১৫।
ঘড়ি নেই, বলেছিলে। নেই তো। ঘড়ি না থাকলে সময় কি থাকে? থাকে। ভিন্নভাবে থাকে। শরীরে থাকে। হাড়ে ব্যথা জমে, পেশি শক্ত হয় সকালে, আয়নায় চুলে নতুন সাদা দেখো।
আলোতে থাকে। চায়ের ঠান্ডা হওয়ায়, ক্ষুধার আসায় আর যাওয়ায়। জোয়ার-ভাটার মতো। শরীরের নিজস্ব চাঁদ আছে, যা টানে, যা ছাড়ে, যার ওঠানামায় রক্ত দৌড়োয় আর থামে। শরীর নিজেই ঘড়ি। থামানোর চাবি নেই। থামাতে চাইলেও নেই।
কিন্তু সময় আছে। জানো কীভাবে? চা দিয়ে। চা গরম ছিল, তারপর আর গরম নেই। তুমি কিছু করোনি, ঠান্ডা করোনি চা, চা নিজে ঠান্ডা হয়েছে। সময়ে। এভাবেই জানো, সময় আছে। ঘড়ি দিয়ে নয়, চা দিয়ে। ঠান্ডা হওয়া দিয়ে। ধূসর যেমন গাঢ় হয়, সেটা দিয়ে। শরীর যেমন জমে যায়, শক্ত হয়, সেটা দিয়ে। রুটি যেমন শক্ত হয়ে শুকিয়ে যায়, সেটা দিয়ে। নীরবতা যেমন ঘন হয়ে ওঠে, ভারী হয়ে ওঠে, সেটা দিয়ে।
ঘড়ি দিয়ে নয়। কাপ দিয়ে, রুটি দিয়ে, শরীর দিয়ে।
সময়ের ঘড়ি লাগে না, তোমাকেও লাগে না। সময় শুধু দাগ রেখে যায় চুপচাপ। জিনিসের ওপর, তোমার ওপর। গোনো বা না গোনো, সময়ের কিছু আসে যায় না। তুমি গোনো না।
সময় আছে। বয়ে যায় না অবশ্য, তুমি বয়ে যাও, সময়ের মধ্য দিয়ে, মাছ যেমন জলের মধ্য দিয়ে যায়। মাছ ভাবে, জল নড়ছে; জল নড়ে না, মাছ নড়ে।
আর মাছ যখন থামে, তুমি যখন থামো, চেয়ারে, প্রথমবার টের পাও হঠাৎ জলের স্থিরতা, যা চিরকাল স্থির ছিল, তুমি সাঁতার কাটছিলে বলে টের পাওনি। সময়ের বিশাল স্থিরতা, যাকে নড়াচড়া ভেবেছিলে, কারণ তুমিই নড়ছিলে তার মধ্য দিয়ে। এখন নড়ছ না, আর স্থিরতাই সব কিছু।
ঘর স্থিরতা। ধূসর স্থিরতা। হাতে কাপ ধীরে ধীরে ঠান্ডা হচ্ছে। সেটাই স্থিরতা, নিজেকে দেখাচ্ছে শেষমেশ, সেই মাছকে, যে সাঁতার কাটা বন্ধ করে বসে আছে।
ঘরে সময় আলাদা, ডুবুরির ঘণ্টার মতো। বাইরে সমুদ্র চলছে, ভেতরে তুমি। বাইরের সময় তোমাকে ছুঁতে পারে না। ভেতরের সময় শুধু শ্বাসে মাপা যায়, আর শ্বাস মাপে না কিছু, শুধু চলে।
তোমার সময়, ঘড়ির সময় নয়, শরীরের সময়। ঘড়ির কাঁটা নেই, ঘণ্টা বাজে না, ঘোষণা নেই। সকাল-বিকেল আলাদা করা যায় না, কাচের মাছঘরের মতো। শুধু জানালায় আলো বদলায়, ধীরে। ধূসর থেকে গাঢ় ধূসর, গাঢ় থেকে অন্ধকার, অন্ধকার থেকে আবার ধূসর। চক্রের মতো। এটুকুই ভাগ, এটুকুই অংশ। সময়ের নিজস্ব, মানুষের চাপানো নয়, কৃত্রিম নয়।
সময় নিজেকে দেখায় নিজের মতো করে, এই ঘরে, যেখানে বসো চেয়ারে, জানালায়। আলো বদলাচ্ছে দেখছ। ধূসর থেকে ধূসরে। সত্যি বলতে, যা বদল নয়, কিন্তু বদল হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়, অন্য কিছু না থাকলে তো আর কী করা!
মাঝে মাঝে ঘরে সময় থামে; ধরো, থামে। সত্যি সত্যি থামে না, থামে মনে হয়। আলো বদলায় না, সমুদ্র নড়ে না যেন, গাঙচিল ডাকে না, মাস্তুলের দড়ি ঠকঠক করে না, সব চুপ।
আর সেই চুপে তুমিও চুপ হয়ে যাও। শরীরও, মনও। সব কিছু একসঙ্গে থামে। মুহূর্তমাত্র। নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে, কাপড়ের মতো, ভাঁজে ভাঁজে, তোমাকে ঢেকে দেয়। তখন ঘর ছবি হয়ে যায়। তুমিও।
আর তুমি চেয়ারে। শ্বাস নিচ্ছ না, ধরো, নিচ্ছ না। নিচ্ছ তো, শরীর নিচ্ছে। কিন্তু তুমি অন্যজন, ভেতরের। যে দেখে, সে শ্বাস নিচ্ছে না। সে স্থির। একটু মুহূর্তের জন্য ধরো, মুহূর্ত যদিও মাপ, আর মাপ নেই এখানে। স্থির সে, একেবারে স্থির।
আর সেই স্থিরতায় কিছু-একটা। কী? ভাবনা নয়, অনুভূতি নয়, উপলব্ধি নয়। অন্যকিছু। নাম নেই। নাম দেবার আগের, শব্দ আসার আগের, জানা আসার আগের। মনের যন্ত্র, তার গিয়ার, তার চাকা চালু হবার আগের কিছু। ফাঁকে। এক শ্বাস আর পরের শ্বাসের মাঝে। এক ধূসর আর পরের ধূসরের মাঝে।
আর এটা শান্তি নয়, ধরো, শান্তি নয়। শান্তির চেয়ে কাঁচা কিছু। পুরোনো কিছু। অভ্যাস আসার আগে যা ছিল। কাঁচা, খোলা। ঢাল আসার আগে, অসাড় করার ওষুধ আসার আগে। কাঁচা সত্যি। করা ছাড়া, যাওয়া ছাড়া, নাম দেওয়া ছাড়া। শুধু থাকা। খালি থাকা।
যা আরামের নয়, সুখকর নয়। থাকা শব্দটা যা মনে আনে, তেমন কিছু নয়। শব্দটা বিশ্রাম মনে আনে, উপস্থিতি মনে আনে, ঘর মনে আনে। কিন্তু থাকা, কাঁচা থাকা, ঢাল ছাড়া। এ একরকম যন্ত্রণা। খুব নিচু, খুব অবিরত। কেতলির গুমগুম ফুটতে শুরু করার ঠিক আগে যেমন। কম্পন, হাড়ে, রক্তে, স্নায়ুতে।
চেতনার যন্ত্রণা এটা। যে জানে যে, সে আছে, তার হওয়ার যন্ত্রণা, আর থামতে না পারার। কারণ নেই এই যন্ত্রণার, তাই ওষুধও নেই কোনো। অবস্থাটাই যন্ত্রণা। অবস্থার লক্ষণ নয়, অবস্থা নিজেই।
অস্তিত্বের মূলসুর। এখন শুনতে পাচ্ছ, ফাঁকে, এক শ্বাস আর পরের শ্বাসের মাঝে। চিরকাল ছিল। করার নিচে, যাবার নিচে, অভ্যেসের নিচে। সেই যন্ত্রণা। একটাই সুর বাজাচ্ছে। নিচু, অবিরত সুর।
কোনোদিন শোনোনি, কারণ বেঁচে থাকার আওয়াজ চিরকাল ডুবিয়ে রেখেছিল। এখন বেঁচে থাকা থেমেছে, আওয়াজ থেমেছে, সুরটা আছে। শুনতে পাচ্ছ। পরিষ্কার। অভ্রান্ত।
যে-সুর বলে, তুমি আছ, এটুকুই। যথেষ্ট নয়, কোনোদিন যথেষ্ট নয়। কিন্তু যথেষ্ট হতে হবে। কারণ এটুকুই তো আছে।
কিছু-একটা। আছে। তারপর নেই।
ছিল, মনে হয়।
আর জানা আসে। নাম দেওয়া আসতে চায়, ব্যর্থ হয়। নাম নেই, যা ছিল ফাঁকে, তার জন্য। জানার আগে, নামের আগে, তোমার আগে।
সেই জিনিস ছিল। চলে গেছে। আবার আসবে ঠিকই। অন্য ফাঁকে, এই শ্বাস আর অন্য শ্বাসের মাঝে। আশা করছ না যখন, আশা করতেও ভুলে গেছ যখন, আসবে। সবসময় আসে, ভুলে গেলে। আর যায়, মনে পড়লে।
এটাই তার স্বভাব। তুমি নেই যখন, তখন থাকা। তুমি আছ যখন, তখন না থাকা।
ফাঁকের জিনিস। কোনোদিন ধরতে পারবে না ওটাকে। আর ওটাও কোনোদিন একা ছাড়বে না তোমাকে।
পুরো সব কিছু একশ্বাসে বলা যায়। কান্না। শ্বাস ভেতরে। নীরবতা। শ্বাস বাইরে। আবার কান্না। পুরোটা এটুকুই।
প্রথম কান্না। শ্বাস ভেতরে। বিরতি। শ্বাস বাইরে। শেষ কান্না।
প্রথম কান্না আর শেষের মাঝে, ধরো, তিরিশ সেকেন্ড। ধরো, একটা জীবন। একই জিনিস, একই দৈর্ঘ্য, একই ঘটনা। টানলে বা চেপে ধরলে তফাত নেই কোনো।
যে কান্না শুরু করে, সে-ই কান্না শেষ করে। যে-শ্বাস ভেতরে আসে, তাকে বাইরে যেতে হবে। মাঝখানে যে-নীরবতা, সেটাই জীবন। সেটাই বিরতি। ভেতরে আসা আর বাইরে যাবার মাঝে।
সেখানে তুমি আছ। বিরতিতে, নীরবতায়, শ্বাস আসা আর যাওয়ার মাঝে।
যে-শ্বাস কোনোদিন তোমার ছিল না। ধার ছিল। বাতাস ফুসফুসকে ধার দিয়েছিল। বিরতি যতক্ষণ, ততক্ষণের জন্য। সেটাই জীবন।
বিরতি শেষ হলে শ্বাস বেরোয়। কান্না আসে। শেষ। যেমন শুরু ছিল কান্না আর শ্বাস ভেতরে আসা।
পুরোটা। তিরিশ সেকেন্ডে, একটা জীবনে। একই। কান্না। শ্বাস। নীরবতা। শ্বাস। কান্না। এটুকুই। চিরকাল এটুকুই ছিল। এর বেশি কিছু না। এটুকুই।
১৬।
রাতে পায়চারি করো, শোবার আগে। ঘর জুড়ে নয়, একটা ফালি দিয়ে, সরু। বিছানা আর দেয়ালের মাঝে আটকানো। নয় পা, ধরো, নয়। গুনে গুনে নয়, শরীর গুনে, পা মেঝে চেনে। কোন তক্তায় খাঁজ পড়েছে, পা জানে। অন্ধকারেও জানে। চোখ বুজেও জানে।
পা তোমার চেয়ে পুরোনো। পা মনে রাখে, যা তুমি ভুলে গেছ। কোথায় পেরেক মাথা তুলে আছে, পা জানে। এই ফালি তক্তায় দাগ পড়ে গেছে তোমার পায়ে পায়ে। চকচকে হয়ে গেছে সেই ফালিটুকু। বাকি মেঝে ম্যাড়মেড়ে। ফকিরের মতো। পুরো পৃথিবী ছেড়ে দিয়ে একটা চাটাই রেখেছ, আর সেই চাটাইতেই চাঁদ ওঠে, চাটাইতেই জগৎ।
তুমি হলে দর্শক আর অভিনেতা দুটোই। মঞ্চ খালি। চেয়ারগুলো সাজানো। দর্শক নেই। আলো জ্বলছে। তবু অভিনয় চলছে। অন্ধকারে যাওয়া, আর কখনও না ফেরা। চিরকালই একই ফালি, একই সংখ্যা। পা গুনছে, যেমন সবসময় গোনে। নয়ে যাও, ঘোরো, নয়ে ফেরো, ঘোরো, নয়ে যাও।
পায়ের শব্দ, মেঝেতে, তক্তায়, অন্ধকারে। আস্তে, খুব আস্তে, কিন্তু আছে। তা একমাত্র শব্দ ঘরে, সমুদ্র আর হৃৎস্পন্দন ছাড়া। পা তক্তায় ফালি মাপছে। এত বার মেপেছ, তক্তা জানে। তক্তা ক্ষয়ে গেছে সেই ফালিতে, বাকি জায়গার চেয়ে বেশি। একটা পথ তৈরি হয়ে গেছে মেঝেতে। রাতের পায়চারিতে পায়ে পায়ে ক্ষয়ে। তক্তা হালকা হয়ে গেছে সেখানে, পাতলা, মসৃণ, দু-পাশের চেয়ে।
ফালিটা তোমার। ঘর তোমার নয়, শহর তোমার নয়, কিন্তু এই ফালি তোমার। বিছানা আর দেয়ালের মাঝে নয়ের পায়ের ফালি তোমার। ক্ষয়ে দিয়েছ। কাঠে, পায়ে, প্রতিরাতে, প্রতিরাতে, শোবার আগে।
অন্য জায়গায় পায়চারি করতে পারতে। ঘর ফালির চেয়ে বড়ো। দরজা থেকে জানালা পর্যন্ত করতে পারতে, চেয়ার থেকে টেবিল। করো না তো। ফালি ফালিই। আর ফালিই যথেষ্ট। পুরো পৃথিবী পেলে হারিয়ে যেতে, ফালি পেয়ে রয়ে গেলে। এদিক ওদিক, এটুকুতেই রাজত্ব, এটুকুতেই স্বাধীনতা।
প্রথম রাত থেকে এটাই। পা বেছেছে, তোমাকে না জানিয়ে। পা বেছেছে, নয়ে পা, নয়ে ফেরা, আর ঘোরা দু-প্রান্তে। নিখুঁত ঘোরা, পায়ের গোড়ায়, অক্লান্ত, দিক উলটে দেওয়া, ছন্দ না ভেঙে কিছুতেই। ঘোরো, ফেরো, ঘোরো, ফেরো।
পায়ের নিজের নৃত্যকলা আছে, নিজের জ্যামিতি, নিজের ভক্তি, নিজের ছন্দ। সেই ফালির প্রতি, যা ক্ষয়ে দিয়েছে মেঝেতে। তুমি পায়ের যন্ত্র শুধু পায়চারিতে, শরীরের যন্ত্র খাওয়ায়, হৃদয়ের যন্ত্র ধুকপুকে। তুমি সেবা করো শুধু। পা পায়চারি করে তোমাকে দিয়ে, তোমার ভেতর দিয়ে, ফালিতে, অন্ধকারে।
মাঝে মাঝে পায়চারির সময় একটা গলা শোনো। খুলির গলা নয়, অন্য গলা। দেয়াল থেকে, নিচ থেকে, মা যেখানে আছে বা ছিল, সেখান থেকে। মায়ের গলা। তোমার নাম বলছে, বা তোমার নাম নয়, একটা নাম, যা তোমার ছিল, নাম ডোবার আগে তলায়।
গলা বলছে দেয়াল থেকে, নিচ থেকে, অন্ধকার থেকে। শেষ হবে না কি তোমার? ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব কিছু তোমার হতভাগা মাথায়। শেষ হবে না? মায়ের গলা জিজ্ঞেস করছে ওপাশ থেকে। দেয়াল, যা মেঝে, যা মাটি, যা পৃথিবী, যা তল, যেখানে সে আছে, তার ওপাশ থেকে। মা জিজ্ঞেস করছে মেঝের ভেতর দিয়ে, মাটির ভেতর দিয়ে। শেষ হবে না তোমার?
আর উত্তর। না। শেষ হবে না কোনোদিন। ঘোরানো থামবে না, পায়চারি থামবে না, ফালি ধরে হাঁটা বন্ধ হবে না। নয়ে যাও, নয়ে ফেরো। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব কিছু হতভাগা মাথায়। মা জানত তো, হতভাগা মাথা। মা দেখেছিল ওপাশ থেকে, নিচ থেকে। যেখানে মায়েরা যায় যাবার পর, যেখান থেকে ডাকে ডাকলে।
গলা, মেঝের ভেতর দিয়ে। শেষ হবে না? না। কোনোদিন না। শেষ হবে না। ঘোরানো চলবে। পায়চারির মতো, শ্বাসের মতো, চালিয়ে যাবার মতো। যতক্ষণ না থামে, পায়চারি থামে, আর শোয়া শুরু হয়, আর শরীর হয়ে যায়, যা রাতে হয়। ভূদৃশ্য।
রাতে শরীর আলাদা। দিনে শরীর বাহন, যানবাহন। বিছানা থেকে চেয়ারে নেয়, চেয়ার থেকে দরজায়, দরজা থেকে বন্দরে, আর ফেরত। দিনে শরীর কার্যকর, ধরো, শরীরের কাজ করে, বহন করে, বয়ে নিয়ে যায়, চালু রাখে কোনোমতে।
কিন্তু রাতে? আহা, রাতে! শরীর অন্যকিছু হয়ে যায় একেবারে। ভূদৃশ্য হয়ে যায়, ভূখণ্ড। তুমি শুয়ে আছ তার মধ্যে, দেশের মধ্যে যেমন। নিজস্ব ভূগোল আছে তার, পাহাড় উপত্যকা আছে, আবহাওয়া আছে, উষ্ণতা-ঠান্ডার নিজস্ব ঋতু আছে।
আবারটুকুই জীবন: পঁচিশ
লেখাটি শেয়ার করুন