গল্প ও গদ্য

তিন-চারটে এক্সট্রা গান

প্রয়োজনের অতিরিক্ত সব‌ই আমি জীবন থেকে বাদ দিয়েছি। এই যেমন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনাকাটা, অতিরিক্ত উপহার দেওয়া কিংবা নেওয়া, অতিরিক্ত ভাত-মাছ, পোলাও কিংবা অ্যালকোহল খাওয়া। বাদ দিয়েছি প্রয়োজনের অতিরিক্ত বন্ধুবান্ধবদেরও, কারণ এত বন্ধুকে সময় দিতে গেলে আসলে ওগুলো আর বন্ধুত্ব‌ই থাকে না, স্রেফ বন্দিত্ব হয়ে যায়।

প্রয়োজনের বেশি আড্ডাবাজি, টিভিদেখা, এ-পাড়ায় ও-পাড়ায় ঘোরাঘুরি, অতিরিক্ত আহ্লাদ পাওয়া কিংবা দেওয়া, কারুর উপর ডিপেনডেন্ট হওয়া কিংবা কাউকে ডিপেনডেন্ট হতে দেওয়া, কাউকে জাজ করা কিংবা জাজড হবার ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া, লোকে কী বলবে তা-ই নিয়ে ভাবা কিংবা আমি যা বলছি তা নিয়ে লোকজনকে অহেতুক বেশি বেশি ভাবানো, এ সবকিছুই আমি ছেড়ে দিয়েছি।

সবটা একসাথে পারিনি, ওটা কেউ পারেও না; তবে ধীরে ধীরে পেরেছি। আমি আগের আমার সাথে এখনকার আমার তুলনা করে মেলাতে পারি না, ভাবি, এই আমিই কি সেই আমি!? আমার প্রতিবেশী আর বন্ধুদের মতে, এমনকী কিছুদিন গভীরভাবে ভেবে আমারও মনে হয়েছিল যে, আমি বুড়িয়ে যাচ্ছি, আর এই যে জীবন থেকে এটা-সেটা ছেঁটে ফেলা, এগুলো তো বৃদ্ধ হবারই লক্ষণ। কিন্তু যখন উপলব্ধি করলাম, আগের আমি আর এখনকার আমি'র কনফিডেন্স লেভেল, উইজডম, কামনেস, পজিটিভ অ্যাটিটিউট, অ্যাক্সেপ্টেন্স, পেশেন্স, নতুন কিছু শেখার এক্সাইটমেন্ট, ছোট্ট ছোট্ট ব্যাপারগুলোকে সেলিব্রেট করতে পারার মতন অনেক বড়ো কিছু জিনিস শিখেছি, তখন মনে হলো, আরে, অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে বাদ দিয়ে তো আমি আমাকেই খুঁজে পেয়েছি!

আমার খুশি হতে, ভালো থাকতে, ঝামেলা এড়াতে আর প্রেশার নিতে হয় না, মিথ্যে বলতে হয় না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত শাড়ি-গয়না কিনে টাকা আর সময় অপচয় না করে সেগুলোকে আমি অন্য প্রোডাকটিভ কাজে কিংবা মানুষের উপকারে কাজে লাগাতে পারি। কাউকে জাজ করি না বিধায় অন্য কারও জাজমেন্ট নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় বেঁচে যায়, যে সময়ে আমি তিন-চারটে এক্সট্রা গান শুনে ফেলতে পারি... হা হা হা

বন্ধুদের সাথে অতিরিক্ত আড্ডাবাজি আর ওয়াইন ছাড়া জীবনকে খুবই পানসে মনে হতো। অ্যাডিকশনটা ওয়াইনের হোক কিংবা আড্ডাবাজির, আমি আর কিছুর উপরই এখন ডিপেনডেন্ট না। সুখ বা দুঃখ সেলিব্রেট করতে আমার এখন আর মদ লাগে না।

আমি শিখেছি, জীবনে সুখ পেতে হলে কিছু আঁকড়ে ধরতে জানতে হয়, মেকি সাজগোজ জানতে হয়, ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েও অনেক কিছুতেই তাল মেলাতে শিখতে হয়। আর জীবনকে উপভোগ করতে হলে, গভীরভাবে বাঁচতে হলে, নিজের আত্মার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে হলে কেবলই বাদ দিতে জানতে হয়।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *