গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: তিন



২।

থেমে গিয়েছিলে। এখান থেকে শুরু করো। শুরু বলে কিছু থাকে যদি।

কেউ চাইছিল না তোমাকে। কোথাও না। কেউ না। তোমার আকৃতির ফাঁকা জায়গা পৃথিবীতে ছিল না কোথাও। তুমি সরে গেলে, জায়গা বন্ধ হয়ে গেল। জলে আঙুল ডোবাও, তোলো, জল মনে রাখে না। আঙুল রাখে।

হতাশা নয়। পরাজয় নয়। আরও নীরব একটা-কিছু। ঘরের কোণে ধুলো জমে, কেউ টের পায় না। সন্ধের আলো কমে আসার মতো এসেছিল বোধটা। তোমাকে কারও লাগে না। কোথাও।

একটা নাম ছিল, বা ছিল বলে মনে হতো, নাম নিজে কিছু নয়, আওয়াজ শুধু, বাতাসে কাঁপন, জন্মের মতোই, না চাইতেই পাওয়া। তোমার গায়ে সেঁটে-দেওয়া, অন্যদের সুবিধের জন্য। জিজ্ঞেসও করেনি কেউ, অন্য শব্দও চলত, বা কোনো শব্দই নয়। নামটা দুর্ঘটনা, সব নামই।

এটা যখন দেখা গেল, সত্যি সত্যি, ঘুম ভেঙে যেমন বোঝো, কোথায় আছ, তখন থামাটা এল, সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়, সিদ্ধান্ত তো বিলাসিতা; এল চেনার মতো করে। তোমাকে কিছুমাত্রও চায়নি কোনোদিন, সেটা সত্যি। তখনও। এখনও।

থামার আগে ছিল চলা, রোজকার সেই চলা। চোখ খুললেই ওঠা। বেরোনো। যা করতে হয় করা। ফেরা। আবার ওঠা, যন্ত্রের মতো, চাকার ভেতরে। দৌড়োচ্ছ, জায়গায় আছ।

জানতে না তখন, চাকা ঘুরত। ঘুরত, ঘুরত, ঘড়ঘড় করে সকাল থেকে সন্ধে। তুমি চাকা ঘোরাতে, না চাকা তোমাকে ঘোরাত, সেটা কোনোদিন পরিষ্কার হয়নি। তুমি থামলে, চাকা চলতে লাগল, এখনও চলছে তোমাকে ছাড়া। তোমার অভাব পড়েনি কারো, চাকার তো ওসব নেই, ওরা ঘোরে, এটুকুই বোঝে, তোমার আগেও ঘুরত, পরেও ঘুরবে।

তুমি কিছু যোগ করোনি, শুধু নিজেকে বিয়োগ করেছ, অঙ্কটা এর চেয়ে সোজা হয় না। তোমাকে বাদ দাও। যা পড়ে থাকে, সেটা আগে থেকেই ছিল, পুরো ছিল, তোমাকে ধরেইনি কখনও। তোমাকে সরালে কিছু বদলায় না। তুমি কোনো পদ ছিলে না অঙ্কে, অঙ্ক তোমাকে ছাড়াই মেলানো ছিল আগে থেকে, আর এখনও তা-ই, বদলায়নি, বদলাবেও না।

সাইকেল ছিল একটা। একটা সাইকেলের কথা বলি, ধরো, সাইকেল, থামার আগের শেষের দিকটায়, চলাটা যখন ভেতরে ভেতরে না-চলা হয়ে আসছিল।

বাড়ির পেছনে অন্ধকার চালায় পড়ে ছিল, রোদ পড়ে না সেখানে। মরচে ধরেছে, হাত দিলে লাল গুঁড়ো ওঠে আঙুলে, ধাতুর তেতো গন্ধ, চেইন ঝুলে আছে মরা সাপের মতো, চাকা চ্যাপ্টা, প্যাডেল নেই। খালি দণ্ডটা বেরিয়ে আছে, কাটা আঙুলের মতো ধাতুর মুণ্ডু হয়ে।

তুমি ওটাকে পেয়েছিলে সেখানে বা ওটাই তোমায় পেয়ে গিয়েছিল। শেষের দিকে জিনিসপত্র অন্ধকারে হাতড়ে যেভাবে একে অন্যকে খুঁজে পায়, সেভাবে, জোর যখন প্রায় ফুরিয়ে আসছে শরীরে।

ঠেলে বের করেছিলে রাস্তায়, চেপে বসতে গিয়ে দেখলে, সিট অনেক উঁচু, শক্ত রোদে-পোড়া চামড়া ফেটে গেছে, বা তোমার পা ছোটো হয়ে গেছে, সেই পা, যা একসময় তরুণ ছিল, ছিল যে-কোনো আসনের জন্য যথেষ্ট লম্বা।

এক পা প্যাডেলে, অন্য পা মাটিতে ঠেলছে। চালানো না, ঠেলাও না। মাঝামাঝি কিছু, চলা আর পড়ে যাবার মধ্যিখানে, কোনটা যে কোনটা বোঝা দায়। তবে এটুকু বলো, চলাটাও একরকম পড়া ছিল, শুধু অন্যদিকে।

সাইকেল হেলছে, তুমি হেলছ, একটা শরীর আরেকটা লোহার শরীরকে জড়িয়ে, হাতল ঘামে পিছলাচ্ছে, দু-জনে মিলে মাতালের মতো হয়ে যাচ্ছ, পৃথিবী যেন বাঁকা হয়ে গেছে। সামনে নয়, কোনোদিকে নয় বলতে গেলে, শুধু হেলা, মাটি নিচ থেকে টানছে, পড়ার আগে যে-হেলাটা থাকে, সেটাই পড়া, মাটি এসে পৌঁছোনোর আগেই।

ঢালু বেয়ে একটু নামলে, সাইকেল তোমায় বইছে, না তুমি সাইকেলকে, বলা মুশকিল। চাকার সেই পুরোনো প্রশ্ন, কে কাকে।

তুমি আর সাইকেল, জড়িয়ে পড়া, সাধারণ নিয়মে, একটা মানুষ আর একটা সাইকেল, যে চালাতেও পারছে না, ছেড়ে দিতেও পারছে না, তাদের মতো।

ফেলে এসেছিলে কোথাও একটা, হাঁটু ছড়ে গিয়েছিল পড়ে, হাতের তালুতে নুড়ির দাগ, রক্ত একটু। শুকিয়ে কালো হচ্ছে, মাটির গন্ধ মুখে। রাস্তায় না খানায় মনে নেই, হেঁটে ফিরেছিলে ঘরে সাইকেল ছাড়া, সাইকেল পড়ে আছে তোমাকে ছাড়া, দু-জনের গা থেকেই যেন বোঝা নামল। স্বস্তি কি না কে জানে।

সেই সাইকেল মরচে ধরছে, যেখানে ফেলেছিলে। চেইন আলগা হচ্ছে, স্পোক পাতলা হচ্ছে, তুমিও যাচ্ছ শূন্যের দিকে। আলাদা আলাদা জায়গায়, অন্য গতিতে, কিন্তু গন্তব্য একটাই। যা-কিছু চলার জন্য তৈরি হয়েছিল আর থেমে গেছে, তাদের সবার একই। মরচে, ধুলো, ভুলে যাওয়া।

গঙ্গায় গেলে গঙ্গা, যমুনায় গেলে যমুনা। শেষে সব সমুদ্র, সব থামাও এক সমুদ্র। আর অপেক্ষা—সেই দুর্গের মতো, যেখানে সৈনিক জীবন কাটায় শত্রুর অপেক্ষায়, যে আসবে না কোনোদিন। সেই অপেক্ষাই তোমার। ফারাক শুধু, সৈনিক জানত, কী অপেক্ষা করছে, তুমি জানো না।

সাইকেলের পর শুধু পা ছিল, তারপর সে-ও একসময় থামল, তারপর শুধু চেয়ার, আর চেয়ার থেকে আর কোথাও যাবার নেই।

থামাটা কেমন করে এল, ভাবো তো। একবারে আসেনি, ভাঙার মতো করে না, ভাঙা নাটকীয়, গর্জন আছে, ধ্বংসের চেহারা আছে। এটা অন্যরকম।

আস্তে আস্তে গতি কমে আসা, হারিকেনের সলতে নামানোর মতো; আলো কমছে কিন্তু নেভেনি এখনও। যে-জোরটা চালু রাখত, সেটা একটু একটু করে ফুরিয়ে আসা।

ঘড়ির মতো ধরো। পুরোনো দেয়াল ঘড়ি, যাকে দম দেওয়া হয়নি। চলে, তারপর আস্তে চলে, টিকটিক ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর, যেন শব্দটা দূরে সরে যাচ্ছে, অন্য ঘরে, অন্য শহরে, তারপর নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে যায়। কোনো নাটক নেই, স্প্রিং ভাঙে না, বিস্ফোরণ হয় না, শুধু নিভে আসা।

কাঁটা স্থির হয়ে আটকে আছে। যে-ঘণ্টায় পৌঁছোতে পেরেছিল শেষ দমটুকু ফুরোনোর আগে। কাঁটা আটকে আছে সেই ঘণ্টায়, আর সেই ঘণ্টাই এখন চিরকাল, মৃত মানুষের চোখ যেমন শেষ দৃশ্যে আটকে থাকে।

তোমার কাঁটাও আটকে আছে একটা ঘণ্টায়, যা পড়তে পারো না। ডায়াল ঘুরে গেছে হয়তো, বা নম্বর ঘষায় ঘষায় মুছে গেছে, বা নম্বর কাকে বলে, তা-ই ভুলে গেছ। যে-কোনোটা হতে পারে, সবকটাও হতে পারে। ঘড়ি থেমেছে, তুমি থেমেছ। তফাত এটুকুই যে, ঘড়িকে কেউ চাইলে আবার দম দিতে পারে।

আর অদ্ভুত ব্যাপারটা, যেটায় নজর যায়, যদিও ‘নজর’ ঠিক শব্দটা নয়। তুমি থামতে থামতে ভেতর থেকে দেখছিলে—নিজেকে, দম ফুরোতে, দম ফুরোতে। দেখাটা থামেনি, শরীর থামলেও চোখ চলেছে। সাক্ষীর ছুটি নেই, জন্মের পর থেকে একমুহূর্তও ছুটি দেয়নি কেউ, চোখ বন্ধ করলেও দেখা থামে না, ভেতরে অন্য পর্দায় চলে।

বল বেরিয়ে যাচ্ছে দেখছিলে, জোয়ার নামতে দেখলে যেমন, বালি ভেসে ওঠে, জল পিছোয়। কাজগুলো খোসা ছাড়ানোর মতো ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে, ভঙ্গিগুলো ভেতরে ফাঁপা হচ্ছে, কথাগুলো অর্থ হারিয়ে স্রেফ আওয়াজ হয়ে যাচ্ছে। শব্দ ছাড়া কিছু নয়। সব দেখছিলে, কিন্তু করার কিছু ছিল না, কারণ দেখাটাই তো ছিল থামার অংশ, বুঝলে, জানাটাই ছিল রোগের অংশ—রোগ যদি বলো তাকে।

হয়তো রোগ নয়, হয়তো ওষুধ। এতটাই নিখুঁত ওষুধ যে, ওষুধের দরকারটা পর্যন্ত সারিয়ে দিল, চাওয়া সারাল, সুস্থ হতে চাওয়াও সারাল, রোগীকে রাখল একদম খালিহাতে খালিচোখে, ভালো হওয়ার ইচ্ছেটুকুও রাখল না।

নিজেকে থামতে দেখেছিলে, দেখা কাজে লাগেনি। দেখা তো কোনোদিনই কাজে লাগে না, দেখাটাই আসল সমস্যা।

ভেতরে যে-জন বসে আছে চোখের পেছনে, সে-ই আদিম দর্শক। সাক্ষী, যে নিজের মাথার ভেতর বসে নিজেকে দেখছে নিজেকে দেখতে। যে সব দেখে, কিন্তু কিছুতে হাত দিতে পারে না, হাত বাঁধা জন্ম থেকে, হাত বাঁধাই তার থাকা, হাল ধরা তার কম্ম নয়, শুধু দেখা।

জাহাজ ডুবুক বা ভাসুক, বন্দরে নোঙর ফেলে পচুক, কোথাও না গিয়ে। আর সেই দর্শক হাত-বাঁধা অবস্থায় একা ডেকে দাঁড়িয়ে বাইরে চেয়ে আছে ধূসরের দিকে, সমুদ্রের দিকে। যে-শূন্য সব কিছু, যেটুকুই আছে।

চেয়ারে বসেই আবিষ্কার করেছিলে এটা, বই থেকে নয়, যদিও বই আগেই বলে রেখেছিল, তুমি বসার অনেক আগে। তুমি দর্শক মাত্র, নিজের শরীরের থিয়েটারে, টিকিট ছাড়া ঢুকে পড়েছ। শরীর হাত-পা নাড়ায়, তুমি দেখো। ভাবো, তুমি নাড়াচ্ছ, ভাবো, তুমি সিদ্ধান্ত নিচ্ছ, ভাবো, তুমি করছ। আর ভেতরের অন্ধকারে যন্ত্র নিজের মতো গুমগুম করে চলছে, দর্শককে এক বারও জিজ্ঞেস করেনি কোনোদিন।

দার্শনিকদের বলে দেবার দরকার ছিল না, তুমি জানতে, শরীর থেকে জানতে, যেটা না চাইতেই উঠত, বসত, খেত, পান করত।

হাত থেকে জানতে, যা তোমাকে না জানিয়ে পাথর তুলত। গরম পাথর, ঠান্ডা পাথর, মসৃণ পাথর। পা থেকে জানতে, যা তোমার অজান্তে সিঁড়ি গুনে যেত একটাও না বাদ দিয়ে।

তোমার আর শরীরের মাঝে যে-ফাঁক, থামা এটাই প্রথম দেখাল, যেখানে তোমার কোনো দাম নেই, কিছু চাও না। চেয়ারে বসে বসেই এসেছিলে এই জায়গায়, যদিও একজন মৃত দার্শনিক, হাড়গোড় কবে মাটি হয়ে গেছে, এরকমই একটা ঘরে বসে বহু আগে বলে গিয়েছিলেন। দাম নেই মানে সবখানে নেই। কিছু চাও না মানে শূন্যই চাও। আর শূন্যই তো পেলে, অবশেষে।

তোমার আগে আরেকজন ছিল, অন্য ঘরে, উনুনের পাশে বসে, সন্দেহ করতে করতে সব কিছু খুলে ফেলেছিল। দেয়াল, উনুন, হাত, চোখ, নিজের আঙুল পর্যন্ত, যতক্ষণ না কিছু বাকি রইল, যাকে সন্দেহ করা যায়, একটা জিনিস ছাড়া—সন্দেহটা নিজে, কারণ সন্দেহটাই তো প্রমাণ যে, কেউ একজন সন্দেহ করছে।

আমি ভাবি, সুতরাং আমি আছি। এ-ই বলেছিল সে, বড়ো আবিষ্কার ভেবে, যেন এই একটা কথায় পৃথিবীর সব কুয়াশা কেটে যাবে, ভোরের আজান যেমন কাটে অন্ধকার, যেন ভাবাটা একটা দড়ি অন্ধকার কুয়োর ভেতর ছুড়ে দেওয়া।

চেয়ার থেকে দেখলে অন্যরকম ঠেকে। দড়িটা ধরেছ, কিন্তু ওটা উদ্ধার নয়। দড়ি ওপরে টানে না, দড়ি জায়গায় ধরে রাখে। শিকল ধরো, গলায় পরানো শিকল। ভাবা মুক্ত করে না, ভাবা যেখানে আছ, সেখানেই বসিয়ে রাখে ভাবতে ভাবতে ভাবতে।

আমি ভাবি, সুতরাং আমি আছি। পুরস্কার—আরও ভাবা। সাজা—আরও ভাবা। একই জিনিস। ভাবা খাঁচা, আমি বন্দি, আছি কুঠুরি, আর চাবি কারও কাছে নেই। আমি ভাবি আর থামাতে পারি না, সুতরাং আমি আছি আর থাকা থামাতে পারি না। প্রমাণটাই শাস্তি আর শাস্তিটাই প্রমাণ, ঘুরে ঘুরে একই জায়গায়।

সে যে-পাথর পেয়েছিল ভিত্তি ভেবে, সেই পাথরেই তুমি বাঁধা। ভাবি, অতএব, আছি—ভিত্তি নয়, ফাঁদ। এটুকু বুঝেছ, শরীরের আগের, ঘরের আগের, ধূসরের আগের। ভাবা যে থাকা প্রমাণ করে, আর থাকা যে থামে না, সেই ফাঁদ।

মন শরীরে বাঁধা, শরীর মনে, কেউ ছাড়া পায় না, দুটোই শিকলে বাঁধা। সুন্দর মোড়কে ঢাকা এক অভিশাপ, সাধারণ নিয়মে, উপহারের মতো যা অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, চিন্তুকদের দেওয়া—তাদের, যারা তা চায়নি।

ওরা বলত, ফাঁকটাই নাকি তোমাকে মানুষ করেছে। পাথর থেকে, গাঙচিল থেকে, সমুদ্র থেকে আলাদা করেছে। ভুল বলত, এখন বোঝো, কতটা ভুল। ফাঁক মানুষ বানায়নি, ফাঁক কিছু-না বানিয়েছে।

পাথরে ফাঁক নেই, পাথর যা, সে পুরোটাই তা তলানি পর্যন্ত, ভেতরে আলাদা কেউ বসে পাথরকে পাথর হতে দেখছে না। গাঙচিলে ফাঁক নেই, গাঙচিল ডাকে আর ডাকটাই সে, ডাক আর ডাকনেওয়ালা এক, ভেতরে আলাদা গাঙচিল নেই, বাইরের গাঙচিলকে দেখছে। শুধু তুমি। মানুষ। ফাঁক শুধু তোমার, চোখের পেছনে আরেক চোখ। মাঝে ফাঁক, চিরকালের, না-ঘোচা।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *