জাপানের একটা পাহাড়। তার গায়ে সরু পথ দিয়ে যেতে হয় অনেকটা। গিয়ে এক সমতলভূমি। সেখানে একটা ছোটো দিঘি। পাহাড়ের গায়ে বড়ো বড়ো গুহামতো কিছু জায়গা, সেগুলির একটাতে বুদ্ধদেবের মূর্তি আছে। আকারে বেশ বড়ো। মাঝে মাঝেই চারপাশের গ্রাম থেকে লোকজন আসে মূর্তির কাছে, পুজো-পাঠ করে, সেই মূর্তি সাজায়, বুদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকে, ধূপধুনো জ্বালায়, ভোগ নিবেদন করে, আবার গ্রামে ফিরে আসে।
ছোট্ট একটা ছেলে; সে-ও সুযোগ পেলে মায়ের হাত ধরে সেখানে যায়, মূর্তির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। তার ভীষণ ভালো লাগে তাকিয়ে থাকতে, ওখান থেকে আসতেই ইচ্ছে করে না। কিন্তু ফিরতে তো হয়, অগত্যা ফিরে আসে। এমনি করে করে যখন সে একটু বড়ো হলো, তখন আশেপাশের মানুষ যখনই কোনও উপলক্ষ্যে ওখানে যেত, সে-ও তাদের সঙ্গ নিত। যাওয়াটা আরও ঘনঘন হতে লাগল। একসময় এমন হলো, তার আর ফিরে আসতেই ইচ্ছে করে না, ওখানেই থেকে যেতে ইচ্ছে করে, অপলক দৃষ্টিতে শুধু বুদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করে।
শেষপর্যন্ত এমন একদিন এল যে তার আর ঘরে থাকাই দায়, নিজেকে ঘরে আটকে রাখা তার পক্ষে রীতিমতো অসম্ভব হয়ে পড়ল। হঠাৎ সে নিজের ঘরবাড়ি ছেড়েছুড়ে সেই পাহাড়ের উপর নির্জন স্থানে গিয়ে রয়ে গেল। সারাদিনই সে বুদ্ধমূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকে। যারা পুজো দিতে আসে, তাদের নিবেদন-করা প্রসাদ যা ওকে খেতে দেয় বা এখানে-ওখানে পড়ে থাকে, তা-ই খায়। কারও কাছেই কিছু চায় না সে; তার কোনও চাওয়া নেই, প্রত্যাশাও নেই, সারাদিন তার মাথায় এক বুদ্ধেরই চিন্তা। বুদ্ধের রূপ ও জীবন নিয়ে সে সারাক্ষণই মগ্ন হয়ে থাকে... মানুষটা কেমন ছিলেন, তাঁর জীবনটা কেমন ছিল।
এভাবে ভাবতে ভাবতে সে বুদ্ধের সম্পর্কে যা পড়েছে বা শুনেছে বা জেনেছে, সেসব যেন একান্ত ধ্যানে প্রাণ দিয়ে অনুভব করে, চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পায়। গ্রামের লোকজন এসে ওকে বার বার বলে ঘরে ফিরে যেতে, কিন্তু সে কিছুতেই ওখান থেকে নড়ে না। কী এক আশ্চর্য ঐশ্বর্যের সন্ধান পেয়েছে সে ওখানে! শেষমেশ সবাই হাল ছেড়ে দিল।
এখন তার বয়স হয়ে গেছে। বুদ্ধের ভাবনাতেই তার জীবন কেটে যায়। সারাক্ষণই সে বুদ্ধতেই লীন হয়ে থাকে যেন!
একদিন সে দিঘির পাড়ে বসে আছে। বুদ্ধের ধ্যানে তন্ময়, বাহ্যিক কোনও হুঁশ নেই। কিছু মানুষ এসে তার উদ্দেশে স্তবস্তুতি, ধূপধুনো, ভোগ নিবেদন করতে লাগল। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে সে ভীতকণ্ঠে বলল, এ কী হচ্ছে? কী করছেন আপনারা? বুদ্ধমূর্তি তো ওখানে, এখানে কেন আমাকে এসব নিবেদন করছেন?
ওরা উত্তর দিল, আপনাতে আর ওতে তো আমরা কোনও পার্থক্য দেখতে পাচ্ছি না।
এ কথা শুনে সে লজ্জায় মাথা নিচু করল, আর তখনই জলের গায়ে দেখতে পেল, তার অবয়বও বুদ্ধের মতো শান্ত, সুন্দর, সৌম্য হয়ে গেছে। তার চোখে যেন আর কিছুই ধরা পড়ছে না।
এমনই এক অখণ্ড চেতনায় পৌঁছে গেলে উপাস্য ও উপাসক এক হয়ে যায়। সারাক্ষণই ঈশ্বরের অভাববোধ সাধকের মন ও শরীরকে যে এতটা আচ্ছন্ন করে রাখে, এর নামই তপস্যা। এই অভাবটা অনুভব করতে পারা খুব জরুরি। অতটা পূর্ণ হতে চাইলে সবার আগে নিজেকে একেবারে শূন্য করে ফেলতে হয়। এই শূন্যতা অনুভব করাই হচ্ছে সাধনার প্রথম ধাপ। এই ধাপ পেরোতে পারলে গ্রহণসামর্থ্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়; একসময় আর কষ্ট করে সাধনায় মন বসাতে হয় না, মন আপনাআপনিই ওতে রয়ে যায় পাকাপোক্তভাবে। যে মানুষ শূন্য হতে জানে না বা চায় না, সে কখনোই পূর্ণতার দেখা পায় না।
উপাস্যের ছায়া
লেখাটি শেয়ার করুন