গল্প ও গদ্য

আবারটুকুই জীবন: একুশ



নানা রঙের, যদি এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলোকেও রং বলা যায়। এক ধূসরের থেকে আরেক ধূসরের সামান্য তফাত; এক বাদামির থেকে আরেক বাদামিরও তা-ই; প্রায়-সাদা, প্রায়-কালো, নীল-ধূসর, বাদামি-ধূসর, ধূসর-ধূসর। শেষে সবই এসে মিশে যায় সেই একই প্রধান বর্ণে, যা পাথরেরও, পৃথিবীরও, আর এই জানালা থেকে দেখা জীবনেরও। ধূসর।

কী উদ্দেশ্যে পাথর কুড়িয়েছ, তা জানো না। হয়তো কোনো উদ্দেশ্যই ছিল না। হাত নিজেই কুড়িয়েছে। যেমন হাত অনেক কিছুই করে তোমাকে জিজ্ঞেস না করে, তোমাকে না জানিয়েই। হাতেরও যেন নিজস্ব বুদ্ধি আছে, পায়ের মতোই। নিজস্ব নির্বাচন, নিজস্ব সঞ্চয়। কারণ যদি থেকেও থাকে, তা মনের নয়; শরীরের, স্নায়ুর, ত্বকের। যেখানে আঙুলের ডগায় পৃথিবী এসে লাগে, যেখানে চামড়া সবচেয়ে পাতলা, আর বাইরের জগৎ সবচেয়ে কাছে, সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। মন ততক্ষণে পৌঁছোয়ও না। পাথর কুড়িয়ে নেওয়া ঘটে যায়, মন পরে এসে জানতে পারে মাত্র।

তুমি হাঁটছ। পকেটে পাথর। কিন্তু তা তুমি জানোই না। পরে, ঘরে ফিরে, পকেটে হাত দিলে অবাক হয়ে পাথর পাও। একটা, দুটো, কখনো তিনটে। তারপর বাটিতে রাখো অন্যগুলোর পাশে। তারাও একইভাবে এসেছিল। প্রতিটি এক-একটি বিস্ময়, প্রতিটি হাতের একান্ত বাছাই, তোমার ঘোষিত ইচ্ছা নয়।

একবার একটি পাথর তুমি মুখেও দিয়েছিলে। কেন, তা জানা নেই। হয়তো হাতই তাকে ঠোঁটের কাছে এনেছিল; হয়তো ঠোঁট নিজেই খুলে গিয়েছিল। পাথরটি ঢুকে পড়েছিল মুখে। ছোটো, মসৃণ, প্রথমে ঠান্ডা, তারপর ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠছিল। মুখের তাপমাত্রা নিচ্ছিল, যেন তোমার শরীরের ভেতরে এসে তোমারই এক অংশ হয়ে যাচ্ছে। জিভ তাকে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দেখছিল, তার তল, তার ভাঁজ, তার ক্ষুদ্রতম খাঁজ চিনছিল, যা আঙুল বুঝতে পারেনি। মুখ পাথরকে হাতে ধরা থেকে বেশি গভীরভাবে জানে; চোখের চেয়েও বেশি। কারণ মুখই তো পৃথিবীর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্থান। হাতের আগে, চোখেরও আগে। যখন তুমি খুব ছোটো ছিলে, যা কিছু পেতে, মুখে নিতে। পৃথিবীকে প্রথম চিনেছিলে স্বাদে, ভেজায়, স্পর্শে। নামের আগে, ভাষার আগে।

তাই মুখে পাথর নেওয়া যেন সেই প্রথম পরিচয়ের কাছে ফেরা। শব্দের আগের এক জ্ঞান, নামের আগের এক নিবিড়তা, ফাঁকের আগের এক মিলন। কারণ মুখে পাথর নিলে মুহূর্তের জন্য ফাঁক কমে যায়। দর্শক তখন তেমন সক্রিয় থাকে না; কেবল জিভ ঘোরে, পাথর উষ্ণ হয়, আর তুমি আর পাথর এক সংক্ষিপ্ত নৈকট্যে এসে দাঁড়াও। কোনো কাচ ছাড়া, কোনো দেয়াল ছাড়া, কোনো দূরত্ব ছাড়া।

সম্ভবত পৃথিবীর সঙ্গে এইটুকুই সবচেয়ে কাছের মিলন, যা তুমি এখনও পেয়েছ। স্যুপের চেয়েও কাছে, রুটির চেয়েও। কারণ স্যুপ ও রুটি শরীরকে খাওয়ায়, কিন্তু পাথর তা করে না। পুষ্টি দেয় না, বাঁচায় না, শরীরের কাজে লাগে না। অথচ অন্য কিছু করে। সঙ্গ দেয়। মুখে চুপচাপ পড়ে থাকে। উষ্ণ, মসৃণ, নির্ভরযোগ্য। কিছু চায় না, কিছু দেয়ও না। শুধু থাকে। আর কখনো কখনো, এই “থাকা”-ই যথেষ্ট। এমনকি, এই যথেষ্টতাই সব কিছু।

একসময় পাথরটি মুখ থেকে বের করেছিলে। পরে বাটিতে রেখে দিয়েছিলে অন্য পাথরগুলোর সঙ্গে। কিন্তু মুখ ভুলে যায়নি। মুখ মনে রেখেছে তার উষ্ণতা, মসৃণতা, তার নিঃশব্দ উপস্থিতি। আর এইখানেই, ধীরে ধীরে, তুমি যেন জিনিসপত্র সম্পর্কে এক নতুন বোঝাপড়ার দিকে পৌঁছতে শুরু করেছ। ঘরের জিনিস, পাথর, কাপ, চেয়ার, টেবিল। এইসব নিয়ে, মাসের পর মাস ধূসরতার দিকে মুখ করে বসে থাকতে থাকতে।

জিনিস মরা নয়। জড়ও নয়। তারা বেঁচে আছে। এমনকি, কোনো কোনো দিক থেকে, তোমার চেয়েও বেশি বেঁচে আছে। তবে সে জীবন তোমার জীবনের মতো নয়। অন্য রকম। এমন এক রকম, যা বাঁচতে কোনো ফাঁক চায় না, কোনো দর্শক চায় না, নিজের সম্পর্কে কোনো সচেতনতা চায় না। পাথর মুখে থাকলে সে জীবিত, কাপ হাতে থাকলে সে জীবিত, চেয়ার তোমার ভার বইলে সে জীবিত। কিন্তু তোমার মতো নয়। জানা-সহ, দেখা-সহ, বিভক্ত চেতনা-সহ নয়। তারা ফাঁক ছাড়া জীবিত।

এবং, হয়তো এটাই আরও সত্যি জীবন, যে-জীবনকে নিজের জীবিত থাকার বোধ বইতে হয় না। নিজের অস্তিত্বের ভারে যার কষ্ট হয় না। জীবিত থাকার জন্য নিজেকে “আমি জীবিত” বলে জানতে হয় না। পাথর জানে না যে, মুখে এসে সে উষ্ণ হচ্ছে; জানার দরকারও নেই তার। উষ্ণতাটুকুই তার জীবন। সেটাই যথেষ্ট।

তখন তোমার মনে প্রশ্ন জাগে, ধরে রাখা কি কিছু খরচ করে? কাপ কি কষ্ট পায় কাপ হতে গিয়ে? টেবিল কি তার দাগ টের পায়? প্রতিটি দাগ কি তার কাছে ততটাই ভারী, যতটা প্রতিটি দিন তোমার কাছে? টেবিল কি নিঃশব্দে তোমার দিনের ভার বহন করছে, যেমন তুমি করছ? ধীরে ধীরে একটু একটু করে নুয়ে পড়ে, কাঠের ভেতরের আঁশে জমতে-থাকা ক্ষয়ে? তুমি জানো না। জানতে পারো না। টেবিল কথা বলে না। তবু তুমি দেখেছ, অথবা অন্তত টের পেয়েছ যে, টেবিলটি আগের মতো নেই। আসার সময়ের চেয়ে নিচু হয়েছে। কাপের নিচে দাঁড়ানো জায়গায় কাঠ নরম হয়ে এসেছে, দেবে গেছে, বার বারের ভারে ক্ষয়ে গেছে।

তখন মনে হয়, সম্ভবত, ধরে রাখাও বিনা ব্যয়ে ঘটে না। সম্ভবত জিনিসের যে-সৌন্দর্য তুমি এতদিন “উদাসীনতা” ভেবেছিলে, তা আসলে সহ্যশক্তি। কাপ চা ধরে আছে, কারণ সেটাই তার কাজ। যেমন তুমি থাকা ধরে আছ, কারণ সেটাও একরকম কাজ। টেবিল দাগ বইছে; তুমি দিন বইছ। দু-জনেই ঘরে, দু-জনেই নিজেদের মতো নুয়ে পড়ছ, অলক্ষ্যে, ধীরে, অভিযোগ ছাড়া। তাহলে জিনিসের যে শান্ত স্বভাব তোমাকে এতদিন আকর্ষণ করত, তার মানে হয়তো সহজতা নয়। হয়তো সহ্য, বহন, নির্বাক নিষ্ঠা।

তুমি ভেবেছিলে, জিনিসপত্রের মধ্যে যে-প্রশান্তি দেখো, তা আসে তাদের অনুভূতিহীনতা থেকে। কিন্তু যদি কাপের ধরে রাখায়ও কোনো খরচ থাকে? যদি টেবিলের দাগ বইবারও নিজস্ব পরিশ্রম থাকে? যদি না বলা মানেই না অনুভব করা না হয়? তুমিও তো অনেক কিছু বলো না, অথচ অনুভব করো। তবে কি কাপও তার নিজস্ব উপায়ে অনুভব করে? টেবিল? চেয়ার? তাদের ভাষা নেই বলেই কি তাদের ভেতরে কিছু নেই? তা কী করে নিশ্চিত হও?

এখানেই তুমি আবার ফিরে আসো পাথরের দিকে। পাথরের জীবনে পাথরের “জানা” লাগে না জীবিত হতে। বোধ হয় জিনিসের জীবন এইখানেই। অচেতন নয়, কিন্তু অনাবশ্যকভাবে সচেতন; মগ্ন, নিঃশব্দ, অবিভক্ত। তুমি হয়তো এই জীবনকেই এতদিন না জেনে দেখে গিয়েছ। ঘরে বসে। চেয়ারে। কাপের দিকে তাকিয়ে। কেতলির দিকে। টেবিলের দিকে। তারা সবাই নিজেদের মতো করে জীবিত। তোমার মতো নয়, কিন্তু তবু জীবিত। এবং হয়তো তোমার চেয়েও সুসংগত, তোমার চেয়েও নির্বিঘ্নভাবে।

পাথর মুখে দেবার দিন কিছু বদলে গিয়েছিল। তখনই প্রথম তুমি টের পেয়েছিলে জিনিসের এই অন্য রকম জীবন সম্পর্কে। যে নিজের জীবিত হওয়া সম্পর্কে কিছুই জানে না, সে-ও পূর্ণভাবে আছে। আর সেই টের পাবার সঙ্গে সঙ্গে তোমার ভেতরেও যেন কিছু খুলে গিয়েছিল, যা অনেকদিন ধরে বন্ধ ছিল। কাঁটাচুয়ার দিন থেকে। বাবার পিঠ চলে যাবার দিন থেকে। পৃথিবী যখন শিখিয়েছিল, হাত টেনে নাও, দূরে থাকো, বাড়িয়ো না।

হঠাৎ যেন আরেকটি শিক্ষা সামনে এল। এমনও কিছু আছে, যার দিকে হাত বাড়ানো যায়, ভয় ছাড়া। যা কাঁটা দেয় না, চলে যায় না। যা শুধু থাকে। পাথর, কাপ, চেয়ার। এই বোবা জিনিসগুলো। এরা সরিয়ে দেয় না। এরা সরে যায় না। ধৈর্য ধরে পড়ে থাকে, বহন করে, গ্রহণ করে।

তখন মনে হয়, পৃথিবী আসলে একরকম নয়। কাঁটাচুয়া যেটুকু দেখিয়েছিল, বাবার পিঠ যেটুকু শিখিয়েছিল, তার আড়ালে পৃথিবীর আরও একটি পাঠ ছিল। হাত বাড়ালে সবসময় ব্যথা হয় না। ডাকলে সবসময় সরে যায় না। কিছু কিছু জিনিস আছে পাথরের, কাঠের, মাটির, যারা থাকে, অপেক্ষা করে, নেয়, কিন্তু আঘাত দেয় না; কাছে আসে, কিন্তু ফিরে তাকাবার আগেই মিলিয়ে যায় না।

সাধারণ নিয়মে।

পাথরের নিয়ম। যেখানে রাখো, সেখানেই থাকে। মুখে, হাতে, বাটিতে, টেবিলে। নির্বাক, কিন্তু উপস্থিত। আর কখনো কখনো, উপস্থিত থাকাটাই সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার।

হাতের এখনও পছন্দ আছে। তোমার আর নেই। হাত এখনও বেছে নিতে পারে, তুমি পারো না। এইখানেই যেন হাতের প্রতি তোমার এক অদ্ভুত ঈর্ষা জন্মায়। হ্যাঁ, ‘ঈর্ষা’, যদি শব্দটি ঠিক হয়। যদিও ঈর্ষার মধ্যেও তো চাওয়া থাকে, আর তুমি আর চাও না। তাই একে ঈর্ষা না বলে হয়তো বিস্ময় বলাই ভালো। তুমি শুধু দেখো, হাত চাইছে, হাত বেছে নিচ্ছে, হাত সিদ্ধান্ত করছে; আর তুমি তাকে দেখছ এমনভাবে, যেন কোনো সম্পূর্ণ অপরিচিত সত্তাকে দেখছ, যে তোমার চোখের সামনেই এক অপরিচিত যুক্তিতে, অপরিচিত প্রয়োজনে, অপরিচিত এক অন্তর্জগতে কাজ করে যাচ্ছে। বিস্ময় এ-ই যে, সেই অপরিচিত সত্তাটি তোমার নিজের শরীরেরই একটি অংশ।

তাহলে এ-ও এক খেলা, যদি একে খেলা বলা যায়। টেবিলের ওপর রাখা বাটি থেকে তুমি পাথর বের করো। বাটিটা কাপ নয়; আলাদা, চ্যাপ্টা, চওড়া, প্রায় পাখির বাসার মতো। কোনো এক পুরোনো জীবনে হয়তো তাতে ফল রাখা হতো। যখন ফল ছিল, যখন জীবনে ফলের মতো সহজ, জ্যান্ত প্রাচুর্য ছিল। এখন সেখানে পাথর আছে। কুড়ি, তিরিশ, কিংবা তারও বেশি। তুমি গোনোনি। গুনতে পারতে, কিন্তু গুনবে না। কারণ একবার গুনে ফেললেই তারা পাথর থাকে না, সংখ্যা হয়ে যায়। সংখ্যা বিশেষভাবে বেঁধে ফেলে, সীমা টেনে দেয়; আর তুমি চাও, পাথরগুলো সংখ্যা হয়ে না থাকুক, অনির্দিষ্ট থাকুক, অগণিতের মতো মুক্ত থাকুক।

প্রতিটি পাথর যেন একটি পৃথক পৃথিবী। ছোটো, মসৃণ, হাতে ধরা যায়, এমন এক-একটি পৃথিবী। নিজস্ব ভূগোল আছে, নিজস্ব ঢেউ-খাওয়া সমতল, গোপন পাহাড়, ক্ষুদ্র উপত্যকা, অদৃশ্য ক্ষয়রেখা। প্রত্যেকের আলাদা ওজন আছে, তালুতে বসার নিজস্ব ভঙ্গি আছে, আলোর সঙ্গে নিজস্ব সম্পর্ক আছে। তুমি যখন পাথরটিকে আঙুলের ফাঁকে ঘোরাও, তখন সে এক মুখ দেখায়, তারপর আরেক মুখ, তারপর দুটির মাঝখানে এমন এক তৃতীয় উপস্থিতি, যা কোনো পূর্ণ মুখ নয়, তবু উভয়ের মধ্যবর্তী এক গোপন রূপ। সেই রূপটি শুধু নড়ার মুহূর্তেই দেখা যায়; এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে যাবার ভাসমান ক্ষণে। থেমে গেলেই তা মিলিয়ে যায়। যেন মানুষের মুখও তেমন। আয়নায় কোনো কোনো কোণে, কোনো কোনো আলোয়, হঠাৎ তার ভেতরের আরেকটি মুখ দেখা দেয়; কিন্তু তাকাতে গেলেই তা সরে যায়।

তুমি বাটি থেকে পাথর বের করো, একটি একটি করে, আর টেবিলের ওপর সাজাতে থাকো। কখনো সরল সারিতে, কখনো বৃত্তে, কখনো পেঁচানো রেখায়, কখনোবা এমনভাবে, যার কোনো স্পষ্ট নকশাই নেই। তুমি ওদের নাড়াও। এটাকে ওখানে, ওটাকে এখানে। কখনো রং মেনে দল করো, কখনো মাপ অনুযায়ী, কখনো এমন এক সূক্ষ্ম সাদৃশ্যের টানে, যার কোনো নাম তুমি দিতে পারো না। হাত যেন তা জানে, মন জানে না। হাত পাথর সরায়, মন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। চিরকালই তো তা-ই করে এসেছে। দেখে, কিন্তু বোঝে না; অংশ নেয় না, শুধু সাক্ষী থাকে। মন দর্শক, হাত খেলোয়াড়। আর তুমি? হয়তো তুমি শুধু সেই মঞ্চ, যেখানে এই ক্রিয়াগুলো ঘটে যাচ্ছে। স্বপ্নের সেই শূন্য ঘরের মতো, যেখানে কোনো কারণ ছাড়াই সব ঘটে, কোনো দর্শকের জন্য নয়, তবু ঘটে।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *