১। পোড়া চাঁদের গান
রাঢ়ের মাটি তার মধ্যে এমন এক টান রাখে, যা মানুষকে সহজে ছেড়ে দেয় না। সে মাটি পায়ের সঙ্গে লেগে থাকে, যেমন আঠা লেগে থাকে, যেমন ভালোবাসা লেগে থাকে, আবার কখনো যেমন অনিচ্ছাও পিছু ছাড়ে না। গভীর রাতে এই মাটির ওপর একা হাঁটতে হাঁটতে নিজের পায়ের শব্দও নিজের কাছে অপরিচিত মনে হয়, যেন অন্য কারও পদধ্বনি শুনছি। সেই অচেনা শব্দ প্রকৃতির নিভৃত অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
বাঁশবনের ভেতরে ঢুকলে রাত যেন আরও ঘন হয়ে ওঠে; মনে হয়, বাইরের জগত থেকে আলাদা এক আবরণ নেমে এল। তখন পালাগান শুরু হলে কথকের কণ্ঠে আর শুধু তার নিজের স্বর থাকে না, তার ভেতর অন্য এক জীবন, অন্য এক সত্তা কথা বলতে শুরু করে। গল্পের ভেতরে ঢুকে সে এত গভীরভাবে ডুবে যায় যে, আর আগের মানুষটি হয়ে ফিরে আসতে পারে না।
আবার কীর্তনের ডাকে মানুষের চলার পথও বদলে যায়। এক পথ থেকে আরেক পথে, এক অনুভব থেকে আরেক অনুভবে, সে বুঝে ওঠার আগেই সরে যায়। এ এক অন্তর্গত রূপান্তর। এরই মধ্যে আকাশে অমঙ্গলের লাল চাঁদ উঠেছে, কিন্তু তা দেখার কেউ নেই। আর যখন গান শেষ হয়, তখন কথক নিজেই আর নিশ্চিত থাকতে পারে না, সে এখনও এই জগতে, এই মাটিতে, নিজের শরীরে স্থির হয়ে আছে কি না।
২। শাপের আগে
বধির বালকটি দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। বাতাস তাকে ধাক্কা দেয়, তবু ফেলে দিতে পারে না। তার কররেখায় নদীর কোনো চিহ্ন নেই; অথচ অন্তরে সে পাথরকে তেমনি চিনে, যেমন নদী নিজের স্রোতের গোপন স্পর্শে পাথরকে চিনে নেয়।
অন্ধ মেয়েটি কালো জলে প্রদীপ ভাসায়। কোনো নিষিদ্ধ ফলের গল্প সে জানে না; শুধু জানে, জলের একটি ঠান্ডা আছে, যা হাতের তালুতে ঢুকে পড়ে, আর সেই ঠান্ডার বুকেও আলো ভাসানো যায়। প্রদীপটি কোথায় যায়, সে দেখতে পায় না। কিন্তু জলের শব্দ বদলে যায়; আগুনের কাছে এলে জল যেন একটু অন্যরকম ভাষায় কথা বলে।
এদের অভিশাপ দিলে সেই অভিশাপ কার কাছে পৌঁছয়, তা বোঝা যায় না। বধির কানে শাপের শব্দ পৌঁছয় না, অন্ধ চোখের সামনে অভিশাপের কোনো মুখও নেই। শুধু রাত নামে। জলের ওপর, অন্ধকারের ভেতর, একটি আলো এখনও কোথাও এগিয়ে চলে।
৩। নদীর নাম নেই
মাঝনদীর ভাষাহীন জলের ওপর নৌকাটি দুলে চলেছে। বাবা যেন নৌকাটি চালান না; নৌকা নিজেই জানে তার গন্তব্য, জানে কোন শরবন এড়িয়ে যেতে হয়, কোন ঝোপ পাশ কাটাতে হয়। চরের উঁচু-নিচু গোপন শরীর জেগে আছে। আর এই জলের নিচে কী যে জন্মায়, কী যে বেড়ে ওঠে, তা অদৃশ্য আবাদ হয়ে রয়ে যায়।
জেলেপাড়া থেকে তামাকের ধোঁয়া উঠছে স্তরে স্তরে, যেন কোনো অদৃশ্য হাত পুরোনো বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছে। কালোবাঁশের শ্যাওলার তলায় কী আছে, তা শুধু কীটের জানা, অথবা কীটেরও নিচের কারও। জেলেরা তা জানে না; তারা শুধু জানে, জল কতটা গভীর হলে মাছ লুকিয়ে পড়ে।
আরমানি গির্জার ঘণ্টা বাজলে সময়ের প্রহর গোনা যেত, যদি হাত মুক্ত থাকত। কিন্তু হাত বাঁধা। তাই আর সময় নয়, শুধু অনুভব করি, কতটা জল, কতটা আঁধার। সেই আঁধারের গভীর তলায় গোপনে ছড়িয়ে আছে চোরা আঙুরের শেকড়; তারা মানুষের স্বাদ, মানুষের অনুভব, কিছুই চেনে না।
৪। নীল সোয়েটার
সিঁদুরে মেঘের হলুদ ডানা চিরে কিছু-একটা সেই রাতে ফিরে যাচ্ছিল। তখন বোঝা যায়নি, সেটি কী। পরে বুঝেছিলাম, সেটি ছিল শেষ তুষারপাতের আগের সেই মুহূর্তটুকু, যখন জল জমে আসে, কিন্তু এখনও বরফ হয় না। এই দুই অবস্থার মাঝের যে-ক্ষণ, তার কোনো নাম নেই।
বিয়ের বাক্সের চাবি হারিয়ে গেছে। আমি যে-শব্দ তুলেছিলাম, তা ঘরের ভেতর প্রতিধ্বনির মতো ঘুরে শেষে বাইরে মিলিয়ে গেল। তারপর তুমি দোরে দোরে ঘুরে একখানা নীল সোয়েটার এনে দিলে। কিন্তু কাঁটাতারের ধারের জীবন, শ্রমশিবিরের ধূসর আলো, সবই সেই নীল রংকে বদলে দেয়; সেখানে সোয়েটারটি আর আগের মতো নীল থাকে না।
সারাটা দুপুর কাঠের ডান পা টেনে হাঁটতে শেখা। তারপর আবার, তারপর আবার। শেষ বিকেলে দু-চোখ বন্ধ। পায়ের তলার মাটি ঠিকই বুঝিয়ে দেয়, কোন দিকে পথ, কোন দিকে ঢাল।
৫। শেষ পাখা
লঘু-সংগীতের সুর ভেসে উঠতে উঠতে এমন এক দেশের কথা মনে পড়ল, যে-দেশ আসলে কোনোদিন ছিলই না। ভেনিসের গ্রীষ্ম, শ্বেত প্রহরীর টানা চোখ, আর জন্মের ভাগ্যে জোটে বৈদ্যনাথধাম। এইসব মিলিয়ে সে এক অদ্ভুত, অসম্ভব ভূগোল।
অভিধানের একটি পাতায় মরা পাখার ছবি। সেই পাখা আর নড়ে না, তবু তার স্মৃতি বাতাসকে জানিয়ে দেয়—একদিন এখানে কিছু উড়ে গিয়েছিল। গর্ভে ফিরে যাবার ইচ্ছেটা দিনের শেষে রাঙা মুকুলের মতো থেকে যায়; তা না ফোটে, না ঝরে।
মাতৃসদনের জ্বর, তুলো, গজ, কাঁচা নর্দমার গন্ধ, এসব বুকের মধ্যে বছরের পর বছর থেকে যায়। সেই পথের ধুলো এখনও গায়ে লেগে আছে। শেষ পাখিটির পাখা ছিল, বাতাস শুধু এইটুকুই মনে রেখেছে।
৬। শরণার্থীর ঈশ্বর
অন্ধ যদি বাকল খুলে নেয়, আঙুলের ডগায় যে-ছাল উঠে আসে, তা কী বলে? রাতে তোমার আকস্মিক ঝাপটায় হাত ছুঁয়েই সে চোখ পেয়েছিল। শরণার্থী তাঁবুতে রাত মানে শুয়ে থাকা নয়; রাত মানে প্রতিটি নিঃশ্বাস আলাদা করে গোনা, একটির পর আরেকটি।
রাজপথে ধুলোর ওপর ধুলো ঝরছে। একটি প্রদীপ জ্বলছে; কীসে জ্বলছে, বোঝা যায় না, তবু জ্বলছে। তোমাকে ‘জল’ বলে ডেকেছিলাম। হাতের প্রদীপটি নামিয়ে মাটিতে রেখে দিলাম।
তা আর জ্বলেনি; শুধু একটি রেখা রয়ে গেল। নিঃশ্বাসের পরে নিঃশ্বাস। একই চালে বৃষ্টি, একই চালে বসবাস। লজ্জা পেতে শেখার পর চালের ভেতরে ঈশ্বরের যে-স্থান ছিল, সেখানে অন্য কেউ এসে বসে।
৭। নিভন্ত কবিতা
কবিতার হাতে পাঁচপয়সা। নিঃসাড় ধুলোয় লেখা অক্ষরগুলোর গায়ে জল নেই, লাভা নেই, কোনো অভিশাপও নেই; আছে শুধু ধুলো, যা উড়ে যায়। পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ পাড়ের কাছে এসে থামে; নদী তা শুনেও মনে রাখে না।
যে-কবিতাকে মৃত বলে মনে হয়, তার ঝুমকোও যেন এখনও কোনোভাবে দৈনন্দিনতার মধ্যে টিকে থাকে। ভিখিরিবাজারে ব্যাকরণ অনাদরে পড়ে থাকে; সেখানে আজ, কাল, পরশুর তফাৎও গুলিয়ে যায়। তবু কারও মনে হয়, অঘ্রাণের গন্ধ এখনও শহরের ক্ষয়িষ্ণু তলানিতেও বেঁচে আছে। কিন্তু আরেক দূর, শুচি সৌন্দর্যের কাছে এই কাঁচাপাকা প্রাণ আজও অপরিচিত।
খেয়া পাঁচপয়সায় পার করে দেয়। ওপারে পৌঁছলে এপার দেখা যায়; ফেরার ভাড়া থাকে না।
৮। শেষের দায়
কখনো মনে হয়, আমি ভিড়ের মধ্যে একটি সাধারণ কণ্ঠমাত্র। আবার বার বার ফিরে আসি মাটির মানুষের জীবনে, শ্রমে, টিকে থাকার লড়াইয়ে। তারপর এমন এক বন্দিজীবনের মুখোমুখি হই, যেখানে চোখ আর আনন্দ বা বিস্ময়ের জন্য নয়, শুধু অন্ধকারের গভীরতা মাপার জন্য ব্যবহৃত হয়।
কখনো শৈশবের দুষ্টুমি, পালিয়ে বেড়ানো, সামান্য সম্বল নিয়ে বেঁচে থাকার দিনগুলি ফিরে আসে। আবার বার বার হৃদয়ে প্রেমের আঘাত লাগে। মানুষ নিজের লোভ, অন্ধতা ও অবক্ষয়ে নিজেই নিজের জন্য নরক বানায়; বিপর্যয়ও প্রায়ই সময়ের আগেই এসে পৌঁছে যায়। কখনো জীবন কেবল শ্রম, টিকে থাকার জন্য জল তোলা; আবার কখনো মনে হয়, সবশেষে বাকি আছে মাত্র এক শেষ চেষ্টা।
শেষপর্যন্ত মনে হয়, আমি ফিরে যাচ্ছি—এক বৃহৎ পরাজয়, ক্ষয় ও হারানোর ইতিহাস বুকে নিয়ে।
৯। জলের লেখা
শেকলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সদ্যকাটা লোহার তীব্র গন্ধ। তুমি এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছিলে, যেখানে মানুষ কেনাবেচার বস্তু হয়ে যায়, এবং একসময় সেই নিয়তির কাছেই নিজেকে সমর্পণ করেছিলে। সেই যাত্রাপথের নদীর শব্দ এখনও মনে বাজে, যদিও বাস্তবে সেই নদী আর নেই।
এক ঝড়ের দিনে দূরের যুদ্ধও যেন আমাদের খুব সাধারণ জীবনের ভেতরে এসে মিশে গেল। বাসি কাগজে মোড়া পেঁয়াজকুচি আর চপ, কাকু-জেঠুদের উৎকণ্ঠা, মেয়েদের স্কুলে ছুটি হয়ে যাবে কি না, এইসব ছোটো ছোটো দৃশ্যের মধ্যে জীবন কেটে যাচ্ছে। ফেরার পথে সংঘে ঢাক বাজে, আর বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ একে অন্যের কাছে কিছু চায়; কখনো ক্লান্তি, কখনোবা আশা।
লিপি, এসো। যে-জিনিসকে তুমি একসময় ধ্বংসের জলে ভেসে যাওয়া ভেবেছিলে, সেটাকেই হয়তো পরে নতুন কাজে লাগানো যায়। হাসিমুখের ভাষায়ও ফাঁদ নেমে আসে। ভাষার যে-ঘাট একসময় ডুবে যায়, সেখানে প্রথমে সব কিছু ঘোলা লাগে; কিন্তু পরে জল পরিষ্কার হয়ে যায়, আর মানুষ পুরোনো ঘাটের কথাও ভুলে বসে।
শরণার্থীর ঈশ্বর: এক
লেখাটি শেয়ার করুন