলে কী? শালগমের মানুষ। রুটির মানুষ। স্যুপ আর কলের জলের গড়া এক শরীর।

ভাবনার তৈরি নও তুমি, যদিও ভাববার দিনে এ কথা মানা কঠিন ছিল। মনে হতো, মানুষ তার চিন্তার দ্বারা গড়া। কিন্তু শরীর তো চিরকালই, যা খায়, তারই তৈরি। চেয়ার এখন যাকে ধরে রেখেছে, সে এক শেকড়-সবজি-নির্মিত মানুষ, ধূসরের দিকে তাকিয়ে আছে। মন এই কথায় আহত হয়, অপমানিত বোধ করে। কিন্তু শরীর তা বহু আগে থেকেই জানত।

আসলে বড়ো সব পরিবর্তন অন্ধকারেই ঘটে। তোমার না জানায়, তোমার সম্মতি ছাড়াই।

আর খেতে খেতে কখনো তলদেশ থেকে কিছু জেগে ওঠে। মুখ চলছে। চোয়াল নড়ছে। তুমি গিলছ। আর শরীরের গভীর থেকে উঠে আসে বহু পুরোনো খাওয়ার স্মৃতি। গলা মনে রাখে। জিভ মনে রাখে। পেটও তার নিজস্ব স্মৃতি ধরে রাখে।

একবার। চলার দিনের কথা, থেমে যাবার আগের। তুমি একটি লবস্টার কিনেছিলে। ধরো, দুপুরের খাবারের জন্য। তোমার জন্য, বা অন্য কারও জন্য। সে-সব এখন আর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়। দোকান থেকে কাগজে-মোড়া অবস্থায় বগলের নিচে চেপে তুমি বাড়ি নিয়ে এলে। তারপর রান্নাঘরে এসে, টেবিলের ওপর কাগজ খুলে রাখতেই…ওটা নড়ল।

তুমি চমকে উঠেছিলে। লবস্টার নড়ছে।

কাগজের ওপর। টেবিলের ওপর। এতক্ষণ ধরে সে জীবিত ছিল। তুমি জানতে না। দোকান বলেনি। কাগজ বলেনি। বগলের নিচে অনুভূত ভারও বলেনি। তবু লবস্টারটি জীবিত ছিল। এখন সে টেবিলে নড়ছে। তার পা নড়ছে, শুঁড় নড়ছে, কালো চোখদুটো ডাঁটার মাথা থেকে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। তুমি ওপর থেকে নিচে তাকিয়ে আছ, সে নিচ থেকে ওপরে। রান্নাঘরে, দু-জনের মধ্যে এক স্তব্ধ চোখাচোখি।

আর তখন চুলোর ওপর হাঁড়ি ফুটছে। টগবগ করে। সেই লবস্টারের জন্য অপেক্ষা করছে, যে এখনও জীবিত।

ঠিক তখনই প্রশ্নটি আসে, যে-প্রশ্ন তুমি আগে জিজ্ঞেস করোনি, কারণ জিজ্ঞেস করলেই উত্তর জানা হয়ে যায়। আর উত্তরটি ভয়াবহভাবে সহজ: হ্যাঁ, এই জীবিত লবস্টারকে, একেবারে জীবিত অবস্থায়, ফুটন্ত জলে ফেলতে হবে। সে আর জীবিত থাকবে না। তাকে দুপুরের খাবার হতে হবে।

“জীবিত”। শব্দটি বোধ হয় তুমি বলেছিলে, অথবা অন্তত মনে মনে শুনেছিলে। কিন্তু গলায় এসে তা আটকে গিয়েছিল।

হাঁড়ি ফুটছে। লবস্টার নড়ছে। আর তুমি দাঁড়িয়ে আছ তাদের মাঝখানে। একটি জ্যান্ত জিনিস আর একটি ফুটন্ত জিনিসের ঠিক মধ্যবর্তী স্থানে।

সম্ভবত প্রতিটি রান্নাঘরের নীরব গোপন সত্য এটাই। প্রতিটি দুপুরের খাবারেরও। অন্তত সেইসব খাবারের, যাদের অস্তিত্বের জন্য কোনো-না-কোনো মৃত্যু প্রয়োজন। স্যুপে শালগম লাগে, তাতে আর্তনাদ নেই। গাজর টেবিলে নড়ে না, চোখ তুলে তাকায় না। কিন্তু লবস্টার? লবস্টার জীবিত ছিল।

তবু তাকে হাঁড়িতে ফেলা হয়েছিল। হাঁড়ি যেমন চায়, মানুষ তেমনই ফেলে দেয় তার ভেতর। কোনো অনুমতি ছাড়া, যে ঢুকবে, তাকে না জিজ্ঞেস করেই। লবস্টার ঢুকল, আর জীবিত রইল না। দুপুরের খাবার হয়ে উঠল। খাওয়া হলো। তারপর ভুলে যাওয়া হলো।

এতদিন পর, চেয়ারে বসে, ধূসরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, সেই স্মৃতি আবার তলদেশ থেকে উঠে আসে। লবস্টার, যে জীবিত ছিল। এখন নেই। তুমি যেমন জীবিত, একদিন তুমিও থাকবে না। সব জীবিতেরই এই পরিণতি।

সাধারণ নিয়মে। জীবিতের নিয়মে। যা একদিন খাওয়া হয়ে যায়, গিলে নেওয়া হয়, পৃথিবীর দুপুরের খাদ্যে পরিণত হয়। যেন পৃথিবী নিজেই এক অনন্ত ক্ষুধা, যার হাঁড়ি চিরকাল ফুটছে, কোনোদিন থামে না।

আরেকদিন, কাউন্টারের কাছে, অথবা কাছাকাছি কোথাও, একজন লোক এলো। তুমি নও, অন্য কেউ। মোটা মানুষ। তার গলার শব্দে যেন পুরো ঘর ভরে গেল। তার কণ্ঠ কাউন্টারের চেয়ে বড়ো, মেয়েটির চেয়ে বড়ো, স্যুপের চেয়ে বড়ো হয়ে ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। শব্দ দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল, ফিরে এল, আবার ছড়াল।

সে বসল। জায়গা করে নিল। আর খেতে শুরু করল।

স্যুপ নয়, একটি গোটা মুরগি।

মেয়েটি রান্নাঘর থেকে এনে দিল। মোটা মানুষটি মুরগিটি খেল হাত দিয়ে, দাঁত দিয়ে, মুখ হাঁ করে। শব্দ করতে করতে। থুতনিতে তেল চকচক করছে, আঙুলে চর্বি, প্লেটে একের পর এক হাড় জমছে। চুষে-নেওয়া, সাদা, উন্মোচিত, মৃত অবশেষের মতো। আর তুমি তোমার সামনে পাতলা স্যুপ নিয়ে বসে আছ, না চেয়েও দেখা হয়ে যাচ্ছে, সে মুরগি খাচ্ছে।

খাওয়া শেষ হলে প্লেটটি হাড়ের স্তূপে ভরে গেল। মাংস তার শরীরের ভেতরে চলে গেছে, যেখানে এখন তা আরেক দেহের কারখানায় কাজ শুরু করবে। আর প্লেটে পড়ে রইল হাড়, সাদা; কোথাও কোথাও সামান্য মাংস লেগে আছে, যা সে চায়নি, তার দরকারের বেশি, অতিরিক্ত, ফেলে দেবার মতো।

আর তখনই, তুমি না চেয়েও, প্রায় শরীর দিয়ে ভেবেছিলে, এই হাড়গুলোর কথা। এই ছেঁড়া টুকরোগুলোর কথা। এই বাড়তির কথা। যা মালিকের দরকার নেই, যা ঠেলে সরিয়ে দেওয়া হলো। আর একমুহূর্তের জন্য তোমার ইচ্ছে হয়েছিল…এই এঁটো, এই হাড়, এই অবশিষ্টাংশ পেতে।

হয়তো চেয়েছিলে। অল্প। মাত্র একমুহূর্তের জন্য।

চাওয়ার ক্ষমতা সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যাবার আগে যেমন শেষবার কেঁপে ওঠে, তেমন।

হাড়ের প্রতি সেই ক্ষণিকের আকাঙ্ক্ষা, এঁটোর প্রতি সেই লঘু টান, তা শুধু ক্ষুধার নয়। বরং এমন এক জীবনের আকৃতি, যা আর নেই। এ এমন এক মুরগির প্রতি আকর্ষণ নয়, যা আর কখনও খাওয়া হবে না; বরং এমন এক ভেতরের শূন্যতার প্রতি, যে বহুদিন আগেই ক্ষুধা ভুলে গেছে। তুমি প্রায় চেয়েছিলে, কিন্তু পুরো চাওনি। কারণ চাওয়াও তো একধরনের কাজ, আর কাজ করা তুমি প্রায় বন্ধই করে দিয়েছ। এঁটো চাওয়াও থেমে গেছে।

এখন খাওয়ানো চলে অন্য নিয়মে। সপ্তাহে তিনদিন সেই কাউন্টার। আর বাকি দিন বিস্কুট। শক্ত, নির্লিপ্ত, না মিষ্টি, না নোনতা। প্যাকেট থেকে বের হয়ে টেবিলে পড়ে থাকে, চায়ের পুরোনো দাগের পাশে।

ধরো, পাঁচটি বিস্কুট আছে। প্রতিটি আলাদা। হয়তো বাদামি, হয়তো সাদা, হয়তো ক্রিমি, হয়তো ডাইজেস্টিভ, হয়তো অন্য কিছু। তুমি বাছোনি। তোমার হয়ে বেছে দেওয়া হয়েছে। কারখানা, দোকানদার, যে-ই বাছুক।

তুমি রোজ একটি করে খাও। কিন্তু কোনটি আগে? একসময় এ-ও সমস্যা ছিল। যখন সমস্যা মাথায় জায়গা পেত। যখন জিনিসের ক্রম মানে বহন করত। তখন প্রশ্ন উঠত, কোন বিস্কুটটি আগে খাওয়া উচিত?
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *