গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: বিশ



দেয়াল ভাগ করা যায়। মেঝে ভাগ করা যায়। ছাদ ভাগ করা যায়। পাইপ, নর্দমা, এমনকি সেই পাইপ-নর্দমার ভেতর দিয়ে ভেসে-আসা শব্দও ভাগ করা যায়। আলো নিভে গেলে অন্ধকারও ভাগ করা যায়, ঠান্ডাও। ভোর হলে ভোরও, ধূসরতাও, নীরবতাও। কিন্তু যা সত্যিই জরুরি, যদি ধরে নেওয়া যায়, জরুরি বলে আদৌ কিছু আছে, তা ভাগ করা যায় না। হয়তো কিছুই জরুরি নয়। তবু যদি কিছু থাকে, তবে তা ভাগ করবার জন্য নয়। দেয়াল অন্তত সেইটুকু রক্ষা করে।

নিচে একটি দোকান আছে। বহুদিন হলো বন্ধ। তুমি এখানে আসারও আগে থেকে বন্ধ। তবু সাইনবোর্ড এখনও ঝুলছে। কেউ খুলে নামায়নি। নামাতে হলে সিদ্ধান্ত লাগে; এই শহরে সিদ্ধান্ত নেবার মানুষ যেন ক্রমে ফুরিয়ে গেছে। বোর্ডটি বছরের পর বছর রোদ, বৃষ্টি, নোনা হাওয়ায় ক্ষয়ে গেছে। এখন আর লেখা পড়া যায় না। অথচ একসময় এই অক্ষরগুলোর মানে ছিল। তারা কারও নাম ছিল, কারও স্বপ্ন ছিল। কেউ কোনোদিন রং কিনে এনে, মাথার ওপর রোদ নিয়ে, ঘাম ঝরাতে ঝরাতে দাঁড়িয়ে নিজহাতে লিখেছিল নিজের নাম। এখন তা পড়া যায় না। হাওয়া, বৃষ্টি, সময়। সব মিলে মুছে দিয়েছে। রং চটে খসে গেছে; অক্ষরের শুধু ছায়া আছে, ভূতের মতো। আর অক্ষর নেই, অর্থ নেই, রয়ে গেছে শুধু বোর্ডের ওপর কিছু দাগ। সময় যথেষ্ট গেলে সব দাগই শেষপর্যন্ত মানহীন হয়ে যায়।

কখনো ওই সাইনবোর্ডের অর্থ ছিল: খোলা, আসুন, কিনুন, এখানে জিনিস মেলে। কী বিক্রি হতো? লোহালক্কড়, সামুদ্রিক সরঞ্জাম, দড়ি, লোহার আংটা, যন্ত্রপাতি। সে-রকম কিছু। এমন এক বাণিজ্যের উপকরণ, যার প্রয়োজন এখন অন্য কোথাও সরে গেছে, অথবা আর কোথাওই নেই। দোকানটি এখন খালি।

একদিন কাচে কম ময়লা থাকলে, তুমি দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকিয়েছিলে। হাতের তালু দিয়ে কাচ একটু ঘষে। পা থেমে গিয়েছিল দোকানের সামনে। ভেতরে প্রায় কিছুই নেই। ধুলো-ঢাকা কাউন্টার। খালি তাক, মাকড়সার জালে জড়ানো। মেঝের ওপর কয়েকটি হালকা চৌকো দাগ, যেখানে কোনোদিন কিছু দাঁড়িয়ে ছিল। আলমারি, অথবা প্রদর্শন-তাক, অথবা আর কোনো ভারী বস্তু। সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার অনুপস্থিতিই এখন সবচেয়ে দৃশ্যমান। যেমন দেয়াল থেকে ছবি নামালে রোদে-ফিকে-না-হওয়া অংশটি থেকে যায়। যেমন কারও চলে যাবার পর স্মৃতিতে তার না থাকা, থাকাকালের চেয়েও বেশি উচ্চারিত হয়ে ওঠে।

এই খালি দোকান ভরা দোকানের চেয়ে বেশি বাগ্মী। ভরা থাকলে সে কেবলই দোকান ছিল; খালি হয়ে অজান্তেই ধ্যানমগ্ন হয়ে গেছে। ব্যবহার, ব্যবহার বন্ধ হওয়া, আর ব্যবহার থেমে গেলে কী থেকে যায়। এই নীরব তত্ত্বই এখন তার একমাত্র প্রদর্শনী। মেঝের হালকা দাগ, ফিকে সাইনবোর্ড, ময়লা কাচ, ধুলো-ঢাকা কাউন্টার। এগুলোই তার অবশেষ। যেমন তোমার অবশেষ এখন ঘর, চেয়ার, কাপ। তুমি যেখানে ছিলে, সেখানেও হয়তো এমনই একটি হালকা চৌকো দাগ একদিন থেকে যাবে। না থাকার দাগ, যা থাকাকালের চেয়েও বেশি স্পষ্ট।

ওপরে আর কিছু নেই। তুমি সবচেয়ে ওপরের তলায় থাকো। তার ওপরে শুধু ছাদ, টালি, গাঙচিল, আকাশ। শূন্যের ওপর আরেক শূন্য। অর্থাৎ আকাশ, যার শেষ নেই, তলা নেই, ধরা যায় না। সাধারণত ধূসর। কখনো কখনো, খুবই কদাচিৎ, নীল। কিংবা এমন কিছু, যাকে চাইলে নীল বলা যেত, যদি তুমি এখনও এসবকে নামে ডাকতে আগ্রহী হতে। কিন্তু তুমি তো বহু আগেই নাম দেওয়া ছেড়ে দিয়েছ। আকাশের নিজস্ব কোনো নামের দরকার নেই। নীল বলো বা না বলো, সে যা, তা-ই। নাম তার জন্য নয়; তোমার জন্য।

আকাশ শব্দ ছাড়াই পূর্ণ। সমুদ্রও তেমনি, ঘরও। শব্দ তোমার যোগ-করা বাড়তি বস্তু, পৃথিবীকে দেওয়া তোমার অযাচিত দান, যা পৃথিবী কখনও চায়নি, যা ছাড়াও তার দিব্যি চলে। তোমাকে ছাড়াও যেমন চলবে। সময় একটি ভিন্নতা মাত্র।

ডানদিকে আরেকটি ঘর আছে। একটি দেয়াল তার আর তোমার মধ্যে। সেখানে কেউ আছে বলে মনে হয়। মাঝে মাঝে শোনা যায়। কিন্তু সেটা গলা নয়, স্পষ্ট পদশব্দ নয়, এমনকি চেনা জীবনযাপনের শব্দও নয়। অন্য কিছু। একধরনের মর্মর। রাতে বেশি শোনা যায়। যেন কোনো ভার নিজের অবস্থান বদলাচ্ছে। যেন কেউ বা কিছু অন্ধকারে নিজের জায়গা নতুন করে ঠিক করছে।

মানুষ কি না, তা তুমি জানো না। মানুষও হতে পারে, আবার নিছক জিনিসও। হয়তো জানালার ফাঁক দিয়ে ঢোকা হাওয়ায় পর্দা নড়ছে। হয়তো কাগজের স্তূপ আস্তে আস্তে বসে যাচ্ছে। হয়তো বহুদিনের পুরোনো কোনো কোট হুকে ঝুলে সামান্য দুলছে। দূরের বাতাসে, ভূতের মতো। তুমি খোঁজ নিতে যাও না। দেয়ালের কাছে গিয়ে কান পাতো না। শব্দ শোনো কি না, তা-ও শেষপর্যন্ত তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। শব্দ থাকুক বা না থাকুক, তুমি আর শব্দ আলাদা আলাদা ঘরে, একটি দেয়াল তোমাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এই দেয়াল তোমাদের কেউ বেছে নাওনি। তোমাদের আগেই এটি ছিল; তোমাদের পরেও থাকবে।

প্রশ্নটি এখানেই। বহু দার্শনিক এই প্রশ্ন তুলেছিলেন, কিন্তু তার সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। তুমিও এখন সেই একই প্রশ্নের মধ্যে বসে আছ, যেন প্রশ্ন না করেই প্রশ্ন করছ। চেয়ারে, নীরবে, ওই মর্মর শুনতে শুনতে। দেয়ালের ওপারে কি সত্যিই কোনো মন আছে? কোনো জীবন্ত কেউ? এমন কোনো চেতনা, যা তোমার মতো, কিংবা তোমার চেয়ে সম্পূর্ণ অন্যরকম, তবু দেখে, জানে, অনুভব করে? না কি সেখানে শুধু শব্দই আছে? মর্মর, নড়াচড়া, নিছক কিছু ঘটা? যে-কিছুই হতে পারে। ইঁদুর, পাইপ, ঢুকে-পড়া হাওয়া, ধীরে ধীরে বসে-যাওয়া কোনো পুরোনো বাড়ি, অথবা কেবল শূন্যতা।

তুমি জানো না। কোনোদিনই হয়তো জানতে পারবে না। সর্বোচ্চ যা করা যায়, তা হলো, শব্দ থেকে অনুমান করা যে, ওপারে কিছু আছে। কিন্তু “কিছু” মানে কী, “কেউ” মানে কে, সেই “কেউ” কি নিজেকেও জানে, সে সম্পর্কে কিছুই নিশ্চিত হওয়া যায় না। দেয়াল তা গোপন রাখে। সব দেয়াল যেমন রাখে, সব তল যেমন রাখে। আয়নায় নিজের মুখ দেখেও তুমি তার গভীরতর তল জানো না; মুখের পেছনে কী আছে, তা কোনো মুখই পুরো প্রকাশ করে না। তুমি ধরে নাও, মন আছে, চেতনা আছে, “আমি” আছে। কিন্তু এই ধারণা শেষপর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে শব্দের ওপরে, মর্মরের ওপরে। আর সেগুলো তো কোনো প্রমাণ নয়।

তুমি একা। অন্তত যতখানি পর্যন্ত তুমি সত্যিই জানতে পারো, তার ভেতরে। আর সেই জানা খুব দূর যায় না। তুমি নিশ্চিত জানো শুধু, দেয়াল আছে, শব্দ আছে। বাকি সবই অনুমান। যদি ধরে নেওয়া যায়, অন্যের মন আছে, তবে তা তোমার কাছে মৃত নক্ষত্রের আলোর মতোই দূর কোনো উৎস থেকে আসা সংকেত, যার অস্তিত্ব তুমি যাচাই করতে পারো না, আর হয়তো যার উৎস আর নেইও। হয়তো দেয়ালের পেছনের মর্মরও সেরকম। মৃত আলো, কোনো জীবনের দেরিতে-আসা কম্পন, যা হয়তো এখন আর নেই, বা কোনোদিন ছিলই না। তুমি জানো না।

আর এই না জানাটাই আসল দেয়াল। প্লাস্টার নয়, ইট নয়, না জানা। এটাই তোমাকে আলাদা করে সব কিছুর থেকে, সবার থেকে, অন্যের থেকে, যদি সত্যিই অন্য বলে কেউ থাকে, যদি “অন্য” আসলে দেয়ালেরই আরেক নাম না হয়। দেয়ালের কিছু যায় আসে না। এপাশে কে, ওপাশে কে। সে নিরপেক্ষ। সে তার কাজ করে: আলাদা করে, ভাগ করে, দূরে রাখে। এই কাজে দেয়াল খুবই দক্ষ। চামড়ার চেয়েও দক্ষ, মুখের চেয়েও, এমনকি শব্দের চেয়েও। যারা একসময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা নাকি মানুষকে যুক্ত করবে।

এক রাতে তুমি হাত রেখেছিলে দেয়ালে। তালু চেপে ধরে, একা। প্লাস্টারের ওপর। আর তখন টের পেয়েছিলে কী? ঠান্ডা। শুকনো ভাব। আর তারও নিচে, প্রায় অদৃশ্য, একটি সূক্ষ্ম কম্পন। কিন্তু সে কম্পন কোথা থেকে? ওপাশ থেকে? বাড়ির পুরোনো কাঠামো বসে যাচ্ছে বলে? না কি তোমার নিজের কবজির নাড়ি দেয়ালে লেগে ফিরে আসছিল? তুমি বলতে পারোনি। আর এই বলতে না পারাটাই তোমাকে শিখিয়েছে যে, তুমি কোনোদিন পুরো নিশ্চিত হতে পারোনি, যা অনুভব করছ, তা ভেতর থেকে আসছে, না বাইরে থেকে; কম্পন তোমার, না পৃথিবীর। যা দার্শনিকেরা বইভর্তি ভাষায়ও বলতে পারেননি।

দেয়ালের কাছে বসে এই শিক্ষা পাওয়া যায়। তুমি পেয়েছও। মাসের পর মাস। তাকের বই যতটা শেখাতে পারেনি, দেয়াল তার চেয়ে বেশি শিখিয়েছে। বই অন্যের কথা বলে; দেয়াল অন্যের কথা কিছুই বলে না, তবু তার নীরবতায় সব কিছু জানিয়ে দেয়। তুমি আর নও-তুমি’-র মধ্যে একটা সীমা আছে। আর সেই সীমা নিছক নিরর্থক নয়। বরং সীমা থাকল বলেই উষ্ণতা, অন্তরঙ্গতা, পৃথকতা, ধরা পড়া, এসব সম্ভব হয়।

দেয়াল না থাকলে ঘর বলে কিছু থাকত কি? “উষ্ণতা” শব্দটি হয়তো যথাযথ নয়, তবু কোনো একটা ভেতরকার অবস্থা তো থাকত না। আলাদা করে বলেই দেয়াল কিছু সম্ভব করে। যেমন কাপ আলাদা বলেই কাপ। হয়তো তার অন্তরঙ্গতা এইখানেই। যেখানে কাপ শেষ হয়, সেখানে তোমার হাত শুরু হয়। তুমি নিশ্চিত নও। কিন্তু অনুভব করো: দেয়াল শুধু আটকায় না, দেয়াল একটি শর্তও তৈরি করে।

ঠিক কী শর্ত, তার ভাষা তোমার কাছে নেই। দেয়াল নিজেও তা জানে না। তবু করে। কাপ যেমন করে, হাত যেমন করে। কোনো কাজ করে যাওয়া, কারণ না জেনেও, প্রশ্ন না তুলেও। যথেষ্ট। দেয়াল জানে না, কেন আলাদা করছে; সে শুধু আলাদা করে। তাতেই তার কাজ সম্পূর্ণ।

তুমি কেন বসে থাকো, তা তুমি জানো না। তবু বসে থাকো। বসে থাকো। অথচ তোমার জন্য “এটাই যথেষ্ট” বলে মেনে নেওয়া কঠিন। এখানেই তোমার আর দেয়ালের মধ্যে তফাত। দেয়ালের যথেষ্ট হওয়ার দরকার পড়ে না। তোমার পড়ে।

এই কারণেই হয়তো দেয়াল তোমার চেয়ে সুখী।

১২।

একটা-কিছু করো। একে খেলা বলবে কি না তুমি জানো না। অভ্যেস বলা যায়, হয়তো ধ্যান, হয়তো প্রার্থনা। যদিও প্রার্থনা কার প্রতি, তা স্পষ্ট নয়। পাথরের প্রতি? শূন্যের? না কি ধরা আর ছেড়ে দেবার মধ্যকার সেই অনুচ্চারিত নিয়মের প্রতি? জপমালার দানার মতো। প্রতিটি পাথর যেন এক-একটি শ্বাস, নাস্তিকের তসবিহ, যেখানে প্রতিটি ‘তুলে নেওয়া’ মানে একবার ধরা, আর প্রতিটি ‘নামিয়ে রাখা’ মানে একবার ছেড়ে দেওয়া।

ধরো, ছাড়ো। আবার ধরো, আবার ছাড়ো। যেন মানুষের সমগ্র দর্শন এই দুই আঙুলের ফাঁকে। এর চেয়ে বেশি কীই-বা শিখেছে মানুষ? ধরা, ছাড়া; জন্ম ধরা, মৃত্যু ছাড়া, আর মাঝখানে বাকি সব কেবল সেই দুইয়ের অন্তহীন অনুশীলন।

খেলাটি খুবই সহজ। তাসের মতো জটিল নয়। এতে কম জিনিস লাগে, কম আয়োজন, কম ব্যাখ্যা, কম ইচ্ছে। যার সবই একটু একটু করে কমে এসেছে, তার জন্য এই সরলতা মানানসই। তোমার আছে কিছু পাথর। সৈকত থেকে কুড়িয়ে আনা, কখনো একদিন, কখনো আরেকদিন, বহুবার যাওয়া-আসার ফাঁকে, মাসের পর মাস ধরে। ছোটো, মসৃণ, হাতে নিলে শীতল।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *