গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: উনিশ



তখন তুমি ছোটো। হাতও ছোটো। তুমি হাত বাড়িয়েছিলে তার দিকে। আর সঙ্গে সঙ্গে কাঁটা বিঁধেছিল। ছোটো, ধারালো ব্যথা। আঙুলে একবিন্দু রক্ত। তুমি হাত টেনে নিয়েছিলে। সেই টান আজও হাতের ভেতর কোথাও রয়ে গেছে। ছোট্ট সেই দংশন, প্রথম রক্তফোঁটা। পৃথিবী সম্পর্কে সম্ভবত প্রথম শিক্ষা।

যার দিকে হাত বাড়াও, সে-ই ব্যথা দিতে পারে। হাত যা ছুঁতে যায়, সেটাই কখনো কাঁটা হয়ে ফুটে ওঠে।

সেইদিনই শিখেছিলে। ঝোপের মধ্যে। বাগানে। মায়ের সময়ে। আর তারপর থেকে যেন তুমি ধীরে ধীরে পৃথিবী নামক কাঁটাচুয়াটির দিক থেকে হাত সরিয়ে নিয়েই চলেছ।

আরেকটি স্মৃতি আছে। একটি গাছ। ছোটোবেলার। তুমি গাছে উঠেছিলে। উঠতে উঠতে একেবারে মাথায় পৌঁছে গিয়েছিলে। তারপর নিচে তাকিয়ে দেখেছিলে, মাটি অনেক দূরে। মাথা ঘুরে গিয়েছিল। হাত শক্ত করে ডাল চেপে ধরেছিল। নিচে বাবা, বা আর কারও গলা। বলছে, নামো।

তুমি নামোনি। নামতে চাওনি।

তুমি থেকে গিয়েছিলে ওপরে। ডালের মাথায়, বাকি সবার ওপরে, বাতাসে। মাটির ওপরে, বাগানের ওপরে, ঝোপের ওপরে, কাঁটাচুয়ার ওপরে। একা। কতক্ষণ? হয়তো ঘণ্টাখানেক। আর যিনি ডাকছিলেন, তিনিও একসময় চলে গিয়েছিলেন। তখন তুমি আরও একা হয়ে গিয়েছিলে।

কারণ ওঠা যত সহজ মনে হয়, নামা তত সহজ নয়। বরং সবসময়ই কঠিন। উঠতে উঠতে শুধু বোঝা যায়, কতটা উঠেছ। তাতে উৎসাহ থাকে। কিন্তু নামতে গেলে বোঝা যায়, মাটি কত দূরে। আর তখনই প্রকাশ পায় ওঠার প্রকৃত রূপ। নামা হলো ওঠার সত্য, যা ওঠা নিজে লুকিয়ে রাখে। কারণ ওঠা অনেক সময় মাটি থেকে পালাতে চায়; নামা তাকে আবার ফিরিয়ে আনে।

নামার সময় হাঁটু ছড়ে গিয়েছিল, হাতের তালু আঁচড়ে গিয়েছিল। গাছের বাকল তার কর আদায় করেছিল নামতে-থাকা শরীরের কাছ থেকে, যেমন পৃথিবী তার ভেতর দিয়ে যাওয়া প্রতিটি শরীরের কাছ থেকে কর নিয়ে থাকে। সেই আঁচড় ধীরে ধীরে সেরে গিয়েছিল; চামড়া মসৃণ হয়ে উঠেছিল আবার। কিন্তু স্মৃতি সারেনি। সারবেও না। গাছের স্মৃতি, উচ্চতার স্মৃতি, নিচে তাকানোর মাথা-ঘোরা ভয়, যে বলেছিল, “নামো”, আর তারপর চলে গিয়েছিল। এসব রয়ে গেছে তলায়, সেই গভীর স্তরে, যেখানে কাঁটাচুয়া আছে, মা আছেন। সব প্রথম জিনিস অন্ধকারে এখনও ফুঁসছে, চিরকাল।

বাবা। যিনি বলেছিলেন, “নামো”, যিনি চলে গিয়েছিলেন। এক বার নয়, বার বার। চলে যাওয়াই যেন তার স্বভাব ছিল। আসার চেয়ে যাওয়াই বেশি করেছেন তিনি। তার যাওয়া প্রথমে ধরা পড়ত না। আস্তে আস্তে সরে যেতেন। একসময় তাকিয়ে দেখা যেত, নেই। কখন গেলেন, ঠিক বোঝা যেত না।

শুধু পিঠটা মনে আছে। দূরে যেতে যেতে ছোটো-হয়ে-যাওয়া পিঠ। পিঠ ফেরানো তার কাছে সহজ ছিল, মুখ দেখানোর চেয়ে। আজ মুখটা ঝাপসা; কুয়াশায় মিশে গেছে, অন্য মুখগুলোর সঙ্গে একাকার হয়েছে। মেয়ের মুখের সঙ্গে, সময়ে হারানো সব মুখের সঙ্গে। কিন্তু পিঠ রয়ে গেছে। চওড়া পিঠ। হয়তো কালো কোটে ঢাকা। চলে যাচ্ছে।

কোথা দিয়ে? কোনো পথ ধরে। বাগানের পথ, অথবা রাস্তা, অথবা সেই বাড়ির করিডোর, যে-বাড়ি এই ঘরের আগেকার। তুমি ছোটো হয়ে পেছনে দাঁড়িয়ে আছ, আর পিঠটা দূরে সরে যাচ্ছে। সে ছোটো হচ্ছে বলে নয়, তোমার আর তার মাঝের দূরত্ব বাড়ছে বলে। সে পা ফেলে ফেলে দূরত্ব বানাচ্ছে, আর এক বারও ঘুরে তাকাচ্ছে না।

এই না ঘোরা ছিল শিক্ষা। কাঁটাচুয়ার পর দ্বিতীয় শিক্ষা। কাঁটাচুয়া শিখিয়েছিল, যার দিকে হাত বাড়াবে, সে তোমাকে ব্যথা দেবে। বাবার পিঠ শিখিয়েছিল, যার দিকে হাত বাড়াবে, সে চলে যেতে পারে।

তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে। পথে, একা। পিঠটা ছোটো হতে হতে একসময় পথের শেষে মিশে যাচ্ছিল। হয়তো কোনো দরজায়, হয়তো কোনো রাস্তায়, হয়তো কেবল অন্ধকারে। তুমি তাকে ডাকোনি। শিশু হয়েও ডাকোনি। গলায় হয়তো শব্দ ছিল, তবু ডাক ওঠেনি। যেন আগে থেকেই জেনেছিলে, ডাকলে সে ঘুরবে না। কারণ কিছু কিছু পিঠ ঘোরার জন্য নয়।

আসলে সেই পিঠ শুধু শরীরের এক দিক ছিল না। একটি ভাষা ছিল। পূর্ণাঙ্গ ভাষা, যার ব্যাকরণ আছে, কিন্তু শব্দ নেই। মুখ ছাড়া বলা, কণ্ঠ ছাড়া ঘোষিত হওয়া। সেই পিঠ বলত, আমি যাচ্ছি। ফিরে তাকাব না। আর বলত, যাকে পেছনে ফেলে যাচ্ছি, তার দিকে ঘুরে দেখার দরকার নেই। আরও বলত, যা ফেলে যাচ্ছি, তা আমার ঘোরার মতো জরুরি নয়।

যে-ভঙ্গিতে সে যেত, কাঁধ শক্ত, মাথা না-কাত, পদক্ষেপ না-মন্থর, সেই ভঙ্গিই ছিল তার বক্তৃতা। কোনো মুখ এত বাগ্মী হয়তো কখনো ছিল না, যতটা বাগ্মী হতে পারে একটি দূরে-যাওয়া পিঠ। শব্দ না বলেই সে সব বলে দিত। শুধু যাওয়া দেখিয়ে। প্রতিটি পদক্ষেপে তোমার থেকে দূরে সরে যেতে যেতে।

এ-ও এক উপহার, যদি একে উপহার বলা যায়। বাবার দেওয়া একমাত্র দৃশ্যমান শিক্ষা। নিজের যে-অংশটি তিনি তোমাকে সবচেয়ে বেশি দেখিয়েছিলেন, তা ছিল তার চলে যাওয়া। সেই পিঠ যেন বলছিল, যাচ্ছি, ফিরছি না, ঘুরছি না, তুমি পেছনে রইলে, আমি দূরে যাচ্ছি; আর তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে, শুধু দেখবে।

বাবার পিঠই ছিল সম্ভবত প্রথম জিনিস, যাকে তুমি চোখের সামনে দিয়ে চলে যেতে দেখেছিলে। ইচ্ছে সরে যাবার আগে। চাওয়া সরে যাওয়ার আগে। প্রিয় মানুষটা চলে যাবার আগে। বন্ধুদের হারানোর আগে। সবার আগেই।

সে পথ দিয়ে চলে গিয়েছিল। না ঘুরে।

আর তুমি দাঁড়িয়ে ছিলে, দেখছিলে, শিখছিলে। সে যে শিক্ষা দিচ্ছে, তা না জেনেই। আর তুমি যে শিখছ, তা-ও না জেনে। কিন্তু পরে বুঝবে, তোমার সমগ্র জীবন বোধ হয় এই দেখাতেই কেটে যাবে। কিছু বা কেউ দূরে সরে যাচ্ছে, আর তুমি দাঁড়িয়ে তা দেখছ।

পিঠ চলে যাচ্ছে। তুমি দেখছ। এটাই হবে তোমার কাজ।

সিঁড়ি। এই তেরো সিঁড়িরও আগে আরেক সিঁড়ি ছিল। চলার দিনের সিঁড়ি। যেখান থেকে তোমাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। “বের করে দেওয়া” বলাটাও পুরো ঠিক নয়, কারণ তাতে ধাক্কা, শোরগোল, শক্ত করে হাত ধরা, প্রতিরোধের ছবি আসে। এখানে তা ছিল না। ছিল একধরনের নীরব অপসারণ। চুপচাপ তোমাকে বাইরে রেখে দেওয়া। যে বের করে দেয়, সে সাধারণত কাঁদে না। কান্না বেরোয় যার ভেতর থেকে, সে তুমি। আর সে কান্না অনেকসময় চিৎকারের চেয়েও খারাপ।

পেছনে দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল; তারপর একটি ছোট্ট শীতল ধাতব শব্দ, সেটা এখনও কানে লেগে আছে। তুমি বন্ধ করোনি। তালা পড়েছিল। তুমি পড়াওনি। কিন্তু সেই ক্ষুদ্র শব্দটি এখনও কানের ভেতরে টিকে আছে। যেন একটিমাত্র ধাতব উচ্চারণে পুরো একটা জীবন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।

তুমি বেরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে সিঁড়ির মাথায়। কোথা থেকে? অফিস থেকে, ধরা যাক। অথবা কোনো বিল্ডিং থেকে। অথবা আরও গভীরভাবে বললে, যে-জীবনে এতদিন ছিলে, সেখান থেকে। তোমাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রায় এমনভাবে, যেমন রাত নামলে কেউ আলো নেভায়। অথবা যেমন কেউ একটা বেড়ালকে বাইরে বের করে দেয়। নিঃশব্দে, ঠান্ডার মধ্যে, দরজা বন্ধ করে।

আর তুমি দাঁড়িয়ে আছ। নিচে রাস্তা। এখন সেটাই তোমার। তুমি চাও কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

মাথায় তখনও টুপি ছিল। ঢোকার সময় যা মাথায় ছিল, বেরোনোর সময়ও সেটাই রয়ে গেছে। যেন বাকি সব কেড়ে নেবার পর সেটুকু শুধু তোমাকে রাখতে দেওয়া হয়েছে। টুপিটা পরে তুমি সিঁড়ি নামছিলে। ধীরে ধীরে, একটি একটি করে। শরীর গুনছিল। শরীর সব কিছুই গুনতে জানে। সিঁড়ি, দিন, হৃৎস্পন্দন, ক্ষয়।

তারপর নেমে এলে রাস্তায়। আর সেখান থেকেই শুরু হলো আরেক চলা, যে-চলা শেষপর্যন্ত এসে থামল এই ঘরে, এই চেয়ারে, এই জানালায়, এই ধূসরতার সামনে।

বের করে দেওয়া সবসময়ই একধরনের শুরু। জন্ম যেমন শুরু। তেমনি প্রতিটি ফেলে দেওয়াও একটি নতুন আরম্ভ। এমন কিছুর আরম্ভ, যা তুমি চাওনি, বেছে নাওনি, কিন্তু তোমাকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হলো। যেমন জীবনের অধিকাংশ বড়ো ঘটনা তোমাকে দিয়ে ঘটে, তোমার ইচ্ছার বাইরে, তোমার প্রস্তুতির বাইরে।

সাধারণ নিয়মে।

যাদের দিয়ে করানো হয়, তারা সচরাচর তা চায় না। কিন্তু ঠেকাতেও পারে না।

এরই মধ্যে পিঠের শিক্ষাও এসে জুড়ে গেল কাঁটাচুয়ার প্রথম শিক্ষার সঙ্গে। কাঁটাচুয়া শিখিয়েছিল, হাত বাড়ালে ফুটবে। বাবার পিঠ শিখিয়েছিল, ডাকলে সরে যাবে। দুটি মিলে পৃথিবীর পাঠ সম্পূর্ণ হলো। সংক্ষিপ্ত, নির্মম, নির্ভুল। পৃথিবী সম্পর্কে প্রথম দ্বিখণ্ডিত জ্ঞান: এগোলে ব্যথা দেবে, ডাকলে ফিরে তাকাবে না।

শব্দের আগেই তুমি এগুলো শিখে গিয়েছিলে। নাম দেবারও আগে। শরীর শিখেছিল, মন বোঝার আগেই। যে-হাত টেনে নিয়েছিল, যে-গলা ডেকে ওঠেনি, তারা আগেই বুঝে ফেলেছিল। পৃথিবীর সঙ্গে শরীরের প্রথম রফা এই: পৃথিবী কাঁটা দেয়, শরীর সরে যায়।

আর তুমি। পথে-দাঁড়ানো একটি শিশু। দেখে যাচ্ছ এক পিঠকে, যা এক বারও ঘোরেনি।

তখনই, না জেনেই, তুমি অনুশীলন করছিলে ভবিষ্যতের জন্য। এই ঘরের জন্য। এই চেয়ারের জন্য। এই থেমে থাকার জন্য। বহু বছর পরে, বহু ‘হাত বাড়ানো’ ব্যর্থ হবার পর, বহু ‘ডাকা’ নিঃশব্দ হয়ে যাবার পর, তুমি এসে দাঁড়াবে এই জায়গায়। যেখানে হাত আর বাড়ে না, গলাও আর ডাকে না। কারণ ধীরে ধীরে শিখে গিয়েছ: পৃথিবী হাত বাড়ানোর জন্য নয়, ডাকার জন্যও নয়। পৃথিবী শুধু সরে যায়। তুমি শুধু দেখো।

সাধারণ নিয়মে।

যারা শেখে কাঁটাচুয়ার কাছ থেকে, পিঠের কাছ থেকে, তারা শেষপর্যন্ত জানে: পৃথিবী দেখা যায়, ধরা যায় না; ডাকা যায়, ফেরানো যায় না। তাই পথ থেকে, চেয়ার থেকে, ঘর থেকে, তারা শুধু তাকিয়ে থাকে। পৃথিবী চলে যাচ্ছে, নিজের পথে, অন্ধকারের দিকে, এক বারও না ঘুরে।

১১।

দেয়ালের ওপারে কেউ আছে। প্রতিবেশী।

তার পায়ের শব্দ পাও। জলের শব্দ। কখনো গলার আওয়াজও। কিন্তু কথাগুলো শোনা যায় না; ভাষা হয়ে পৌঁছোয় না। শুধু কম্পন আসে। দূর থেকে, ভাঙা, অস্পষ্ট।

দেয়ালে হাত রাখলে বোঝা যায়, ওপাশে কেউ আছে। তোমার মতোই একা, হয়তো। এমনও হতে পারে, সে-ও একই সময়ে দেয়ালে হাত রেখে আছে, এপাশে কে আছে ভাবছে। দু-জন মানুষ, এক দেয়ালের দুই পাশে, দু-জনেই পৃথক, দু-জনেই অনিশ্চিত, দু-জনেই একা। কৌতুকের মতো শোনায়, যদি হাসতে পারতে।

সম্ভবত তোমরা দু-জনেই একই কাজ করছ, কেউ কারও খবর না রেখেই।

এই শহর এমন অসংখ্য ঘর, বাড়ি, দেয়াল, মেঝে, ছাদ দিয়ে ভাগ হয়ে আছে। মৌচাকের মতো খোপে খোপে। প্রতিটি আলাদা। প্রতিটি আবার একই। প্রতিটি খোপে একটি জীবন আছে। অথবা জীবনের অবশেষ, অথবা তার ছায়া, অথবা শুধু অভ্যাস। যেখানে সব কিছু চলতে থাকে যান্ত্রিকভাবে, কারণ একসময় জীবনের জায়গায় যন্ত্রচালিত অভ্যেসই এসে দাঁড়ায়।

তুমি তাদের চেনো না। তারাও তোমাকে চেনে না।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *