গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: চব্বিশ



এই যে বলার বাধ্যবাধকতা, এটাও তোমার পছন্দে আসেনি। এটা তোমার নিজের তৈরি নয়। জন্মের মতোই চাপিয়ে-দেওয়া, থাকার মতোই অনিবার্য, সম্মতি ছাড়া এসে বসা। যখন বলার কিছু অবশিষ্ট নেই, তখনও বলা যেন এক দাবি হয়ে থাকে। কূপ শুকিয়ে গেছে, তবু বালতি নামানো হয়। উঠে আসে প্রায় খালি, দড়িতে লেগে থাকে শুধু একটু স্যাঁতসেঁতে চিহ্ন। শব্দ যথেষ্ট নয়, গলাও যথেষ্ট নয়, এমনকি বলার ইচ্ছেটুকুও আর নেই। তবু এই বাধ্যবাধকতা বিশ্রাম দেয় না। নীরবতার মধ্যেও তার তৃপ্তি নেই। অর্থ সরে যাবার পরেও শব্দ মনোযোগ চায়, কারণহীন-হয়ে-পড়া গলার কাছ থেকেও উচ্চারণ দাবি করে।

তুমি এটি টের পেয়েছ। চেয়ারে বসে, গলার গভীরে, মাথার ভেতরে। তা কোনো স্পষ্ট ভাবনা নয়, কোনো নির্দিষ্ট বাক্যও নয়। যেন এক চাপ। বাঁধের পেছনে জমে-থাকা জলের মতো চাপ, যেখানে জলের আর আলাদা স্রোত নেই, আছে শুধু ঠেলা, জমে থাকা, ফেটে বেরোবার অদম্য প্রবণতা। কিছু একটা বলতে চায়, অথচ তার বলবার বিষয় নেই। কোনো বিষয়বস্তু বহন করে না, তবু এগিয়ে আসে। নীরবতার বিরুদ্ধে, স্থবিরতার বিরুদ্ধে, বন্ধ মুখের বিরুদ্ধে, একরকম চেপে-রাখা ঠোঁটের বিরুদ্ধে।

তাই বলা চলতেই থাকে। যে-কথাগুলো বলা যায় না, তাদেরও বলা চলতে থাকে; যে-শব্দ আর কাজ করে না, সেই শব্দ দিয়েই। শুনবার কেউ নেই, কারণও নেই, তবু উচ্চারণের প্রবাহ বন্ধ হয় না। অর্থ শেষ হবার পরেও, উদ্দেশ্য ঝরে পড়ার পরেও, “শেষ কথা” বলে কিছু-একটা একদিন বলা হয়ে যাবার পরেও, পরের শব্দটি তবু আসে। কোথা থেকে? সেই চাপ থেকে। সেই পুরোনো কারখানা থেকে, যেখানে একসময় শব্দ তৈরি হতো।

কারখানাটি বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিকেরা চলে গেছে, যন্ত্রে মরচে পড়েছে, মেঝেতে ধুলো জমেছে। তবু কখনো কখনো চিমনি থেকে ধোঁয়া এখনও ওঠে। শব্দ হবার আগের মুহূর্তে, যখন তা এখনও কেবল চাপ, কেবল জমে-থাকা সম্ভাবনা, গলা আর খুলির ভেতরে তার ঘন ধোঁয়া অনুভব করা যায়। এবং, তখন প্রশ্ন ওঠে, একে বহন করবে কোন রূপ?

কী ধরনের রূপ লাগবে সেই কিছুকে বর্ণনা করার জন্য, যা বলা যায় না? পুরোনো রূপগুলো এখানে আর কাজ করে না। গল্প দিয়ে হবে না। কবিতা দিয়েও নয়। প্রবন্ধ বা যুক্তিতর্কের রাস্তাও ব্যর্থ। কারণ এগুলো সবই “কিছু-একটা”-র জন্য তৈরি। যে-পৃথিবীতে শুরু আছে, মাঝ আছে, শেষ আছে; আকৃতি আছে; কারণ-ফল আছে; অর্থের গঠন আছে। তোমার বর্তমান পৃথিবী সেরকম নয়। তোমার পৃথিবী এখন ঘর, চেয়ার, ধূসরতা, আর চালিয়ে যাওয়া, এই পর্যন্ত। এখানে স্পষ্ট শুরু নেই, না আছে শেষ; মাঝও ধরা পড়ে না। কোনো দৃশ্যমান বিন্যাস নেই, কোনো সম্পূর্ণ নকশা নেই। পুরোনো রূপ এই বাস্তবতাকে ধরতে পারে না।

তাই দরকার হয় “কিছু-না”-র একটি রূপ। এমন এক রূপ, যা আকৃতি দিতে ব্যস্ত নয়, বরং আকৃতিহীনতাকে জায়গা দিতে পারে। এলোমেলোকে বাদ না দিয়ে, বরং তাকে প্রবেশের অনুমতি দেয়। কারণ পৃথিবী তো মূলত এ-ই। একটি অগোছালো বিস্তার, যাকে গল্প সাজিয়ে ফেলে, কবিতা ছাঁদে বেঁধে ফেলে, প্রবন্ধ যুক্তির রেলিং তুলে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। রূপের ইতিহাসই যেন অনেকখানি সেই অপ্রতিরূপযোগ্য বিশৃঙ্খলাকে বাইরে রেখে দেবার ইতিহাস। গল্প যা বাদ দেয়—অসংলগ্ন অংশ, ফেলে-রাখা অবশিষ্ট, অনির্ধারিত বিরতি, সেগুলোই তো এলোমেলো। কবিতা যা ছন্দে ধরতে পারে না, প্রবন্ধ যা তর্কে নামাতে পারে না, সবই সেই অবিন্যস্ত অবশেষ।

আর তুমি? তুমি তো সেই অবশেষের মধ্যেই আছ। জন্ম থেকে। চেয়ারে, ঘরে, ধূসরে, থেমে থেকেও এক অন্তহীন চলার ভেতরে। শিক্ষা তোমাকে যে-রূপগুলো শিখিয়েছিল, বইগুলো যে-কাঠামোয় কথা বলেছিল, সেগুলো এলোমেলোর পক্ষে ছিল না। বরং এলোমেলোকে বাইরে ঠেলে রাখার পক্ষে ছিল। এখন যখন এই ঘরে, এই ধূসরতায়, এলোমেলো ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই, তখন দরকার হয় এমন এক রূপের, যা তাকে অস্বীকার করবে না, বেছে বেছে ছেঁটে ফেলবে না, চিহ্নিত করে শৃঙ্খলাবদ্ধও করবে না। বরং দরজা খুলে রাখবে, যাতে এলোমেলো এসে ঢুকতে পারে, আর নিজেই সেই রূপের অংশ হয়ে ওঠে।

এমন রূপ তুমি পাওনি। হয়তো কোনোদিন পাবে না। কিন্তু হয়তো খোঁজাটাই রূপ। যেমন গল্প বলতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়াই অনেকসময় প্রকৃত বলা হয়ে ওঠে, তেমনি প্রকাশ করতে না পারাটাই কখনো সবচেয়ে সত্য প্রকাশ। যে-রূপ এলোমেলোকে জায়গা দেয়, সে রূপ হয়তো এলোমেলো নিজেই। যা কিছুই বলছে না, কিছু স্পষ্টভাবে প্রকাশও করছে না, তবু শূন্যতার মধ্যেই একটি মানানসই কাঠামো তৈরি করছে। সেই শূন্যতাই হয়তো একমাত্র রূপ, যা সত্যিই ধরে রাখতে পারে, কারণ সে ধরতে গিয়ে বিকৃত করে না, মানিয়ে নিতে গিয়ে বর্জন করে না, কেবল জায়গা দেয়। আর কখনো কখনো জায়গা দেওয়াই সবচেয়ে পূর্ণ প্রকাশ।

১৪।

একটা পুরোনো যন্ত্র আছে। ধুলোয়-ঢাকা, বিস্মৃতপ্রায়। চাবি ঘোরালে তার ভেতরে ঘড়ঘড় শব্দ ওঠে; যেন লোহার দাঁত লোহাকেই চিবোচ্ছে, চাকা ধীরে ধীরে ঘুরছে, কাশি-ধরা কোনো বৃদ্ধের বুকে জমে-থাকা সর্দির মতো খসখসে এক আরম্ভ।

তারপর হঠাৎ একটি গলা শোনা যায়। তোমার গলা, অথচ তোমার বলে চেনা যায় না। মনে হয়, অন্য কেউ তোমার জীবনটি নিয়ে বলছে; তোমারই জীবন, কিন্তু আজকের তুমি নয়, বহু আগেকার তুমি। এমন এক তুমি, যে এখন মৃত। তুমি যেন নিজের ভূতের কণ্ঠস্বর শুনছ।

মৃতদের গলা কোথাও-না-কোথাও থেকে যায়। দেয়ালের ভেতরে, কাঠের শিরায়, বাতাসের অদৃশ্য স্তরে, কিংবা টেপের কালো ফিতের গায়ে। শুধু শোনার মতো নীরব হলেই তারা ফিরে আসে। এই যন্ত্র সেই কাজটিই করে: ধরে রাখে, তারপর একদিন বাজিয়ে শোনায়। একটি গলা, তোমার গলা, চলার দিনের, থামার আগেকার।

পেয়েছিলে তাকে একটি বাক্সে, বিছানার নিচের অন্ধকারে। বাক্সের মধ্যে যন্ত্র, যন্ত্রের মধ্যে টেপ, টেপের মধ্যে গলা। তোমার গলা। আগেকার, তরুণ; বয়সে নয়, অন্য অর্থে তরুণ।

সেই সময়ের, যখন তোমার কণ্ঠে এখনও ছিল চলা, করা, চাওয়া, ইচ্ছে করা। মানুষকে টেনে-নিয়ে-চলা সেই চারটি গোপন শক্তি। এখন আর তোমার মধ্যে নেই তারা; কিন্তু টেপের গলায় এখনও তাদের চাপা কম্পন রয়ে গেছে, যেমন আঠায় আটকে-পড়া কোনো মাছি ডানা মেলে স্থির হয়ে থাকে। সময় বহু আগেই তাকে ছাড়িয়ে চলে গেছে, অথচ তার ছটফটানি শুকিয়ে লেগে আছে।

টেপের গলা জানত না যে, একদিন এই চারটিই হারিয়ে যাবে। থেমে যাওয়া এসে সব দখল করবে। জীবন শেষপর্যন্ত ঘর, চেয়ার, ধূসর আলো আর নিস্তব্ধতার মধ্যে গুটিয়ে যাবে।

সেই গলা কিছু-একটা বলছিল। জন্মদিনের কথা, বা কোনো ছুটির দিন, বা কোনো মেয়ের কথা। কিন্তু কেবল কথাই নয়, আরেকটি শব্দও ছিল তার পেছনে। খুব মৃদু, প্রায় অন্যমনস্ক এক মর্মর। যেন কেউ ধীরে ধীরে, যত্ন করে, একটা ফলের খোসা ছাড়াচ্ছে।

শুনতে শুনতে বোঝা যায়, কমলালেবু। খোসা আলগা হচ্ছে, নরম ছাল ফলের গা থেকে সরে আসছে, নিশ্চয়ই তখন গন্ধও ছড়িয়ে ছিল ঘরে। তারপর খাওয়ার শব্দ। মুখ ফলের রসে ভরা, শব্দগুলো একটু ভারী, একটু আর্দ্র।

তুমি কমলালেবু খাচ্ছিলে, একইসঙ্গে কথা বলছিলে, একইসঙ্গে বেঁচে ছিলে সেই জীবনে, যা একদিন এই ঘরে বসে, স্যুপ-ও-চা-দিয়ে-গাঁথা তোমার বর্তমানের মধ্যে, ফিরে শুনবে। এখন তোমার চারপাশে কমলালেবু নেই, ফল নেই, রস নেই। আছে শুধু বয়াম, গুঁড়ো, চা, আর সপ্তাহে তিন দিনই স্যুপ।

অথচ সেই টেপে, বহু বছরের দূরত্বে, একটি কমলালেবু এখনও জ্বলজ্বল করছে। আজ তোমার জীবনে সে-ই সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে রঙিন বস্তু। একটা কমলালেবু, যা অনেক আগে খাওয়া হয়ে গেছে, অন্য ঘরে, অন্য এক তোমার হাতে, যে তোমার মতোই এখন মৃত।

তবু কমলালেবুটি মরে যায়নি; সে বেঁচে আছে শব্দে। খোসা ছাড়ানোর ক্ষীণ ঘর্ষণে, চিবোনোর ভেজা সুরে, আর গলার চারদিকে তার গন্ধময় উপস্থিতিতে।

কিন্তু শব্দ পরিষ্কার নয়। টেপ পুরোনো, যন্ত্র পুরোনো, ব্যাটারি ফুরিয়ে আসছে। তাই গলাটিও যেন মরতে মরতে বাঁচছে। আস্তে হচ্ছে, গভীর হচ্ছে, টেনে নামাচ্ছে নিজেকে। ব্যাটারি যেমন জোর হারায়, মানুষও তেমনি হারায়।

গলা ধীর হয়ে আসে, যেমন তুমি একদিন ধীর হয়ে এসেছিলে; কণ্ঠের উজ্জ্বলতা ক্ষয়ে যায়, যেমন তোমারও গেছে। তুমি বসে শুনতে থাকো। তোমারই সেই পুরোনো গলা, যা একদিন তোমার ছিল, আজও তোমার, যদিও অন্য সময়ে, অন্য ঘরে, অন্য জীবনে।

শুনতে শুনতে গতি কমে আসে, শব্দ ঘন হয়, তারপর থেমে যায়। যেমন ব্যাটারি মরে যায়। যেমন সব কিছুই শেষ পর্যন্ত মরে যায়। অন্ধকারে।

ব্যাটারি বদলানো যেত। এখনও দোকান খোলা আছে। তুমি চাইলে তেরোটি সিঁড়ি নেমে যেতে পারতে, পয়সা দিয়ে নতুন ব্যাটারি কিনে আনতে পারতে, যন্ত্রে লাগিয়ে সেই মৃত কণ্ঠে আবার শ্বাস ফেরাতে পারতে। সে আবার চলত, যেখানে থেমেছিল, সেখান থেকেই শুরু করত, জন্মদিনের, ছুটির, কিংবা মেয়েটির গল্প বলত।

এ কাজকে দয়া বলা যায় কি? না কি নিষ্ঠুরতা? মৃতকে আবার কথা বলতে বাধ্য করা কি করুণা, না তাকে দ্বিতীয়বার মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া? তুমি জানো না।

তবে তার চেয়েও বড়ো সত্য এ-ই, তুমি করো না। সিদ্ধান্ত নিয়ে করো না, তা-ও নয়; কেবল সেই জোর আর নেই, যা মানুষকে সিঁড়ি নামায়, কাউন্টারে হাত বাড়াতে শেখায়, ব্যাটারি কিনে ফিরিয়ে আনে।

মনে পড়ে পালের কথা। নৌকোর পাল। হাওয়া থেমে গেলে পাল ঝুলে পড়ে। ঝুলতে চায় বলে নয়; পাল তো কিছুই বাছে না। হাওয়া থামে, আর পাল তার অনিবার্য নিষ্ক্রিয়তায় নেমে আসে।

তোমার অবস্থাও যেন সেইরকম। ঠিক পালের মতো নয়, কারণ কিছু কখনও কিছুর মতো হয় না পুরোপুরি; তবু এই ঝুলে পড়া, এই না যাওয়া, এই সিদ্ধান্তহীন স্তব্ধতা, এগুলো খুব চেনা। তোমাকে যে-শক্তি নাড়াত, তা থেমে গেছে। তার নাম জানো না। তার জন্য হাহাকারও করো না, কারণ হাহাকার করতেও তো আরেক ধরনের শক্তি লাগে, তা-ও নেই।

তাই যন্ত্রটি পড়ে থাকে টেবিলের উপর, পুরোনো দাগের ভেতরে। গলা চুপ। টেপ স্থির। গল্প মাঝপথে থেমে আছে। যেমন করে প্রায় সব গল্পই থেমে থাকে। তোমার নিজের গল্পও তেমনি।

পার্থক্য শুধু এ-ই: যন্ত্রের গল্প আবার শুরু হতে পারে, যদি তুমি ব্যাটারি দাও। তোমারটা পারে না। কিংবা পারলেও তুমি আর তা ঘটাবে না। শেষপর্যন্ত এই দুই একই হয়ে যায়।

আর রাতে, যখন ঘুম আসে না, যা প্রায়ই হয়, তুমি কখনো কখনো অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে বোতাম টিপে দাও। যন্ত্র চলে না। ব্যাটারি নেই। তবু তুমি গলা শুনতে পাও। খুলির ভেতরে।

কবে যে স্মৃতি সেই টেপটিকে শুষে নিয়েছে, কবে যে শব্দগুলো নেমে গেছে তলার দিকে, ঠিক জানো না; কিন্তু এখন তারা বাজে যন্ত্র ছাড়াই, ব্যাটারি ছাড়াই, টেপ ছাড়াই। তোমার পুরোনো গলা খুলির অন্ধকারে ঘুরতে থাকে।

সব কণ্ঠ যেমন শেষপর্যন্ত খুলির মধ্যেই বাজে, যন্ত্র থেমে যাবার বহু পরে, টেপ গুঁড়ো হয়ে যাবার বহু পরে। গলা, তোমার গলা, চলার দিনের, অন্ধকারে বাজতেই থাকে। কাউকে শোনানোর জন্য নয়, কোনো প্রয়োজন ছাড়া, কেবল অন্ধকারের জন্য। যখন বাকি সব থেমে গেছে, তখনও।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *