গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: এক



(বিশেষ কাউকে মাথায় রেখে এই লেখা লিখছি না।)

১।

একটা ঘর। ঘর বললে চলে। চারটে দেয়াল, ওপরে ছাদ, নিচে মেঝে—যা যা লাগে, আছে। স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, পুরোনো কাঠ, সমুদ্রের নুনের আভাস—এসবও আছে। এসব আগেও ছিল, পরেও থাকবে, কে ভেতরে আছে না আছে, ঘরের কিছু এসে যায় না।

এটুকু ধরে নাও। বা ধরে নাও যে, ধরে নেওয়া হলো, মানে আবারও ধরে নেওয়া হলো, যেমন রোজ নেওয়া হয়। আসলে কিছুই ধরে নেবার মতো না, তবু ধরে নাও। চালিয়ে যেতে গেলে কিছু-একটা তো মেনে নিতে হয়। কিছু না থাকলেও।

জানালা। বাইরে সমুদ্র বা যাকে সমুদ্র বলে এদিকে। ধূসর একটা-কিছু—মোহনার জলের মতো; না নদী, না সমুদ্র, না মিঠে, না নোনতা। দুইয়ের মাঝে, টিনের রং—পুরোনো বালতির। মাঝখানটাই সত্যি। নদী আর সমুদ্রের মাঝে যা, সেটাই—সীসার মতো ভারী, ধোঁয়ার মতো আবছা; আসছেও না যাচ্ছেও না; যা করার, তা-ই করে যাচ্ছে, নিজের মতো, মানে টিকে আছে। তুমি তাকাও বা না তাকাও, তাতে তার কী? ও টিকে থাকবে, ওর ধাত জন্ম থেকে ও-ই—চলতে থাকা।

শ্বাসের মতো, বুকের ভেতর যে-ধুকপুক, তার মতো। যেসব তোমার হুকুম মানে না আর মানেওনি কোনোদিন—সমুদ্র মানে না, হৃৎপিণ্ড মানে না। তোমাকে কেউ জানতে চায়নি কোনোদিন, এটা এখন হাড়ে হাড়ে বোঝো। আগে বুঝতে না।

একটা সময় ছিল, যখন মনে হতো, প্রশ্নগুলো সত্যি, উত্তরের দাম আছে। সে সময় শেষ, খেয়াল করার আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আসল জিনিসটা ঘটে পিঠ ফেরানো থাকলে। মনোযোগই অন্ধত্ব—যেদিকেই তাকাও, সেদিকে কিছু নেই। বেশিরভাগ জিনিস এমন। সব জিনিসই এমন। খেয়াল করতে করতেই ফুরিয়ে যাওয়া—চিরকালের নিয়ম।

ঘরে আছ। এটুকু জানো। ইন্দ্রিয়ে যতটুকু ভরসা করা যায়, যা খুব বেশি নয়। কিন্তু যথেষ্ট। এর বেশি তো লাগে না। চালিয়ে যাবার মতো যথেষ্ট। জানার মতো যথেষ্ট নয়, কোনোদিনই ছিল না, কিন্তু চালিয়ে যাবার মতো। যথেষ্ট ধরে নাও।

বিছানা। সরু। কয়েক ইঞ্চি ছোটো, পা বেরিয়ে থাকে শেষ প্রান্তে, ঠান্ডা হাওয়ায়। বাচ্চার জন্য বোধ হয়, বা যে কুঁকড়ে শুতে শিখে গেছে—শামুক যেমন শেখে খোলসের ভেতর, তার জন্য।

তুমি শিখেছ। শেখা কঠিন কিছু ছিল না। শরীর মানিয়ে নিতে পারে, শরীর এদিকে ঢের ওস্তাদ। তোমার চেয়ে ঢের ওস্তাদ, ভেতরে যে-মানুষটা বসে আছে চুপ করে, তার চেয়ে তো বটেই। সে মানিয়ে নেয়নি। কোনোদিনই। সে থেমে গেছে। আর শরীর চালিয়ে যাচ্ছে, মানিয়ে নিচ্ছে, কুঁকড়ে শুচ্ছে, টিকে আছে।

শরীর জানেই না, সে টিকে আছে। এটাই তার শক্তি। তোমার সুবিধে হলো, তুমি জানো, যেটা আদৌ সুবিধে নয়। অবস্থা বলো একে—এমন একটা অবস্থা, যা তুমি বাছোনি, বরং তোমাকে বেছে নিয়েছে, তুমি ‘না’ বলতে পারার অনেক আগে থেকেই। মানে চিরকালই।

চেয়ার। জানালার ধারে। কাঠের। শক্ত। একটু ডানদিকে হেলানো। ওটাও সোজা থাকা ছেড়ে দিয়েছে, এমনিই। দোলে। দোলনা-চেয়ার নয়, কিন্তু মেঝে এবড়োখেবড়ো, পায়া সব সমান নয়। ভর সরালেই চেয়ার নড়ে, পেছনে-সামনে, একটু, খুব একটু। সবচেয়ে ছোটো দোল, যাকে কোনোরকমে দোল বলা চলে। কাঠে কাঠে যে-শব্দ হয়, খুব মৃদু, কিড়িক কিড়িক, সেটুকুই। দোল। দোল। বন্দরের নৌকোগুলোর মতো, ঠান্ডা জলে বাঁধা। যে-দোলনার কথা তোমার মনে নেই, তার মতো।

মন সরে গেলে শরীর যে-দুলুনি দেয় নিজেকে। নিজের একলা আরামে, নিজের মা-ছাড়া ঘুমপাড়ানি সুরে—ঠিক সেই দুলুনি। চেয়ার তোমাকে দোলায়, বা তুমি চেয়ারকে দোলাও। কে কাকে, সে কথা থাক, দোলটাই তো কথা।

যাওয়া আর ফেরা, এদিক আর ওদিক, কোথাও না পৌঁছে, কোনোদিন না পৌঁছে। নড়ার সবচেয়ে খাঁটি রূপ। কোথাও যায় না, কোথাও পৌঁছোয় না, পৌঁছোতে চায়ও না। এতেই তুষ্ট, এটুকুতেই রাজি। যাওয়া আর ফেরা, আবার যাওয়া আর ফেরা, একই জায়গায়, একই জানালায়, একই ধূসর আলোতে। দোল। আবার দোল। আরও। আবার। তুমি বসে থাকো ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বাইরে তাকিয়ে, ধূসর জিনিসটার দিকে চেয়ে। সমুদ্র, যা তোমার মতোই কোথাও যাচ্ছে না।

একবার, শুরুর দিকে, থেমে যাবার ঠিক পরে, যখন ভয় ছিল, শরীর বুঝি জোর করবে, উঠে দাঁড়িয়ে পড়বে, টেনে নিয়ে যাবে আবার সেই চলায়—নিজেকে বেঁধে ফেলেছিলে চেয়ারে। স্কার্ফ দিয়ে, পুরোনো স্কার্ফ; বিছানার তলায় বাক্সে পড়ে ছিল টেপ-মেশিনের পাশে। কার স্কার্ফ, কে জানে। সাতটা হবে বা পাঁচটা। লম্বা। পাতলা। জায়গায় জায়গায় সুতো ছিঁড়েছে। একটায় ন্যাপথলিনের গন্ধ এখনও। বাক্সের ভেতরের বছরগুলো শুকিয়ে জমে আছে কাপড়ে, সময়ের গন্ধ।

নিজেকে বেঁধেছিলে। একটা বুকে আর চেয়ারের পিঠে, একটা কোমরে, দুই কবজিতে হাতলের সঙ্গে। শক্ত করে নয়, ব্যথা দেবার মতো করে নয়। ধরা হচ্ছে, এটুকু গায়ে গায়ে বুঝতে পারার মতো। কাপড় যেমন করে শিশুকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে, মাটি যেমন করে মৃতকে জড়িয়ে রাখে, শীতল হাতে, ধৈর্য ধরে।

স্কার্ফগুলো তোমাকে ধরেছিল চেয়ারে, শরীরের বিদ্রোহের বিপক্ষে, যে-পা হয়তো উঠে দাঁড়াত, তার বিপক্ষে; যে-পা-জোড়া হয়তো হেঁটে বেরিয়ে যেত, তারও বিরুদ্ধে।

বসেছিলে, স্কার্ফে বাঁধা, আর দোলটা তখন আরও ভালো লাগত, স্কার্ফ নিয়ে। কাপড়ের টান নড়ার বিপরীতে, শরীর সামনে ঝুঁকলে পেছনে টান, উঠতে চাইলে নিচে টান। স্কার্ফগুলো তাদের কাজ বুঝত—তোমাকে থামিয়ে রাখা, যাওয়া আটকানো। তোমারও তো কাজ তা-ই ছিল। দু-জনে একই কাজ করছিলে। তুমি আর স্কার্ফ, একই কাজে ব্যস্ত—থাকার কাজে, যে-কাজে শেষ বলে কিছু নেই।

বাঁধন খুলেছিলে শেষে, একদিন। ভয় কেটে গেলে, শরীর যখন আর ওঠার চেষ্টাই করত না। থামাটা পুরোপুরি পেকে গেল, শরীরও মেনে নিল, আর স্কার্ফগুলো ফিরে গেল বাক্সে, বিছানার তলায়, টেপের পাশে। নিজের জায়গায়।

সমুদ্র। কাচের ওপারে। ফিরে তাকাচ্ছে না, তাকায়নি কোনোদিন, অভ্যাসই নেই ওর। জানে না, তুমি আছ। জানার প্রয়োজনও নেই, জানলেও কিছু বদলাত না। ঘরের মতো, চেয়ারের মতো, সবার মতো—যারা কিছু জানে না। তুমি ছাড়া সবাই।

তুমি জানো, আর এই জানাটুকু যদি না থাকত, তাহলে হয়তো বাঁচতে।

টুপি। ধরো, একটা টুপি। টেবিলে, বা বিছানায়, বা মাথায়। কোথায়, ঠাহর হয় না। নড়ে। টেবিলে ছিল, এখন দেখো, বিছানায়। তুমি সরাওনি, হয়তো সরিয়েছ, মনে নেই। টুপির নিজের একটা আলাদা সংসার আছে। বাউলার হ্যাট, কালো, বা ধূসর হয়ে আসছে, কিনারা কুঁকড়ে গেছে বছরের পর বছর হাতে তুলে রাখতে রাখতে—হাত যেমন কাজ করে, না ভেবে।

টুপি বাইরে যাবার শেষ স্মারক, পুরোনো রেওয়াজের—যখন বাইরে যেতে টুপি পরতে, ফিরে এলে খুলতে। বাইরে যাবার কথাটা টুপি মনে রেখেছে, তুমি না রাখলেও। বসে আছে টেবিলে, কাপের দাগের ভিড়ে, মাথার অপেক্ষায়—যে-মাথা আর বাইরে যায় না, ভোলেনি, যেতে পারে না শুধু। টুপি অপেক্ষা করে। অপেক্ষা, থাকো আর না থাকো। টুপির কিছু এসে যায় না।

জুতো। দরজার কাছে দুটো, একটা খাড়া, একটা কাত হয়ে পড়ে আছে, যেন জুতোরাও বুঝে উঠতে পারেনি, না-পরা অবস্থায় ঠিক কেমন করে থাকতে হয়। কতদিন পরা হয়নি—সপ্তাহ বলো বা মাস। চামড়া ধরে আসছে, শক্ত হচ্ছে, আঙুলে ঠেকালে বোঝো, কাঠ হয়ে যাচ্ছে—পায়ের ছাপ মিলিয়ে যাচ্ছে ভেতর থেকে। একদিন জুতোয় গন্ধ করত চামড়ার আর ঘামের, এখন শুধু ধুলোর। জুতো পা ভুলছে, পা জুতো ভুলছে। সব কিছু তো সব কিছুকে ভোলে, শেষমেশ, যথেষ্ট সময় দিলে।

একবার চেষ্টা করেছিলে পরতে, সম্প্রতি বলো বা সম্প্রতি নয় বলো—ডান জুতো ডান পায়ে। পা ঢুকত না। ফুলে গেছে বোধ হয়, বা জুতো শুকিয়ে কুঁচকে গেছে, বা দুটোই। জোর করে ঢোকালে বেরোত না। বিছানার কিনারায় বসে হাঁফাতে হাঁফাতে টানাটানি। জুতো ছাড়তে রাজি নয়, পা ঢুকতে রাজি নয়, দু-জনে মিলে চক্রান্ত করছে বাইরে যাবার বিরুদ্ধে।

ছেড়ে দিলে। খুললে, বা পরেই রেখে দিলে, মনে নেই। এক পায়ে জুতো, আরেক পা খালি। ভাঁড়ামি, কারণ ছাড়া, মঞ্চ ছাড়া, দর্শক ছাড়া, সেই হাসি ছাড়া, যা না হলে ভাঁড়ের পক্ষে দুঃখটাকে বয়ে বেড়ানো যায় না। দর্শক নেই, হাসি নেই, শুধু জুতো দরজার কাছে। একটা খাড়া একটা কাত, আর দুটো খালি পা ঠান্ডা মেঝেতে, কোথাও যাচ্ছে না—কোথাও না। চিরকাল যেমন।

কোট। দরজার পেছনে, হুকে ঝুলছে। লম্বা, ভারী, কালো থেকে সবুজ হচ্ছে, সবুজ থেকে ধূসর—সব কিছু যেমন ধূসর হয়ে আসে। ঝুলছে হুক থেকে, নিজের ভারে একটু একটু নামছে, যে-কাঁধ নেই, সেই কাঁধ থেকে। কোট আকৃতি ধরে রেখেছে নিজের ভাঁজে ভাঁজে, পরার সময়ের আকৃতি, কিংবা বাইরে যাবার সময়ের।

সে সময় তিনটে একসঙ্গেই বাইরের পৃথিবীটা আটকে দেবার বর্ম। আগে জুতো, তারপর কোট, তারপর টুপি। আর বেরিয়ে পড়তে, হাওয়ায়, দুনিয়ায়।

কোট বৃষ্টি আটকাত, বা আটকানোর ভান করত। একটু বেশি লম্বা ছিল কোটটা, পেছনে মাটিতে ঘষত। কাদা উঠত, ভিজে যেত, ঘাস জড়িয়ে ধরত—বাইরে যাবার ছাপ। কোটের আঁচলে আঁকা ছিল, ছাপ কোথায় যেন চলে গিয়েছিলে তার। টেবিলের দাগ যেমন নকশার ভিড়ে হারিয়ে যায়, তেমনই। নাম তলিয়ে গেছে, কিন্তু জলের তলায় পড়ে আছে, মাঝে মাঝে ঝিলিক দেয়।

পকেট আছে। গভীর। হাত লুকোত চলার সময়ে, পাথর জমত অজান্তে, জিনিস হারাত, খুঁজে পেত, আবার হারাত। কখনো একই জিনিস, কখনো আলাদা—রুমাল, মুদ্রা, একটুকরো সুতো। পকেটেরও নিজের ইতিহাস, টেবিলেরটার মতোই। কোট ঝুলছে দরজার পেছনে, হুকে, ঝুলবে এভাবে হুক যতদিন টেকে। কাপড় পাতলা হচ্ছে, সুতো আলগা হচ্ছে, সবুজ ধূসর হচ্ছে। সব কিছু যেমন যায় শূন্যের দিকে, নদী যেমন সমুদ্রে। সাধারণ নিয়মে—অপেক্ষা আর ক্ষয়, নিঃশব্দে, হুকে ঝুলে।

টেবিল। চেয়ার আর বিছানার মাঝখানে, ছোটো, চারকোনা, দাগে ভরা—কাপ রাখতে রাখতে দাগ, বছরের পর বছর। প্রতিটা দাগ একটা কাপ, প্রতিটা কাপ একটা দিন, প্রতিটা দিন একটা বসে থাকা। দাগে নকশার মতো ফুটে উঠেছে, ঠিক নকশা নয়। ছড়ানো। এলোমেলো। মাঝে ঘন। কিনারায় ফাঁকা—কাপগুলো একই জায়গায় নামত, যেন হাত কোনো অদৃশ্য টানে নামত।

অভ্যাসই ধর্ম। নিজে বানানো ধর্ম, কেউ শেখায়নি, কোনো বই নেই। প্রতি সকাল পাথর গড়িয়ে ওঠানো, প্রতি সন্ধে গড়িয়ে পড়া। আর পরদিন আবার, আর তার পরদিন। এই আবারটুকুই জীবন।

দাগের ওপর দাগ—কোনোটা গাঢ় বাদামি যেন গতকালের, তাজা, এখনও চায়ের গন্ধ ধরে আছে কাঠে। কোনোটা ফিকে, বহু আগের, ভুলে যাওয়া সকালের। দাগ মনে রাখে—জোয়ারের দাগ যেমন, জল সরে গেলেও রেখা থাকে।

কোনোটা প্রায় মুছে গেছে। কাঠ গিলে নিয়েছে, শুধু আভাস পড়ে আছে। গুনতে পারতে, গুনতে চাইতে না—চাওয়াটাই তো ফুরিয়ে গেছে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *