গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: পনেরো



আদা-দেওয়া বিস্কুটটা যদি আগে খাও, তাহলে সেটাই তো প্রথমেই শেষ হয়ে যায়। তারপর বাকি থাকে চারটি। কিন্তু যদি আদারটাই সবচেয়ে ভালো হয়, তবে সবচেয়ে ভালো জিনিসটি দিয়ে শুরু করার মানে হলো, বাকিটুকু ক্রমশ নিচের দিকে নামা। আদা থেকে দূরে সরে যাওয়া, ধীরে ধীরে খারাপের দিকে নামতে থাকা।

আবার যদি সাদা বিস্কুটটা আগে খাও, ধরো, সবচেয়ে নীরসটাকে আগে শেষ করলে, তাহলে যেন বাকি দিনগুলো ওঠার দিকে থাকবে। আদার দিকে, অপেক্ষমাণ ভালো কিছুর দিকে। কিন্তু সেই ভালো জিনিসটাকে শেষের জন্য রেখে দেবার মধ্যেও তো একধরনের কষ্ট আছে। ততক্ষণ পর্যন্ত বাকি সব বিস্কুটকে পেরোতে হবে শুধু আদার অপেক্ষায়। অর্থাৎ ভালো কিছুর দিকে এগোনোও যন্ত্রণা, আর ভালোটা আগে শেষ করে ফেলাও যন্ত্রণা।

এইসব ক্রম নিয়ে তুমি অনেক ভেবেছ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাসের পর মাস। আদা, ক্রিম, সাদা, ডাইজেস্টিভ, আর যা-ই থাক। সোজা ক্রমে, উলটো ক্রমে, মাঝের নানান বিন্যাসে। যেন বিস্কুট সাজানোর মধ্যে কোনো গূঢ় ন্যায় আছে, কোনো সঠিক বণ্টন আছে, কোনো নিখুঁত ক্রম আছে, যেখানে পৌঁছলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

কিন্তু পৌঁছেছ কোথায়?

কোথাও না। কোনো সমাধানে নয়। বিস্কুটেরও কোনো সঠিক ক্রম নেই। সম্ভবত কোনো কিছুরই নেই। কোনোদিন ছিলও না।

আছে শুধু খাওয়া। ক্রম দিয়ে বিশেষ কিছু বদলায় না। যেমন দিনের ক্রম দিয়েও বদলায় না। সোমবার মঙ্গলবারের চেয়ে ভালো নয়; আদা সাদার চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয় শেষপর্যন্ত। মুখের ভেতর, অন্ধকার দেহ-কারখানার মধ্যে, সব বিস্কুটই শেষে এক হয়ে যায়। যেমন সব দিন এক হয়ে যায় ঘরে, চেয়ারে, ধূসরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে।

এটাও তুমি শিখেছ। অনেক কিছুর সঙ্গে মিলে যার যোগফল দাঁড়ায় শূন্য।

তবু সপ্তাহে তিনদিন তুমি কাউন্টারে যাও। বসো। খাও। কথা বলো না। মেয়েটিও বলে না, অথবা শুধু দাম বলে। অল্প দাম। প্রায় প্রতিবারই একই। স্যুপের মতো। রুটির মতো। অপরিবর্তিত।

তোমাদের মাঝখানে যে-নীরবতা থাকে, সেটাই ঘরের সবচেয়ে বড়ো জিনিস। কাউন্টারের চেয়ে বড়ো, মেয়েটির চেয়ে বড়ো, স্যুপের চেয়ে বড়ো। সেই নীরবতা ফাঁকা নয়; ভরা। যে-সব কথা বলা যেত, অথচ বলা হয়নি, এবং আর কোনোদিনও বলা হবে না, তাদের ভারে ভরা। না-বলা কথাগুলো যেন বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকে, তোমাদের মাঝখানে। ঘন। ভারী। প্রায় কঠিন। হাত বাড়ালে যেন ছুঁয়ে ফেলা যায়। আর আশ্চর্যের বিষয়, ওই না-বলা কথাগুলোই যে-কোনো উচ্চারিত বাক্যের চেয়ে বেশি উপস্থিত, বেশি সত্যি।

হয়তো এটাই কাছাকাছি আসার শেষ রূপ, যাকে একসময় মানুষ মিলন বলত। তুমি আর মেয়েটি, কাউন্টারের দুই পাশে, আলাদা হয়েও যুক্ত। স্যুপে, রুটিতে, দাম বলায়, মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায়। নীরবতার ভেতরেই যেন সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সংযোগ।

এখন বোধ হয় এইটুকুই প্রার্থনা। রুটি ছেঁড়া। স্যুপ খাওয়া। কাউন্টারে দাঁড়ানো। গির্জা বন্ধ। মন্দিরও বন্ধ। কিন্তু কাউন্টার খোলা। যেন পৃথিবীর শেষ মন্দির, যেখানে প্রসাদ গরম, আর খাওয়ানোই একমাত্র লিটুর্জি বা উপাসনা-পদ্ধতি। এখানে শরীর তার অংশ পায় অন্য এক হাত থেকে, যে-হাত তোমাকে ভালোবাসে না, হয়তো চেনেও না, চেনার বা ভালোবাসার দরকারও নেই। তার কাজ কেবল পরিবেশন করা। স্যুপ, রুটি, দাম, মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। এ-ও একধরনের আচার, একধরনের ক্রুশযাত্রা। শরীরের ক্রুশ, যা তুমি বইছ না; বরং শরীর নিজেই বইছে।

তুমি যেন শুধু আরোহী। একটা ঘোড়ার পিঠে বসে আছ, আর ঘোড়াটি নিজেই পথ চেনে। তাকে চালাতে হয় না। সে নিজেই জলের কাছে যায়, মাথা নিচু করে পান করে; নিজেই খাবারের কাছে যায়, খায়; তারপর আবার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকে, অপেক্ষায়। পরের জল, পরের খাদ্য, পরের অংশের জন্য।

শরীর আর কিছু জানে না। তার আলাদা কোনো ধর্মতত্ত্ব নেই, কোনো বিশ্বাস নেই, কোনো প্রার্থনা নেই। আছে শুধু ক্ষুধা, তৃষ্ণা, তৃপ্তি। এই ত্রিত্বই তার একমাত্র দেবতা। এর বাইরে তার আর কোনো ঈশ্বর নেই।

আর তুমি? তুমি যেন সেই মন্দিরের মধ্যে বসবাসকারী এক ভূত, একটি যন্ত্রের ভেতরে আটকে-থাকা অনুপস্থিত ঈশ্বর। শরীর তার পূজা চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও দেবতা বহু আগেই সরে গেছে। মন্দির প্রায় খালি, তবু আচার থামেনি। মোমবাতি এখনও জ্বলছে, কাঁপছে। রুটি এখনও ছেঁড়া হচ্ছে। কফি ঢালা হচ্ছে। কারও উদ্দেশে নয়, কাউকে স্মরণ করে নয়, শুধু অভ্যাসের জন্য। শুধু চালিয়ে যাবার জন্য।

মাঝে মাঝে স্যুপ খেতে খেতে মনে হয়, আমি আসলে শুধু একটা মাথা, আর কিছু নই।

কাউন্টারের ওপর দিয়ে সামান্য উঁকি দিয়ে আছি, শরীরটা নিচে আড়াল হয়ে গেছে, দেখা যাচ্ছে শুধু মাথা। যেন কোনো বয়ামের ভেতর রাখা মাথা, রেস্তোরাঁর বাইরে, প্রদর্শিত অথচ অবান্তর। খদ্দেররা আসে, যায়, কখনো একটু তাকায়, বেশিরভাগ সময় থামে না। কেউ কেউ কৌতূহলী চোখে একঝলক দেখে, তারপর ভেতরে ঢুকে যায়। মাথাটি আর কাউকে বিচলিত করে না। লোকেরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বয়ামের মাথাও যেন দোকানেরই একটা অংশ, সাইনবোর্ড, মেনু, চাঁদোয়ার মতো। যেমন টবে গাছ থাকে, দেয়ালে চকবোর্ড ঝোলে, তেমনি বয়ামের মাথাও আছে। চিরকাল ধরে।

সে শুধু দেখে। খদ্দেররা ভেতরে ঢোকে, বসে, খায়, বেরিয়ে যায়, যেখানে মাথাটি যেতে পারে না। কারণ মাথা তো বয়ামে, আর বয়াম বাইরে। শরীর যদি কোথাও থেকেও থাকে, তবে সে-ও বোধ হয় ওই বয়ামেরই নিচে, দৃষ্টির আড়ালে, ঢাকনার তলায়। কাউকে তা দেখা দেয় না। বয়ামের মাথা রেস্তোরাঁয় ঢুকতে পারে না, টেবিলে বসতে পারে না, মেনু থেকে কিছু বেছে নিতে পারে না। তার কাজ শুধু দেখা। বাইরে থেকে। দূর থেকে।

আর ভেতর থেকে গন্ধ আসে। রান্নার গন্ধ, খাওয়ার গন্ধ, জীবনের গন্ধ। এমন কিছুর গন্ধ, যা সেখানে আছে, যেখানে এই মাথার প্রবেশাধিকার নেই।

তখন মনে হয়, তুমি সেই মাথা। কাউন্টারই তোমার বয়াম। মেয়েটি, খদ্দের, স্যুপ। সবই সেই জগতের অংশ, যার তুমি শুধু সাক্ষী। স্যুপ যেন গন্ধ হয়ে তোমার কাছে আসে, দরজার ফাঁক দিয়ে, কিন্তু তুমি যে ভেতরে ঢুকতে পারো না। বোধ হয় তুমি চিরকালই এই বয়ামের মধ্যে ছিলে; শুধু এতদিন তা বুঝতে পারোনি। বয়ামই খুলি, বয়ামই ঘর, বয়ামই জীবন। তিনটি আলাদা জিনিস নয়, একই আবরণ।

তুমি তাই শুধু মাথা হয়ে উঁকি দিচ্ছ। দেখছ তাদের, যারা বয়ামে নেই, যাদের শরীর দৃশ্যমান, যারা ভেতরে ঢোকে, বসে, খায়, উঠে, চলে যায়। আর তুমি তোমার বয়ামের মধ্যে বসে আছ। স্যুপ আসে, আবার সরে যায়। দেখাই শুধু তোমার কাজ। যেখান থেকে বেরোনোর দরজা নেই।

তারপরও তুমি খাও। স্যুপ ভেতরে যায়, রুটি তার পেছনে, জলও। শরীর সেগুলো গ্রহণ করে। নিচের অন্ধকার কারখানায় কাজ শুরু হয়। সে-সব তুমি জানো না। জানার দরকারও নেই। শরীর তোমার চেয়ে বেশি জানে, কী লাগে, কতটুকু লাগে, কখন থামতে হয়। তার নিজের একটা শৃঙ্খলা আছে। এক আদিম, অবিচল শিল্পকারখানা, যেখানে শ্রমিক নেই, মালিক নেই; শুধু আগুন আছে, অন্ধকার আছে, আর কাজ আছে।

সে তার কাজ করে যায়। তোমার কাজও নেহাত সামান্য, খাবারটুকু দরজায় পৌঁছে দেওয়া। এইটুকুই এখন বাকি দায়িত্ব। শরীরকে ঘরে পৌঁছে দেওয়া, ঘরকে দিনে, দিনকে রাতে, রাতকে আবার দিনে বয়ে নেওয়া। এক বদ্ধ বৃত্ত। সম্পূর্ণ। যেন বাইরে থেকে আর কিছু লাগার কথা নয়।

শুধু মেয়েটি আছে। সপ্তাহে তিনদিন, কাউন্টারের ওপারে, যে খুব বেশি কথা বলে না, বলার দরকারও পড়ে না। স্যুপ দেয়, রুটি দেয়। রুটি একটু শক্ত, সামান্য বাসি, দাঁতে কড়কড় করে; তবু পেট ভরে। পেট ভরলেও মন খালি থাকে। কারণ ক্ষুধা দুই রকম, একটি রুটি মেটায়, আরেকটি কোনো কিছুতেই মেটে না।

মেয়েটি দাম বলে, পয়সা নেয়, মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটাই তোমার সঙ্গে পৃথিবীর লেনদেনের সম্পূর্ণ রূপ: স্যুপ, রুটি, দাম, মুখ ফেরানো।

হয়তো এইটুকুই যথেষ্ট। বা যথেষ্ট হওয়া ছাড়া উপায় নেই। যখন জীবনের সব কিছু ছেঁটে-ছেঁটে শেষে এই অল্প ক-টি জিনিসে এসে দাঁড়াতে হয়, তখন এই অল্পই সব হয়ে ওঠে। স্যুপ সব কিছু। রুটি সব কিছু। নীরবতা সব কিছু। মুখ ফিরিয়ে নেওয়াও সব কিছু। কারণ যখন চারপাশের বাকি সব সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন যা অবশিষ্ট থাকে, তার ওপরেই সমগ্র অস্তিত্বের ভার এসে পড়ে।

আর আশ্চর্যের বিষয়, যত কম থাকে, প্রতিটি জিনিস তত ভারী হয়। অর্থে নয়, উপস্থিতিতে। স্যুপ তখন ভোজের চেয়েও ভারী হয়ে ওঠে। নীরবতা হাজার কথার চেয়েও বেশি ওজনদার হয়। রুটি সেই শরীরের চেয়েও ভারী মনে হয়, যে-শরীর তাকে খাচ্ছে।

সব কিছু যেন ভারী হয়ে যায়, শুধু এই কারণে যে, তা-ই এখন “সব”। প্রতিটি ছোটো জিনিসকে সব কিছুর হয়ে থাকার ভার বহন করতে হয়।

তারপর যখন তুমি জায়গাটা থেকে বেরোও, স্যুপ আর রুটি তোমার ভেতরে নেমে গেছে, শালগম শরীরের কারখানায় তোমার অংশ হয়ে উঠছে, খাদ্য আর খাদক একে অন্যের মধ্যে মিশে যাচ্ছে, ঠিক তখনই হঠাৎ তুমি হাসো। অথবা, বলা ভালো, হাসি তোমার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। তুমি তাকে ডাকোনি, চাওনি, অনুমতিও দাওনি। সে নিচের সেই কারখানা থেকে উঠে আসে, যেখানে শালগম তুমি হয়ে উঠছিল।

এ হাসি কোনো রসিকতায় নয়। কোনো আনন্দে নয়। কোনো মজার ঘটনার প্রতিক্রিয়াও নয়। এ এক অন্য রকম হাসি, যে-হাসি আসে তখন, যখন মানুষ হঠাৎ মহাজাগতিক কৌতুকটির আভাস পায়। যখন সে বুঝতে পারে, এই সমস্ত গুরুগম্ভীর, ক্ষুধার্ত, নীরব, পুনরাবৃত্ত, অবশ্যম্ভাবী ব্যবস্থার মধ্যে এক অদ্ভুত ব্যঙ্গ লুকিয়ে আছে, এবং তা একবার বুঝে ফেললে, হাসা ছাড়া আর কিছুই আর যথার্থ মনে হয় না।

কৌতুক বলে আলাদা কিছু নেই; হাসিটাই কৌতুক। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে এক মানুষ। পেটে স্যুপ, মুখে শূন্যতা, আর সে হঠাৎ কিছু-না-কে দেখে হাসছে। এ-ই কৌতুক। আর সেই হাসির সঙ্গে, বা তার পরেই, বা হয়তো একই সঙ্গে, চোখ থেকে জল নামতে শুরু করে, রাতের মতো, কিন্তু এবার দিনের রাস্তায়। হাসি আর কান্না পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়।

এই দুই বোধ হয় সবচেয়ে পুরোনো যুগল। ছেলে আর মেয়েরও আগে, ইচ্ছে আর চাওয়ারও আগে—হাসি আর কান্না। যেন এদের বিয়ে অনেক আগেই হয়ে গেছে। গলায় আর চোখে তারা একসঙ্গে ফিরে আসে, যখন মিলন পুরো হয়, যখন শরীর আর পৃথিবীর মাঝখানে আর কিছু থাকে না, যা একটাকে অন্যটার আঘাত থেকে রক্ষা করতে পারে। তখন হাসি আর কান্না আলাদা থাকে না। তারা একই জিনিস হয়ে যায়, একই শূন্যের দুই ভঙ্গি, যা শেষপর্যন্ত সব কিছু।

সেদিন তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলে। হাসছ, আবার কাঁদছ। কেউ দেখলে কী ভাবত, কে জানে। ঘটনাটা বেশিক্ষণ স্থায়ীও হয়নি; এক-দুটি মুহূর্ত, হয়তো তারও কম। যেমন অনুমতি ছাড়া এসেছিল, তেমনি অনুমতি ছাড়াই থেমে গেল। তারপর তুমি হাঁটতে হাঁটতে ঘরে ফিরে এলে। তেরো ধাপ সিঁড়ি, চেয়ার, কাপ, ধূসর আলো। সব আবার আগের মতো। অথবা একেবারে আগের মতো নয়। কারণ তোমার ভেতর দিয়ে কিছু-একটা ঝড়ের মতো চলে গেছে। অপ্রত্যাশিত, অসংযত, এমন কিছু, যা তুমি সামলাতে পারোনি।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *