কেটলি, কাপ, কিছু-একটা ভরা বয়াম—চা বলো, বা যাকে চা বলে চালাও, সেই গুঁড়ো। জল ফোটাও—কেটলির সেই গুনগুন, প্রথমে ফিসফিস, তারপর জোর পায়, ঝনঝন, তারপর ক্লিক। থামা। কথা যেমন থামে, মানুষ যেমন, হৃদয় যেমন—একই ক্লিক।
ঢালো, খাও, কাপ রাখো। নতুন দাগ, পুরোনোর ওপর। তোমার দিনগুলোর একমাত্র নথি। গোল গোল বৃত্ত। একটার ওপর আরেকটা। কোনটা কোন দিনের জানো না। দিনগুলো তো একই, শুধু দাগ আলাদা, হালকা বাদামি, চুপচাপ শুয়ে আছে। কাঠের টেবিলে, একটা ঘরে, সমুদ্রের দিকে মুখ, একটা শহরে, একটা উপকূলে, যার নাম বলতে পারতে, কিন্তু বলবে না। কিছু এসে যায় না। কারোই এসে যায় না। শুধু ঘর। আর ঘরও মুখ্য নয়। কিন্তু এটুকুই তো আছে।
আর কী। আর কিছু না।
শূন্যের চেয়ে সত্যি আর কিছু নেই। তুমি এটা বুঝতে না—চলার সময়ে, করার সময়ে, কিছু-একটা খুঁজে বেড়াতে, মনে হতো, চলাটাই তো কিছু-একটার দিকে। কিছু খুঁজতে। আর পেলে কী—শূন্য, আর শূন্যটাই বেশি সত্যি বলে জানান দিল কিছু-র চেয়ে।
কিছু ছিল। ছায়া-মায়া। কাজ। চাকা। চলা আর করা। এসবই ছিল সেই কিছু, আর ফিকে ছিল শূন্যের পাশে, যা শেষমেশ দেখা দিল। কিছু সরতেই শূন্য—ছিলই সবসময়, কিছু-র তলায়, নিঃশব্দে। চিরকালই যেমন থাকে—কিছু সরবে আর শূন্য দেখা যাবে, এই অপেক্ষায়।
গালিচা সরালে যেমন মেঝে বেরিয়ে আসে—ঠান্ডা, শক্ত, যা সবসময়ই ছিল পায়ের তলায়, তেমন। শূন্যই মেঝে, কিছু ছিল গালিচা। আর মেঝে তো ছিলই, যে-কোনো গালিচার চেয়ে বেশি সত্যি। শূন্যের চেয়ে সত্যি কিছু নেই।
কখনো কখনো মনে হয়, ঘরটা তোমার মাথার খুলি। নিজের খুলির ভেতরে বসে আছ, হাড়ের দেয়াল গায়ে ছুঁয়ে। চোখ যে-জানালা। ঘোলাটে। পুরু। আলো ঢোকে, পরিষ্কার দেখায় না, তার মধ্য দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছ, একটা দুনিয়ার দিকে। সত্যিই বাইরে কি না, খুলিরই গড়া। নিজের ধূসর, হাড়ে বানানো, হাড়ের পেছনে যে-অন্ধকার চুপচাপ জমে আছে, তা দিয়ে বানানো।
ঘর খুলির চেহারা নিয়েছে। ওপরটা গোল, নিচটা সমতল। জানালা চোখের গর্ত—দেখাটা বেরিয়ে যায় ধূসরে, বা বেরোয় না, ভেতরেই ঘুরে বেড়ায় দেয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে। ভেতরের দেয়ালে, খুলি যে-ঘর, ঘর যে-খুলি।
ভেতর থেকে বোঝার জো নেই। বাইরে দেখছ, না ভেতরে। সমুদ্র সমুদ্র নয়, খুলির কল্পনা। ধূসরটা জগতের নয়, মাথার রান্না, কিছু বানাবার নেই আর, ছবি তৈরির শক্তি নিভে আসছে। যেটুকু পড়ে আছে, সেটা খুলির নিজস্ব আলো। ক্ষীণ, জোনাকির মতো, জ্বলজ্বল-করা। হাড়ের ভাবনা কেউ ভাবছে না, তবু চলছে। ঘরের স্বপ্ন কেউ দেখছে না, তবু দেখা হচ্ছে।
ভাবো।
বানানো থামলে তখন কী আসে? পুরোনো ক্ষমতা মরে। তুমি জানো, মরেছে। যে-জানাটা নিজেই তো সেই ক্ষমতার কাজ। মানে তাহলে মরেনি, মানে কী, যে মারে, তাকে মারা যায় না, গড়নেওয়ালা গড়া ভাঙতে পারে না।
চেষ্টা করো। একটা সাদা জায়গা ভাবো। ধরো, সাদা, ছোটো, গোল, খুলির মতো, চারদিকে সাদা। ভেতরে দুটো শরীর, শুয়ে, বাঁকা, পিঠে পিঠ দিয়ে, ছুঁচ্ছে না, প্রায় ছুঁচ্ছে। একটার উষ্ণতা অন্যটার গায়ে পৌঁছোচ্ছে মাঝখানের ফাঁকটুকু পেরিয়ে। সেই উষ্ণতা, যা চামড়া চেনে, মুখ চেনে, হাতের পিঠ চেনে। সেই ফাঁক, যা সব শরীরের মধ্যে থাকে, তোমার আর বাকি সব কিছুর মাঝে, কিছুতেই ঘোচে না।
দুটো শরীর সাদার মধ্যে, শ্বাস নিচ্ছে। চাইলে মাপতে পারো। বুক ওঠা, বুক নামা, এক শ্বাসের পর পরের শ্বাসের আগে কতটুকু ফাঁক। তিন গুনো, বা চার। শ্বাস ওঠে, শ্বাস নামে, বুকের কাপড় একটু নড়ে। শরীর বেঁচে আছে, পাশেরটাও বেঁচে আছে। দু-জনেই বেঁচে আছে, পাশাপাশি, চুপচাপ। সাদায়, গোলে, মরে-যাওয়া ক্ষমতার মধ্যে যা মরেও চলছে। সাধারণ নিয়মে, চিরকালের নিয়মে। মরা জিনিসের মতো যা চলতেই থাকে, মরে গেলেও।
কাপ, চেয়ার, টেবিল, কেটলি। আর একটা খেলনা, ধরো, খেলনা, কুকুর। তুলোভরা, বা একদিন ভরা ছিল। কাঠের গুঁড়ো দিয়ে বা তুলো। ভরাট বছরে বছরে নেমে গেছে নিচের দিকে, তাই কুকুরটা একদিকে হেলে থাকে, যেন সে-ও রফা করে নিয়েছে নিজের মতো—মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে, টলমলের সঙ্গে, তুমিও তো তা-ই করেছ।
তিনটে পা, চতুর্থটা হারিয়ে গেছে, তুমি আসার আগে না পরে কে জানে, জানার দরকারও নেই। দাঁড়িয়ে আছে তিন পায়ে। তাকে। বইয়ের পাশে, কোনোদিকে তাকাচ্ছে না। কাচের চোখে কিছু দেখে না, দেখেওনি কোনোদিন। চোখ না ওগুলো, চোখের অভিনয় মাত্র। তোমার চোখও তেমনই আয়নায়। চোখ নয়, ভান।
কুকুর তুমি আসার আগে থেকেই ছিল, তুমি যাবার পরেও থাকবে। আনোনি, আনতেও না এমন জিনিস। খেলনা কুকুর, তিন পা, নেমে-যাওয়া তুলো, কাচের চোখ। ওটা আছে, তাকে। সরাওনি, সরাবেও না। সবচেয়ে সৎ সঙ্গী, পৃথিবীতে যত সঙ্গী পেয়েছ, তার মধ্যে। যে জীবিত থাকার ভান করেনি কোনোদিন, তাই মরবেও না কোনোদিন। চলে যেতেও পারে না, হতাশায় ডুবতেও পারে না।
কুকুর আছে, যেমন সবসময় ছিল, একটু হেলে, কিছুর দিকে না তাকিয়ে। তুমি যেমন তাকাও, কিছুর দিকে নয়। কিছু-না-দেখায় সঙ্গী, তুমি আর কুকুর।
আর একটা পাখি। ধরো, পাখি, গাঙচিল নয়, জীবন্ত পাখি নয়, সবুজ একটা জিনিস, খাঁচায়, তাকে, কুকুরের পাশে, বইয়ের পাশে। টিয়া বলো। জীবিত নয়, ধরো, জীবিত নয়, বা সেইভাবে জীবিত, যেভাবে জিনিসপত্র জীবিত হয়ে ওঠে যথেষ্ট দিন একটা ঘরে থাকলে। টিয়া তৈরি কী দিয়ে? পালক ধরো, রং-করা কাঠ, তার, কাচের চোখ, কুকুরের মতোই। এই ঘরে সবার চোখই কাচের, তুমি ছাড়া। তোমারও তো হতে পারত।
টিয়া তুমি আসার আগে থেকেই ছিল। কুকুরের মতো, ঘরের মতো, সব কিছুর মতো। কারও ছিল আগে—তোমার আগেকার জীবনে, তোমার আগেকার ঘরে। কেউ টিয়া রেখেছিল, তাকে, খাঁচায়, কাচের চোখে। ঠোঁট আছে, লেজ টিপলে খোলে। টিপেছিলে একবার, শুরুর দিকে, যখন টেপা এখনও তোমার তালিকায় ছিল। ঠোঁট খুলল, আওয়াজ বেরুল। কিড়মিড়। কর্কশ শুকনো কিড়মিড়, যেন মরচে-পড়া কবজা খুলছে। কথা নয়, বা এতবার বলা হয়েছে, এমন কথা, এত পুরোনো, এত ক্ষয়ে-যাওয়া, যে-কিড়মিড় ছাড়া কিছুই বাকি নেই।
হয়তো কথা ছিল একদিন, মালিকের জীবনে, যে শিখিয়েছিল বলতে। কী শিখিয়েছিল কে জানে, কিড়মিড়টা যে-কোনো কিছু হতে পারে, নমস্কার বা বিদায় বা মালিকের নাম, যে-মালিক চলে গেছে নিচে, সব মালিকের সঙ্গে।
কিন্তু তুমি মনে মনে ধরে নাও, না বেছে ধরে নাও, কিড়মিড়টা একটা কথা, মানে ফুঁড়ে বেরিয়ে ক্ষয়ে-যাওয়া কোনো কথা। বোধ নিয়ে কিছু-একটা, ইন্দ্রিয় নিয়ে, পুরোনো ঘরের পুরোনো তর্ক, যে কিছুই মনে পৌঁছায় না শরীরের মধ্য দিয়ে না গিয়ে আগেই। টিয়া সেটা বলে, বা কিড়মিড়ই বলে, বা তুমি শুনতে পাও কিড়মিড়ের ভেতরে। শুনতে চাও বলে, আর কিড়মিড় কিছু না বলেও, আর বোধের মধ্যে কিছু-না থাকাটাই তো আছে—খুলিতে, ঘরে, টিয়ার কিড়মিড়ে।
আর এখন ইন্দ্রিয়ও ক্ষয়ে যাচ্ছে, বোধও ফুরিয়ে আসছে—আর যা শেষমেশ পড়ে থাকে, তা কিড়মিড়—টিয়ার, তাকে থেকে, মৃত ভাষায় না থেমে কিছু-না বলে যাচ্ছে, কাউকে না বলেই। সাধারণ নিয়মে। টিয়াদের মতো, যারা বলতে থাকে যা শেখানো হয়েছিল, শেখানেওয়ালা চলে যাবার অনেক পরে, মানে একেবারে চলে যাবার অনেক পরে। কিড়মিড় চলতে থাকে…চলতেই থাকে।
তুমি ওদের মধ্যে থাকো, ভালো সঙ্গীদের মধ্যে, যাদের পেয়েছ। ওরা কথা বলে না, জিজ্ঞেস করে না, দাবি করে না, চলে যায় না, মত বদলায় না। ভালোবাসি বলে তারপর সব কেড়ে নেয় না, হাত বাড়িয়ে দিয়ে হঠাৎ গুটিয়ে নেয় না। তোমার বসে থাকার কোনো বিচার নেই ওদের কাছে—না-যাবার, না-করার।
কাপ চা ধরে রাখে, এটুকুই তার কাজ। তুমি চায়ের যোগ্য কি না কাপের কোনো মাথাব্যথা নেই। যোগ্য—ওপারের কথার, চলার দুনিয়ার, সেখানে সব কিছু অর্জন করতে হতো, সেখানে চা ছিল পারিশ্রমিক। চলার বদলে, করার বদলে। এখানে, ঘরে, কাপ চা দেয় এমনিই, শর্ত ছাড়া, কোনো প্রত্যাশা ছাড়া।
চেয়ার ভার বহন করে গোঙানি ছাড়া, ধন্যবাদ না চেয়ে। টেবিল কাপ নেয় কোনো অভিযোগ ছাড়া। দাগের পর দাগ, বছরের পর বছর, টেবিল সব বহন করে। তোমার দিনগুলোর পুরোটা বোঝা বাদামি গোলে নামিয়ে রাখা, আর বাঁকে না, প্রতিবাদ করে না, কৃতজ্ঞতার দাবি জানায় না।
এই বোবা জিনিসগুলো—কাঠে মাটিতে ধাতুতে গড়া, এরাই সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী। বন্ধুদের চেয়ে বিশ্বস্ত, যারা দরজায় আসা বন্ধ করে দিয়েছে। সেই মেয়েটার চেয়ে বিশ্বস্ত, নাম ডুবে গেছে তলিয়ে, মুখটাও ঝাপসা হয়ে আসছে। শরীরের চেয়েও, যে চাহিদা জানায়।
কাপ কিছু চায় না, চেয়ার কিছু চায় না। টেবিল, কেটলি—ওরা শুধু আছে, ঘরে, তুমি যেমন আছ। কিছুর অপেক্ষায় নয়, কিছু আশা করে নয়, যা আছে, তা দিয়ে যাচ্ছে—যা খুব বেশি কিছু নয়। একটা তল, যেখানে কাপ বসে, একটু উষ্ণতা, যা হাতে আসে, একটা ধরে রাখা, যা ভেঙে পড়তে দেয় না। কিন্তু এমনিই দিচ্ছে, প্রতিদান চায় না, ভালোবাসা ফেরত চায় না।
জিনিসগুলো চায় না, এটাই ওদের অনুগ্রহ। কাপের অনুগ্রহ—সমুদ্র যেমন পাথর ধরে রাখে, তেমনই চা ধরে রাখে। ধরে রাখাটা কোনো দয়া না করে, কোনো ঋণ না চাপিয়ে।
আর তোমার মনে হতে শুরু করেছে, ওদের মধ্যে বসে বসে, মনোযোগের কাজ কি এটাই ছিল চিরকাল? আঁকড়ে ধরার মনোযোগ নয়, চলার দিনের সেই মনোযোগ নয়, অন্যরকম, যে-মনোযোগের কোনো লক্ষ্য নেই, যা আছে, তার ওপর এমনি পড়ে থাকা, আরও ভালো কিছু চাইছে না মন।
কাপ কাপ। ধূসর ধূসর। সমুদ্র সমুদ্র। কিছু যোগ করো না, বাদও দাও না, শুধু তাকিয়ে থাকো। আর তাকাতে তাকাতে খোলে কিছু, জিনিসগুলোতে নয়, ওরা তো আগে থেকেই খোলা, চিরকালই খোলা ছিল। তোমার ভেতরে কিছু খোলে।
একটা ছোটো দরজা। চাহিদা বন্ধ রেখেছিল যেটা, কাজ খিল এঁটেছিল, চলা তালা মেরেছিল। চাহিদা শেষ, কাজ শেষ, চলা শেষ। আর সেই ছোটো দরজাটা, তোমার ভেতরে, খুলতে শুরু করেছে। খুব আস্তে আস্তে, যেন কবজায় মরচে, যেন বহুদিনের জমা ধুলো সরাতে সরাতে। কোনোদিকে নয়, কিছুর উদ্দেশে নয়, শুধু খুলতে। জানালা যেমন খোলে বাতাসের জন্য, কোনো বিশেষ বাতাস নয়, বাতাস।
জিনিসগুলো তোমাকে এটা শিখিয়েছে, না শিখিয়ে। নিজে যা, তা-ই থেকে, অন্যকিছু হতে না চেয়ে। কাপ যে-চা ধরে রাখে আর মদ ধরতে চায় না, চেয়ার যে-ভার বহন করে আর হালকা মানুষ চায় না। জিনিসের না-থামা সততা যা আছে তার প্রতি। এই তো শিক্ষা, যদি কিছু থাকে। এই ঘরে শিক্ষা, যদি কিছু থাকে। যা নেই, শুধু তাকানো আছে, আর আছে খোলা।
সাধারণ নিয়মে। জিনিস খোলে এভাবেই। যথেষ্ট দিন বন্ধ থাকলে একদিন খোলে। যত দিন লাগে।
আবারটুকুই জীবন: দুই
লেখাটি শেয়ার করুন