গল্প ও গদ্য

আত্মার পাশে বসে

আমাদের ভেতরে একটা আমি আছে। তাকে চিনতে হয়, তাকে বুঝতে হয়। এই চেনার ও বোঝার পথটা সহজ নয়। তবে সহজ করে ভাবতে শিখে নিলে সেই আমি'র কাছাকাছি পৌঁছোনো যায়। যা জানি, তা মাথা থেকে সরিয়ে ফেলতে হয়। যা ভাবি, তা ভাবনা থেকে সরিয়ে ফেলতে হয়। এই দুইটি কাজ করতে না পারলে নতুন সেই পথে ঠিকভাবে হাঁটা যায় না।

আমি যা ভাবি এবং যা অনুমান করে নিই, তা সত্য না-ও হতে পারে। এইটুকু মেনে নিতে হয়। মেনে নিতে না পারলে দুঃখ আসে প্রায়‌ই। কাউকে বন্ধু বানাতে চাইলে, কার‌ও সাথে সম্পর্ক গড়তে চাইলে প্রথমেই তার সম্পর্কে যা যা অনুমান করি, তার সবকিছুই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হয়। এরপর আমার নিজের ভেতরের আমি'র সাথে তার ভেতরের আমি'টা গল্প করতে শুরু করে। বন্ধুত্বের শুরুটা মোটামুটি এরকমই।

আমাদের সবার মধ্যেই একটা জাদু আছে। অদৃশ্য সেই জাদু আমাদের মধ্য থেকে সুন্দরকে বাইরে নিয়ে আসে, শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। বেশিরভাগ মানুষই নিজের কাঁধে দুঃখ ব‌ইতে ব‌ইতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন আর ইচ্ছে করে না নতুন পথে হাঁটতে। অদৃশ্য জাদুটা এভাবেই আড়ালে থেকে যায়। থাকতে থাকতে একদিন কোথায় যেন হারিয়ে যায়।

সুখ কী? এ এমন‌ই এক অনুভূতি, যা মানুষ অনুভব করতেই ভুলে যায়। আত্মার সাথে যে নিরন্তর আলাপ, যা মানুষকে আলোর খোঁজ দেয়, তা থেকে দূরে সরে থাকতে থাকতে মানুষ একসময় ধরেই নেয়, চোখের সামনে যতটুকু দেখা যায়, তার বাইরে আর কিছু নেই, তা থেকে সরে দাঁড়াবার চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই।

মানুষ পুরো পৃথিবীর সাথে বন্ধুত্ব পাতানোর চেষ্টা করে, অথচ নিজের হৃদয়ের সাথে দূরত্ব রেখে চলে আমৃত্যু। নিজের চাইতে বিশ্বস্ত আর কে হয় পৃথিবীতে! এইটুকু বুঝতে পারে না বলেই মানুষ এমন মানুষ বেছে নেয়, যে মানুষটা তার ভেতরের মানুষটার মতো নয়। শেষমেশ, মানুষ নিজেকেও হারায়, বন্ধুও হারায়।

মানুষ যতটা পরের বিচারে চলে, ততটা নিজের বিচারে চলে না। সুখী হবার প্রথম ধাপ‌ই হচ্ছে, নিজের বিচারে বাঁচার পর হাতে সময় থাকলে এবং সেই বাড়তি সময়টুকু খরচ করতে ইচ্ছে করলে তবেই পরের বিচারে চলা। লোকের মতামতের পাশে বসে নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করার চাইতে নিজের আত্মার পাশে বসে নিজের মনের সাথে বোঝাপড়া করা অনেক বেশি স্বস্তির ও কাজের।

মা যেভাবে তাঁর সন্তানের যত্ন নেন, ঠিক তেমনিভাবে যেদিন থেকে আমরা আমাদের ভেতরের আমি'র যত্ন নিতে শিখি, সেদিন থেকেই আমাদের চোখ খুলে যায়, আমরা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আলোর দিকে চলতে শুরু করি।
লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *