গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: সতেরো



চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে তুমি এই সত্যিটা বুঝেছিলে। যদিও তোমার আগেই আরেকজন, নির্বাসন, অসুস্থতা ও একাকিত্বের ভেতর থেকে, স্মৃতি সম্পর্কে লিখতে লিখতে এই কথার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবু আবিষ্কারটি শেষপর্যন্ত তোমার কাছে নতুন মনে হয়েছিল, কারণ প্রতিটি মানুষকে নিজের শূন্যতার ভেতর দিয়েই স্মৃতির প্রকৃতি চিনতে হয়।

স্মৃতি বোধ হয় দুই রকম। এক, ইচ্ছেয় ডাকা যায় যে-স্মৃতি, মানে ইচ্ছে-স্মৃতি। আর দুই, না ডেকেও হঠাৎ এসে পড়ে যে-স্মৃতি, মানে অনিচ্ছে-স্মৃতি। প্রথমটি প্রায় মৃত; দ্বিতীয়টি এখনও জীবিত। আর সম্ভবত একমাত্র সেই দ্বিতীয়টিরই কোনো সত্যিকারের মানে আছে।

ইচ্ছে-স্মৃতি ডাকলে আসে, কিন্তু কিছু ফেরত দেয় না। সে কোনো অনুভূতি নিয়ে আসে না, নিয়ে আসে শুধু তথ্যের কঙ্কাল। দিন নয়, তারিখ। মুখ নয়, নাম। স্পর্শ নয়, বিবরণ। যেন মৃতদের আলমারি থেকে তুলে আনা কিছু ঠান্ডা বস্তু; পরিপাটি, কিন্তু প্রাণহীন।

অনিচ্ছে-স্মৃতি তার উলটো। তাকে ডাকলে সে আসে না; বরং না ডাকলে, একেবারে অপ্রস্তুত মুহূর্তে, অতর্কিতে এসে আঘাত করে। কোনো গন্ধে, কোনো স্বাদে, কোনো বিশেষ আলোর ভঙ্গিতে। আর সে খবর নিয়ে আসে না, অনুভূতি নিয়ে আসে। তারিখ নয়, দিনটাকেই নিয়ে আসে। নাম নয়, মুখটাকে। কাগজ নয়, ঘটনাটির তাপ, গন্ধ, ওজন, দেহ। তার নিজের উপস্থিতি।

এ কারণেই অনিচ্ছে-স্মৃতিই একমাত্র আসল স্মৃতি। একমাত্র সে-ই জিনিসটাকে তার নিজের শরীরে স্পর্শ করে। কাগজের প্রতিবেদন হিসেবে নয়, চিন্তার পুনর্গঠন হিসেবে নয়, বরং যেমন ছিল, তেমন। সেই আলোতে, সেই বিছানায়, সেই ঘরে, সেই ঘনিষ্ঠতার তাপ নিয়ে।

তবু সেই প্রত্যাবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অনিচ্ছে-স্মৃতি আসলটাকে স্পর্শ করে মাত্র একঝলক, যেন বিদ্যুতের ক্ষণিক দীপ্তি। তারপরই তা সরে যায়। তার জায়গায় ফিরে আসে ইচ্ছে-স্মৃতি। তার হিমশীতল তাক, তার পরিপাটি শ্রেণিবিন্যাস, তার মৃত সংগ্রহশালা নিয়ে। তখন আসল অভিজ্ঞতাটি আবার আড়ালে চলে যায়; অবশিষ্ট থাকে কেবল তার অনুজ্জ্বল প্রতিলিপি, নকলেরও নকল, যার ওপর সময় ধীরে ধীরে ধুলো জমায়।

চেয়ারে বসে, ধূসরের দিকে তাকিয়ে তুমি এই পার্থক্য বুঝেছ। ইচ্ছে-স্মৃতি প্রায় মরে গেছে; বেঁচে আছে শুধু অতর্কিত আক্রমণ। কিন্তু সেই আক্রমণও পূর্ণ নয়। হঠাৎ কোনো গন্ধ, হঠাৎ কোনো শব্দ, হঠাৎ কোনো বিকেলের বিশেষ আলো এসে যা নিয়ে আসে, তা সম্পূর্ণ স্মৃতি নয়; স্মৃতির একটি টুকরো মাত্র। ভাঙা আয়নার খণ্ডের মতো। একফালি উষ্ণতা। কোনো তলের চাপ। যেন কারও হাত, বা পিঠ, বা পাশে কোনো শরীরের ভার। এমন এক বিছানার অনুভূতি, যা এই বিছানা নয়। এমন এক ঘর, যা এই ঘর নয়।

তুমি হাত বাড়ানোর আগেই সেটি সরে যায়। ভাবনা তার কাছে খুব ধীর। দর্শক পুরোটা দেখতে পাবার আগেই টুকরোটি এসে চলে যায়। শুধু একটি স্বাদ রেখে, ঘণ্টা থেমে যাবার পরের রেশের মতো।

তখন তুমি সরু বিছানায় এই ঘরে পড়ে থাকো, মুখে সেই স্বাদ নিয়ে, যা আসলে স্বাদ নয়। বরং চামড়ার তলায় এক হালকা দহন, এক দূরাগত কম্পন, মৃত তারার আলোর মতো, যার উৎস আর নেই। স্মৃতি যেন মৃত আলো। তা এখনও পৌঁছয়, বহু পরে, উৎস নিভে যাবার বহু পরেও। যেমন পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে মৃত নক্ষত্রের আলো চোখে পড়ে, তেমনি বহু আগের, লুপ্ত ঘর, লুপ্ত উষ্ণতা, লুপ্ত উপস্থিতি এখনও এসে লাগে তোমার ভেতরে।

স্মৃতি অনেক আগে রওনা হয়েছিল। এমন এক জায়গা থেকে, যা এখন আর নেই। এমন এক ঘর থেকে, যা বিলুপ্ত। এমন এক উষ্ণতা থেকে, যা আর পৃথিবীতে নেই। তবু সেই আলো এসে পড়ে তোমার ক্লান্ত চোখে, চেয়ারে বসে-থাকা তোমার ভেতরে। আর একমুহূর্তের জন্য মৃত জিনিসগুলি আবার বেঁচে ওঠে। পৃথিবীতে নয়, তোমার মধ্যে।

এইভাবেই স্মৃতি আসে। সাধারণ নিয়মে। মৃত আলোর নিয়মে, যে-আলো জানেই না, তার উৎস অনেক আগে নিভে গেছে।

সে। যার কথা মনে পড়ছে, এখানে নেই। যেখানেই থাকুক, এখানে নয়। এই ঘরে নয়, এই শহরে নয়, এই উপকূলে নয়। সে আছে অন্য কোথাও। আর “অন্য কোথাও” তো প্রায় গোটা পৃথিবীই, এই ঘরটুকু বাদে সবখানেই। যা নেই, শেষপর্যন্ত তা-ই সবচেয়ে বেশি থাকে। যা এই চেয়ার নয়, এই সমুদ্র নয়, এই ধূসরতা নয়, তা-ই সর্বত্র। আর হয়তো সে এখনও মানুষের মতোই মানুষের কাজ করছে। যাওয়া, করা, চাওয়া, ইচ্ছে করা, যে চারটি ক্রিয়া তুমি অনেক আগেই থামিয়ে দিয়েছ।

সে কি থেমেছে? তুমি জানো না। জানার উপায়ও নেই। কাচে কুয়াশা জমেছে, নাম ডুবে গেছে, সংযোগ ভেঙে গেছে, যদি আদৌ কোনো সংযোগ থেকে থাকে। ছিল কি? মনে হয়, ছিল। মনে হওয়াটুকুই অবশিষ্ট।

তবে টানটা মনে আছে। যেন একটি সরু সুতো ছিল, তোমার শরীর আর অন্য একটা শরীরের মধ্যে। অদৃশ্য, কিন্তু স্পষ্ট। দূরে গেলে টান বাড়ত, কাছে এলে ঢিলে পড়ত। টানলে ব্যথা করত। দেখা যেত না, কিন্তু টের পাওয়া যেত।

বহুদিন সেই সুতোটিকে অনুভব করেছিলে। তারপর একদিন। দেখলে, সুতো আর নেই।

কবে ছিঁড়ল, তা জানো না। শুধু জানো, নেই।

আর শরীরে যেখানে তা একসময় বাঁধা ছিল, সেই জায়গাটিও মসৃণ হয়ে গেছে। কোনো দাগ নেই। চামড়া সেরে উঠেছে। যেন কোনোদিন কোনো সুতোই ছিল না। যেন টান ছিল কল্পনা, সংযোগ ছিল স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে তুমি আবার এই ঘরেই ফিরে এসেছ, যেখানে সুতো নেই, টান নেই, কেন্দ্র নেই। আছে শুধু ঘর, চেয়ার, সমুদ্র, ধূসরতা।

তবু স্মৃতি সবসময় নিয়ম মেনে আসে না। হঠাৎ আসে। অতর্কিতে। মাঝে মাঝে সমুদ্রের আলো এক বিশেষ রকমের হয়ে উঠলে। চেনা ধূসর নয়, অন্য কিছু; কখনো একটু হালকা, কখনো একটু ঘন, কখনো এমন এক ঝিলিক, যা সাধারণত টিকে থাকে না, ঠিক তখনই স্মৃতি ঢুকে পড়ে। তুমি ডাকোনি। কেবল আলোর কোণ বদলেছে, আর তার সঙ্গে সঙ্গে অতীত এসে ভেতরে নেমেছে।

তখন মনে পড়ে। নৌকার আগের দিনগুলো, নলবনের আগের দিনগুলো, শুয়ে পড়ার আগের দিনগুলো। তখন ছিল একটি কবরস্থান। সেখানে যেতে, মৃতদের জন্য নয়, একটি বেঞ্চের জন্য। মৃতদের মধ্যে বসে থাকা একধরনের শান্তি ছিল। কবরগুলোর মাঝখানে একটি বেঞ্চ ছিল, নাম আর তারিখখচিত সমাধিফলকের ভেতরে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে বসে থাকতে, কেবল তারিখ পড়তে, জন্ম আর মৃত্যুর ফারাক কষতে। যেন জীবনকে শেষপর্যন্ত নামিয়ে আনা যায় একটি বিয়োগে।

জন্ম ১৮৯২, মৃত্যু ১৯৪১; উনপঞ্চাশ। জন্ম ১৮৮৭, মৃত্যু ১৯৫৩; ছেষট্টি। এইভাবে সংখ্যা উঠে আসত। মৃতদের অঙ্ক। কবরস্থানের বেঞ্চে বসে, মৃত্যুকে বিয়োগ করে, জীবনকে একটি মাত্র সংখ্যায় নামিয়ে আনা। আর বাইরে থেকে দেখলে জীবন বোধ হয় সত্যিই এইটুকুই, দুটি তারিখের মাঝের ব্যবধান। একটি সংখ্যা, যা মাথায় রাখা যায়, পাথরে লেখা যায়, বেঞ্চে বসে বিয়োগ করা যায়। উনপঞ্চাশ। ছেষট্টি। তিয়াত্তর। মৃতদের সংখ্যা, জীবিতদের সংখ্যাও শেষে তা-ই। তুমিও একদিন তাদেরই দলে যোগ দেবে, যখন তোমার সংখ্যাটি পূর্ণ হবে। তোমার পাথরের সামনে বসেও কেউ হয়তো বিয়োগ কষবে। তোমাকে না-চেনা, তোমার মধ্যিখানের জীবন সম্পর্কে কিছুই না-জানা কেউ। সে জানবে কেবল দূরত্বটুকু, সংখ্যাটুকু। মাঝখানে কী ছিল, কেমন ছিল, তা কোনোদিন জানবে না।

আর সেই কবরস্থানেই, সেই বেঞ্চের আশেপাশে, প্রথম দেখেছিলে তাকে। সেই মেয়েটিকে, যার নাম পরে ডুবে যাবে অতলে। সে-ও ছিল মৃতদের মধ্যে। তোমার মতোই, হয়তো বেঞ্চের জন্য, হয়তো নীরবতার জন্য, হয়তো এমন কোনো নিজের কারণ নিয়ে, যা আজ আর মনে নেই। সে বসেছিল, অথবা দাঁড়িয়েছিল, অথবা সমাধিফলকের ফাঁকে হাঁটছিল। হয়তো সে-ও তারিখ পড়ছিল। হয়তো সে-ও জন্ম আর মৃত্যুর মাঝখানের অঙ্ক কষছিল।

আর সেখানেই প্রথম কিছু নড়ে উঠেছিল ভেতরে। তাকে ভালোবাসা বলবে কি না, তা নিশ্চিত নও; ‘ভালোবাসা’ শব্দটি বোধ হয় পরে আসে। প্রথমে আসে নড়া। ভেতরে এক অদ্ভুত টান। কোনো অদৃশ্য সুতোর প্রথম কাঁপুনি। যে-সুতো পরে জুড়বে, আবার কোনোদিন ছিঁড়বেও।

অদ্ভুত, যদি অদ্ভুত বলা যায়, প্রথম ভালোবাসা শুরু হয়েছিল মৃতদের মধ্যে। যারা থেমে গেছে, চলে গেছে, বিয়োগ শেষ করে পাথরে নেমে এসেছে, তাদের ভেতরেই। যেন ভালোবাসা এসে শুরু হয়েছিল ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে বাকি সব শেষ হয়ে গেছে। কবরস্থানে। বেঞ্চে। ধূসরের মধ্যে।

তারপর সরু ভাসান নৌকো। হ্রদ। নলবন। ঝাউপাতার ছায়া। জলের হালকা ছলছল শব্দ, যেন কাঠের গায়ে আঙুলের ডগা দিয়ে কেউ টোকা মারছে। নৌকো প্রায় নড়েই না, শুধু পালকের ওজনের মতো সামান্য দুলে ওঠে। আর সে, ধরো, সেই মেয়ে, চিৎ হয়ে শুয়ে আছে সরু ভাসান নৌকোর তলায়। তার চুল জলে প্রায় ভেসে আছে। আকাশ তার চোখে উলটো হয়ে ধরা পড়েছে। হাতে লেগে আছে নলবনের গন্ধ।

সে কথা বলছে না। নড়ছেও না। কিছু করছে না। শুধু শুয়ে আছে। মুখে উষ্ণ রোদ এসে পড়েছে। জল ধীরে ধীরে ছলছল করছে। নলবন সামান্য হাওয়ায় দুলছে। আর তুমি নিচু হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছ। মুখে রোদ, চোখে আকাশ, আর সেই চোখ যেন একই সঙ্গে তোমার দিকেও তাকিয়ে আছে, আকাশের দিকেও, ওপরে ফাঁকা বিস্তারের দিকেও।

তুমি সরু ভাসান নৌকোটিকে আরও ভেতরে ভাসতে দিয়েছিলে, নলবনের গভীরে, ঝাউয়ের ছায়ায়, যেখানে জল আরও অন্ধকার, আরও স্থির, আরও গভীর। তারপর তুমিও তার পাশে শুয়ে পড়েছিলে। ভাসান নৌকোর তলায়। আর তখন নৌকো নড়ছিল জলের সঙ্গে, জল নড়ছিল হাওয়ার সঙ্গে, হাওয়া নড়ছিল আরেক অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে। তোমরা দু-জনও নড়ছিলে। সব কিছুর সঙ্গে, একই তালে, না ভেবে, না বেছে, সিদ্ধান্ত না নিয়ে।

সেই মুহূর্তে যেন কোনো ফাঁক ছিল না। দর্শক, যে সবসময় বাইরে বসে দেখে, সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। অথবা এক বারের জন্য সরে গিয়েছিল। আর তখনই, ঠিক ঘুমের কিনারায়, সেই বিরল মুহূর্তে সবচেয়ে সত্যি কথাটি মনে এসেছিল। কিন্তু সকালে আর তা মনে থাকেনি। কারণ দর্শক আবার জেগে উঠেছিল, অথবা আসলে কখনও ঘুমোয়ইনি। তবু একবার, একমাত্র একবার, মনে হয়েছিল, সে সরে গেছে। আর তখন বাকি ছিল শুধু শুয়ে থাকা। নৌকোয়, নলবনের ভেতর, জলের ওপর, রোদের মধ্যে, সেই মেয়েটির পাশে।

এটাই সেই স্মৃতি, যা ফিরে আসে কেবল তখনই, যখন সমুদ্রের আলো এক বিশেষ রকমের হয়ে ওঠে। মাত্র এক বারের স্মৃতি। সেই একমুহূর্ত, যখন ফাঁকটি বন্ধ হয়েছিল, দর্শক ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর তুমি অখণ্ড হয়েছিলে। অল্প সময়ের জন্য, ছোট চ্যাপ্টা নৌকোয়, নলবনের ভেতর।

তখন তুমি জেনেছিলে, যদিও জানতেই পারোনি যে, জানছ, ফাঁক আসলে চিরকাল ধরে কী লুকিয়ে রেখেছিল। নিজের না থাকার সম্ভাবনা। বিচ্ছেদের ভেতরে লুকিয়ে-থাকা অবিচ্ছেদের সম্ভাবনা। ফাঁক বোধ হয় ছিলই শুধু এজন্য, যাতে কোনো একদিন, কোনো একমুহূর্তে, তা বন্ধ হতে পারে। ছোট চ্যাপ্টা নৌকোয়, নলবনের ভেতর, এমন এক মেয়ের পাশে, যার নাম তুমি একদিন ভুলে যাবে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *