গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: বারো


তুমি তাকিয়ে থাকো। নড়ো না। ছুঁতে পারো, কিন্তু ছোঁও না। মনে হয়, ছোঁয়া মানেই জেগে ওঠা। আর তুমি জাগতে চাও না। এখনই না, কোনোদিনও না। বরং এই স্বপ্নের ভেতরে, এই সাদা ঘরে, এই খোলা হাতের সামনে, অনন্তকাল দাঁড়িয়ে থাকতে চাও। সব দিক থেকে দেখতে চাও, সে কী ধরে ছিল, এখন কী ধরে আছে, পরে কী ধরবে।

কিন্তু হাত কিছু বলে না। হাত হাতই থাকে। খোলা, শূন্য, নির্বাক। ঘরের মাঝখানে। স্বপ্নের মধ্যে। তুমি বেরোতে পারো না, বেরোতে চাও-ও না। তবু জাগরণ তো ইচ্ছের ধার ধারে না। সে নিজের সময়ে এসে পড়ে, আর প্রায়ই খুব দ্রুত।

হাতটি বন্ধ হবে কি না, মিলিয়ে যাবে কি না, তা আর জানা হয় না। তুমি ফিরে যাবে তোমার নিজের ঘরে। ফাটা ছাদ, ধূসর সমুদ্র, পরিচিত নিঃশব্দতা নিয়ে। আর সেই হাত থেকে যাবে তলদেশে, চোখের পেছনের সেই দেশে, যেখানে সব কিছু অপেক্ষা করে থাকে, পরের স্বপ্নের জন্য। দর্শকের চোখ যদি কোনোদিন বন্ধ হয়, তবে আবার।

তারপর আর-একটি স্বপ্ন। অথবা হয়তো একই স্বপ্নের আর-এক দিক। এবার তুমি নিজেকে বাইরে থেকে দেখতে পাও। তুমি চেয়ারে বসে আছ, ঘরের ভেতর, যেমন সবসময় থাকো। কিন্তু এবার স্বপ্ন তোমাকেই দেখছে বাইরে থেকে। যেন স্বপ্নের নিজস্ব একটি ক্যামেরা আছে। মাথাটা সামান্য ঝুঁকে, হাতদুটি হাঁটুর ওপর, জানালা দিয়ে ধূসর আলো এসে পড়ছে।

আর তখন, ওপর থেকে, একটি হাত নামতে থাকে। তোমার হাত নয়, অন্য এক হাত। ওপরের অন্ধকার থেকে, ধীরে, এত ধীরে, যেন সে নিজেই ভয় পাচ্ছে, পাছে তোমাকে জাগিয়ে ফেলবে। ছাদ যে-জায়গায় শেষ হয়, তারও ওপরে যে-শূন্য, সেখান থেকে। কোনো শরীরের অংশ বলে মনে হয় না; কেবল একটি হাত। তোমার নত মাথার দিকে নেমে আসছে।

যেমন বৃষ্টি ধীরে শস্যের ওপর ঝুঁকে আসে। তারপর এসে থামে। মাথায়। খুব আলতো। যেমন ঘুমন্ত শিশুর মাথায় যত্ন করে হাত রাখা হয়, যেন ঘুম না ভাঙে। যেমন কম্বল নিজে থেকেই শরীরের ওপর এসে বসে।

হাতটি তোমার মাথায় এসে থামে। ধরে রাখে। আর তুমি সেই ধরে রাখা অনুভব করো। সেই উষ্ণতা, সেই নরম স্থিরতা, যা কতদিন পাওনি। মায়ের পর থেকে নয়, মায়ের আগের কোনো অন্ধকার থেকে, যখন কিছু-একটা তোমাকে ধরে রেখেছিল, অথচ তা হাত ছিল না; অন্ধকার নিজেই ছিল, এক অদৃশ্য ধারণ, যে ধরে রাখে, না চেয়েও।

তারপর আর-একটি হাত আসে, অথবা একটি কাপড়, হাতের ভেতর ধরা। তা চোখের কাছে নেমে আসে। মুছে দেয়। কী মুছে দেয়? জল। তুমি তো জানতেই না, রাতের ভেতর চোখ থেকে জল বেরোয়। কারণও নেই। তবু জল আছে। স্বপ্নের হাত মুছে দেয়, যা দিনে কেউ মোছে না। ওই কাজ দারোয়ানের নয়, তোমার নিজেরও নও। কারণ মুছে দেওয়া মানে যত্ন, আর যত্ন নেওয়া তুমি অনেক আগেই বন্ধ করেছ।

কিন্তু স্বপ্ন তা বন্ধ করেনি। স্বপ্ন তার হাত পাঠায়। মুছতে, ধরে রাখতে, মাথায় আলতো করে রাখতে, সেই মাথায়, যাকে সারাদিন কেউ স্পর্শ করে না। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত শুকনো, অনস্পর্শ, যেন স্পর্শহীন মরুভূমি। কেবল রাতেই সে ছোঁয়া পায়। স্বপ্নই তাকে ছোঁয়, যখন দর্শক ঘুমিয়ে পড়ে, যদি সত্যিই কখনো ঘুমোয়।

হাতটি নামে, থাকে, মুছে দেয়, ধরে রাখে। তারপর খুব আস্তে উঠে যায়। ফিরে যায় ওপরের অন্ধকারে। কেন এসেছিল, কেন পাঠানো হয়েছিল, অন্ধকার তা বলে না, কোনোদিন বলবেও না। আর তুমি আবার একা। চেয়ারে। নত মাথা নিয়ে। এইমাত্র যে-ছোঁয়া পেয়েছিলে, এখন তা আর নেই। তবু শরীর মনে রাখে। হাড় মনে রাখে। মন ভুলে গেলেও।

এটাই সাধারণ নিয়ম। ছোঁয়া সরে যাবার অনেক পরেও, তার স্মৃতি নিয়ে যারা বেঁচে থাকে, তাদের বেলায়।

সেই হাত নিয়ে তুমি ভেবেছ। দিনের পর দিন ভেবেছ। স্বপ্ন গলে গেছে, বরফের মতো; একসময় হাতে ছিল, পরে জল হয়ে মিলিয়ে গেছে। কিন্তু তার শীতলতা, বা উষ্ণতা, যা-ই বলো, লেগে আছে।

তখন মনে হয়, হাতটি কি আসলে ঘরের জিনিসগুলোর হাত? কাপ কি হাত বাড়ায়? চেয়ার, টেবিল, কাচের চোখওয়ালা কুকুর। ওরাই কি রাতে স্বপ্নের ভিতর দিয়ে আসে, দিনে যাকে ছুঁতে পারে না, তাকে ছুঁতে? দিনের বেলায় তাদের হাত তো নেই, আছে শুধু তল, কাঠ, সিরামিক, কাচ। কিন্তু স্বপ্নে সেই তল হাত হয়ে যায়। ঠান্ডা সিরামিক উষ্ণতায় বদলে যায়। শক্ত কাঠ হয়ে ওঠে নরম আঙুল। কাচের চোখ হয়ে ওঠে এমন এক দৃষ্টি, যা শুধু দেখে না, ধরে রাখে, মুছে দেয়, যা দিনে তুমি নিজের জন্যও করতে না।

জেগে থাকার সময়ে তুমি যত্ন করো না; প্রহরীও করে না। কিন্তু রাতে জিনিসগুলো তোমার যত্ন নেয়, স্বপ্নের ভেতর দিয়ে। নেমে-আসা সেই হাতের মধ্যে দিয়ে, যে-হাত থাকে, মুছে দেয়, ধরে রাখে। হয়তো এটাই জিনিসপত্রের গোপন জীবন, তাদের রাত্রিকালীন সত্তা।

তুমি যখন দেখো না, দর্শক যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন জিনিসগুলো জেগে ওঠে। চুপচাপ তোমার দেখাশোনা করে। হয়তো চিরকালই করেছে। তুমি শুধু জানোনি। দিনে তল দিয়ে, রাতে হাত দিয়ে। এ-ই জিনিসের সাধারণ নিয়ম, যারা চুপচাপ তাদের মধ্যে থাকা জীবগুলোর ভার বহন করে।

তারপর স্বপ্ন বদলে যায়। হাত নেই, ঘর নেই। তুমি বাইরে। একটি তলের ওপর দাঁড়িয়ে আছ, সেটা জল কি না বোঝা যায় না; বরফও হতে পারে, কাচও হতে পারে, বা কোনো বিশাল ঘুমন্ত সত্তার ত্বক। যেন মাটির নিচে এক দৈত্য শুয়ে আছে, আর তার চামড়ার ওপর তুমি দাঁড়িয়ে।

ওই স্বপ্নটি পরে এসেছে, না কি আগে, তা বলার উপায় নেই। কারণ স্বপ্ন তো ক্রম মানে না। আগে-পরে তার কাছে অর্থহীন। সব স্বপ্নই যেন একই সময়ে ঘটে, চোখের পেছনের সেই দেশে, যেখানে ঘড়ি নেই, সময় নেই, আগে নেই, পরে নেই।

অন্য একটি স্বপ্ন। অথবা একই স্বপ্নের অন্যরূপ। তুমি কিছু-একটা টেনে নিয়ে চলেছ কোনো অনির্ধারিত ভূমির ভেতর দিয়ে, যা পুরোপুরি মাটি নয়, জলও নয়। ঘন। আঠালো। মাকড়সার জালের মতো গায়ে জড়িয়ে থাকে। প্রতিটি পদক্ষেপে তোমাকে যেন নিজের শরীরকে টেনে বের করতে হচ্ছে এক অদৃশ্য প্রতিরোধের ভেতর থেকে। প্রতিটি নড়াচড়াই এক-একটি যুদ্ধ।

সেই ঘনতার নিজস্ব এক উষ্ণতা আছে, ধূসরের মতো, জন্মের আগেকার অন্ধকারের মতো, কিন্তু সে ছাড়ে না। যেমন ঘর ছাড়তে দেয় না, যেমন চেয়ার থেকে উঠতে দেয় না, তেমনি এই ঘন পদার্থও সব কিছুকে আটকে রাখে। সেখানে চলার মানেই বাধা।

আর তোমার পেছনে বাঁধা আছে একটি দড়ি। ধরো, সরু, খসখসে, টানলে হাতে কেটে যায়। সেই দড়ির শেষে একটি ভারী কাঠের বাক্স। বন্ধ। তুমি জানো না, তার ভেতরে এখন কী আছে, যদিও অনেকদিন আগে একবার খুলেছিলে। তখন পেয়েছিলে কিছু পুরোনো জিনিস। একটি কাপ, কিছু ছবি, একটি চাবি, বেঁচে থাকার ভাঙাচোরা উপকরণ, এমন এক জীবনের যন্ত্রপাতি, যা আর নেই। কাজে লাগে না, তবু ফেলে দেওয়াও যায় না।

বাক্সটি যেন তোমার সংগ্রহশালা, তোমার অতীত, যা তুমি টেনে নিয়ে চলেছ এই ঘনতার মধ্যে দিয়ে, যেন সামনে এখনও কোনো “পরে” আছে। অথচ বাক্সটি ভারী, তোমার চেয়েও ভারী। যে-চলা এমনিতেই কঠিন, তাকে সে আরও কঠিন করে তোলে।

তুমি চাইলে দড়ি কেটে ফেলতে পারতে। বাক্সটি ফেলে হালকা হতে পারতে। কাপ ছাড়া, ছবি ছাড়া, সেই চাবি ছাড়া, যে কোন তালা খুলত, তা-ও আর মনে নেই। তবু কাটো না। পারো না। কারণ দড়িটি আসলে দড়ি নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তোমার আর বাক্সের মাঝখানে গজিয়ে-ওঠা আরেক ধরনের সংযোগ, এমন কিছু, যা তোমার নিজের শরীরেরই অংশ হয়ে গেছে। তাকে কাটতে গেলে যেন নিজেরই হাত কাটা হবে।

তাই তুমি টানতে থাকো। হাঁপাতে হাঁপাতে। বাক্স আর তুমি, দু-জনেই সেই ঘন জায়গার মধ্যে কোথাও না যেতে যেতে এগিয়ে চলেছ। এমন সব কিছু বয়ে নিয়ে চলেছ, যার আর কোনো ব্যবহার নেই, আছে শুধু ভার। আর সে ভার যোগ হচ্ছে এমন এক চলার সঙ্গে, যা এমনিতেই যথেষ্ট ভারী।

বাক্স আর তুমি, এক প্রাচীন যুগল। মানুষ আর তার স্মৃতির জুটি, জন্মের সঙ্গেও যার তুলনা কম পড়ে। তুমি টানো, আর তাকে টানা হয়; তাকে পুরো খোলা যায় না, ব্যবহার করা যায় না, ফেলে দেওয়াও যায় না। বাক্স অতীত, তার ভেতরের জিনিস স্মৃতি, আর দড়ি বন্ধন। তিনটিই ভারী। তিনটির কোনোটিই কাটা হবে না। তাই সেই ঘনতার মধ্যে তোমার কাজ একটাই, টেনে চলা। অতীতকে, স্মৃতিকে, বন্ধনকে, সেই অদৃশ্য পরের দিকে।

আর সেই ঘনতার মধ্যেই কেউ একজন আছে। সামনে, অথবা পেছনে, দিক পরিষ্কার নয়। আরেকটি শরীর। আরেকটি উপস্থিতি। তুমি তার দিকে এগোচ্ছ, না কি সে তোমার দিক থেকে সরে যাচ্ছে, বোঝা যায় না। ধরা যাক, সে “অন্য”। নির্দিষ্ট কোনো মানুষ নয়; শুধু অন্য। সেই অন্য, যাকে তুমি সারাজীবন খুঁজেছ। কখনো কোনো মেয়ের মুখে, কখনো কুকুরের চোখে, কখনো কাচে নিজের প্রতিবিম্বে। যেন সে সবখানেই আছে।

নামের আগেকার কোনো সময় থেকে তুমি তার দিকেই চলেছ। ঘনতার ভেতর দিয়ে। সে সবসময় ঠিক সামনে, অথবা ঠিক পেছনে। তার ভারী শ্বাস যেন শুনতে পাও; তার শরীরের উষ্ণতা ঠান্ডা ঘনতার ভেতরেও প্রায় অনুভব করা যায়। প্রায় ছুঁতে পারো তাকে। প্রায়।

কিন্তু সেই অন্য কিছু বলে না। কথার কোনো স্থান নেই সেখানে। সে শুধু নড়ে, যেমন তুমি নড়ো। তোমার দিকে, অথবা তোমার থেকে দূরে। একই সঙ্গে দুটোই যেন সত্যি। স্বপ্নের মধ্যে এ ধরনের বৈপরীত্য সম্ভব: একে অন্যের দিকে এগোনো মানেই দূরে সরে যাওয়া; পৌঁছোনো মানেই আবার নতুন করে না পৌঁছোনো। দু-জন মানুষ অন্ধকারে, ঘনতার মধ্যে, একে অন্যের দিকে বা উলটো দিকে সরে যাচ্ছে এবং তবু কিছুই ঘটছে না। কেউ থামে না। কেউ পৌঁছয় না।

সাধারণ নিয়মে।

ঘনতার নিয়মে। যে সব কিছুকে ধরে রাখে, কিছুই পুরো ছাড়ে না। তুমি টেনে চলছ সেই অন্যের দিকে, যে সবসময় আছে, অথচ কোনোদিন পুরো উপস্থিত নয়। সবসময় প্রায়। প্রায় সেখানে। প্রায় ধরা-দেওয়া। কিন্তু শুধু প্রায়। কখনও সম্পূর্ণ নয়।

জেগে ওঠার পর তুমি বসে বসে এই ঘনতার কথা ভেবেছ। ঘনতা গলে গেছে, যেমন স্বপ্ন গলে যায়, কিন্তু স্মৃতি রয়ে গেছে। তখন মনে হয়েছে, ঘনতা আসলে একধরনের মাধ্যম, যার ভেতর দিয়ে আমরা নড়ি। আর সেই মাধ্যমের ভেতর কখনো কখনো কিছু নকশাও দেখা যায়। মাকড়সার জালের মতো, ফাটলের মতো, অথবা হয়তো চোখেরই ভুল।

স্বপ্নে চোখকে বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু জাগ্রত জীবনে কি খুব যায়? সেখানে এই ঘনতার অন্য নাম আছে; সময়, হয়তো অভ্যাস, হয়তো দিনের জমে-থাকা ভার, হয়তো বহু সকালের ক্লান্তি, বহু বিকেলের স্থবিরতা, বহু বছরের ধূসর সঞ্চয়। সেই সবই চলাকে কঠিন করে তোলে। প্রতিটি পদক্ষেপ কাদায় পড়ার মতো ভারী হয়। পৌঁছোনো ধীর হয়ে যায়। আর তুমি আটকে থাকো, সেই অন্যের থেকে, যে সবসময় ঠিক সামনে থাকে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *