গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: আঠারো



ফাঁকের উদ্দেশ্য ছিল তার নিজস্ব বিলোপ। যেমন সুরের মাঝের নীরবতা আসলে গানের জন্য, তারার মাঝের অন্ধকার আলোর জন্য, তেমনি তোমার ভেতরের ফাঁকও বোধ হয় ছিল এইজন্য, যাতে একদিন তা রোদমাখা এক মুখের দিকে তাকিয়ে, নলবনের জলের ওপর, মুহূর্তের জন্য বন্ধ হতে পারে। তুমি হয়ে উঠতে পারো অখণ্ড। দর্শক আর দৃশ্য নয়, ভাগ আর প্রতিভাগ নয়, সেই চিরন্তন দুই-এক-এ বিভক্ত অবস্থা নয়; বরং শুধু এক। যেমন পাথর এক, যেমন গাঙচিল এক, যেমন পৃথিবীর অন্যান্য নির্বাক জিনিস এক, যাদের মধ্যে ফাঁক নেই।

তুমি অখণ্ড ছিলে। অল্পক্ষণ। ছোটো চ্যাপ্টা নৌকোয়, নলবনের মধ্যে। আর তোমার জানবার কোনো উপায়ই ছিল না যে, এ-ই শেষবার।

তারপর শেষ হয়ে গেল। ফাঁক ফিরে এল। দর্শক জেগে উঠল। তুমি উঠে বসল। নৌকোটি নলবন ছেড়ে খোলা জলে বেরিয়ে এলো, আর হাওয়া হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। সেই মেয়েটি, যার নাম এখন তলিয়ে গেছে, কিছু-একটা বলেছিল। তুমি হয়তো শুনতে পাওনি, অথবা শুনেছিলে, কিন্তু ভুলে গেছ। হয়তো সেখানেই শুরু হয়েছিল শেষ। যে-সুতো পরে ছিঁড়ে যাবে, অথবা হয়তো সেই সময়েই, অদৃশ্যভাবে ভেতরে ভেতরে, ছিঁড়তে শুরু করেছিল, যখন তুমি নলবনের মধ্যে, দর্শকের ঘুমের সুযোগে, শেষবারের মতো অখণ্ড ছিলে।

শেষবার কখনও নিজেকে শেষবার বলে পরিচয় দেয় না। সে আসে ছদ্মবেশে। পরিচিত মুখে, সাধারণ পোশাকে, অন্য সব বিকেলের মতোই। সে বলে না, এই দেখো, এ-ই শেষ। ছোটো চ্যাপ্টা নৌকোর সেই বিকেলও তেমনি এসেছিল। যে-কোনো সাধারণ বিকেলের বেশে। আর বহু পরে, মাস কেটে, বছর কেটে, ঘরে বসে, চেয়ারে, ধূসরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তুমি ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছ, নলবনের সেই বিকেলই ছিল ফাঁক বন্ধ হবার শেষ বিকেল। অখণ্ড হবার শেষ মুহূর্ত।

তারপর থেকে প্রতিটি বিকেল, প্রতিটি কাপ চা, প্রতিটি ধূসর সকাল, প্রতিটি বসে থাকা। সবই সেই শেষবারের পরের সময়। দীর্ঘ, অনন্তপ্রসার এক বিকেল, যার সন্ধে আর নামে না। অখণ্ডতার পর ভাঙনের পথে চলা, আর বোধ হয় এটাই একমাত্র পথ, যা তোমার জন্য বাকি ছিল।

তবু তুমি তাকে “মিস” করো না। কাউকে মিস করতে গেলে স্পষ্ট স্মৃতি লাগে। মুখ লাগে, গলার স্বর লাগে, নির্দিষ্ট উষ্ণতা লাগে। সেগুলো তোমার কাছে আর নেই। আছে শুধু একটি বোধ, যেমন ফসল-কেটে-নেওয়া মাঠে নাড়া পড়ে থাকে, আর বোঝা যায়, এখানে একসময় কিছু ছিল। এখন বাতাস। শুধু বাতাস।

বাতাস সব ফাঁকেই ঢুকে পড়ে। তার কোনো সংকোচ নেই। সে এসে পুরোনো অনুপস্থিতির আকৃতি ধরে। যেমন দেয়াল থেকে একটি ছবি নামিয়ে নিলে, কিছুদিন সেই ফ্রেমের ছাপ থেকে যায়। চারপাশ রোদে ফিকে হয়, কিন্তু যেখানে ছবিটি ঝুলছিল, সেখানকার রং অন্যরকম থেকে যায়। পেরেকও রয়ে যায় প্লাস্টারে। তুমি তাকালে বুঝতে পারো, এখানে কিছু ছিল।

কিন্তু তুমি তাকাও না। সমুদ্রের দিকে তাকাও। কারণ সমুদ্রের মধ্যে এমন কোনো হালকা দাগ নেই, এমন কোনো খালি জায়গা নেই, যা বলে, এখানে একসময় কিছু ছিল। সমুদ্রের ওপর কিছু ঝোলানো ছিল না, নামিয়েও নেওয়া হয়নি। সে সর্বত্র একই। ধূসর, বিস্তৃত, সমতল। তার স্মৃতি নেই। তাই তার হারানোও নেই।

সমুদ্র কিছু ভোলে না, কারণ সে কিছু মনে রাখেও না। এই গুণটিই তুমি চাও। সমুদ্রের সেই স্মৃতিহীনতা। তার বিশাল উদাসীনতা নিজের অতীতের প্রতি। প্রতিটি ঢেউ তার কাছে প্রথম ঢেউ। গতকালের ঢেউ সে মনে রাখে না। প্রতিটি ধূসর সকাল তার কাছে প্রথম ধূসর। সমুদ্রের টেবিলে কোনো দাগ নেই, ছাদে কোনো চিহ্ন নেই, তলায় কোনো নাম ডুবে নেই।

সমুদ্র মুক্ত। তার কোনো ঋণ নেই। সে মুক্ত সব কিছু থেকে, যে-সব কিছু থেকে তুমি এখনও মুক্ত নও। অর্থাৎ, প্রায় সব কিছু থেকেই।

১০।

মা।

অনেক দিন তুমি তাকে ভাবোনি। মাথায় আসেনি। আসার দরকারও হয়নি। কারণ মা সেই ধরনের উপস্থিতি নন, যাকে আলাদা করে মনে করতে হয়। তিনি এমন এক সত্তা, যিনি ভাবলে আছেন, না ভাবলেও আছেন। ভাবনার ওপর নয়, ভাবনার নিচেও নয়, আরও গভীরে, এমন এক স্তরে, যেখানে চিন্তা পৌঁছোনোর আগেই মায়ের উপস্থিতি শুরু হয়ে যায়। বাতাসের মতো। দেখা যায় না, তবু ছাড়া যায় না। অথবা তারও আগে। মাটি। তুমি গাছ।

গাছ কি রোজ মনে রাখে মাটির কথা? শেকড় কি আলাদা করে স্মরণ করে সেই অন্ধকারকে, যার ভেতর থেকে সে জল টেনে নেয়? হয়তো মনে রাখা শেকড়ের কাজ নয়। দাঁড়িয়ে থাকা, বেড়ে ওঠা, মাটি থেকে লুকিয়ে পাওয়া খাদ্যে বেঁচে থাকা, এইটুকুই তার কাজ।

মা যে একদিন মারা গিয়েছিলেন, এ কথা তুমি জানো। কিন্তু কখন, কীভাবে, থামার আগে না পরে, তা আর স্পষ্ট নয়। আগে-পরে সব জট পাকিয়ে গেছে। ক্রমের দড়ি খুলে গিয়ে গিঁট হয়ে আছে, যেমন সেই সুতোটির কথা মনে পড়ে, বা করিডোরের স্বপ্নের মতো মনে হয়, যেখানে দিক আর ধারাবাহিকতা বলে কিছু থাকে না।

মা মারা গিয়েছিলেন কোনো এক ঘরে। এই ঘর নয়। অন্য একটি ঘর। হয়তো হাসপাতাল। এমন এক জায়গা, যেখানে মানুষকে ঘিরে থাকে নল, যন্ত্র, সাদা চাদর, ওষুধের গন্ধ, ফিনাইলের তীব্রতা। যেখানে শরীরকে নিয়ে যাওয়া হয়, যখন নিচের কারখানা বিকল হতে শুরু করে, আর ভেতরের অন্ধকার ধীরে ধীরে ওপরের আলোয় উঠে আসে। অথবা হয়তো বাড়িতেই। সেটাও এখন আর নিশ্চিত নয়।

তুমি সেখানে ছিলে কি না, তা-ও স্পষ্ট মনে নেই। স্মৃতি এটুকুও গিলে ফেলেছে। নামের সঙ্গে, সুতোর সঙ্গে, ঘরের আগেকার জীবন, চেয়ারের আগেকার চলা, ধূসরের আগেকার আলো। সব কিছুর সঙ্গে।

তবু মা আলাদা। মেয়ের থেকে আলাদা। বন্ধুদের থেকে আলাদা। অন্য সবার থেকে আলাদা। কারণ বাকিরা এসেছিল পরে। মা-ই প্রথম তোমাকে এনেছিলেন। অন্ধকার থেকে আলোয় ঠেলে দিয়েছিলেন। তুমি কেঁদে এসেছিলে; পৃথিবী তোমাকে ডাকেনি, কিন্তু মা ডেকেছিলেন। পৃথিবী হয়তো তোমাকে চায়ইনি; মা চেয়েছিলেন।

মা তাই একধরনের দরজা। প্রথম দরজা। হয়তো শেষ দরজাও। ভারী, একদিকে খোলা, মরচে-ধরা, অনিবার্য। তুমি সেই দরজা দিয়ে এসেছিলে। তারপর থেকে আর ফিরে যাবার পথ নেই। কারণ মা আরও গভীরে। সবসময়ই সেই গভীরে, যার ভেতর দিয়ে তুমি এসেছ, কিন্তু যার ভেতরে আর ফিরে যেতে পারো না।

তোমার আসার আগে ছিল উষ্ণ অন্ধকার। সেই উষ্ণতা, যার পরেই শুরু হলো শীতল আলো। মা-ই সেই মধ্যবর্তী সীমানা। তাই কোনো কোনো মুহূর্তে মনে হয়, এই সমগ্র অস্তিত্বের জন্য, এই ঘর, এই চেয়ার, এই ধূসরতা, এই থেমে থাকা, এই না-থেমে-থাকার যন্ত্রণা, এই খুলির ভেতরের গলা, চোখের পেছনের দর্শক, সব কিছুর জন্য মা-ই দায়ী। “দায়ী” শব্দটি হয়তো কঠিন; তবু অন্য কোনো শব্দও সহজে আসে না। কারণ এই সব কিছুর সূত্রপাত তো তাঁরই মধ্য দিয়ে।

তিনি তোমাকে বানিয়েছিলেন। ইচ্ছে করে কি না, তা জানা নেই। হয়তো তিনি অন্য কিছু আশা করেছিলেন। একটি চলমান জীবন, একটি কার্যকর অস্তিত্ব, এমন একজন মানুষ, যে চলবে, করবে, বাঁচবে, এবং তিনি থেমে যাবার পরেও নিজের গতিতে এগিয়ে যাবে। তিনি বোধ হয় এই চেয়ারে বসে থাকা, এই একাকী তাকিয়ে-থাকা, এই ধূসর জীবনের মানুষটিকে কল্পনাও করেননি।

তারপর তিনি নিজেই থামলেন। সেই অন্য ঘরে, যন্ত্রের পাশে। অথবা বাড়িতে, নিজের চেয়ারে, নিজের জানালার ধারে, নিজের ধূসরের দিকে তাকিয়ে। কারণ মায়েরও তো ধূসর ছিল। সবারই থাকে। তার ধূসর তোমার ধূসরের মতো ছিল না, তবু ধূসর ছিল। নিজস্বভাবে, অপরিহার্যভাবে।

তিনি থামলেন। তুমিও থেমে গেলে।

তফাত শুধু এইটুকু, তার থামা ছিল চূড়ান্ত; তোমার থেমে থাকাটাই আবার চলতে থাকল। তার শেষের পরে তুমি থেকে গেলে। যেন সেই একই চেয়ারে, যেখানে বসার অভ্যাস তিনি তোমাকে দিয়ে গেছেন; সেই একই জানালার সামনে, যেটি তিনি কোনো একদিন তোমার জন্য খুলেছিলেন। সেই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে, যেটাকে তুমি নিজে চেনার আগেই তিনি হয়তো আঙুল তুলে দেখিয়ে বলেছিলেন, ওই দ্যাখো।

মা। যিনি তোমাকে বহন করেছিলেন প্রথম অন্ধকারে, উষ্ণ অন্ধকারে, সেই অঞ্চলে, যেখানে তুমি আর তিনি আলাদা ছিলে না। তখন তুমি তার অংশ ছিলে, যেমন জল সমুদ্রের অংশ, আলাদা নয়। বিচ্ছেদের আগের ঐক্য। আর তারপর এল জন্ম। প্রথম বিচ্ছেদ, প্রথম দরজা, একবার খুলে চিরকালের মতো বন্ধ-হয়ে-যাওয়া দরজা।

এখন তিনি আছেন ওপারে। সেই দরজার ওপাশে। দ্বিতীয় অন্ধকারে। সেটিও উষ্ণ কি না, তুমি জানো না। জানতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজে সেখানে পৌঁছোও। যদি পৌঁছোও। যখন পৌঁছোবে।

সাধারণ নিয়মে।

যাওয়াই নিয়ম। সব কিছু যায়।

মা তোমার আগে গেছেন, যেমন সব কিছুতেই তিনি তোমার আগে ছিলেন। দরজায়, আলোয়, চলায়, থামায়। সব কিছুর আগে। পথ দেখিয়ে। মায়েরা যেমন দেখায়। এমনকি মৃত্যুতেও। হয়তো বিশেষ করে মৃত্যুতেই। তিনি আগে গেছেন, যেন সেখানেও পথ দেখিয়ে রাখেন। তুমি একদিন আসবে, সময় হলে; যদি সময় হয়; যখন সময় হবে।

তুমি তার জন্য শোকও করো না। শোকের জন্য একটি “আগে” লাগে, একটি “পরে” লাগে। দুটি আলাদা সময়, দুটি আলাদা অবস্থা। তোমার আর সেসব নেই। তোমার কাছে এখন আর অবস্থা বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। আছে শুধু ঘর, চেয়ার, ধূসরতা। মা-ও সেইসব জিনিসের সঙ্গে নেমে গেছেন তলায়। নামের সঙ্গে, সুতোর সঙ্গে, ইচ্ছের সঙ্গে। যেখানে সব কিছু গিয়ে জমা হয়, যখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। মা-ও সেখানে। সব কিছুর মতোই, ভেঙে পড়ে।

একদিন তুমিও পড়বে। যখন তল বলবে, না। যে-পা-টি বেশি দূর যাবে, যে-পা-টি অনুমতির সীমা ছাড়াবে, সেই পা-র পরে তুমিও নিচে নেমে যাবে। সেখানে, যেখানে মা আছেন। যেখানে নাম আছে। যেখানে সব কিছু আছে, যা এখানে নেই। অর্থাৎ, প্রায় সবই।

তবু স্মৃতি এই নিয়ম মানে না। নিজের ইচ্ছেমতো, অতর্কিতে, সে তলা থেকে জিনিস তুলে পাঠায়। মা-কে নয় সবসময়। কখনো পাঠায় সেই শিশুটিকে, তুমি যে-শিশু ছিলে মায়ের সময়ে, থেমে যাবার অনেক আগেরও আগে। সবচেয়ে আদি, সবচেয়ে গরম, সবচেয়ে ঝাপসা সময়। যেন তখনও গর্ভের উষ্ণতা পুরো কাটেনি, পৃথিবী সদ্য শুরু হয়েছে, আর সব কিছু প্রথমবার ঘটছে।

একটি ঝোপ ছিল। ধরা যাক, বাগানে। আর সেই ঝোপের মধ্যে ছিল একটি ছোটো প্রাণী। গোল, কাঁটায় ঢাকা। কাঁটাচুয়া। রাস্তার ধারে কুঁকড়ে থাকা একটি ছোটো গোলক, বোঝা যায় না, ভয়ে গুটিয়েছে, না ঘুমে। বাইরে কাঁটা, ভেতরে নরম প্রাণ। তোমার মতোই। বাইরে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা, ভেতরে কাঁচা অংশ।

কাঁটাচুয়া আর তুমি। দু-জনেই যেন একই সমস্যার দুই রূপ। কাছে যেতে দিলে ব্যথা দেয়। নিয়ম এটাই। কে বানিয়েছে, কেউ জানে না। কিন্তু সবাই মানে।

তুমি তাকে পেয়েছিলে ঝোপের মধ্যে, বাগানে। বাগানটি মায়ের ছিল, অথবা বাবার, অথবা কারওই ছিল না। এখন আর তাতে কিছু আসে যায় না। কাঁটাচুয়াটি কুঁকড়ে ছিল, বিছানায় তোমার মতোই। একই রকম গোল হয়ে। একই রকম ভয়ের ভঙ্গিতে। যেন ভ্রূণের আকার, যে নিজেকে রক্ষা করে কাঁটা বাইরে রেখে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *