গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: এগারো



ধরো, কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে স্থির। ফাঁকে ফাঁকে। শহরটিকে ঘিরে। পাহারাদারের মতো। বারো জন হতে পারে, কিংবা এগারো, কিংবা তেরো। এত দূরে যে, বোঝা যায় না, তারা শহরের দিকে মুখ করে আছে, না শহর থেকে মুখ ফিরিয়ে। শুধু মনে হয়, অন্ধকারের ভেতর কিছু স্থির অবয়ব দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের স্থিরতাই তাদের উপস্থিতির একমাত্র প্রমাণ।

অবশ্য তারা আদৌ মানুষ না-ও হতে পারে। খুঁটি হতে পারে, পাথর হতে পারে, শুকনো গাছের গুঁড়ি হতে পারে, এমনকি কিছুই না-ও হতে পারে। অন্ধকার তো চতুর ভেলকিবাজ; দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকলে সে চোখকে প্রতারণা করতে জানে। তবু অনুভূতিটা থেকে যায়। ওরা আছে। পাহারাদার। সমতলে দাঁড়িয়ে। বৃত্তাকারে। শহরকে ঘিরে। হয়তো তোমাকেও ঘিরে। কিন্তু তারা তোমাকে দেখছে কি না, শহরকে দেখছে কি না, তা বোঝা যায় না। মনে হয়, তারা যেন অন্য কিছু দেখছে, যা তুমি এই পাহাড় থেকে দেখতে পাও না। সেই বৃত্তের কেন্দ্রে যা আছে, হয়তো তারই দিকে তাদের মুখ, অথবা হয়তো তার দিক থেকেই মুখ ফিরিয়ে আছে।

আর কেন্দ্রস্থলে কী? ধরো, একটি ছোটো কুঁড়েঘর। নিচু, অপ্রকাশ্য, প্রায় অন্ধকারে ডুবে-যাওয়া। হয়তো তার একটি জানালায় অস্পষ্ট আলো জ্বলছে।

আর সেই কুঁড়েঘরে কেউ আছে। তুমি নও। লাঠিওয়ালা লোকটিও নয়। কাউন্টারের মেয়েটাও নয়। অন্য কেউ। ধরো, এক বুড়ি, তোমার মতোই একা, জানালার ধারে চেয়ারে বসে আছে। বাইরে তাকিয়ে। পাহারাদারদের দিকে। অথবা তাকিয়ে নেই, তবু দেখা হয়ে যাচ্ছে, যেমন অনেক কিছুই সরাসরি না তাকিয়েও দেখা হয়ে যায়। পাহারাদাররা যেন তাকিয়ে আছে, অথচ হয়তো তারাও আসলে কিছুই দেখছে না।

পাহাড়ের এই দূরত্ব থেকে এতটুকুই ধরা পড়ে। অন্ধকারে কোনো রকমে দেখা, কোনো রকমে অনুমান, কোনো রকমে ভাষায় তোলা। কুঁড়েঘরের বুড়ি, সমতলের পাহারাদার, শহরের বাইরে সেই বৃত্ত, সবই যেন আধ-দেখা, আধ-বলা। শব্দ যতটা ধরতে পারে, ঠিক ততটাই।

শেষপর্যন্ত সব কিছুই তো এইরকম; আধ-দেখা, আধ-বলা। চোখ যা দেখে, তাকে পুরো ধরে রাখতে পারে না; যেন হাতের ভেতর জল ধরে রাখার চেষ্টা। আর শব্দও যার নাম দেয়, তাকে পুরো বহন করতে পারে না। নাম ছোটো হয়ে যায়, জিনিস বড়ো থেকে যায়।

কুঁড়েঘরটিকে তুমি দেখো, কিন্তু আসলে দেখতে পাও কেবল তার রেখা। ধোঁয়া দেখো, কিন্তু ধোঁয়া নিজে নয়, তার ক্ষীণ ছায়া। বুড়িকে দেখো, কিন্তু বুড়ি নয়, শুধু ঝুঁকে থাকার আকৃতি। দরজায়, জানালায়, অথবা যে-জায়গাটিকে তুমি আগুন বলে ভাবছ, সেখানেও নিশ্চিত হবার উপায় নেই, ওটা সত্যিই আগুন কি না; হ্যাঁ, তা-ও জানা যায় না।

তবু তুমি বলার চেষ্টা করো। আর বলাটা কম পড়ে, চিরকালই কম পড়ে। দেখা আর বলার মাঝখানে যে-দূরত্ব, সেটাই তো সেই পুরোনো দূরত্ব: শব্দ আর জিনিসের মধ্যে, তোমার আর পৃথিবীর মধ্যে। একটি ফাঁক থাকে, এখানেও, এই পাহাড়ে, এই অন্ধকারে। যা আছে, আর যা তুমি ফিরিয়ে আনতে পারো দেখা থেকে ভাষায়, তাদের মধ্যে এই ফাঁকটি স্থির। প্রায় কিছুই হাতে আসে না; অথচ এই সামান্যটুকুই তোমার সমস্ত সম্পদ।

সমুদ্রকে যেমন একসঙ্গে ধরে রাখা যায় না, সমুদ্র অক্ষরের ফাঁক দিয়ে গলে যায়, আঙুলের ফাঁক দিয়ে জলের মতো সরে যায়, তেমনি যা আধ-দেখা, তা আধ-বলার ফাঁকেই কোথাও থেকে যায়। পুরো আসে না, পুরো ধরা দেয় না। যে-জিনিস বলা হলো না, তা সেই ফাঁকে গিয়ে অপেক্ষা করে।

আবার দেখা হবে, অপূর্ণভাবে। আবার বলা হবে, অপূর্ণভাবে। সাধারণ নিয়মে। আধ-দেখা আর আধ-বলার সেই পুরোনো নিয়মে। যেন এইটুকুই মানুষের অংশ: পুরো নয়, অর্ধেক। দেখাও অর্ধেক, বলাও অর্ধেক, প্রাপ্তিও অর্ধেক। চিরকাল।

যদি সত্যিই দেখা যায়, তারারা মেঘের ছেঁড়া পর্দায় সুচফোটার মতো জ্বলে ওঠে। মনে হয়, ওপারে কিছু একটা জ্বলছে। জীবিত না মৃত, কী করে বোঝা যায়? হয়তো তাদের অনেকেই আর নেই। শুধু তাদের আলো আছে। তারা মরে গেছে, শরীর নিভে গেছে, অথচ আলো এখনও পথেই আছে। অন্ধকার পেরিয়ে, বছরের পর বছর, হয়তো সহস্র বছর, হয়তো লক্ষ বছর ভ্রমণ করে, শেষে এসে পৌঁছায় এখানে।

এই পাহাড়ে। এই চোখে। যে-চোখ সামান্য ভেজা বলে মনে হয়, যদিও সে তা চায়নি, তার দরকারও ছিল না। তবু চোখ তো এ-ই করে—যা আসে, তা গ্রহণ করে। চাওয়া হোক বা না হোক, প্রয়োজন হোক বা না হোক।

তুমি তখন এমন আলোর গ্রহীতা, যা আসছে এমন সব স্থান থেকে, যেগুলো হয়তো আর অস্তিত্বেই নেই। সেই আলো রওনা হয়েছিল তোমার জন্মেরও আগে, শহর তৈরি হবারও আগে, পাহাড় এই রূপে দাঁড়াবারও আগে। আর এখন, এই দেরিতে, সেই আলো এসে পড়ছে তোমার ওপর। তোমার; যে-ঘাসে বসে আছ, পাহাড়ে, অন্ধকারে, কেবল চোখ খোলা আছে বলে মৃত নক্ষত্রের আলো গ্রহণ করছ।

সম্ভবত এটাই তোমার কাজ, যদি একে কাজ বলা যায়। তুমি মৃত আলোর ঠিকানা। এক দীর্ঘ যাত্রার শেষ থামা। এমন এক যাত্রা, যা শুরু হয়েছিল তোমার আগে, সব কিছুর আগে, আর এসে শেষ হচ্ছে তোমার চোখে। এই চোখও একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। তুমিও মরবে।

তারপর আলো তোমাকে পেরিয়ে যাবে। তোমার পেছনের সেই অন্ধকারে প্রবেশ করবে, যেখানে আর কোনো চোখ নেই, কোনো গ্রহণ নেই, কিছুই নেই, শুধু অন্ধকার। সেখানে গিয়ে সে হারিয়ে যাবে। যেমন সব আলো একদিন হারায়। যেমন সব কিছুই। কেউ কাউকে রক্ষা করতে পারে না শেষপর্যন্ত।

সাধারণ নিয়মে। হারিয়ে যাবার নিয়মে।

৭।

চোখের পেছনে যেন একটি দেশ আছে। তাকে স্বপ্ন বলবে কি না, তা নিশ্চিত নও। সেখানে তুমি রাজা নও, প্রজাও নও, শুধু এক পথিক। সেই দেশের কোনো মানচিত্র নেই, কোনো আইন নেই, পরিচিত জিনিস হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়, আর পৃথিবীর প্রচলিত নিয়ম সেখানে আর খাটে না। না টান, না ভদ্রতা, না মৃত্যু।

মনে আছে সেই দর্শকের কথা, যে চোখ বন্ধই করে না? যদি কোনোদিন সেই চোখ ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যদি কোনোদিন তা বন্ধ হয়, তবে হয়তো মানুষ ঠিক সেখানেই পৌঁছয়, যাকে আমরা স্বপ্ন বলি। অথবা বলা যায়, শরীর যখন ঘুমিয়ে পড়ে, মনও স্তব্ধ হয়, ইচ্ছে বহুদিন কোমায় থাকার মতো নিশ্চল হয়ে থাকে, তখন যে একমাত্র সত্তা জেগে থাকে, সে-ই দেখে এই দেশ। বাকি সব চলে গেলে, যে আর ঘুমোতে পারে না, সে একা জেগে থাকে এবং দেখে যা দেখার।

সেখানে প্রথমে আসে একটি করিডোর। দীর্ঘ, অশেষ, যার শেষ দেখা যায় না। আলো আছে, কিন্তু সে আলো কোথা থেকে আসছে, বোঝা যায় না। মনে হয়, দেয়াল নিজেই ভেতর থেকে মৃদু জ্বলে উঠেছে। আলো নয়, আলোর স্মৃতি। কোনো বাতি নেই, সূর্য নেই; বাতাস যেন নিজেই জ্বলছে, যেমন জোনাকি নিজের আলো সম্পর্কে কিছু না জেনেই জ্বলে।

সেই আলোর ভেতর তুমি হাঁটছ। অথবা হয়তো করিডোরই তোমাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দিক পরিষ্কার নয়। তুমি নড়ছ, অথচ কিছুই বদলায় না। দেয়াল একই, মেঝে একই, চারপাশের বিস্তার একই থাকে। পায়ের শব্দ দেয়ালে গিয়ে লেগে ফিরে আসে প্রতিধ্বনির মতো। সামনে শূন্য, পেছনেও শূন্য।

তুমি চাইলে ঘুরে দেখতে পারতে, কিন্তু ঘোরার সিদ্ধান্ত তো ইচ্ছে থেকে আসে, আর ইচ্ছেকে তুমি পেছনে ফেলে এসেছ অনেক আগেই। জাগ্রত পৃথিবী কোথাও আছে বোধ হয়, কিন্তু কোনদিকে, তা আর বলা যায় না। কারণ এই করিডোরে ওপর-নিচ নেই, সামনে নেই, পেছনও নেই। যা সামনে, তা-ই পেছনে; যা পেছনে, তা-ই সামনে।

এখানে সময়ও নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটছ বলে মনে হতে পারে, অথচ সেখানে “ঘণ্টা” বলে কিছু নেই। আছে শুধু হাঁটা, আর সেই হাঁটাই যথেষ্ট।

এই হাঁটার একটি নিজস্ব গড়ন আছে, ওজন আছে, চরিত্র আছে, যা জাগ্রত জীবনের হাঁটায় থাকে না। জাগ্রত পৃথিবীতে হাঁটার নিচে থাকে পাথর, ফুটপাত, কংক্রিট। কিন্তু এখানে পায়ের তলায় যেন কিছুই নেই, শুধু এক অদ্ভুত ভরসা, যেন বাতাসই সাময়িকভাবে মাটির কাজ করছে।

আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এখানে মাটি আগে থেকে থাকে না। তোমার হাঁটাই মাটি তৈরি করে। পা পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, ঠিক সময়ে, তোমার পায়ের নিচে মাটি এসে হাজির হয়; আর পা সরে গেলে, পেছনের সেই মাটি আবার মিলিয়ে যায়। কোনো সময়েই এক পা-র বেশি জমি তোমার জন্য প্রস্তুত থাকে না। যে পায়ে দাঁড়িয়ে আছ, কেবল সেইটুকুই আছে; তার আগে শূন্য, তার পেছনেও শূন্য।

সম্ভবত এই করিডোরের সবচেয়ে গভীর শিক্ষা এটাই, যদি তাকে শিক্ষা বলা যায়। মাটি হাঁটা থেকে তৈরি হয়; হাঁটা মাটি থেকে জন্মায় না। তুমি হাঁটতে হাঁটতে পথ নির্মাণ করো। পা ফেলা মানেই জন্ম দেওয়া। তোমার অগ্রসর হওয়াই তোমার পৃথিবীকে অস্তিত্ব দেয়।

থেমে গেলে পায়ের ছাপও মুছে যায়। আবার শূন্য। যেমন আগে ছিল, যেমন পরে থাকবে। তোমার আসার আগেও যেমন ছিল, তোমার চলে যাওয়ার পরেও তেমনই থাকবে। হাঁটার আগেও, পায়ের আগেও, তোমার আগেও।

তারপর করিডোর হারিয়ে যায়। কোথায় গেল, জানা যায় না। হঠাৎ তুমি একটি ঘরে এসে পড়ো। ঘরটি তোমার নয়। বিশাল। প্রায় শূন্য। সেখানে জানালা নেই, চেয়ার নেই, টেবিল নেই, কাপ নেই; শুধু মেঝে, দেয়াল, ছাদ। সব সাদা। এমন পরিষ্কার, যেন কোনোদিন কেউ এখানে বাস করেনি। আলো এত উজ্জ্বল যে, মনে হয়, বায়ুই বুঝি এখানে জ্যোতিরূপ।

আর ঘরের একেবারে মাঝখানে কিছু-একটা আছে। দূর থেকে বুঝতে পারো না। কাছে এগোলে দেখা যায়, সেটি কোনো নির্দিষ্ট জিনিস নয়। আকৃতির মতো, শরীরের মতো, বস্তুর মতো, অথচ ঠিক এগুলোর কোনোটাই নয়। অদ্ভুতভাবে বদলে যেতে থাকে তোমার কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে। দূর থেকে পাথর বলে মনে হয়েছিল। ধূসর, মসৃণ, হাতে ধরলে নিশ্চয়ই ঠান্ডা লাগত, বাটির পাথরের মতো। আরও কাছে এলে মনে হয়, যেন কোনো জন্তু কুঁকড়ে শুয়ে আছে। আরও কাছে গেলে দেখো, সেটি একটি হাত।

খোলা হাত। তালু ওপরে। আঙুল সামান্য বাঁকা, যেন কিছু ধরে আছে, অথবা এইমাত্র ছেড়ে দিয়েছে, অথবা ধরতে যাচ্ছে। একটি হাত, যা একই সঙ্গে সব কিছু এবং কিছুই নয়। এই দুই বিপরীত সত্য কীভাবে একসঙ্গে থাকতে পারে, তা বোঝা যায় না। অথচ মনে হয়, সারাজীবন ধরে তুমি এটিকেই খুঁজছিলে, যদিও জানতেই না যে, খুঁজছ। সমস্ত ধূসরতা, সমস্ত থেমে-থাকা, সমস্ত বসে-থাকার কেন্দ্রবিন্দু যেন এই হাত। হাতটি দিচ্ছে। কী দিচ্ছে? কিছুই নয়। সব কিছু। আর এই দুটো শেষপর্যন্ত হয়তো একই।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *