তোমাকে ছুড়ে দিয়েছিল। ধরো, ছুড়ে দেওয়া, আলোতে, আস্তে বসায়নি কেউ, আলতো করে নামায়নি, পাথর যেমন ছোড়া হয় মাঠে, তেমন। আর পাথর বাছেনি, কোন মাঠে পড়বে।
পড়লে, হাঁটু ছড়ে গেল, হাতের তালু কাঁকড়ে ভরল, রক্ত একটু। দাঁড়ালে, শরীর তো দাঁড়িয়ে যায় ছুড়ে ফেলা হলেও, চারদিকে তাকালে সেই শূন্যের দিকে, যা ছিল মাঠ, যা ছিল জীবন।
জীবন জিনিস বাড়িয়ে ধরত, কুকুরকে যেমন খাবার দেখানো হয়, তেমন। দেখা যায়, গন্ধ পাওয়া যায়, চাওয়া যায়, এমন কাছে। গাছ, ধরো, ছায়ার জন্য; গেলে সেদিকে, গাছ সরে গেল। অদৃশ্য হাতে, অজানা কলকাঠিতে, নাগালের বাইরে। বোতল, ধরো, তেষ্টার জন্য; গেলে, বোতল সরে গেল। সঙ্গী, ধরো, মাঠে দাঁড়িয়ে; গেলে, সে-ও পিছিয়ে গেল, ঠিক যতটুকু তুমি এগোলে, ততটুকু। হাত বাড়ানো আর পাবার মাঝে যে-দূরত্ব সেটা অটল, কমে না কিছুতেই।
প্রতিটি বাড়ানো জিনিস সরে যেত হাত বাড়ালেই, প্রতিটা কথা পিছোত পা ফেললেই। গাছ, জল, সঙ্গী মানে উদ্দেশ্য, চলার কারণ, সব সরে যেত সেই কলকাঠিতে।
এটাই ছিল জীবন। বাড়ানো আর সরানো, হাত বাড়ানো আর না পাওয়া, বার বার, একই গাছ একই বোতল একই মানুষ, একই খেলা, বাড়ানো আর সরানো, বাড়ানো আর সরানো। যতক্ষণ না থামলে, মাঠে বসে পড়লে আলোতে, জিনিসগুলো আবার বাড়ানো হলো। এবার কাছে, হাতের নাগালে, আর তুমি নড়লে না, হাত বাড়ালে না, দাঁড়ালে না, কোথা থেকে ডাক এল, আবার চেষ্টা করো, নড়লে না।
এটাই জয়। জয়, যদি শব্দটা ঠিক হয়, মাঠে জীবনে একমাত্র জয়। সরিয়ে নেওয়া হবে জেনেও হাত না বাড়ানো, পিছিয়ে যাবে জেনেও পা না ফেলা, মাঠে বসে থাকা, আলোতে হাত না বাড়িয়ে, সাড়া না দিয়ে, ছুড়ে-ফেলা মানুষের জয়। যারা তা ধরার চেষ্টাই ছেড়েছে, যা সবসময় সরিয়ে নেওয়া হয়। সাধারণ নিয়মে।
আর তোমার পাশে, ধরো, পাশে, মাঠে মাটিতে আলোতে, আরেকজন। কম্বলের নিচে, ধরো, কম্বল, পুরু খসখসে ন্যাপথলিনের গন্ধ, তুমিও কম্বলের নিচে, দুটো কম্বল পাশাপাশি। মাঝে একটু ফাঁক, ঠান্ডা হাওয়া ঢোকে, গায়ে লাগে।
ঠান্ডা। ফেলে-দেওয়া জুতোর মতো, সব জোড়ার মতো, যা দুনিয়া চায়, অবস্থা চায়। দুটো কম্বল আর একটা আলো, ধরো, পড়ে একজনের ওপর। সে ওঠে আস্তে আস্তে যন্ত্রণায়, অভ্যেসগুলো সেরে নেয়। ধোয়া খাওয়া তাকানো, বড়ি ধরো, প্রার্থনা ধরো; বড়িও নয়, প্রার্থনাও নয়, শুধু সেরে নেওয়া; আর শুয়ে পড়ে কম্বলের নিচে, যেখানে অন্ধকার, না-করার।
কম্বল বিচার ছাড়া নেয়, যে সেরে এসেছে, তারপর আলো পড়ে অন্যজনের ওপর, সে ওঠে চটপট, যেন কিছুই হয়নি, একই অভ্যেস সারে দ্রুত হালকা পায়ে, যেন মানে আছে, যেন এপার আর ওপারে তফাত আছে, আর শুয়ে পড়ে একই কম্বলে একই অন্ধকারে। একইভাবে নেওয়া।
দু-জন কম্বলের নিচে একই নিয়মে। একজন আস্তে আস্তে যন্ত্রণায়, একজন চটপট, যেন কিছুই ঘটেনি; কিন্তু একই নিয়ম, একই কম্বল শুরুতে শেষে, তেজি আর ঢিমে, একই শেষ, দু-জনেই কম্বলের নিচে শেষ, দু-জনেই কম্বলের নিচে শুরু। কম্বলের কিছু যায় আসে না, কম্বল দু-জনকেই নেয়, ঘর যেমন নেয়, ধূসর যেমন, বাছবিচার ছাড়া।
জন্মানোই তো মরা। এটা এখন জানো, আগে জানতে না, কিন্তু জানো। প্রথম কান্না আর শেষ কান্না। মাঝে একটা ঝলক, চোখ ধাঁধায়, তারপর অন্ধকার আবার। এটুকুই সার যত দর্শন পড়েছ আর যত বই, তার। জন্মই মরা, প্রথম শ্বাসই শেষ, মাঝের আলো ঝলক শুধু, যা শুরু থেকেই যাচ্ছিল একটুও না থেমে। কোনোদিন থামেনি।
আর কবর সবসময়ই ছিল, মাটির ভেজা গন্ধ নিয়ে। বিছানার তলায়, চেয়ারের তলায়, মায়ের তলায়, চলা-করা-কাজ-চাকার তলায়। কবর অপেক্ষায়, শীতল; ভেজা, সমুদ্রের ধৈর্যে, ঘরের ধৈর্যে, কোনো তাড়া নেই ওর। আর তুমি তার ওপর বসে এখন চেয়ারে। এপারেও না, ওপারেও না, জন্মও না, মৃত্যুও না। বসে আছ ওটার ওপর, ঝলকের মধ্যে যা শুরু থেকেই যাচ্ছে, বসে আছ। সাধারণ নিয়মে। বসে-থাকা মানুষের মতো।
সেদিক থেকে দেখলে থামাটা, সত্যি করে বললে, মরার যতটা কাছে যাওয়া যায় না মরে, মরাকে তো দেওয়া হয়নি, বেছে নিতেও নয়, বাছা তো একটা করা আর তুমি করাই বন্ধ করেছ। শুধু থেমেছ, আর থামাটা হলো ফিরে যাওয়া। ভাটার মতো, জল সরে যাচ্ছে, নুড়ি বেরোচ্ছে একটু একটু করে, প্রথম চলার আগের জায়গায়, যে-চলা ছিল জন্ম, যা সব শুরু করেছিল তোমার সম্মতি ছাড়া। সাধারণ নিয়মে।
আর তা-ই হয়ে আছ তখন থেকে। কতদিন, মাস, ধরো, বা বছর বা বছরের পর বছর। গুনছো না, আঙুল কুঁকড়ে আছে কোলে, যত কিছু বন্ধ করেছ, তার মধ্যে একটা।
৩।
সকাল। সকাল যদি হয়, আলো আসছে জানালায়। ঠান্ডা। ধূসর। নির্বিকার। গতকাল যেমন এসেছিল, আগামীকালও তেমন আসবে। একই জিনিস বার বার, চাকা নয়, মাটি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আছ। তার পেছনে সেই গুনগুন, সবসময়, মৃত্যুর গুনগুন। অভ্যেসে ভুলে যাও, থামলেই কানে আসে।
বেছে আসে না, ডেকে আসে না। অতিথি, ডাকোনি, এসেছে, ফেরাতে পারো না, ঘর চাইছে বলে নয়, ধূসরকে আরেকবার দেখাতে হবে বলেও নয়। আলোর কোনো বাছাবাছি নেই, সকালেরও নেই, এটাই ওদের সুখ, ওরা যা করে, তা-ই করে। জানা ছাড়া যে করছে, আলো জানে না, সে আলো; সকাল জানে না, সে সকাল, শুধু আসে।
সেই একই ঘরে একই ছাদে একই ফাটলে যা একটু একটু বাড়ছে। কেউ খেয়াল করুক বা না করুক, গতকালের ধূসরই আজকের ধূসর, আগামীকালেরও হবে।
আলো পড়ে সবার ওপর গতকালের মতোই, পড়বে তুমি না থাকলেও, তোমার চেয়ার খালি থাকলেও। নতুন করে নয়, ফেরায় না সে, চুপ, শুধু পড়ে, যে-শূন্যটা বদলায় না, তার ওপর, যে-ঘর বদলায় না, তার ওপর, তোমার ওপর, যে বদলাও না। যদিও আলো পড়ে রোজ সকালে, যেন বদলাতে পারো, যেন এবার একটু নড়বে হয়তো।
বসে আছ বা শুয়ে; না বেছে, শরীর শ্বাস নিচ্ছে না বেছে, সব কিছু না বেছে, এটাই অবস্থা। মুক্তি না বন্দিত্ব ঠাহর হয় না, বাছাই না বাছাই না-থাকা, আলো বাছে না পড়তে, হৃৎপিণ্ড বাছে না ধুকতে, তুমি বাছো না চালিয়ে যেতে। উপায় নেই তো, চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তোমার আর কিছু করার নেই।
সকাল এটাই। প্রতিটা সকালই এটাই। গতকালও ছিল, আগামীকালও হবে। সূর্য উঠছে না বেছে একই ঘরে, এটুকুই সব।
কাচের ওপারে সমুদ্র, স্থির বিশাল, যা করার, তা-ই করছে, মানে কিছু না বা সব কিছু। কোথা থেকে দেখছ, তার ওপর। তুমি দাঁড়িয়ে নেই, শুয়ে আছ বিছানায় কুঁকড়ে, হাঁটু বুকে টেনে, কম্বল গায়ে, টেনে দাওনি, নিজে থেকেই একটু একটু করে ধৈর্য ধরে বসে গেছে নিচের শরীরের আকৃতিটা, খুঁজে নিয়ে তার খাঁজে খাঁজে।
একটা সময় ছিল। জেগে ওঠাটা তখন ঢাকা থাকত অভ্যেসে। অভ্যেস, যে প্রতিটি সকালকে কাপড়ে মুড়ে রাখত। চোখ খোলামাত্র যা আসে, ঠান্ডা বাতাস, আবার জেগে থাকতে হবে, এটা। চাপা থাকে, নিয়মের দয়ায় সহ্য করা যায়।
অ্যালার্ম, ওঠা, ধোয়া, পোশাক, চা, সিঁড়ি, রাস্তা, বেরোনো। একটা একটা ধাপ, একটা একটা ঢাল, যন্ত্রের মতো, না জেনে, জেগে থাকার ভয়ের বিরুদ্ধে, এখানে আলোতে থাকার ভয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো।
অভ্যেসই বর্ম—ক্ষতের ওপর যে পুরু চামড়া জমে, ক্ষত ভুলে যেতে দেয়, সারায় না, কোনোদিন সারায় না, শুধু ঢেকে রাখে, ঢাকাটাই সারানো, বার বার করা ভঙ্গির মোটা চামড়ায়।
আর অভ্যেস ভাঙলে, নিয়ম থামলে, ওঠা না হলে, যাওয়া না গেলে, চামড়া খুলে আসে, টানলে যেমন খোসা ওঠে, তেমন, আর ক্ষত সেখানে যেমন ছিল, তেমনই, কাঁচা তাজা প্রায় রক্তমাখা, এতদিন পরে খোলা হয়ে নিজেই চমকে উঠেছে, হাওয়া লাগছে গায়ে।
জানার ক্ষত, এখানে থাকার ক্ষত, জেগে থাকার চিরকালের শাস্তি। অভ্যেস লুকিয়ে রেখেছিল, থামা দেখিয়ে দিয়েছে। এখন রোজ সকালে ক্ষতের মধ্যেই শুয়ে থাকো ঢাল ছাড়া অবশ করা ছাড়া কাঁচা আলোতে, যা চামড়া পোড়ায়, অভ্যেস যা থেকে বাঁচিয়ে রাখছিল, সেটা এখন পুরোটা টের পাচ্ছ। সব কিছুটা, পুরো ভারটা, এখানে থাকার, জেগে থাকার, যে-জানে-আর-থামাতে-পারে-না, সে হবার।
ভারটা কম নয়, অভ্যেসের দিনে বিশ্বাস করতে না, কত ভারী থাকাটা করা থামলে, কত তীব্র নীরবতা কানে ভোঁ ভোঁ করে শব্দ থামলে, কত উজ্জ্বল ধূসর চোখ সইতে পারে না এত ধূসর রং থামলে।
থামা দেখিয়ে দিয়েছে চলা কী লুকিয়ে রাখছিল। আসল পৃথিবী, ঢাল ছাড়া, আর আসল পৃথিবী দেখা গেল অসহ্য, চোখ-ধাঁধানো রকমের ফাঁকা। প্রায় অসহ্য, পুরো না। সহ্য করে যাচ্ছ, সহ্য ছাড়া তো আর কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না, সহ্য করাটাই চালিয়ে যাওয়া আর চালিয়ে যাওয়া চলতেই থাকে।
শরীরের আকৃতি আছে, পছন্দ হোক বা না হোক, জায়গা নেয়, দম নেয়। চাইতে জায়গা না নিতে, সেই জিনিসটা হতে, যে জায়গা নেয় না। ফাঁক, না-থাকা, ঘরের যেখানটায় কিছু নেই, সেটা। কিন্তু শরীর রাজি নয়, থাকবেই বলে জিদ ধরেছে, ভারী ঘামের গন্ধসমেত, বাতাসে নিজের ভাগ নেবেই। আলোতে নিজের অংশ, সরু বিছানায় নিজের জায়গা।
তাড়াতে পারো না ওকে, ভেতর থেকে চেষ্টা করেছ, শরীর দিয়ে নয়, জোর তোমার হয় না শরীরের বিরুদ্ধে, না কারও বিরুদ্ধে। জোরে ইচ্ছে লাগে, ইচ্ছে তোমার নেই; ইচ্ছেটাও তো একটা করা।
চলে যাবার প্রথম দিকেই গেছে ইচ্ছে, তারপর আগ্রহ, তারপর মত, তারপর পছন্দ-অপছন্দ, একটা একটা করে বিদায় নিল অতিথিদের মতো, একজন একজন করে দরজার দিকে এগিয়ে, সবার শেষে গেল ওদের ফিরে পাবার ইচ্ছেটা; হ্যাঁ, তা-ও গেল।
এখন শুধু ঘর আছে, বিছানা, শরীর, ধূসর আলো, সমুদ্র। এটুকুই।
পা নামাও বিছানার ধার দিয়ে। শরীরের প্রতি একটু ছাড়, যাকে খালি হতে হবে, তোমার সাহায্য ছাড়াই। হয় বা ধরো একটু সাহায্যে, যেখানে সেটা করা হয়। ছোটো ঘর, ঠান্ডা, পাথরের মেঝেতে পা শিরশির করে। সেখানে যাও, ঘরের পাশের ছোটো ঘরটায়, একটা বাটি চিনামাটির, চিড়-ধরা, একটা কল, যা থেকে জল ঝরে ফোঁটায় ফোঁটায়, একটা নালা। এটুকুই যথেষ্ট।
শরীরের দেখাশোনা করো, যেমন দারোয়ান বাড়ি দেখে ভালোবাসা ছাড়া, উৎসাহ ছাড়া, বকুনিও না দিয়ে। শরীর নিজেই নিজের দেখাশোনা করে। তুমি শুধু দেখছ।
কল ঘোরে, জল পড়ে, বাটির ওপর কাচে মুখটা দেখা যায়। চেনো এই মুখ, বা চিনতে, বদলেছে, নাটক করে নয়, অন্য কেউ থাকলে বলত না, বদলেছে, অন্য কেউ নেই, কিন্তু তুমি দেখতে পাও।
ঢিলে-হয়ে-আসা, বসে-যাওয়া, মাংস হাড়ের দিকে নেমে আসছে আস্তে আস্তে, মাটির টানে, যেমন হয় বাড়ির ভারা খুলে নিলে আর দেখা যায়, কতটুকু নিজের জোরে দাঁড়িয়ে আছে।
আর বোঝো, ভারা কী ধরে রেখেছিল। বেশি কিছু নয়, একটা দেয়াল, তাতে একটা জানালা, যার ভেতর দিয়ে কিছু একটা বাইরে তাকিয়ে আছে ক্লান্ত চোখে।
তুমি না অন্য জিনিসটা, মুখের পেছনে যা বসে আছে, তুমি কি না কে জানে, তুমি বলে দাবি করে কোন প্রমাণে, কোনো প্রমাণে নয়, শুধু সেখানে আছে, এটুকুই। যেটা প্রমাণ নয়, অবস্থান মাত্র, আর কিছু নয়।
আবারটুকুই জীবন: পাঁচ
লেখাটি শেয়ার করুন