ঈশা খাঁর দুর্গ দিয়ে শুরু। ওখানে দুর্গের অস্তিত্ব ছিল, এটা বোঝার উপাদান বলতে টিলার উপরে ইটের একটা ছোট্ট কাঠামো। স্থানীয় লোকজন জানাল, কিছুদিন আগে সরকারি দপ্তর থেকে এসে কী কী যেন নিয়ে গেছে খোঁড়াখুঁড়ি করে।
খুব কাছেই সেই আমলের একটা মসজিদ, শাহ মাহমুদ মসজিদ, ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত। কাঠামোর গায়ে প্রাচীনত্বের ছাপ সুস্পষ্ট। মিঠে রৌদ্রের গন্ধে কীরকম যেন একটা শান্তি ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। দিল্লির পুরোনো মসজিদগুলির চেহারা মনে চলে আসে। একেবারেই ছিমছাম সবকিছুই, একধ্যানে এখানে দীর্ঘসময় বসে থাকলে অন্তরস্থিত সৃষ্টিকর্তার সাথে কিছু হলেও কথোপকথন হবার কথা।
ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম রঘুনাথ ভবন-এ। বেশ পুরোনো জমিদারবাড়ি। ঘরের ভেতর দেয়ালে দেয়ালে বুড়ো বুড়ো গাছের বেয়াড়া শেকড়ের নকশা ছড়ানো। সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়ে দেখি, একটা ভাঙাচোরা পুরোনো দালানে যা যা দেখা যায়, তার সবই আছে। ইটপাথরের শরীর ভেদ করে সদর্পে বেরিয়ে এসেছে লতা, গুল্ম, বুনোফুলের গাছ... লাগোয়া দালানের উপরিভাগে কিছু মাস আগ পর্যন্ত দুটো বড়ো আকৃতির পেঁচা দেখা যেত, ওরা বলল। পুরো বাড়িটাই দেখতে রাজবাড়ি নয়, বরং গাছবাড়ির মতন।
ঘাটে ট্রলার অপেক্ষায় ছিল। পাকুন্দিয়ার মির্জাপুর বাজার থেকে নিমকি, সন্দেশ, বাদাম, পেঁয়াজ- লবণ-কাঁচামরিচ-সহ আরও নানান খাবার নিয়ে আমরা ট্রলারের ছাদে বসলাম। বিকেলের মিষ্টি রোদ ভেঙে ভেঙে জলের শরীর কেটে ট্রলার ছুটছে টোকের দিকে। নিমকি আর বাদাম, সাথে পেঁয়াজ- লবণ-কাঁচামরিচ। আহা, সে এক অমৃতভোগ! ধুমসে আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়া, সাথে ব্রহ্মপুত্রের বৈকালিক হিমেল রোদ-হাওয়া। ওখানে কোনও মাস্টার ছিল না, ছাত্রও ছিল না। আমরা সবাই ছিলাম বন্ধুর মতো। নিজেকে লুকোতেও হয়নি, মেলতেও হয়নি। আমি ঠিক যেমন, তেমন হয়েই থাকতে পেরেছি পুরোটা সময়। বন্ধুর চোখের দিকে সহজেই তাকানো যায়, যা ভক্তের বা আমাকে নিয়ে নানান জাজমেন্টে আচ্ছন্ন কারও বেলায় কখনোই করা যায় না। আজ ওদের সঙ্গে পেয়ে নদীপথের ভ্রমণটি জমে জমে হয়ে উঠছিল একেবারে ক্ষীর!
টোকের ঘাটে এসে যন্ত্রতরী ভিড়ল। ইউনিয়নের এমন নামটি যিনি রেখেছেন, তিনি কি কবিতা ভালোবাসতেন? যাকগে! নেমেই বুঝলাম, টোকের ঘাট সংলগ্ন এলাকাটি মূলত একটি শিল্পিত চা-পাড়া। তিন নদীর মোহনার ঠিক পাড়ে বসে চায়ের কাপে চুমুকে চুমুকে ধোঁয়া দিয়ে কুয়াশা ওড়াবেন... ভাবুন তো কী দারুণ ব্যাপারটা! নিরিবিলি নামের রেস্টুরেন্ট থেকে ভর্তা-ভাজি-সবজি-ছোটোমাছ, সঙ্গে আচার-সালাদ, শেষে পান... এই মেন্যুতে আহার সেরে নদীর তীরে এসে সবাই মিলে বসলাম। নদী থেকে ভেসে আসছে জলের প্রহারের শব্দ; আর ঝিরিঝিরি হিমেল হাওয়া, কুয়াশার কাছে রৌদ্রের সুখী সুখী পরাজয়, এদিক-ওদিক সবুজের গালিচা। চায়ের সাথে এর চাইতে ভালো টা আর হয় না। এখানে দীর্ঘসময় থেকে যেতে ইচ্ছে করে, এখানে নদীর মুখোমুখি বসে চা-টা'য়ে ডুবতে ইচ্ছে করে, এখানে প্রাণ জুড়োতে বার বার আসতে ইচ্ছে করে। কাছেই এক প্রকাণ্ড বটগাছ। ওর নিচেও অনেক রাত অবধি চায়ের কাপের জমজমাট মিছিল চলে নিয়মিত।
সন্ধে নামছে দেখে সবাই মিলে ট্রলারে চাপলাম। ফেরার সময় শীতের সাথে মজা করার জো নেই। রৌদ্রই তো নেই, আমাদের বাঁচাবে কে? তাই সবাই ছাদের নিচেই বসলাম। দু-একজন নৌকোর গলুইয়ে, বাকিরা বাঁশের মেঝেতে। এবার মাথা আর কান ঢাকতে অনিবার্যভাবেই হুডি উঠল। দু-জন মাঝপথেই নেমে গেল হাঁটুকাদায় লাফিয়ে পড়ে, ওদের বাড়ি ওদিকেই। এরপর আমাদের নিয়ে নৌকো ছুটল মির্জাপুরের দিকে। সন্ধে নামার মুহূর্ত দেখতে সবসময়ই খুব ভালো লাগে, আর তা যদি হয় হিমবিলাসী নদীর বুকে, তাহলে তো সন্ধের হাত ধরে স্বর্গও নামে। জলে জলে চলতে থাকে সন্ধের অবিশ্রান্ত প্রার্থনা।
আগেই ঠিক করা ছিল, চরপলাশের মাজার সংলগ্ন মেলায় যাব। মেলার একধরনের মাদকতা আছে, সেই মাদকতা প্রাণে-আত্মায়-হৃদয়ে কেমন এক মেলা মেলা ঘ্রাণ ছড়িয়ে দেয়। বিচিত্র সব সুরে-বেসুরে বাঁশি বাজে, হাওয়াই মিঠাইয়ের রং এসে এসে চোখে লাগে, নাগরদোলা-সার্কাস-ম্যাজিক বয়স ভুলিয়ে দিতে চায় নিপুণ আবেদনে; ময়দার চালের মাসকলাইয়ের ডালের জিলাপি, আইসক্রিম পিঠা চা পুরি-পরোটা-ডাল-সবজি চিকেন চিংড়ির কাটলেট, জাত-অজাত-কুজাত-বেজাত এবং অবশ্যই সুজাতের মিষ্টির বাহার, খেলনা কসমেটিকস খাবার গয়না... কী নেই এখানে! কাচের চুড়ি দেখে মনটা অনেকক্ষণ ধরে কী এক অচেনা মোহে আচ্ছন্ন হয়ে ছিল... মনে হচ্ছিল... দেরি হয়ে গেছে, বড্ড দেরি হয়ে গেছে, আমার শুধুই দেরি হয়ে যায়...
গাড়িতে চেপে কিশোরগঞ্জে ফিরছি, সবাই মিলে গল্প করতে করতে হঠাৎ মাথায় এল, হোসেন্দী গেলে কেমন হয় খেজুরের রস খেতে! দ্বিধাহীন চিত্তে বিরক্ত ও বিব্রত না হয়ে মস্তিষ্কের উপর কোনও চাপ না দিয়ে একেবারেই সহজভাবে মেশা যায়, এমন মানুষের সাথে তো আমি নরকে যেতেও রাজি, আর সেখানে গাছ থেকে নামিয়ে টাটকা খেজুরের রস খাব না ওদের সাথে সবাই মিলে? এ কী করে হয়! গাড়ি ঘুরিয়ে ছুটলাম হোসেন্দীতে। ওই এলাকার লোকজন ভদ্র ও শিক্ষিত... ওদের এমন আলাপের চেয়ে আমার কাছে জরুরি ছিল, ওখানে এই রাতেও সদ্য-নামানো খেজুরের রস পাওয়া যায়। যে এলাকার মানুষ আমাকে এমন রাতেও আত্মার শান্তি জোগায়, তার চাইতে ভদ্রলোক আর কোথায় আছে?!
গাছির খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে একটি কাঁচাপাকা বাড়ির উঠোনের সামনে গাড়ি থামালাম। দুই যুবক বাড়ির ডানদিকের অংশে খড়ের গাদার দিকে তাকিয়ে কী-একটা জানি নাম ধরে ডাকছিল। ওদিকে ভালো করে খেয়াল করতেই চমৎকার এক অভিজ্ঞতা হলো। খেজুরপাতা দিয়ে এক অস্থায়ী কুটিরে এক লোক গায়ে কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছেন। খুব ছোট্ট একটি কুটির, ওখানে কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢোকা যাবে। মেঝেতে খড় বিছানো, চারিদিকে খেজুরপাতায় নির্মিত উলটো-ভি আকৃতির ছাউনি। ঘরটির এই অভিনব স্থাপত্য সত্যিই দেখার মতো! কিছু সময় তাকিয়ে থাকলে বাবুই পাখির বাসার কথা মাথায় আসে। জিজ্ঞেস করলাম, "ওখানে থাকতে কেমন লাগে? শীত লাগে না?" উত্তর এল, "খুবই আরামের জায়গা! একবার ঢুকলে আর বেরোতেই ইচ্ছে করে না। ভেতরে কোনও শীত নেই, শুধু ওম আর ওম।"
গাছির কথা শুনে ওই প্রাসাদে একটুখানি শোবার লোভ হয়নি বললে মিথ্যে বলা হবে। ঘুম ভাঙিয়ে তাঁকে অনুসরণ করে করে সবাই চললাম সেই গাছের কাছে, যে গাছের রস সবচাইতে মিষ্টি। খেজুরগাছে চড়ার কায়দাটি বেশ শৈল্পিক। তরতরিয়ে গাছে উঠে রসের কলসির মুখ দড়িতে বেঁধে ছুড়ে নিচে নামিয়ে দিলেন তিনি। সেই রসের জাদুতে ওই মেঠোপথের ধুলোয় আমাদের সবার হৃদয়ে যেন নৈশস্বস্তি ভর করল... গাছি ভাইটিকে বললাম, আপনিও একটু খান... উত্তর এল, "আমাকে সবাই আদর করে রসল্লা বলে ডাকে। রস খাওয়াই বলেই তো অমন আদর করে... খেলে কি আর রসল্লা ডাকত?" ... জানলাম, তাঁর চোখে ঘুম নেই, আধোঘুমেই তাঁকে রাত পার করতে হয়। সারারাতই, বিশেষ করে রাত তিনটের পর থেকেই তাঁর ডাক পড়ে আর পড়তেই থাকে অবিরাম... গাছে গাছে চড়তে হবে...
আজ বড়ো তৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফিরলাম। তৃপ্তি নিয়ে ঘরে ফিরতে ঘরের মানুষ লাগে না, মনের মানুষ লাগে... সেই মানুষ ঘরেরই হোক, আর বাইরেরই হোক। ছোট্ট একটা জীবন! সত্যিই কে ভাবে আপনাকে নিয়ে? আপনি কষ্টে কষ্টে একদিন টুক করে মরে গেলেও কার কী এসে যাবে? এসে গেলেও কী লাভ হবে তখন আর? ফিরে আসতে পারবেন? পাবেন আরেকটা জীবন? ... কারও মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে তাই নিজেই নাহয় একটু ভাবলেন নিজেকে নিয়ে!
একদিন তৃপ্তির দিন
লেখাটি শেয়ার করুন