কখনো কখনো এই পাথর সরানোর কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। হাত সাজায়, ভাঙে, আবার সাজায়। মন হিসেব করে ফেলেছে, না চাইলেও, যেমন শরীর অনেক কিছু হিসেব করে ফেলে তোমাকে না জানিয়ে। ধরো, টেবিলের ওপর কুড়িটি পাথর। তারা যেন বর্ণমালার অক্ষরের মতো। প্রতিটি নতুন বিন্যাস যেন একটি নতুন বাক্য। তুমি লিখছ, অথচ পড়তে পারো না। অর্থ গোপন, তবু রচনা থামে না। সব কিছু একে একে সরে গেছে, কিন্তু মনোযোগ এখনও রয়ে গেছে। এইটুকুই শেষ আশ্রয়। সাজানোর সম্ভাবনা এত বেশি যে, সমুদ্রতীরের সব বালুকণার চেয়েও, আকাশের সব তারার চেয়েও তা অফুরন্ত মনে হয়। সারাটা জীবন বসে থেকেও তুমি হয়তো একই বিন্যাস দ্বিতীয় বার তৈরি করতে পারবে না। সম্ভাবনার প্রকৃতি এ-ই। যা ঘটেছে, তা সামান্য, কিন্তু যা ঘটতে পারত, তার বিস্তার অকল্পনীয়।
হাত যেন এই গোপন অসীমতার কথা জানে। সে ছোটোটুকু নিয়ে, বাস্তবের অল্প কয়েকটি পাথর নিয়ে, অফুরন্ত সম্ভাবনার দিকে হাত বাড়ায়। বাস্তব পাথরগুলোকে সে এমন সব সম্ভাব্য বিন্যাসের দিকে ঠেলে দেয়, যা তাদের মধ্যে কোনো একটিতে হয়তো আছে, কিন্তু পুরোপুরি নেই। হয়তো কোনোদিন কোথাও আরেক টেবিলে, আরেক ঘরে, আরেক জোড়া হাতে এমনই কোনো বিন্যাসের খোঁজ চলেছিল। হয়তো সেখানেও পৌঁছোনো যায়নি। কারণ হাত যেন এমন এক বিন্যাস খুঁজছে, যা ঠিক সেইটিই। যে-সাজানোয় পৌঁছোলেই তার নাড়াচাড়া থামত, তার খোঁজ শেষ হতো, একধরনের বিশ্রাম এসে নামত। শান্তি নয় ঠিক; বরং থামা, স্তব্ধতা, এমন এক মিলন, যেখানে আর সরানোর প্রয়োজন থাকে না। কিন্তু সেই বিন্যাসের জন্য তোমার কাছে কোনো শব্দ নেই। হয়তো হাতের কাছেও নেই।
সম্ভাব্য কারণ, হাত যা খুঁজছে, তা আদৌ কোথাও নেই। এ-ই এই খেলাটির স্বভাব, যদি একে খেলা বলা যায়। যা নেই, তাকে যা আছে, তার মধ্যে খোঁজা; দৃশ্যমান জিনিসগুলোকে সাজাতে সাজাতে অদৃশ্য কোনো সমগ্রতার দিকে এগোতে চাওয়া; অসম্ভবের পেছনে বাস্তবকে সরাতে থাকা। এ শুধু খেলার সংজ্ঞা নয়, পাগলামিরও নয়, বরং জীবনেরই আরেক নাম। তুমি সেই জীবনের বহু কিছুই ছেড়ে দিয়েছ; কিন্তু হাত ছাড়েনি। হাত এখনও থামেনি। হাত পাথর সরায়, সাজায়, ভাঙে, আবার সাজায়। সেই বিন্যাসের সন্ধানে, যা হয়তো কোথাও নেই, কোনোদিন ছিল না, তবু অনবরত আহ্বান করে।
এ-ই তো সাধারণ নিয়ম। খোঁজার নিয়ম। খোঁজা জানে না যে, তা বৃথা। অথবা জেনেও তাতে কিছু এসে যায় না। পরোয়া তো তাদের জন্য, যারা এখনও বোঝে যে, ‘বৃথা’ আর ‘উদ্দেশ্য’ আলাদা জিনিস। অথচ ‘বৃথা’-ই তো উদ্দেশ্যের গোপন কেন্দ্র। বৃথা উদ্দেশ্যের বিপরীত নয়, তার অন্তরতম সত্য। যেমন কার্পেট মেঝের বিপরীত নয়। কার্পেট সরালে যে-মেঝে দেখা যায়, সেটাই তো আগে থেকে ছিল। তেমনি প্রত্যেক উদ্দেশ্যের নিচে, খুব ভেতরে, চুপচাপ লুকিয়ে থাকে বৃথা। শুরু থেকেই। সে জানে। তবু থামে না।
তবু। চিরকাল তবু।
এখনও পড়ো, তবে আগের মতো নয়।
একসময় যে-ক্ষুধা ছিল, যে-ক্ষুধা একটি বইকে এক রাতে গিলে ফেলতে পারত, পাতা থেকে পাতায় দৌড়োত আগুন-ধরা বাড়ির ভেতর দিয়ে ছুটে-যাওয়া মানুষের মতো, জানালা থেকে জানালায়, ঘর থেকে ঘরে, সেই ক্ষুধা আর নেই। সে মরে গেছে। এখন বই হাতে নিলে ভারী লাগে। পাতাগুলো যেন কাগজ নয়, ছোটো ছোটো ফলক; অক্ষরগুলো স্থির থাকে না, চোখের সামনে সাঁতার কাটতে থাকে। বাক্যের ভেতর দিয়ে মানে এগোয়, আবার হঠাৎ মাঝপথে ডুবে যায় মাছের মতো। তুমি ধরতে যাও, সে পিছলে সরে যায়। ছিপ ফেলো, অপেক্ষা করো; কখনো হালকা টান পড়ে, কখনো কিছুই ওঠে না।
আগের সেই গ্রাসী ক্ষুধা ছিল অন্যরকম। সে খুঁজছিল কী, তুমি তখন হয়তো স্পষ্ট জানতেই না। হয়তো বেরোনোর পথ। হয়তো এমন কোনো বাক্য, যার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ, যে লিখেছে, আর লিখতে গিয়ে এমন কিছু জেনে ফেলেছিল, যা তুমি জানো না, অথচ জানতে চেয়েছিলে না জেনেই। বইয়ের পাতায় পাতায় তুমি হয়তো সেই অদৃশ্য অন্যজনকেই খুঁজতে, যে বুঝেছিল, যে আগে পৌঁছেছিল, যে তোমার বদলে ভাষাকে তার শেষসীমা পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে গেছে।
সেই ক্ষুধা চলে গেছে। ইচ্ছে, চাওয়া, যত্ন। যারা একে একে সরে গেছে, শব্দের ক্ষুধা তাদের সবার পরে গিয়েছে। খাবারের ক্ষুধা কমে যাবার পরেও তা ছিল। সঙ্গের ক্ষুধা নিভে যাবার পরেও ছিল। এমনকি সেই মেয়েটির জন্য আকুলতাও ফুরিয়ে যাবার পর, যার নাম এখন তলায় ডুবে গেছে, শব্দের ক্ষুধা তবু কিছুদিন টিকে ছিল। সে ছিল সবচেয়ে জেদি। শেষ অতিথি। যে উঠতে চায় না, বিদায় নিতে চায় না, ঘর খালি হয়ে যাবার পরেও কোণে বসে থাকে। শেষপর্যন্ত সে-ও গেছে, তবে সবার পরে।
এখন যা আছে, তা আর ক্ষুধার পড়া নয়। অন্যরকম পড়া। ধীর, উদাসীন, অনাগ্রহী নয়, তবু অনাবেগী। খোঁজার জন্য নয়, জেতার জন্য নয়, শেষ করবার জন্য নয়। যেন শ্বাস নেবার মতো। যান্ত্রিক, কিন্তু পুরোপুরি মৃতও নয়। একটি লাইন পড়ো, তারপর আরেকটি, তারপর হঠাৎ আবার প্রথমটিতে ফিরে যাও। কারণ প্রথম বার পড়া অনেকসময় পড়া হয় না; পড়া শুরু হয় দ্বিতীয় বার, তৃতীয় বার। যত বার লাগে। যত বার না শব্দগুলো গলে ভেতর দিয়ে নেমে যায়। স্যুপের মতো, সমুদ্রের মতো, বাতাসের মতো। কোনো স্পষ্ট দাগ না রেখে। আবার পড়ো, আবার। একই শব্দ, একই শূন্যতা। তবু কখনো কখনো, চতুর্থ বারে, কিংবা দশম বারে, হঠাৎ একটি শব্দ আটকে যায়। একেবারে সাধারণ শব্দ। কোনো আভিজাত্য নেই, কোনো ঘোষণা নেই। তবু আজ, কোনো কারণ ছাড়াই, তা চোখে লেগে থাকে, যেমন পেরেকে সুতো হঠাৎ আটকে যায়।
এই শব্দ আগেও হাজার বার পড়েছ। কখনো থামাওনি। আজ হঠাৎ তা স্রোতের অংশ না থেকে স্রোতে উঠে থাকা পাথর হয়ে দাঁড়ায়। তুমি থেমে যাও। তাকিয়ে থাকো তার দিকে। সমুদ্রের দিকে যেভাবে তাকিয়ে থাকো, দেওয়ালের ফাটলের দিকে যেমন তাকিয়ে থাকো। বুঝতে চাও না, তবু সরে আসতেও পারো না। আর তখন মনে হয়, শব্দটিও যেন তোমার দিকে ফিরে তাকিয়ে আছে। একই ধূসর ধৈর্যে, একই রাজি-হয়ে-থাকা ভঙ্গিতে, যেন সে তোমার দৃষ্টি সহ্য করছে, কিছু না দিয়েও, কিছু না চেয়েও।
একটা পুরোনো বই আছে। বহুদিনের। এমন এক ভাষায় লেখা, যা একসময় তুমি সাবলীলভাবে পড়তে জানতে। সেইসব ভাষা মুছে যাবার আগের ভাষা। ভাষা, যা একসময় জ্বলত, এখন কেবল ছাইয়ে-ঢাকা। তবু ছাই ঘেঁটে পড়া যায়। ঐশ্বরিক প্রহসনের সেই ভাষা, যেখানে এক মানুষ জীবনের মাঝপথে নেমে গিয়েছিল অন্ধকারের দিকে, বৃত্ত থেকে বৃত্তে, গভীরে, আরও গভীরে। আগুনের গন্ধ পেরিয়ে, ভয়ের অরণ্য পেরিয়ে, সে নেমেছিল সেখানে, যেখানে অভিশপ্তরা ঘুরে বেড়ায়। প্রতিটি বৃত্ত আগেরটার চেয়ে ছোটো, প্রতিটি যন্ত্রণা আগেরটার চেয়ে বেশি সুনির্দিষ্ট, বেশি মানানসই, বেশি নির্মমভাবে যথাযথ।
একসময় তুমি সেগুলোকে শাস্তি বলে পড়েছিলে। তখন ন্যায়বিচার এখনকার চেয়ে বড়ো কিছু ছিল তোমার কাছে। তখন মনে হয়েছিল, পাপ আছে, শাস্তি আছে, পরিমাপ আছে, উপযুক্ত পরিণতি আছে। এখন, এই চেয়ারে বসে, সব কিছু অন্যভাবে ধরা দেয়। এখন মনে হয়, বৃত্তগুলো শাস্তি নয়, অবস্থা। ঘুরে যাওয়াই জীবন। একই ভেতরে প্রতিদিন ওঠা, যাওয়া, ফেরা, আবার ওঠা, আবার ফেরা। এই পুনরাবৃত্তিই বৃত্ত। তুমিও তো সেই বৃত্তের মধ্যেই ছিলে, চলার দিনে। তখন জানতে না। যেমন যারা অভিশপ্ত, তারাও হয়তো জানে না। তারা এত ব্যস্ত ঘুরতে থাকে যে, টেরই পায় না, ঘোরাই আসল যন্ত্রণা। থামতে না পারাই।
আর সেই অন্ধকার বন? জীবনের ঠিক মাঝপথে যে-বনে ঢুকে পড়া, যেখানে সোজা পথ হারিয়ে যায়? একসময় তুমি ভেবেছিলে, এ কেবল মহাকাব্যের দৃশ্য। এখন বোঝো, তুমিও ঢুকেছিলে তেমন এক বনে। কোনো একসময়। থামার আগে। আবার এ-ও হতে পারে, থামাটাই ছিল সেই বনে ঢোকা। ঢোকাটাই থামা। সোজা পথ কখন, কোথায় হারিয়ে গেছে, তা আর মনে নেই। এখন তুমি বনের ভেতরেই আছ। আর বন ধীরে ধীরে ঘর হয়ে গেছে, ঘর বন হয়ে গেছে। নামার পথ, ফেরার পথ। দুটো আলাদা কি না, সে নিশ্চয়তাও নেই।
পার্থক্য আরেক জায়গায়। সেই নেমে-যাওয়া মানুষের সঙ্গে ছিল পথপ্রদর্শক। তোমার নেই। সেখানে কেউ নেই। কোনো ভার্জিল নয়, কোনো সঙ্গী নয়, কোনো কণ্ঠ নয়, যে বলে দেবে, এই পথ, এই নামা, এই অন্ধকারেরও একটি অর্থ আছে। তুমি একাই আছ। বনে, যা এখন ঘর। ঘরে, যা এখন বন। আর সেই একাকিত্বেই পড়ো। ধীরে, ফিরে ফিরে, একই শব্দের ওপর থেমে, যেন কোনো লাইন নয়, নিজেরই এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনি পড়ছ।
১৩।
তুমি নামছ। বৃত্ত থেকে বৃত্তে। এই নামা কোনো নাটকীয় অতলগমন নয়; এ নামা দিনের মধ্যে, কাপের মধ্যে, টেবিলের দাগের মধ্যে। প্রতিটি দিন যেন এক-একটি বৃত্ত। প্রতিটি অভ্যাস, প্রতিটি পুনরাবৃত্তি, প্রতিটি ক্ষয়। একটি করে নিচতল। তুমি আরও গভীরে যাচ্ছ, ধীরে, শব্দ না করে। এমন তলগুলোর দিকে, যেখানে আলো হঠাৎ নিভে যায় না, কেবল কমতে কমতে একসময় আর আলাদা করে তাকে আলো বলা যায় না। তার পরেও বৃত্ত আছে। তার পরেও দাগ। তার পরেও নামা।
এই পৃথিবী নামের টেবিলের ওপর তুমি একটার ওপর আরেকটা রেখেছ দিন, কাপ, দাগ, বিরতি, অপেক্ষা। না জেনেই যে, এগুলো কেবল সঞ্চয় নয়, এক-একটি অবতরণও। না জেনেই যে, নিচের দিক বলে কিছু আছে। না জেনেই যে, মানুষ নামতেও পারে।
আরেক জায়গায়, কবিতার ভেতরে, নরকের বৃত্তের বাইরে, আরেক অঞ্চল আছে। একটি পাহাড়, একধরনের অপেক্ষার ভূখণ্ড। সেখানে যারা আছে, তারা অভিশপ্ত নয়, কিন্তু মুক্তও নয়। তারা স্থগিত। মুক্তি তাদের হাতে নয়; তা আসবে, যদি আসে, নিজের সময়ে। তারা অপেক্ষা করছে এমন কিছুর জন্য, যার তারিখ তারা নির্ধারণ করতে পারে না।
সেই অপেক্ষাকারীদের মধ্যে একজন আছে, যাকে তুমি অদ্ভুত অন্তরঙ্গতায় চেনো। সে উঠে দাঁড়ায় না, নড়ে না, মাথা তোলে না। পাথরের ছায়ায় বসে আছে, মাথা দুই হাঁটুর মাঝে গুঁজে, হাত দিয়ে হাঁটু জড়িয়ে, যেন আবার ভ্রূণের ভঙ্গিতে ফিরে গেছে। কবি তার পাশ দিয়ে চলে যায়, তবু সে ওপরে তাকায় না, অভিবাদন করে না, নিজের অবস্থার ব্যাখ্যা দেয় না। সে কেবল অপেক্ষা করছে। যতদিন বেঁচে আছে, ততদিন তাকে আবার অপেক্ষা করতে হবে; তার পরে হয়তো ওঠা শুরু হবে। হয়তো। কিন্তু সেই “হয়তো” নিয়েও তার কোনো অস্থিরতা নেই। অপেক্ষাকে সে মেনে নিয়েছে। প্রতিবাদ ছাড়া। অভিযোগ ছাড়া। বুঝে নিতে হবে, এমন কোনো জেদ ছাড়া।
সে বসে আছে ছায়ায়, মাথা হাঁটুর মধ্যে, এমনভাবে, যেন অপেক্ষা নিজেই তার একমাত্র ভঙ্গি হয়ে গেছে। কোনো কিছুর জন্য নয়, কোনো আশা নিয়ে নয়, এমনকি হতাশা নিয়েও নয়। শুধু অপেক্ষা। শুধু বসে থাকা। আর তখন তুমি চিনে ফেলো তাকে। এ তো তুমিই। বরাবরই। পাথরের ছায়া তোমার চেয়ার, মাথা হাঁটুর কাছে নামানো তোমার ধূসরতা, না নড়া তোমার দিনযাপন। যতদিন বেঁচে আছ, ততদিন যেন এই বসে থাকা চলবে। এ আশায় যে, যদি এরপর সত্যিই কোনো ওঠা থেকে থাকে, যদি কোনোদিন কোনো উর্ধ্বগমন শুরু হয়। তুমি জানো না। সে-ও জানে না। জানতে হয়ও না। অপেক্ষাই যথেষ্ট। ছায়াই যথেষ্ট। পাথর, হাঁটু, মাথা, স্তব্ধতা। এই সামান্য উপকরণেই যেন পূর্ণ হয়ে গেছে সমগ্র অবস্থা।
আবারটুকুই জীবন: বাইশ
লেখাটি শেয়ার করুন