এবং, অনেক দিন পর, অনেক ভেবেচিন্তে, অবশেষে কাজটা সে করেই ফেলল। শেষমেশ সব কিছুই সে তার নিজের হাতে নিজেই শেষ করে দিল। হ্যাঁ, নিজের জীবন থেকে অবলীলায় সে মুছে ফেলল পুরো একটা অধ্যায়। অনেক চেষ্টার পর, সে ওখান থেকে বেরিয়ে এল। সে নিজের চোখের সামনেই সম্পর্কটার প্রস্থানদৃশ্য প্রত্যক্ষ করল। দীর্ঘদিনের অভ্যেস থেকে আজ সে পুরোপুরি মুক্ত। কেন এমন করল সে? কেননা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস তাকে খুব বাজেভাবে বোঝানো হয়েছে, তাকে ভালোবাসা যায় না, তাকে বোঝা খুব কঠিন, এমনকী তার সঙ্গে থেকে যাওয়াও প্রায় অসম্ভব! হ্যাঁ, এইসব তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক দিন ধরেই। ছেলেটা তাকে ক্রমাগত আঘাত করে গেছে সুকৌশলে, খুবই নির্দয়ভাবে। অথচ দিনশেষে, ক্ষমাটা চাইতে হতো তাকেই, যেন আঘাতটা সে-ই করেছে! আহত হয় যে, তাকেই যখন মাথাটা নত করে রাখতে হয়, তখন এটা মেনে নেওয়া সত্যিই খুব কঠিন। ছেলেটার অসংখ্য ভুলের দিকে তাকিয়ে থেকেও একবুক অসহায়ত্ব নিয়ে তাকেই বরাবর সরি'টা বলতে হয়েছে। ভুল না করেও তাকেই অপরাধীর মতো কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। সবসময়ই ভয়ে বাঁচতে হয়েছে। ভয়টা যে কীসের, তা সে নিজেই কোনোদিন বুঝতে পারেনি। ছেলেটা সবসময়ই নিজ থেকে তর্কাতর্কির সূত্রপাত করলেও, উলটো তাকেই সবসময় শুনতে হয়েছে, তোমার মধ্যে কোনও ধৈর্য নেই, তোমার মাথায় সমস্যা আছে, তুমি অনর্থকই গায়ে পড়ে ঝামেলা বাধাও, ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব দেখতে দেখতে এবং সহ্য করতে করতে আজ সে নিজের উপরই বিরক্ত, ক্লান্ত। সে সত্যিই আজ আর পারছে না এত কিছু নিতে। তার ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে সব কিছু। অনেক হয়েছে! নিজেকে সে অনেক ছোটো করেছে, অনেক নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করেছে। দোষ না করেও দোষীর মতন বেঁচেছে। আর কত? সত্যি বলতে কী, সে আজ আর চেষ্টা করতেও চায় না। সে নিজেকে আজ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, এতটা কষ্ট ও ক্লান্তি মেনে নেওয়া তার পক্ষে আর সম্ভব নয়। এনাফ ইজ এনাফ! সে তাকে যতটা ভালোবাসত, তার বিন্দু পরিমাণও যদি নিজেকে ভালোবাসত, তবে আজ তাকে এমন বাজে অবস্থায় পড়তে হতো না। না, সে আর কিছুতেই ওই ভুলটা করবে না। তারও অধিকার আছে সম্মান নিয়ে বাঁচার। কী অপরাধ তার!? সে এখন নিজেকে অনেক বেশিই ভালোবাসে, নিজেকে অনেক বেশিই যত্নে রাখে। সে এখন সত্যিই খুব ভালো আছে, সে এখন নিজেকে নিয়ে ভাবে এবং নিজেকে ভীষণ ভালো রাখে। সে আজ নিজেকে সময় দিতে শিখেছে। সে একসময় ভাবত, বেঁচে থাকাটা বুঝি তার জন্য কঠিন হয়ে গেল! আজ তার উপলব্ধি, এত চমৎকার একটা জীবন আরও অনেক আগেই তার পাবার কথা ছিল, যদি বোকার মতন অতদিন তার সঙ্গে থেকে না যেত। 'আরও একটু সহ্য করে দেখি।'---এই ভাবনাটাই তাকে তখন অমন তীব্রভাবে অন্ধ করে রেখেছিল। কিছু মানুষ কখনও বদলায় না, শোধরায় না। এটা যত তাড়াতাড়ি বোঝা যায়, ততই মঙ্গল। হ্যাঁ, পুরোপুরি আগের মতো করে বাঁচতে তার আরও একটু সময় লাগবে, তবে সঠিক পথের দিকে যাত্রাটা দেরিতে হলেও সে শুরু করেছে। এই শুরু করাটাই সবচেয়ে বড়ো কথা। তার যে কষ্ট হয় না, তা নয়। কষ্ট হয়, ভীষণ ভীষণ কষ্ট হয় বাঁচতে। এতদিনের প্রিয় একটা অভ্যেস থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। প্রায় সময়ই সে তাকে মিস করে। তার শুধুই কান্না পায়। কান্না গিলে গিলে বাঁচা কী যে কঠিন, যাকে কখনও বাঁচতে হয়নি ওরকমভাবে, সে এটা কিছুতেই ভাবতেও পারবে না। তবু, প্রতিদিনই কষ্টে মরার চাইতে এক দিনও কষ্টে বাঁচা অনেক অনেক ভালো। সে জানে, সব ঠিক হয়ে যাবে। সে দেখছে, সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। সময়ের উপর আস্থা রাখতে হয়, নিজেকে স্রেফ নিয়তির উপর ছেড়ে না দিয়ে নিয়তকে দৃঢ় করতে হয়। সে আজ অনুভব করতে পারে, সে ভুল পথে চলছিল। সে আজ খুব ভালো করেই জানে, আরেকটু দেরি করে ফেললে সে হয়তো মারাই যেত দম আটকে! যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রথম পদক্ষেপটা নিজেকেই নিতে হয়; আর তা হলো, যন্ত্রণার উৎসটা থেকে নিজেকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও জোর করে সরিয়ে নিয়ে আসা। আর যা-ই করুন, কোনও অবস্থাতেই সেই উৎসের ধারেকাছেও দ্বিতীয় বার ফিরে যাওয়া যাবে না, যতই কষ্ট হোক না কেন! বাকি কাজটা সময়ের। হ্যাঁ, এইসব ক্ষেত্রে, সাহস করে শুরুটা করতে পারলে শেষটা সত্যি সত্যি ভালো কিছুই হয়।
হ্যাঁ, সব ঠিক হয়ে যায়!
লেখাটি শেয়ার করুন
এ জগতে যে কয়েকটা ডাহা মিথ্যা সান্ত্বনা আছে, সেগুলির মধ্যে একটা হলো: একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
আসলে ঠিক হবার সেই একদিনটা যেদিন আসে, সেদিন থেকে নতুন আরেকটা বেঠিক শুরু হয়ে যায়। আমরা আবারও দিন গুনতে থাকি, নিজের মাথায় নিজেই হাত বুলিয়ে বলি: একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
পুরোনো দুঃখগুলো খোলস পালটে পালটে নতুন চেহারা নিয়ে ফিরে ফিরে আসে।
পুরোনো যন্ত্রণাগুলোর চামড়া শুকিয়ে নতুন চামড়ায় নতুন করে ঘা জমতে শুরু করে।
একদিন চলে-যাওয়া মানুষটা ফিরে আসবে বলেও ফিরে আর আসে না, একবার হাসতে ভুলে-যাওয়া মানুষগুলো নতুন করে আর হাসে না, একবার ভেঙে-যাওয়া বিশ্বাসের টুকরাগুলো জোড়া লাগানো আর যায় না, গভীরভাবে পুড়ে-যাওয়া হৃদয়ের ক্ষতের দাগটা সেরে আর ওঠে না।
না, ভালোবেসে বিবাগী-হওয়া মানুষগুলোও নতুন করে ভালো আর বাসে না। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবার কথা বলেও আসলে কোনোদিনই কোনোকিছু ঠিক আর হয় না। যা হারায়, তা হারিয়েই যায়।
একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে যাবে করে কত সূর্য ডুবে যায়, কত দিন গত হয়ে যায়, কত ফুল ফুটে ঝরেও যায়। একদিন সব কিছু ঠিক হয়ে যাবার দিনটাই শুধু আর আসে না।
এই দিনটা আসি আসি করে, করতেই থাকে, আর এদিকে একদিন আমরাই চলে যাই। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবার দিনটা তবু ভুল করেও আসে না। আসেও যদি, তখন যার জন্য সব ঠিক করে নিতে চেয়েছিলাম, সেই মানুষটাই জীবন থেকে হারিয়ে যায়।
তাই বলছি, কিছুই ঠিক হয়ে যায় না, বরং নিজেকেই ঠিক করে নিতে হয়, বাস্তবতা মেনে নিয়ে নিজেকেই সত্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। মেনে ও মানিয়ে নিতে শিখে না নিলে কিছুই কখনও ঠিক হয়ে যায় না।
লিখাটা অনেক ভাল লাগছে