আশা ভোঁসলে ও গজলের অন্তরঙ্গ জগৎ
খবরটা পেয়ে সেই রাতে "দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়" শুনছিলাম। ১২ই এপ্রিল ২০২৬, ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতাল, মুম্বই। আশা ভোঁসলে আর নেই। বয়স হয়েছিল বিরানব্বই। আগের দিন বুকের সংক্রমণ ও তীব্র অবসাদ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন; পরদিন বহু অঙ্গ একসঙ্গে বিকল হয়ে চলে গেলেন। তার পরদিন শিবাজি পার্কে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য সারা হলো।
সবাই তাঁর ক্যাবারে গান, পপ হিট, "ডম মারো ডম" নিয়ে কথা বলছে। আমি বরং তাঁর গজলগুলো নিয়ে লিখি। সেগুলো নিয়ে কথা হয় কম, অথচ সেই গজলগুলোই তাঁর কণ্ঠের সেই জায়গাটা ধরে রেখেছে, যেখানে সাধারণত আলো পৌঁছোয় না।
গজল কী, এবং কেন এত কথা
আরবি শব্দ 'গজাল' মানে প্রেমালাপ, প্রণয়চর্চা, মিষ্টি কথা বলা। একটি প্রচলিত লোককথা আছে যে, শব্দটি এসেছে আহত হরিণীর মৃত্যু-চিৎকার থেকে; সেই শেষ মুহূর্তের ডাক, যেটা বেদনা আর সৌন্দর্যের সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকে। ভাষাতাত্ত্বিকেরা এটা মানেন না বিশেষ, কিন্তু গজলপ্রেমীদের কাছে এই ব্যাখ্যাটাই বেশি প্রিয়। কেন প্রিয়, সেটা বোঝা কঠিন নয়। প্রেমের মিষ্টতা আর যন্ত্রণার চিৎকার একসঙ্গে থাকার যে-ব্যাপারটা, তা-ই তো গজলের প্রাণ।
সপ্তম শতাব্দীর আরব কবিতায় এর শুরু। তখন 'কাসিদা' নামে এক দীর্ঘ, আনুষ্ঠানিক কাব্যরূপ চলত, যা ছিল রাজাদের প্রশংসা, বীরত্বের বর্ণনা, রাজদরবারের আনুষ্ঠানিক ভাষা। কাসিদার শুরুতে একটা অংশ থাকত, নাম 'নাসিব', আরবিতে যার অর্থ নিয়তি বা ভাগ্যলিপি, কিন্তু কবিতায় এটা সেই আবশ্যিক প্রস্তাবনা, যেখানে কবি রাজার প্রশংসায় যাবার আগে একটু থামতেন, যেন দম নিতেন, প্রেমিকার স্মৃতিতে একটু বিলাপ করে নিতেন। আনুষ্ঠানিকতার ভেতর সেটুকু ছিল মানবিক ফাঁকফোকর। সেই বিলাপের অংশটুকুই একদিন আলাদা হয়ে গেল, রাজার দরবার ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল নিজের পথে। আর গজল হয়ে উঠল।
আরব থেকে তা পারস্যে গেল। পারস্যে হাফিজ, রুমি, সাদি গজলে সুফিবাদ ঢুকিয়ে দিলেন। প্রেমিকার ভেতরে ঈশ্বরকে দেখতে শেখালেন, মদের পেয়ালায় আধ্যাত্মিক নেশার স্বাদ ঢাললেন, বিরহকে সাধনার মর্যাদা দিলেন। তারপর দ্বাদশ শতাব্দীতে সুফি সাধকদের সঙ্গে গজল ভারতে এল; মরুপথ পেরিয়ে, পাহাড় ডিঙিয়ে, সওদাগরের গানের মতো। ত্রয়োদশ শতাব্দীর আমির খসরু ফার্সির সঙ্গে হিন্দাভি মেশালেন। হিন্দাভি সেই কথ্য উত্তর-ভারতীয় ভাষা, যেটা আজকের হিন্দি-উর্দুর পূর্বপুরুষ। ফলে দুই ভাষার মাঝখানে একটা নতুন সুর তৈরি হলো। তারপর মীর, মোমিন, গালিব, ফয়েজ উর্দু গজলকে এমন জায়গায় নিয়ে গেলেন, যেখানে একটিমাত্র শের, অর্থাৎ দুই পঙ্ক্তির সেই ছোট্ট কবিতার একক, একটা সম্পূর্ণ মহাকাব্যের ভার বহন করতে পারে। তা পড়ে মানুষ ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারে, কারণ প্রতিটি শব্দের ভেতরে আরেকটি শব্দ লুকিয়ে থাকে।
গজলের গঠনটা সংক্ষেপে বলি। প্রথম শেরটাকে বলে মাতলা, যা উদয়কালের মতো সেই উদ্বোধনী দ্বিপদী, যার দুই পঙ্ক্তিতেই ছন্দমিল থাকে এবং শ্রোতাকে প্রথমেই বলে দেয়, কোন সুরে, কোন মেজাজে আসতে হবে। এই ছন্দমিলকে বলে কাফিয়া, যা শব্দের সেই অন্ত্যমিল, যেটা প্রতিটি শেরের শেষে একটা চেনা ঘরে ফিরিয়ে আনে। কাফিয়ার পর প্রতিটি শেরের একেবারে শেষে ফিরে ফিরে আসে রদিফ, যা গজলের সেই স্থায়ী সঙ্গী, পরিচিত মুখের মতো যাকে বার বার দেখলে ভালো লাগে। শেষ শেরটা মাকতা, যা সমাপ্তির সেই শের, যেখানে কবি নিজের কলমের উপনাম বা তাখাল্লুস রেখে দেন; যেন শিল্পী নিজের ছবিতে সই করলেন, বললেন, এটা আমার, এই কষ্টটা আমার, এই প্রেমটা আমার। মাঝের শেরগুলো প্রত্যেকটা আলাদা বিষয়ে হতে পারে—একটায় বিরহ, পরেরটায় দর্শন, তার পরেরটায় হয়তো রাগ, অথচ পুরো গজলটা একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা থাকে। এই স্বাধীনতাটাই গজলকে আলাদা করেছে সব কাব্যরূপ থেকে। জীবনের মতো—প্রতিটা দিন আলাদা, তবু একটাই জীবন।
সুফি দর্শন ছাড়া গজল অসম্পূর্ণ
গজলের সুরটা কানে ভালো লাগে, কিন্তু ভেতরের দর্শনটা না জানলে শোনাটা অসম্পূর্ণ থাকে। এ যেন ছবি দেখলাম, কিন্তু রঙের ভাষা জানি না।
সুফিরা প্রেমকে বলেন ইশক। আরবি এই শব্দটা সাধারণ ভালোবাসার চেয়ে অনেক গভীর, এটা এমন এক অনুভূতি, যেটা মানুষকে পার্থিব থেকে তুলে পরমসত্তার দিকে নিয়ে যায়। এই ইশক আবার দু-রকম। ইশক-এ-মাজাজি, মানে পার্থিব প্রেম, মানুষে-মানুষে প্রেম, যেটা আমরা চিনি, যেটা চোখে দেখা যায়; আর ইশক-এ-হাকিকি, মানে সত্যিকারের বা ঐশ্বরিক প্রেম, ঈশ্বরের সঙ্গে প্রেম, যেটা ধরা যায় না, কিন্তু যা টান দেয় তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে। গজলের মজাটাই এখানে। কবি কখনও খোলসা করেন না, তিনি কোন ইশকের কথা বলছেন। এই দুটো অর্থ গজলের ভেতরে একসঙ্গে বাস করে, একে অপরের উপর পড়া ছায়ার মতো। শ্রোতা নিজে বেছে নেন, কোনটা নেবেন, এবং সেই বেছে নেওয়াটাই বলে দেয় শ্রোতার ভেতরে কোথায় ক্ষত আছে।
‘ফানা’ হচ্ছে ‘আত্মবিলোপ’। আরবি এই শব্দটা 'নিঃশেষ হওয়া' অর্থের হলেও সুফি দর্শনে এটা মৃত্যু নয়, এটা সেই অবস্থা, যখন 'আমি' আর আলাদা থাকে না, সাধক পরমসত্তায় মিশে যান। জলবিন্দু যেভাবে সমুদ্রে মিশে যায়, তারপর আর খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু সে হারায়নি, বরং বড়ো হয়ে গেছে। রুমির একটা কথা মনে পড়ে: "যুক্তি দরজায় দাঁড়িয়ে ভাবছে, প্রেম ততক্ষণে ঝাঁপ দিয়ে ফেলেছে।"
ফানার পর আসে বাকা। আরবিতে 'অবশিষ্ট থাকা' বা 'টিকে থাকা' অর্থের এই শব্দটা বলে সেই পুনর্জন্মের কথা, বিলীন হবার পর যে টিকে থাকা। সেই পুনর্জন্ম, যেখানে আর আগের 'আমি' নেই, আছে অন্য কেউ, যে আরও বড়ো কিছুর অংশ। বেগম আখতার বা মেহেদি হাসান যখন গাইতেন, এই ফানার ব্যাপারটা ঘটত—কণ্ঠ আর গান আলাদা থাকত না, গায়ক তাঁর নিজের গানে হারিয়ে যেতেন।
সুফি কবিতার প্রতীকগুলো জানা দরকার, নইলে গজলের অর্ধেক অর্থ হারিয়ে যায়। ধরুন, কবি লিখলেন মৈখানায় বসে শরাব খাচ্ছেন। শুনলে মনে হবে নিছক মদ্যপানের কথা। কিন্তু মৈখানা, ফার্সি এই শব্দটায় যে-স্থানের কথা, সেটা কোনো সাধারণ পানশালা নয়, এটা সেই আধ্যাত্মিক মিলনের জায়গা, যেখানে সাধক যান ভেতরের তৃষ্ণা মেটাতে; আর শরাব এখানে ঈশ্বরপ্রেমের নেশা, যেটা একবার লাগলে আর জাগতিক নেশায় কাজ হয় না। যে ঢালছে, সে-ই সাকি। ফার্সিতে পানীয় পরিবেশনকারী এই শব্দটা এখানে গুরু অথবা ঈশ্বর নিজেই, যিনি পথ দেখান।
বুলবুল, ফার্সি-তুর্কি উৎসের এই শব্দে যে-পাখির কথা আসে, সে হলো প্রেমিক কবি, যে ব্যাকুল, ভাষাহীন, শুধু গান দিয়ে নিজেকে বলতে পারে। আর যে-গোলাপটার দিকে তাকিয়ে বুলবুল গাইছে, সেটা প্রেমাস্পদ, তা মানুষও হতে পারে, ঈশ্বরও। এই চাবিকাঠি একবার হাতে পেলে একটা শের তিন-চারবার পড়া যায়, প্রতিবার নতুন কিছু পাওয়া যায়, এ যেন পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো, প্রতিটি স্তরে নতুন গন্ধ।
গালিব লিখেছিলেন, প্রেমের যন্ত্রণাই প্রেমের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার। কথাটা শুনতে প্যারাডক্স মনে হয়, কিন্তু ভাবলে দেখবেন, এর মধ্যে একটা নিষ্ঠুর সত্য আছে। প্রাপ্তি আকাঙ্ক্ষাকে মেরে ফেলে। যা পেয়ে গেছি, তার জন্য আর কাঁদা যায় না। অপ্রাপ্তি বাঁচিয়ে রাখে, কারণ তৃষ্ণাটা থাকে, গানটা থাকে। আশা ভোঁসলের সবচেয়ে ভালো গজলগুলো এই জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেই অপ্রাপ্তির কিনারায়, যেখান থেকে সব সুন্দর জিনিস দেখা যায়।
আশা—ক্যাবারে থেকে গজলে যাবার অসম্ভব পথ
আশার জীবনটাই একটা গজলের মতো। শুরু এক জায়গায়, শেষ অন্য জায়গায়, মাঝখানে এমন সব মোড়, যেগুলো আগে থেকে বোঝা যায় না। কিন্তু পুরোটা শেষ হলে মনে হয়, এ ছাড়া আর কীভাবে হতে পারত?
একটু চেষ্টা করি দেখাতে।
১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর, সাংলির গোয়ার গ্রাম। পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের ঘরে জন্ম। বাবা ছিলেন মারাঠি শাস্ত্রীয় সংগীতের মানুষ, তাঁর গান ছিল সংসারের নিঃশ্বাসের মতো। সেই নিঃশ্বাস থামল আশার নয় বছর বয়সে, বাবা চলে গেলেন। পরিবার শহর থেকে শহরে ঘুরল, রুজির খোঁজে, স্থিরতার খোঁজে, শেষে বম্বেতে এসে থিতু হলো। ষোলো বছর বয়সে পরিবারের মতের বিরুদ্ধে গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে। লোকটি তাঁর প্রায় দ্বিগুণ বয়সী, দিদি লতার ব্যক্তিগত সেক্রেটারি। এই বিয়ে পরিবারে এমন ফাটল ধরাল যে, লতা আর আশার সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে টানাপোড়েনে কাটল। দুই বোন, দুই ভিন্ন কক্ষপথ, মাঝে মাঝে কাছে, বেশিরভাগ সময়ই দূরে। ১৯৬০-এ সেই দাম্পত্য ভেঙে গেল তিক্তভাবে, ততদিনে তিনটি সন্তান, আর একটা ইন্ডাস্ট্রি, যেখানে তাঁকে কেউ সিরিয়াসলি নেয় না।
ক্যারিয়ারের শুরুতে আশার ভাগ্যে জুটত বি-গ্রেড ছবি, ক্যাবারে নম্বর, হেলেনের নাচের ওপর ফিল্মি গান। সেইসব গান, যেগুলো বড়ো গায়িকারা গাইতেন না। ইন্ডাস্ট্রি তাঁকে ডাকত 'ক্যাবারে সিঙ্গার' বলে, যেন একটা খোপে বন্দি করে দিলেই কাজ শেষ। কেউ ভাবেনি, এই মেয়ে একদিন গজল গাইবে, এবং গাইবে এমনভাবে যে, রীতিমতো জাতীয় পুরস্কার পাবে।
আর. ডি. বর্মনের সঙ্গে সম্পর্কটা প্রথমে ছিল সৃষ্টিশীল, এক অদ্ভুত সুরকারের সঙ্গে এক আশ্চর্য কণ্ঠের রসায়ন। ১৯৮০ থেকে তা গড়ায় দাম্পত্যে। এটাই আশার জীবনের সবচেয়ে উর্বর অধ্যায়। পঞ্চম তাঁকে দিয়ে কী না গাইয়েছেন! ক্যাবারে, রক, ডিস্কো, পাহাড়ি লোকগান, রবীন্দ্রসংগীতের ছায়া, পশ্চিমা পপের স্বাদ। আবার এমন গানও, যেগুলো ঠিক গজল নয়, কিন্তু গজলের আত্মা নিয়ে জন্মেছে। "ইজাজত"-এর "মেরা কুছ সামান" তেমনই। সে কথা একটু পরে। আগে ১৯৮১-র গল্পটা বলা দরকার।
উমরাও জান—সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দুর্ঘটনা
এই ছবিটার গজলগুলো কীভাবে তৈরি হলো, সেই গল্পটাই আশ্চর্য। গজলগুলো প্রায় হয়ইনি।
শুরুতে সুরকার ছিলেন জয়দেব, যিনি মুজফ্ফর আলির আগের ছবি "গামান"-এর সূত্রে তাঁর পুরোনো সঙ্গী। তিনি এমন একজন সুরকার, যিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতাকে ফিল্মে আনতে পারতেন। কিন্তু কাজের শুরুতে আলির সঙ্গে মতবিরোধে তিনি সরে গেলেন, সঙ্গে গেলেন তাঁর পছন্দের কণ্ঠ মধুরানিও। জয়দেবের জায়গায় এলেন খৈয়াম, এবং তখনই আলি বুঝলেন, গানগুলোর গন্তব্য আসলে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ।
শাহরিয়ার (Shahryar), তাঁর আসল নাম আখলাক মোহাম্মদ খান; তিনি এই রদবদলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, কারণ তিনি আলির বহুদিনের পুরোনো বন্ধু, "গামান" থেকেই দু-জনের যৌথ যাত্রা। বলিউডে তাঁর যাত্রা সংক্ষিপ্ত কিন্তু অবিস্মরণীয়। তিনি ছিলেন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক, পরে বিভাগীয় প্রধান। কবি হিসেবে তাঁর পরিচয় পর্দার পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড়ো—১৯৮৭ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, ২০০৮ সালে জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, উর্দু সাহিত্যে মাত্র চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে। ফিল্মের জন্য লিখতেন কদাচিৎ, কেবল বন্ধুর ডাকে। সেই কদাচিতের ফসল "দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়", "ইন আঁখোঁ কি মস্তি", এই পঙ্ক্তিগুলো।
খৈয়াম রেকর্ডিংয়ের প্রথম দিনেই আশাকে বললেন, স্বাভাবিক জায়গা থেকে দেড় স্বর নিচে নেমে গাইতে হবে—ডি শার্প থেকে সি-তে। তাঁর গবেষণায় বেরিয়ে এসেছিল, উমরাও জানের কণ্ঠ ছিল গভীর ও কষাটে, লখনউয়ের সেই মাটির মতো, যেটা ভেজালে আরও গন্ধ ছাড়ে। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন: "আমরা আশা ভোঁসলেকে চাই না, আমরা উমরাও জানকে চাই।" আশা প্রথমে রাজি হলেন না; সারাজীবন একটা কণ্ঠ তৈরি করেছেন, সেটাকে হঠাৎ বদলে দিতে বলছেন। শেষে রাজি হলেন। নিচু স্বরে গেয়ে আশা নিজেই বললেন: "এর মধ্যে একটা জাদু আছে।" তারপর প্লেব্যাক শুনে থমকে গেলেন। "এটা কি আমিই গাইছিলাম? এভাবে নিজেকে আগে কখনও শুনিনি।" দ্বিতীয় রেকর্ডিংয়ের আর দরকার পড়েনি।
আশার কণ্ঠে একধরনের ভেলভেটি গভীরতা এল, যেটা আগে ছিল না; যেন মাটির নিচে একটা স্তর ছিল, খৈয়াম খুঁড়ে বের করলেন। "দিল চিজ ক্যায়া হ্যায়" একবার মন দিয়ে শুনলে বুঝবেন, এই জাদু কোথায়। প্রথম পঙ্ক্তিতে কণ্ঠে একরকম কোমল সমর্পণ, যেন কেউ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে; দ্বিতীয় পঙ্ক্তিতে সেটা তীব্র হয়ে উঠছে, যেন বুঝতে পারছে, এই দেওয়াটা আর ফেরানো যাবে না। প্রতিটি শের আলাদা আবেগের ঘর, আশা তা বুঝতেন; তাই প্রতিবারই দরজা খুলে অন্য একটা ঘরে ঢুকতেন।
আশা শুধু গাইলেনই না। মুজফ্ফর আলি বলেছেন, আশা তাঁকে ধরে বসেছিলেন—মির্জা হাদি রুসওয়ার "উমরাও জান আদা" উপন্যাসটার অনুবাদ তাঁকে পড়তেই হবে। ১৮৯৯ সালের সেই উর্দু উপন্যাস, যা লখনউয়ের এক তাওয়ায়েফের জীবনগল্প বলে; একটু দূরত্ব রেখে, একটু নস্টালজিয়া মিশিয়ে। তাওয়ায়েফ; উর্দু এই শব্দটা 'ভ্রমণকারী' অর্থ থেকে এলেও অর্থের বিবর্তনে হয়ে উঠেছে লখনউয়ের সেই বিশেষ শ্রেণির শিল্পীর পরিচয়, যাঁরা শাস্ত্রীয় সংগীত, কবিতা, নৃত্য ও উর্দু আদবকেতায় গভীরভাবে শিক্ষিত ছিলেন। আশা সেই বইয়ের ভেতর দিয়ে লখনউয়ের তহজিব গিলে নিলেন। তহজিব; আরবি-ফার্সি উৎসের এই শব্দটা শুধু 'সংস্কৃতি' নয়, এর মধ্যে আছে সেই পরিশীলন, যেখানে আবেগ দেখানো অভদ্রতা কিন্তু না-দেখানোটা শিল্প, যেখানে কথার চেয়ে নীরবতায় বেশি বলা হয়। এমনকি আলির রান্নাঘরে ঢুকে তাঁর পাচকের কাছে লখনউয়ি রন্ধনশৈলীর কয়েকটা পদও শিখে নিলেন, কারণ লখনউকে বুঝতে হলে শুধু পড়লে হয় না, গন্ধ নিতে হয়, স্বাদ নিতে হয়। তারপর যা গাইলেন, সেটা গান নয়, লখনউয়ের আত্মা।
এই ছবিতে আশার গাওয়া গজলগুলো:
"দিল চিজ ক্যায়া হ্যায় আপ মেরি জান লিজিয়ে"—হৃদয় তো সামান্য জিনিস, প্রাণটাই নিয়ে নাও। সুফি ভাষায় এটা ফানার আহ্বান, সেই আত্মবিলোপের ডাক, নিজেকে প্রেমে বিসর্জন দেওয়ার অনুরোধ। কিন্তু আশার কণ্ঠে শুনলে সুফিবাদ মাথায় আসে না। মনে হয়, কেউ সত্যিই নিজেকে গুছিয়ে উপহার সাজাচ্ছে, কোনো তত্ত্ব ছাড়াই, কোনো দর্শন ছাড়াই, শুধু একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে সব দিয়ে দিতে চাইছে।
"ইন আঁখোঁ কি মস্তি কে মস্তানে হাজারোঁ হ্যায়"—চোখের মাদকতায় হাজার মানুষ মাতাল। আশার গলায় 'মস্তি' শব্দটায় একটা টলমল আছে, মদের প্রথম ঢোকের মতো—একটু মিষ্টি, একটু ঝাঁজ, একটু অনিশ্চয়তা। সুফি কবিতায় এই চোখ সেই সাকির দৃষ্টি; গুরুর সেই চাহনি, যা একবার পড়লে পথ হারিয়ে যায়, কিন্তু তখনই আসল পথ খোলে। কিন্তু আশা যেভাবে গান, তাতে সেই রহস্যময় তত্ত্বের চেয়ে লখনউয়ের মেহফিলে বসা এক তাওয়ায়েফের চোখই বেশি মনে পড়ে; সেই উচ্চশিক্ষিত শিল্পী-নর্তকীর, যাঁর কোঠায়, অর্থাৎ সেই মেহফিলের কক্ষে, যেখানে সংগীত ও কবিতার সমাবেশ হতো, নবাব থেকে কবি সবাই আসতেন, শুধু তাঁর চোখের ভাষা পড়তে। এখানেই আশার জোর। তত্ত্বকে তিনি শরীরে নামিয়ে আনতে পারতেন, আকাশ থেকে মাটিতে।
"ইয়ে ক্যা জগহ হ্যায় দোস্তোঁ"—এটা কোন জায়গা, বন্ধুরা? আশার কণ্ঠে একধরনের ক্লান্তি আছে, সেই ক্লান্তি, যা শুধু পথ হেঁটে আসে না, বছরের পর বছর বেঁচে থেকেও আসে। দীর্ঘ পথ হেঁটে কেউ যেন থমকে দাঁড়িয়েছে, পেছন ফিরে দেখছে, কতটা এসেছে, সামনে তাকিয়ে দেখছে, আর কতটা বাকি।
"জুস্তুজু জিসকি থি"—যাকে খুঁজছিলাম, পেলাম। কিন্তু কী দামে? এই প্রশ্নটা গজল করে না, বরং শ্রোতাকে ভাবতে দেয়।
"জব ভি মিলতি হ্যায়"—এই গজলটা নিয়ে মানুষ কম আলোচনা করে, কিন্তু আমার কাছে এটা এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সৎ। যখনই দেখা হয়, নতুন অভিযোগ। প্রেমের সেই রোজকার ক্ষত, যেটা সারেও না, মারেও না। বড়ো বিরহ নিয়ে কবিতা লেখা সহজ, কারণ সেখানে নাটকীয়তা আছে। প্রেমের রোজকার ক্লান্তি নিয়ে লেখা কঠিন, কারণ সেখানে শুধু সত্য আছে। এই গজল সেই কঠিন কাজটিই করেছে।
এই গজলগুলো আশাকে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দিল। তার চেয়ে বড়ো কথা, 'ক্যাবারে সিঙ্গার' ছাপটা মুছে দিল। একটা মানুষ যখন একটা বাক্সে বন্দি থাকেন, তখন মুক্তিটা শুধু তাঁর নিজের জন্য নয়, সবার জন্য প্রমাণ হয়ে যায়। মুজফ্ফর আলি শোকাভিভূত হয়ে বলেছেন: "উমরাও জান তার সমস্ত কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলেছে। প্রথমে শাহরিয়ার, তারপর খৈয়াম সাহেব, আর এখন আশাজি।" শাহরিয়ার গেছেন ২০১২-তে, খৈয়াম ২০১৯-এ, আশা ২০২৬-এ। তিনটি মৃত্যু, একটা গজলের তিনটি স্তম্ভের পতন।
আশাজির মাকতায়
গজল গায়কির ইতিহাসটা মূলত পুরুষদের ইতিহাস। মেহেদি হাসান, গুলাম আলি, জগজিৎ সিং, তালাত মাহমুদ। বেগম আখতার অবশ্যই ছিলেন, কিন্তু তাঁকে সবাই লখনউয়ের সেমি-ক্লাসিক্যাল ধারায় ফেলে রাখত—একটা নির্দিষ্ট খোপে, একটা নির্দিষ্ট শ্রোতাশ্রেণীর জন্য।
আশা এলেন একদম অন্য রাস্তা দিয়ে। কোনো ঘরানা নেই; হিন্দুস্তানি সংগীতে ঘরানা শুধু 'বিদ্যালয়' নয়, এটা একটা বংশানুক্রমিক সংগীত-পরম্পরা, যেখানে গুরু থেকে শিষ্যে বিদ্যা নামে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গায়কির একটা বিশেষ রং তৈরি হয়। তাঁর তালিম হয়েছে স্টুডিয়োতে হাজার হাজার রেকর্ডিং সেশনে, শত শত সুরকারের সঙ্গে কাজ করে। তালিম; আরবি-উর্দুতে যে-শব্দে সেই প্রশিক্ষণের কথা আসে, যেটা কৌশলের পাশাপাশি একটা মানসিক গঠন তৈরি করে। এই বৈচিত্র্যটাই তাঁর গজলকে আলাদা করেছে। তিনি একটা ঘরানার কণ্ঠ নন, তিনি একটা যুগের কণ্ঠ। তিনি গজলকে দরবার থেকে বের করে আনলেন সাধারণ মানুষের বসার ঘরে।
স্বর থেকে স্বরে যাবার সময় তাঁর কণ্ঠে একটা তরল টান থাকত; মীড়ের সেই মসৃণ সরণ, যেন দুটো সুরের মাঝখানের পুরো রাস্তাটা হেঁটে যাওয়া, লাফ দিয়ে পার না হওয়া, প্রতিটা মাঝামাঝি সুর অনুভব করা। শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা এভাবেই ধরে রাখা যায়। মুর্কিতে ছিল ক্ষিপ্রতা। হিন্দুস্তানি সংগীতের এই অলঙ্কারে কণ্ঠ দ্রুত কয়েকটা স্বর ঘুরে আসে, একটু উড়িয়ে দেয়, একটু চমকে দেয়, তারপর ঝলক দিয়ে ফিরে আসে। কিন্তু এত কারিগরির পরেও উচ্চারণে এতটাই সহজ স্বাভাবিকতা যে, মনে হতো, কেউ চিঠি লিখছে, মঞ্চে গাইছে না, কারণ সত্যিকারের দক্ষতা সেটাই, যেটা দেখা যায় না, অনুভব করা যায় শুধু। গুলাম আলি বা মেহেদি হাসান শুনলে মনে হয়, কোনো বড়ো মুশায়রায় বসে আছি, সেই কবিতার সমাবেশে, যেখানে শায়েরেরা একে অপরের মুখোমুখি তাঁদের শের পড়েন এবং শ্রোতারা শিল্পের সামনে মাথা নত করেন। আশা শুনলে মনে হয়, কেউ দরজা বন্ধ করে একটাই কথা বলতে চাইছে, এবং সেই কথাটা শুধু আমার জন্য।
বেগম আখতারের সঙ্গে তুলনাটা এখানে প্রাসঙ্গিক। বেগম আখতারের গজলে আবেগটা প্রকাশ্য, কণ্ঠের কাঁপুনিতে ব্যথা সরাসরি শোনা যায়, শ্রোতা বুঝতে পারে, গায়িকা কষ্টে আছেন। আশার রাস্তা উলটো। তিনি আবেগটা চেপে ধরতেন এবং সেই চেপে ধরার মধ্যে এমন একটা টান থাকত যে, শ্রোতা নিজেই ভেঙে পড়ত। নিজে কাঁদতেন না, শ্রোতাকে কাঁদাতেন। মুজফ্ফর আলি বলছেন: "এমন কিছু গায়ক থাকেন, যাঁরা একটি শব্দ উচ্চারণ করলে সেই শব্দের পুরো অনুভূতিটাই বদলে যায়। আশার এই ক্ষমতা ছিল। প্রতিটি শব্দে তিনি সার ঢেলে দিতেন।" আশার প্রতিটি উর্দু শব্দ শুনলে মনে হতো, তা প্রথমবার কারো মুখ থেকে বেরোচ্ছে, যেন ভাষাটা সেই মুহূর্তে আবিষ্কৃত হচ্ছে। এ ওস্তাদি প্রদর্শন নয়, স্বীকারোক্তি।
পার্থক্যটা ছোটো মনে হতে পারে। আসলে বিশাল। এই পার্থক্যের জোরেই গজল দরবার ও মুশায়রার গণ্ডি ছাড়িয়ে সিনেমার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষের কাছে গেল, সেই মানুষদের কাছে, যারা কখনও মুশায়রায় যাননি, যারা উর্দু পুরোটা বোঝেন না, কিন্তু আশার গলায় কষ্টটা চিনতে পারেন।
ননফিল্ম গজল
সিনেমার বাইরে আশার গজল-যাত্রায় সবচেয়ে জরুরি নামটি গুলাম আলি। তিনি পাকিস্তানের গজল সম্রাট, যাঁর গলায় গজল যেন সবচেয়ে স্বাভাবিক মেজাজে কথা বলে। তাঁদের যৌথ অ্যালবাম "মেরাজ-এ-গজল"। ‘মেরাজ’ আরবিতে সেই ঊর্ধ্বারোহণ, যেখানে সাধক ঈশ্বরের নিকটতম বিন্দুতে পৌঁছান; নামটাই বলে দিচ্ছে এর উচ্চাকাঙ্ক্ষা কতটা: গজলের শীর্ষবিন্দু, সেই উচ্চতা, যেখানে পৌঁছোনো কঠিন। দুই দেশের দুই শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ একসঙ্গে, যখন দুই দেশের সম্পর্ক সহজ ছিল না। রাজনীতি যা-ই বলুক, সংগীত নিজের পথ করে নেয়।
গুলাম আলির সঙ্গে আশার গাওয়া "সালোনা সা সাজন হ্যায়" শুনলে বোঝা যায়, রসায়নটা কেমন ছিল। দুটো কণ্ঠ যখন একসঙ্গে গায়, প্রত্যেকটা আলাদা থেকেও একটা তৃতীয় কিছু তৈরি করে। কয়েক বছর আগে একটি ভিডিয়োকলে আশা গায়ক বাবুল সুপ্রিয়কে এই গানের সূক্ষ্ম অলঙ্কারগুলো শিখিয়েছিলেন। মীড়ের কোথায় একটু থামতে হবে, মুর্কির কোথায় একটু দ্রুত যেতে হবে। নব্বই বছর বয়সে। ভাবুন একবার।
হরিহরনের সঙ্গে "আবশার-এ-গজল" (১৯৮৫)। ফার্সিতে ‘আবশার’ মানে ঝরনা, জলপ্রপাত; নামটাই বলে দেয়, এই অ্যালবামে কী প্রত্যাশা করা হয়েছিল। আটটা গজল, সবগুলোর সুর হরিহরনের নিজের, কথা লিখেছেন বশির বদর, হাসান কামাল-সহ আরও কয়েকজন। ছয়টায় আশা একা, দুটোয় হরিহরনের সঙ্গে যুগলবন্দি। "কুছ দূর হামারে সাথ" আর "পেহলে ভি জিতে থে"। এই যুগলবন্দিগুলোতে দুটো কণ্ঠের রসায়ন এমন ছিল যেন দুটো ভিন্ন নদীর জল এক খাতে মিলছে, প্রত্যেকে নিজের স্বভাব বজায় রেখে।
অ্যালবামটা বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সাড়া পড়ে গেল। ১৯৮৪-৮৫ সাল ছিল বাংলার বাইরে গজলের জোয়ারের সময়। জগজিৎ-চিত্রা সিং, পঙ্কজ উধাস একের পর এক অ্যালবাম করছেন, শ্রোতারা তবলা-সারেঙ্গির সেই অন্তরঙ্গ জগতে ঢুকছেন। সেই ঢেউয়ে "আবশার-এ-গজল" নিজেকে আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠিত করল, কারণ এখানে আশার কণ্ঠ ছিল অন্যরকম, উমরাও জানের সেই গভীরতা নিয়ে, কিন্তু একটা তাজা আলোয়। অ্যালবামটা এতটাই সফল ছিল যে, পরে হরিহরন একাই সব গান নতুন করে গেয়ে "কুছ দূর হামারে সাথ" নামে পুনঃপ্রকাশ করেন। সেই সংস্করণের অস্তিত্ব নিজেই প্রমাণ করে, আশার কণ্ঠে গানগুলো কতটা অপরিহার্য ছিল। ১৯৯৪ সালে অ্যালবামটা সেরা অ্যালবামের দিভা পুরস্কার পেল—প্রায় দশ বছর পরে, যা বলে দেয়, এটা কোনো তাৎক্ষণিক হিট ছিল না, ছিল ধীরে ধীরে মানুষের মনে বসে-যাওয়া কিছু-একটা।
"কাশিশ" অ্যালবামটা ভিন্ন মেজাজের। নটা গজল, আশা একাই গেয়েছেন, সারেগামা প্রকাশিত। "মেরাজ-এ-গজল" বা "আবশার-এ-গজল"-এর মতো কোনো সহযাত্রী নেই, শুধু একটা কণ্ঠ এবং সেই কণ্ঠের নিজস্ব নিঃসঙ্গতা। গজলগুলোও অন্তর্মুখী, যেন ঘরের দরজা বন্ধ করে নিজের সঙ্গে কথা বলা।
২০০৫ সালে আশা এমন একটা কাজ করলেন, যেটা শুনে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন। চারজন গজল ওস্তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত গজলগুলো নিজের কণ্ঠে নতুন করে রেকর্ড করলেন। মেহেদি হাসানের "রঞ্জিশ হি সহি", "রাফতা রাফতা", "মুঝে তুম নজর সে"। গুলাম আলির "চুপকে চুপকে", "আওয়ারগি", "দিল মেঁ এক লহর"। ফরিদা খানমের "আজ জানে কি জিদ না করো"। জগজিৎ সিংয়ের "আহিস্তা আহিস্তা"। এগুলো কিংবদন্তিদের গান, যেগুলো ছুঁতে যাওয়া সাহসের কাজ। পণ্ডিত সোমেশ মাথুর আধুনিক সুরসজ্জা দিলেন, তবলা-সারেঙ্গির বদলে এল সমসাময়িক বাদ্য। আশা বলেছিলেন, নতুন প্রজন্ম তবলা-সারেঙ্গির ভাষা বোঝে না, তাদের জন্য গজলকে নতুন ভাষায় বলতে হবে, নইলে গজল হারিয়ে যাবে। কথাটায় মনে একটু কষ্ট আসে, কারণ পুরোনো ভাষাটা সুন্দর ছিল, তবে তিনি ভুল বলেননি।
"মেরা কুছ সামান" এবং গজলের ছায়া যেখানে যেখানে
উমরাও জানের পর আশার কণ্ঠে একটা গজল-চেতনা থেকে গেল; এমন গানেও, যেগুলো কাঠামোগতভাবে গজল নয়, কিন্তু আত্মায় গজলের আত্মীয়।
সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ "ইজাজত" (১৯৮৭)-এর "মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস পড়া হ্যায়"। গুলজারের কথা, আর. ডি. বর্মনের সুর। এতে মাতলা নেই, সেই উদ্বোধনী শের নেই, যেটা ছন্দের চাবিকাঠি দেয়; কাফিয়া-রদিফ নেই, সেই অন্ত্যমিলের বাঁধুনি নেই, যেটা গজলকে গজল করে। টেকনিক্যালি ওটা গজলই নয়। কিন্তু এর ভেতরের জিনিসটা? খাঁটি গজল।
একটা মেয়ে তার প্রাক্তন প্রেমিককে বলছে, তোমার কাছে আমার কিছু জিনিসপত্র পড়ে আছে, ফেরত দাও। কী জিনিসপত্র? মৌসুমি বৃষ্টির গন্ধ। একটা রুপোলি সন্ধে। কিছু ভেজা ভেজা স্বপ্ন। এ স্মৃতির তালিকা, কিন্তু গজলের ভাষায় স্মৃতি মানে শুধু অতীত নয়; স্মৃতি মানে এখনও বেঁচে থাকা সেই অনুভূতিগুলো, যেগুলো ফেরত দেওয়া যায় না, কারণ সেগুলো এখনও বেঁচে আছে। স্মৃতি ফেরত চাওয়া মানে নিজের একটা অংশ ফেরত চাওয়া। এটা গজলের চিরন্তন বিষয়, শুধু সম্পূর্ণ আধুনিক ভাষায় বলা। এই গান আশাকে দ্বিতীয় জাতীয় পুরস্কার এনে দিল, গুলজারও একই গানের জন্য শ্রেষ্ঠ গীতিকারের পুরস্কার পেলেন। একই ছবির "খালি হাথ শাম আয়ি হ্যায়"-তেও সেই সন্ধেবেলার বিষণ্নতা—গজলের 'শাম' প্রতীক, যেখানে দিন শেষ হয় কিন্তু রাত আসে না, একটা ঝুলন্ত অনিশ্চয়তার মুহূর্ত।
"আইতবার" (১৯৮৫)-এ বাপ্পি লাহিড়ির সুরে এবং হাসান কামালের কথায় "কিসি নজর কো তেরা ইন্তেজার আজ ভি হ্যায়"—আশা ভোঁসলে ও ভূপিন্দর সিংয়ের যুগলবন্দি, এবং এর থিম অপেক্ষা। ইন্তেজার; উর্দু-ফার্সিতে এই শব্দটা শুধু সময় কাটানো নয়, এটা সেই সক্রিয় প্রতীক্ষা, যেটা নিজেই একটা উপাসনায় পরিণত হয়। সুফি কাব্যে অপেক্ষা সাধনারই অন্য নাম। সাকির কাছ থেকে সেই এক ঢোক পাবার জন্য সাধক অপেক্ষা করেন, অনন্তকালও যদি লাগে তবু, কারণ সেই অপেক্ষার মধ্যেই উপাসনা।
বিশ্বমঞ্চে
আশাকে বিশ্ব চিনেছে গজলের জন্য নয়, গোটা শিল্পীসত্তার জন্য। সেই কণ্ঠের জন্য, যা যে-কোনো কিছু গাইতে পারে এবং সেটাকে নিজের করে নিতে পারে। কিন্তু গজল-চেতনাটা তাঁর সব কাজে এমনভাবে ছড়িয়ে ছিল যে, সেই পরিচিতিতে তা একটা গভীরতা এনেছিল, যেটা শুধু পপ হিট দিয়ে আসে না।
কর্নারশপের "Brimful of Asha" ১৯৯৭-এ বেরিয়ে প্রথমে তেমন সাড়া জাগায়নি, মাত্র ষাট নম্বরে উঠেছিল UK চার্টে। কিন্তু নর্মান কুক ওরফে ফ্যাটবয় স্লিমের রিমিক্সে ১৯৯৮-এর ফেব্রুয়ারিতে UK সিঙ্গেলস চার্টে এক নম্বরে উঠল, সেলিন ডিওনকে সরিয়ে। গানটির শিরোনামে 'আশা', যা একইসঙ্গে আশা ভোঁসলের নাম এবং হিন্দিতে 'প্রত্যাশা' অর্থবাহী, সেই প্রত্যাশা, যেটা অভিবাসীরা বুকে নিয়ে নতুন দেশে যান। এই দ্বৈত অর্থ গীতিকার তিন্দর সিং (Tjinder Singh)-এর অজানা ছিল না বলে একাধিক সূত্র জানাচ্ছে।
২০০৫-এ ক্রোনোস কোয়ার্টেটের সঙ্গে "You've Stolen My Heart: Songs from R.D. Burman's Bollywood"—পঞ্চমের গানগুলো, একদিকে স্ট্রিং কোয়ার্টেট, যেটা পশ্চিমা ক্লাসিক্যাল সংগীতের মেরুদণ্ড, অন্যদিকে জাকির হোসেনের তবলা ও চীনা পিপাবাদক উ মানের সুর, ভিনটেজ ইলেকট্রনিক্স-সহ। তিন মহাদেশের শব্দ এক অ্যালবামে, পঞ্চমের সুর সেগুলোকে একটা সুতোয় বেঁধে রেখেছে, এ যেন রদিফ, যা সব কিছুর শেষে ফিরে আসে। অ্যালবামটা ২০০৬-এর গ্র্যামিতে মনোনীত হয়েছিল, সেই প্রথমবার নয়, কিন্তু প্রতিবারই মনে করিয়ে দিয়েছে যে, আশার কণ্ঠ কোনো একটা ভূগোলে আটকানো নয়।
২০২৩-এর ৮ই সেপ্টেম্বর, আশার নব্বইতম জন্মদিন। দুবাইয়ের কোকা-কোলা এরেনায় আশা গাইলেন, নাচলেন। নব্বই বছর বয়সে যেভাবে মানুষ গায় না, সেভাবে গাইলেন। সাংবাদিকদের বললেন: "মেঁ ইস ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি কি আখরি মুঘল হুঁ।" আমি এই ইন্ডাস্ট্রির শেষ মোগল। নব্বই বছর বয়সে এই কথা বলার জন্য যে-আত্মবিশ্বাস লাগে, সেটা গজলের কবি যেভাবে মাকতায়, অর্থাৎ গজলের সেই শেষ শেরে নিজের তাখাল্লুস রাখেন, সেই একই জিনিস। নিজেকে ঘোষণা করা। নিজের স্বাক্ষর রাখা। বলা যে, আমি ছিলাম, এবং আমি এই।
আর একেবারে শেষে, ২০২৬-এর ২৭শে ফেব্রুয়ারি। গোরিলাজের নবম স্টুডিয়ো অ্যালবাম "The Mountain"-এ "The Shadowy Light"; অ্যালবামটার থিম মৃত্যু, শোক, পারঘাট। ডেমন অ্যালবার্ন পঞ্চমের দীর্ঘদিনের ভক্ত, আশার কণ্ঠকে তিনি বলেছেন 'সাইকেডেলিক' ও 'এক্সপেরিমেন্টাল'—সেই অর্থে, যেটা সীমানা ভাঙে। এই ট্র্যাকে আশার সঙ্গে ছিলেন গ্রাফ রিস (Gruff Rhys; সুপার ফারি অ্যানিমালসের কণ্ঠশিল্পী), বাঁশিশিল্পী অজয় প্রসন্ন এবং সরোদশিল্পী আমান আলি বাঙ্গাশ ও আয়ান আলি বাঙ্গাশ। আশার কণ্ঠ মুম্বাইয়ের তাঁর ফ্ল্যাটেই রেকর্ড করা হয়েছিল। অ্যালবার্ন হারমোনিয়াম বাজিয়েছিলেন, যেন দুই প্রান্তের দুই শিল্পী একই মৈখানায় বসে আছেন। গানের কথা ছিল নৌকোয় পার হবার; মাঝিকে ডাকা, অপর পারে যাবার। গানটি এখন তাঁর শেষ পেশাদার রেকর্ডিং হিসেবে চিহ্নিত। পরে মনে হচ্ছে, শেষ গান হিসেবে এর চেয়ে ভালো কিছু হতে পারত না।
যা হবে না, আর যা রয়ে গেল
মুজফ্ফর আলি জানাচ্ছেন, তাঁরা দু-জনে একটা ফার্সি গজলের অ্যালবাম করবেন বলে ঠিক করেছিলেন। সেই ভাষায়, যেখানে গজলের শেকড়; হাফিজের ভাষায়, রুমির ভাষায়। আশা বলেছিলেন: "আমরা এটা করবই।" সেই অ্যালবাম আর হবে না।
মাস তিন-চার আগে আলি গিয়েছিলেন আশার বাড়িতে, নিজের বই আর "উমরাও জান"-এর পুনঃমুক্তি উপলক্ষ্যে। আশা নিজের হাতে কাবাব রেঁধে খাইয়েছিলেন। আশা বলতেন, গান না গাইলে রাঁধুনি হতেন, আর দুবাই ও যুক্তরাজ্যে "আশা'জ" রেস্তোরাঁ চেইন খুলে সেটাও করে দেখালেন। কিন্তু সেই শেষ দেখার সময় যদি কেউ জানত যে, এটাই শেষ—লখনউয়ের তহজিব শেখা সেই মানুষটার রান্নার গন্ধ, সেই কাবাবের স্বাদ! কেউ জানেনি। গজল তা-ও শেখায়—শেষ মুহূর্ত বলেকয়ে আসে না।
গজলের জগতে আশা যা রেখে গেলেন, তা শুধু গান নয়। একটা প্রমাণ যে, গজল মুশায়রার বাইরেও বাঁচতে পারে। সিনেমায়, রেকর্ডিং স্টুডিয়োতে, এমনকি গোরিলাজের অ্যালবামে, এমনকি সেলিন ডিওনকে চার্ট থেকে সরিয়ে দেওয়া একটা ব্রিটিশ ইন্ডি গানের শিরোনামে। আরেকটা প্রমাণ যে, নারীকণ্ঠ এই ভূমিতে পুরুষদের চেয়ে কম কিছু নয়। আর প্রমাণ যে, তবলা-সারেঙ্গি না বুঝলেও গজলের কষ্টটা বোঝা সম্ভব, যদি কণ্ঠটা ঠিক হয়, কারণ কষ্টের কোনো ভাষা লাগে না।
সুফি কবি ফখরুদ্দিন ইরাকি লিখেছিলেন: "লা ইলাহা ইল্লাল ইশক।" প্রেম ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আশার গজল-যাত্রা ছিল এই কথারই সুর—সেই তাখাল্লুস, যা কণ্ঠে ছিল, কাগজে নয়।
শেষ শের
গজলে মাকতায় কবি তাখাল্লুস রাখেন; সেই শেষ শেরে নিজের কলমের নামটুকু, নিজের সই। বলেন, এই কষ্টটা আমার, এই প্রেমটা আমার, এই গানটা আমার। আশার তাখাল্লুস তাঁর কণ্ঠ। বারো হাজারের বেশি গান। কুড়িটার বেশি ভাষা। আট দশকের বেশি সময়। এই সংখ্যাগুলো বলা সহজ, কিন্তু এগুলোর পেছনে যত নির্ঘুম রাত স্টুডিয়োতে কাটানো, যত সুরকারের সঙ্গে তর্ক, যত শব্দ বার বার গাওয়া যতক্ষণ না ঠিক হয়, তা ভাবাও যায় না।
গজলের দর্শন বলে, মৃত্যু শেষ নয়। ফানার পর বাকা আসে। আত্মবিলোপের পর সেই টিকে থাকা, যেখানে আর আগের 'আমি' নেই, কিন্তু কিছু-একটা থাকে, যা আরও বড়ো। বিলোপের পর ফেরা আসে। কথাটা সুন্দর, কিন্তু আজকের দিনে এটুকু লিখেই সবটুকু লেখা হয়ে যাচ্ছে না। আশা ভোঁসলের গজল এখনও বাজবে, সেটা সত্যি। কিন্তু যে-কণ্ঠটা নতুন করে একটা শব্দ উচ্চারণ করে তাকে অন্য উচ্চতায় তুলে দিতে পারত, সেই কণ্ঠটা আর নেই। এই নেই-টুকু কোনো দর্শন দিয়ে ভরাট করা যায় না।
গজল এটাও তো শেখায়—কিছু কিছু শূন্যতা শূন্যই থাকে। সে-ও একরকমের পূর্ণতা।
ওঁ শান্তি।
আশাজির মাকতায়
লেখাটি শেয়ার করুন